যজুর্ব্বেদীয়া
সম্পাদক ও অনুবাদক পণ্ডিত শ্রীযুক্ত দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ।
প্রিন্টার—শ্রীআশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়। মেটকাফ্ প্রেস, ৭৬ নং বলরাম দে স্ট্রীট, কলিকাতা।
চতুর্থ ও পঞ্চম সংখ্যায় কঠোপনিষৎ সমাপ্ত হইল। আমরা প্রথমেই বলিয়াছি, যে, উপনিষৎ মাত্রই ব্রহ্মবিদ্যা-প্রকাশক, সেই ব্রহ্ম-বিদ্যাই সংসার-সাগরে নিমগ্ন মানব মণ্ডলীর উদ্ধারের একমাত্র তরণী, এবং ত্রিতাপ-তাপিত মানব হৃদয়ে শান্তিপ্রদ মহৌষধি। কিন্তু যাহাদের পরলোকে বিশ্বাস নাই, আত্মার নিত্যত্বে শ্রদ্ধা নাই, এবং বেদ ও ঋষিবাক্যে আস্থা নাই, কেবল দেহমাত্র পরিচালন ও তৎপরিপোষণই যাহাদের একমাত্র কার্য্য, অধিকন্তু, “ন স্বর্গো নাপ- বর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ।” স্বর্গ নাই অপবর্গ(মোক্ষ) নাই, এবং পরলোকগামী আত্মাও নাই, ইহাই যাহাদের মূলমন্ত্র, অন্ধের নিকট দর্পণের ন্যায় ব্রহ্মবিদ্যাও তাহাদের সমীপে আত্মপ্রকাশনে সমর্থ হয় না—তৈলসিক্তদেহে জল- সেকের ন্যায় ভাসিয়া যায়। এই কারণে লোক-হিতৈষিণী শ্রুতি, মাতার ন্যায় পুত্রকল্প মুগ্ধ মানবমণ্ডলীর মায়া-মোহ নিবারণার্থ নানা উপায়ে ও বিবিধ প্রকারে সেই ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ প্রদান করিয়াছেন।
বিষয় উৎকৃষ্ট হইলেও উত্তম আদর্শের অভাবে অনেক সময় তদ্বিষয়ে দৃঢ় ধারণা বা ঐকান্তিক আগ্রহ হয় না; পরন্তু উত্তম আদর্শ সম্মুখে থাকিলে, অতি দুর্বোধ্য বিষয়ও সহজেই শ্রোতার হৃদয়ে ‘প্রবেশ করিতে সমর্থ হয়। এই কারণে শ্রুতি নিজেই দয়াপরবশ হইয়া এই উপনিষদে একটি সুন্দর আখ্যায়ি- কার অবতারণাপূর্ব্বক ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশ করিয়াছেন—
সরলস্বভাব, শিশু, ঋষিকুমার নচিকেতা প্রশ্নকর্তা, আর স্বয়ং প্রেতাধিপতি যমরাজ তাহার উত্তরদাতা; প্রধান প্রষ্টব্য বিষয়—মৃত্যুর পর এই স্থূলদেহ বিনষ্ট হইয়া গেলেও, আত্মার অস্তিত্ব থাকে কিনা অর্থাৎ সেই আত্মার লোকান্তরে গমন হয় কি না?
একদা নচিকেতার পিতা উদ্দালক ঋষি একটি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। যজ্ঞটির নাম ‘বিশ্বজিৎ’। যজ্ঞান্তে উপযুক্ত দক্ষিণা দান না করিলে সমুচিত ফল লাভ করা যায় না। দক্ষিণার মধ্যেও গো-দক্ষিণা সবিশেষ প্রশস্ত; তাই
10
ঋষি উদ্দালক যজ্ঞ-দক্ষিণার্থ কতকগুলি অদেয় গো দান করিতে প্রস্তুত হইলেন। তদ্দর্শনে শিশু, সরলহৃদয় নচিকেতার মনে বড় বেদনা উপস্থিত হইল; নচিকেতা ভাবিতে লাগিলেন—পিতা এ কি কার্য্য করিতেছেন—শীর্ণকায়, আসন্নমৃত্যু এই সকল অদেয় গাভী দক্ষিণা দান করিয়া ধর্ম্মের বিনিময়ে যে, অধর্ম্ম সঞ্চয় করিতেছেন! দুঃখময় নরকের দ্বার উন্মুক্ত করিতেছেন! আমি পুত্র, প্রাণ দিয়াও ইঁহার কিঞ্চিৎ উপকার-সাধন আমার একান্ত কর্তব্য। তখন নচিকেতা আর স্থির থাকিতে পারিলেন না; শ্রদ্ধাপরবশ হইয়া ব্যাকুলহৃদয়ে পিতার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন—পিতঃ! আপনি ত সমস্ত সম্পত্তিই দান করিতেছেন; আমিও আপনার একটি সম্পত্তি; আমাকে কাহার উদ্দেশে দান করিবেন?’ বারংবার প্রত্যাখ্যাত হইয়াও যখন নচিকেতা নিবৃত্ত না হইয়া আত্মদানার্থ পিতাকে নির্ব্বন্ধাতিশয় জ্ঞাপন করিতে লাগিলেন, তখন পিতা উদ্দালক ক্রোধান্ধ হইয়া প্রাণসম প্রিয় পুত্রকে বলিয়া ফেলিলেন—‘তোকে যমের উদ্দেশে দান করিলাম।’
শিশু নচিকেতা অতি অল্পমাত্রও বিচলিত না হইয়া পিতার আদেশ শিরো- ধারণপূর্ব্বক যমালয়াভিমুখে প্রস্থান করিলেন; যথাকালে তিনি যমভবনে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, যমরাজ গৃহে নাই। তিনি যমের আগমন প্রতীক্ষায় সে স্থানেই অনশনে বাস করিতে লাগিলেন। এইরূপে ত্রিরাত্র অতীত হইল। যমরাজ যথাকালে প্রত্যাগত হইয়া নচিকেতার সংবাদ অবগত হইলেন এবং তৎসমীপে উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন-“হে ব্রাহ্মণ! তুমি তিন রাত্রি অনাহারে আমার গৃহে অতিথিরূপে বাস করিয়াছ; ইহাতে আমার মহা অপরাধ হইয়াছে। সেই তিন দিনের অপরাধ ক্ষালনের নিমিত্ত আমি তোমাকে তিনটি বর দিতেছি; তুমি ইচ্ছামত অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর।”
নচিকেতা বয়সে শিশু হইলেও জ্ঞানে প্রবীণ; তাই তিনি প্রথম বরে পিতৃ- ভক্তির নিদর্শন স্বরূপ পিতার মানসিক শান্তি বা অনুদ্বেগভাব প্রার্থনা করিলেন; দ্বিতীয় বরে স্বর্গসাধন অগ্নিবিদ্যা প্রার্থনা করিলেন। যমরাজ ‘তথাস্ত’ বলিয়া বিনা আপত্তিতে ঐ উভয় প্রার্থনা পরিপূরণ করিলেন।
অনন্তর নচিকেতা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন-তৃতীয় বরে কি প্রার্থনা করি? দুর্লভদর্শন যমরাজের সমীপে সমাগত হইয়া যে, অকিঞ্চিৎকর, নশ্বর,
1/0
ধন, জন, ভোগৈশ্বর্য্য প্রার্থনা করা, তাহা ঠিক রত্নাকরের নিকট উপস্থিত হইয়া শুক্তি-শম্বুক প্রার্থনারই অনুরূপ। অতএব, ঐ সকল বিষয় প্রার্থনা করা হইবে না। যমরাজ যখন মৃত্যুর ঈশ্বর—প্রেতাধিপতি, তখন ইঁহার নিকট হইতে পরলোকের খবরটা জানিয়া লই—মানুষ মরিয়া কি হয়। যম ভিন্ন আর কেহই ইহার প্রকৃত তত্ত্ব জ্ঞাপনে সমর্থ হইবে না। অতএব ইঁহার নিকট পরলোকতত্ত্ব জিজ্ঞাসা করাই শ্রেয়ঃ। এইরূপ আলোচনার পর নচিকেতা যমরাজ-সমীপে প্রার্থনা করিলেন—
“যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে, অস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি চৈকে। এতদ্বিদ্যাম্ অনুশিষ্টস্বয়াহং বরাণামেয বরস্তৃতীয়ঃ ॥”
প্রভো! ‘মনুষ্য মরিলে পর কেহ বলেন, সেই মনুষ্যাত্মা পরলোকে থাকে, আবার কেহ বলেন থাকে না; এই যে, একটা বিষম সংশয় রহিয়াছে, আপনার নিকট ইহার প্রকৃত তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করি। অর্থাৎ মৃত্যুর পর দেহনাশেই সব শেষ হইয়া যায়, না—তাহার পরও আবার আত্মাকে সুখ-দুঃখ ভোগের নিমিত্ত ভিন্ন ভিন্ন লোকে বিভিন্নপ্রকার জন্ম পরিগ্রহ করিতে হয়? ইহার প্রকৃত তত্ত্ব উপদেশ দিয়া আমার পূর্ব্বোক্ত সংশয়চ্ছেদন করুন।’
এখানে বলা আবশ্যক যে, খৃষ্টান ও মুসলমান ধর্ম্মে যেরূপ মৃত্যুর পর বিচারার্থ চিরাবস্থিতি এবং বিচারান্তে অনন্ত স্বর্গ বা অনন্ত নরকবাসের কল্পনা করা হয়, নচিকেতা সেরূপ আত্মাস্তিত্ব জানিতে চাহেন নাই; তিনি জানিতে চাহেন, একই অভিনেতা যেমন আবশ্যকমত এক একটি পরিচ্ছদ পরিত্যাগ পূর্ব্বক নানাবিধ নূতন নূতন পরিচ্ছদ পরিগ্রহ করিয়া থাকে, তেমনি একই আত্মা বিভিন্ন কর্মফল ভোগের উদ্দেশে জন্মের পর জন্ম—মৃতুর পর মৃত্যু এবং দেহের পর দেহান্তর ধারণ করেন কি না? ইহাই নচিকেতার প্রধান জিজ্ঞাস্য বিষয়।
যম দেখিলেন, এই বালকটি শিশু হইলেও বড় সহজ পাত্র নহে; একেবারে আমার গুহ্যতত্ত্ব—ঘরের খবর জানিতে চাহে! যাহা হউক, ইহাকে পরলোকতত্ত্ব বলা হইবে না, অপর বিষয় দিয়া বিদায় করিতে হইবে। ইহার পর তিনি নচিকেতাকে বিবিধ ভোগৈশ্বর্য্য ও দীর্ঘায়ু প্রভৃতির প্রলোভনে বিমুগ্ধ করিতে চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। কিন্তু ধীর-প্রকৃতি নচিকেতা অটল অচল,—কিছুতেই
190
লক্ষ্যভ্রষ্ট হইলেন না। তখন যমরাজ সন্তুষ্ট হইয়া নচিকেতার প্রশ্নের উত্তর দিতে আরম্ভ করিলেন,—
তিনি বলিলেন,—সৎ-চিৎ-আনন্দময় ব্রহ্মই একমাত্র সৎপদার্থ, তদতিরিক্ত সমস্তই অসৎ—মিথ্যা। সেই ব্রহ্মই প্রতিদেহে প্রবিষ্ট হইয়া জীবরূপে ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞায় অভিহিত হন। অগ্নি যেরূপ নানাবর্ণের কাচপাত্রের মধ্যগত হইয়া নানারূপে প্রতিভাত হয়, অথচ অগ্নি যাহা তাহাই থাকে, কিছুমাত্র বিকৃত হয় না, তদ্রূপ সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্মও জীবরূপে নানাবিধ উপাধিগত হইয়া নানাকারে প্রকাশমান হইয়াও আপনার: সচ্চিদানন্দময় স্বভাব পরিত্যাগ করেন না, নিজে নিত্যশুদ্ধ, নির্ব্বিকার রূপেই অবস্থান করেন।
জীব ও ব্রহ্ম মূলতঃ এক হইলেও ব্যবহার-ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য ঘটে। জীব স্বীয় শুভাশুভ কর্মফলে স্বর্গনরকাদি লোকে গমন করে, এবং সমুচিত সুখদুঃখ ভোগ শেষ করিয়া পুনশ্চ জন্মধারণ করে।
“যোনিমধ্যে প্রপদ্যন্তে শরীরত্বায় দেহিনঃ।
স্থাণুমন্যেহনুসংযন্তি যথাকর্ম্ম যথাশ্রুতম্ ॥”
কোন কোন দেহী নিজ নিজ কৰ্ম্ম ও জ্ঞান(উপাসনা) অনুসারে যোনিদ্বার প্রাপ্ত হয়(জরায়ুজ হয়); কেহ কেহ বা স্থাবরদেহ প্রাপ্ত হয়; কিন্তু, ব্রহ্ম কোনরূপ ফলই ভোগ করেন না--কেবল উদাসীন ভাবে জীবের কর্ম্ম ও ফলভোগ দর্শন করেন মাত্র। এই কারণেই শ্রুতি “ছায়াতপৌ ব্রহ্মবিদো বদন্তি।” ইত্যাদি বাক্যে আলোক ও অন্ধকারের তুলনায় উভয়ের পার্থক্য প্রদর্শন করিয়াছেন।
জীব যখন নিত্য নির্বিকার ব্রহ্মেরই স্বরূপ, তখন তাহার অত্যন্ত উচ্ছেদ বা বিকার কোন প্রকারেই সম্ভবপর হয় না; সুতরাং দেহপাতের সঙ্গে সঙ্গে তাহার বিনাশও কল্পনা করা যাইতে পারে না। তাই শ্রুতি অতি গম্ভীরস্বরে বলিয়াছেন যে, “অস্তীত্যেবোপলব্ধব্যঃ,” অর্থাৎ নিত্য সত্য আত্মা আছে, এইরূপই বুঝিতে হইবে; দেহপাতের পর বিনষ্ট হইয়া যায়, এরূপ মনে করিতে হইবে না।
কিন্তু, যাহারা দেহাত্মবাদী, অজ্ঞানান্ধ, প্রমত্ত, হিতাহিত-চিন্তারহিত এবং ধনমদে মত্ত, তাহারা কখনই এই ধ্রুবসত্য পরলোক-তত্ত্বটি উপলব্ধি করিতে পারে না, বা উপলব্ধি করা আবশ্যকও মনে করে না। তাহার ফলে পারলৌকিক
1e’o
কল্যাণ সাধনেও প্রস্তুত হয় না; এবং কোনরূপ সৎক্রিয়া বা অধ্যাত্ম-চিন্তায় মনোনিবেশ করে না; পরন্তু উচ্ছৃঙ্খলভাবে যাহা ইচ্ছা, তাহাই করিয়া থাকে। তাহাদের সম্বন্ধে যমরাজ বলিয়াছেন—
ন সাম্পরায়ঃ প্রতিভাতি বালং, প্রমাদ্যন্তং বিত্তমোহেন মূঢ়ম্। ‘অয়ং লোকঃ, নাস্তি পরঃ, ইতি মানী, পুনঃ পুনর্বশমাপদ্যতে মে ॥
অর্থাৎ বালস্বভাব(অবিবেকী), প্রমাদগ্রস্ত ও ধনমোহে বিমুগ্ধ লোকের নিকট পরলোক চিন্তা স্থান পায় না; তাহারা মনে করে ‘ইহলোক ছাড়া পরলোক’ বলিয়া কিছু নাই। তাহার ফলে তাহারা বারংবার ‘আমার অধীন হইয়া বিবিধ যাতনা ভোগ করিয়া থাকে। আত্মার পরলোকে বিশ্বাস ও তদুপযোগী ক্রিয়ানুষ্ঠান এবং জীবের ব্রহ্মভাবে নিশ্চয় ও তদনুসারে যে ব্রহ্মাত্মৈকত্ব বোধ, ইহাই জীবের যমযাতনা নিবৃত্তির এবং পরম শ্রেয় মোক্ষলাভের প্রধান উপায়। জীব যতকাল ব্রহ্মাত্মৈকত্ব উপলব্ধি করিতে অসমর্থ থাকে, ততকাল তাহার স্বর্গাদি সুখসম্ভোগ সম্ভবপর হয় বটে, কিন্তু পরমপুরুষার্থ মোক্ষলাভের আশা থাকে না। তাই শ্রুতি উপসংসারে বলিয়াছেন যে,-“তং স্বাৎ শরীরাৎ প্রবুহেৎ মুঞ্জাৎ ইব ইষীকাং ধৈর্য্যেণ।” অর্থাৎ মুঞ্জতৃণ হইতে যেরূপ তন্মধ্যস্থ ইষীকা(গর্ভস্থ পত্র) উত্তোলন করে, সেইরূপ ধীরতা অবলম্বন পূর্ব্বক সেই আত্মাকে দেহ হইতে পৃথক্ করিতে হইবে; অর্থাৎ আত্মা যে জড়দেহ হইতে অত্যন্ত পৃথক্ পদার্থ, তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে হইবে; ইহারই নাম বিবেক এবং ইহাই মোক্ষলাভের প্রধান সহায়। বুদ্ধিমান্ মানব উক্তরূপ বিবেকলাভে যত্নপর হইবে।
যজুর্বেদে ‘কঠ’ নামে একটি ব্রাহ্মণ এবং একটি সংহিতা আছে। এই ‘কঠোপনিষৎ’ যে কাহার অন্তর্গত, তাহা নির্ণয় করা কঠিন; তবে, অধিকাংশ ‘উপনিষৎ’ই ব্রাহ্মণভাগ-প্রসূত; এই কারণে অনেকে মনে করেন যে, ইহাও কঠ ব্রাহ্মণেরই অন্তর্গত। কিন্তু, আচার্য্য শঙ্কর স্বামী দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় বল্লীর ব্যাখ্যাস্থলে বলিয়াছেন যে, “যদাপি আদিত্য এব মন্ত্রেণোচ্যতে, তদাপি * * * ব্রাহ্মণব্যাখ্যানেহপি অবিয়োধঃ।” অর্থাৎ যদি মনে কর এই মন্ত্রে আদিত্যই বর্ণিত হইয়াছেন; তাহা হইলেও আদিত্যই যখন ব্রহ্মস্বরূপ, তখন
no
ব্রাহ্মণকৃত ব্যাখ্যার সহিত ইহার বিরোধ হইতে পারে না। এবং পরিশেষে “এক এবাত্মা জগতো নাত্মভেদ ইতি মন্ত্রার্থঃ।” বলিয়া ইহার মন্ত্রাত্মকতা স্পষ্টাক্ষরে নির্দেশ করিয়াছেন। অতএব, এই কঠোপনিষৎটি সংহিতাভাগের অন্তর্গত বলিয়াই আমাদের মনে হয়, ব্রাহ্মণভাগের অন্তর্গত নহে।
সম্পাদক শ্রীদুর্গাচরণ শর্ম্মা।
প্রথম অধ্যায়।
॥%
॥೮.
૫૦
হইতে—পর্য্যন্ত।
২৪। আত্মজ্ঞানে মুক্তি, তদভাবে লোকান্তর প্রাপ্তি; আদর্শাদি আশ্রয়ভেদে আত্ম-প্রতীতির পার্থক্য; ইন্দ্রিয়াদি হইতে পৃথক্ করিয়া আত্মোপলব্ধির উপদেশ; ইন্দ্রিয়াদি অপেক্ষা আত্মার সমুৎকর্ষ কথন এবং আত্মবিষয়ে চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের আগমন ও কেবল বিশুদ্ধ মনের মাত্র গমন......
২৫। পরাগতি বা মুক্তির স্বরূপ কথন; যোগের স্বরূপ নিরূপণ; এবং সোপাধিক ও নিরূপাধিকরূপে আত্মার ‘অস্তিত্ব’ উপলব্ধির উপদেশ। আর হৃদয়স্থ সর্ব্ব বাসনা ত্যাগ ও সমস্ত গ্রন্থিচ্ছেদে এবং হৃদয়স্থ এক শত একটা নাড়ীর মধ্যে মূর্দ্ধন্য নাড়ী যোগে দেহত্যাগে ব্রহ্মপ্রাপ্তি, আর অন্যান্য নাড়ী দ্বারা নিষ্ক্রমণে লোকান্তর প্রাপ্তি নিরূপণ; এবং হৃদয়স্থ অঙ্গুষ্ঠ পরিমিত আত্মাকে দেহ হইতে বিবিক্তভাবে বা পৃথক্করণে মুক্তিলাভ; পরিশেষে উপনিষৎ পাঠের ফল শ্রুতি বর্ণন......
সূচী সমাপ্ত।
+7456124
ওঁ পরমাত্মনে নমঃ। ওঁ নমো ভগবতে বৈবস্বতায় মৃত্যবে ব্রহ্মবিদ্যাচার্য্যায় নচিকেতসে চ। অথ কঠোপনিষদ্বল্লীনাং সুখার্থপ্রবোধনার্থমল্পগ্রন্থাবৃত্তিরারভ্যতে।
সদেধাতোর্ব্বিশরণগত্যবসাদনার্থস্য উপনিপূর্ব্বস্থ্য কিপ্রপ্রত্যয়ান্তস্য রূপমিদম্ “উপনিষৎ”ইতি। উপনিষচ্ছবেন চ ব্যাচিখ্যাসিত গ্রন্থ প্রতিপাদ্যবেদ্য বস্তুবিষয়া বিদ্যোচ্যতে। কেন পুনরর্থ:যোগেন উপনিষচ্ছব্দেন বিদ্যোচ্যুত ইতি? উচাতে, যে মুমুক্ষবো দৃষ্টানুশ্রবিকবিষয়বিতৃষ্ণাঃ সন্তঃ উপনিষচ্ছন্দবাচ্যাং বক্ষ্যমাণলক্ষণাং বিদ্যা- মুপসদ্যোপগম্য তন্নিষ্ঠতয়া নিশ্চয়েন শীলয়ন্তি, তেষামবিদ্যাদেঃ সংসারবীজস্য বিশরণা- দ্ধিংসনাদ্ বিনাশনাৎ ইত্যনেনার্থযোগেন বিদ্যাপনিষদিত্যুচাতে। তথাচ বক্ষ্যতি, “নিচায্য তং মৃত্যুমুখাৎ পমুচ্যতে” ইতি। পূর্ব্বোক্তবিশেষণান্মুমুক্ষুন্ বা পরংব্রহ্ম গময়তি, ইতি ব্রহ্মগময়িত্বেন যোগাদ্রহ্মবিদ্যা উপনিষৎ। তথাচ বক্ষ্যতি, “ব্রহ্ম প্রাপ্তো বিরজোহভূদ্বিমৃত্যুঃ”ইতি। লোকাদিব্রহ্মজ্ঞঃ যোহগ্নিঃ, তদ্বিষয়ায়া বিদ্যায়া দ্বিতীয়েন বরেণ প্রার্থ্যমানায়াঃ স্বর্গলোকফলপ্রাপ্তিহেতুত্বেন গর্ভবাসজন্মজরাদ্যুপ- দ্রববৃন্দস্য লোকান্তরে পৌনঃপুন্যেন প্রবৃত্তস্য অবসাদয়িত্বেন শৈথিল্যাপাদনেন ধাত্বর্থযোগাদগ্নিবিদ্যাপি উপনিষদিত্যুচ্যতে। তথাচ বক্ষ্যতি “স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্তে” ইত্যাদি।
ননু চোপনিষচ্ছব্দেন অধ্যেতারো গ্রন্থমপ্যভিলপন্তি—‘উপনিষদমধীমহে উপনিষদমধ্যাপয়ামঃ’ ইতি চ। এবং; নৈষ দোষঃ, অবিদ্যাদিসংসারহেতুব্বিশরণাদেঃ সদিধাত্বর্থস্য গ্রন্থমাত্রেহসম্ভবাদবিদ্যায়াঞ্চ সম্ভবাৎ গ্রন্থস্যাপি তাদর্থ্যেন তচ্ছব্দোপপত্তেঃ; “আয়ুর্ব্বে ঘৃতম্” ইত্যাদিবৎ। তস্মাদবিদ্যায়াং মুখ্যয়া বৃত্ত্যা উপনিষচ্ছব্দো বর্ত্ততে; গ্রন্থে তু ভক্ত্যেতি। এবমুপনিষন্নিৰ্ব্বচনেনৈব বিশিষ্টোহধিকারীবিদ্যায়াম্ উক্তঃ। বিষয়শ্চ বিশিষ্ট উক্তো বিদ্যায়াঃ পরং ব্রহ্ম প্রত্যগাত্মভূতম্। প্রয়োজনঞ্চাস্যা উপনিষদ আত্যন্তিকী সংসারনিবৃত্তিব্রহ্মপ্রাপ্তিলক্ষণা। সম্বন্ধশ্চৈবস্তুতপ্রয়োজনেনোক্তঃ। অতো যথোক্তাধিকারি-বিষয়-প্রয়োজন-সম্বন্ধায়া বিদ্যায়াঃ করতলন্যস্তামলকবৎ- প্রকাশকত্বেন বিশিষ্টাধিকারি-বিষয়-প্রয়োজন-সম্বন্ধা এতা বল্ল্যো ভবন্তীতি। অতস্তা যথাপ্রতিভানং ব্যাচক্ষ্মহে।
%
পরমাত্মার উদ্দেশে নমস্কার, ব্রহ্ম-বিদ্যাপ্রবর্ত্তক ভগবান্ বৈবস্বত ও তৎশিষ্য নচিকেতার উদ্দেশে নমস্কার।(অথ *) উক্তপ্রকার মঙ্গলা- চরণের পর কঠোপনিষদ্বল্লী সমূহের অনায়াসে অর্থগ্রহণোপযোগী অনতিবিস্তীর্ণ বৃত্তি(ব্যাখ্যা) আরব্ধ হইতেছে,—
‘সদ্’ ধাতুর অর্থ—বিশরণ(শিথিলাকরণ—জার্ণতা-সম্পাদন), গতি ও অবসাদন(বিনষ্টকরণ)।[‘উপ’ অর্থ—নিকট—সত্বর, এবং “নি” অর্থ নিশ্চয় ও নিঃশেষ—সম্পূর্ণরূপে।] উক্তার্থ সম্পন্ন উপ+নিপূর্ব্বক ‘সদ্’ ধাতু হইতে ‘ক্লিপ্’ প্রত্যয় যোগে ‘উপনিষৎ’ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। এই ব্যাখ্যাতব্য গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বস্তুবিষয়ক বিদ্যাকে ‘উপনিষৎ বলা হয়।[‘সদ্’ ধাতুর যে তিনপ্রকার অর্থ আছে, তন্মধ্যে] কোন্ অর্থানুসারে ‘উপনিষৎ’ শব্দে বিদ্যাকে বুঝায়? বলা যাইতেছে;—যে সকল মুমুক্ষু পুরুষ ঐহিক(দৃষ্ট) ও পারলৌকিক (আনুশ্রবিক) বিষয় ভোগে বিতৃষ্ণ হইয়া ণ অর্থাৎ বৈরাগ্যসম্পন্ন
* তাৎপর্য্য,—“যশ শ্যামলনে প্রথমে ক।ধ্যাৎপ্রভনন্তরে।
অধিকারে প্রতিজ্ঞায়াম্বাদেশাদিবু ক্বচিৎ, ॥”
এই প্রমাণানুসারে জানা যায়,—মঙ্গলাচরণ, প্রশ্ন, কায্যের আরম্ভ, আনন্তযা, অধিকার (প্রাধান্যে কখন) এবং প্রতিজ্ঞা প্রভৃতি অনেকগুলি অর্থ ‘অথ’ শব্দের আছে। ভিন্ন ভিন্ন স্থলে ঐ সকল অর্থে ‘অথ’ শব্দের প্রয়োগও আছে। কিন্তু এই ভাষ্যোল্লিখিত ‘অথ’ শব্দ টি ‘মঙ্গল’ অর্থে প্রযুক্ত হইয়াছে। গ্রন্থারম্ভের প্রথমে যে, মঙ্গলাচরণ, তাহা শিষ্টাচার সম্মতও বটে ॥ † তাৎপয্য,—মুমুক্ষুমাত্রেরই বৈরাগ্য থাকা আবশ্যক, অথবা বৈরাগ্য না থাকিলে মুমুক্ষাই (মুক্তির ইচ্ছাই) হইতে পারে না। সেই বৈরাগ্য দুই প্রকার,(১) অপর বৈরাগ্য,(২) পর বৈরাগ্য। অপর বৈরাগ্যই পর বৈরাগ্যের সাধন। পাতঞ্জল-দর্শনে বৈরাগ্যের লক্ষণ এইরূপ নিরূপিত হইয়াছ,—“দৃষ্টানুশ্রবিক-বিষয়-বিতৃষ্ণস্য বশীকারসংজ্ঞা বৈরাগ্যম্।” দৃষ্ট(যাহা ইহকালে ভোগ্য), এবং আনুশ্রবিক(যাহা কেবল অনুশ্রবে—বেদ পরিজ্ঞাত,) অর্থাৎ মৃত্যুর পর ভোগ্য স্বর্গাদি লোক; এই উভয়বিধ ভোগ্য বিষয়ের যে, চিত্তের বশীকার বা তৃষ্ণানিরত্ত, তাহার নাম:বৈরাগ্য। এই অপর বৈরাগ্যের লক্ষণ। তাহার পর “তৎপর” পুরুষখ্যাতেগুণ-বৈতৃষ্ণাম্।” সূত্রে পরবৈরাগ্যের লক্ষণ অভিহিত হইয়াছে। সূত্রের মর্মার্থ এই যে,—পুরুষ—আত্মার স্বরূপ সাক্ষাৎকার বশত যে, সত্ত্ব, রজঃ, ও তমোগুণে, অর্থাৎ গুণাত্মক প্রকৃতিতে পর্য্যন্ত অভিলাষ না থাকা, তাহার নাম পরবৈরাগ্য। উক্ত প্রকার বৈরাগ্যবোধনার্থ ভাষ্যে ‘দৃষ্টানুশ্রবিক বিষয় বিতৃষ্ণ’ কথায় ব্যবহার করা হইয়াছে॥
৯৮
হইয়া ‘উপনিষৎ’ শব্দবাচ্য, বক্ষ্যমাণ বিদ্যার আশ্রয় লইয়া তদগতভাবে নিঃসংশয়-চিত্তে ঐ বিদ্যার অনুশীলন করে, তাহাদের সংসার-বীজ অর্থাৎ জন্ম-মরণকারণীভূত অবিদ্যা প্রভৃতিকে বিশীর্ণ(শিথিল বা ক্ষয়ো- মুখ) করে এবং হিংসা করে—বিনষ্ট করিয়া দেয়; এইরূপ অর্থযোগেই বিদ্যাকে ‘উপনিষৎ’ বলা হয়। এই উপনিষদেও বলিবেন যে, ‘তাঁহার সেবা করিয়া মৃত্যু-গ্রাস হইতে পরিত্রাণ পায়‘। অথবা, পূর্ব্বোক্ত লক্ষণ-সম্পন্ন মুমুক্ষুগণকে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত করায়, অর্থাৎ ব্রহ্ম-সমীপে লইয়া যায়; এই ব্রহ্ম-প্রাপ্তি সাধনত্বরূপ অর্থানুসারেও ‘উপনিষৎ’ শব্দে ব্রহ্ম-বিদ্যা বুঝায়। এগ্রন্থে এরূপ কথা এখানেও বলা হইবে, ‘[ নচিকেতা ব্রহ্মবিদ্যা-বলে] বিরজ(ধর্মাধৰ্ম্ম রহিত) ও বিমৃত্যু (কামনা ও অবিদ্যাবজ্জিত) হইয়া ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।’ তা‘ছাড়া, নচিকেতা দ্বিতীয় বরে, ভূঃপ্রভৃতি লোক সমুদয়ের অগ্রেজাত ও ব্রহ্মসম্ভূত যে অগ্নির তত্ত্ব(অগ্নিবিদ্যা) জানিবার অভিলাষ করিয়া- ছিলেন, সেই অগ্নিবিদ্যার বলে স্বর্গলোক লাভ করা যায়, এবং তাহার ফলে ভিন্ন ভিন্ন লোকে যে, বারংবার গর্ভবাস, জন্ম, জরা ও মরণাদি উপদ্রব ভোগ করিতে হয়, তাহার অবসাদন বা শৈথিল্য করা হয়; এই কারণে উক্ত ধাত্বর্থানুসারে অগ্নিবিদ্যাকেও ‘উপনিষৎ’ বলা যাইতে পারে। এখানেও ‘স্বর্গগামীরা অমৃতত্ব ভোগ করে’ ইত্যাদি বাক্যে ঐরূপ কথাই বলিবেন।
এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, কেন পাঠকগণ ব্রহ্মবিদ্যাপ্রতিপাদক গ্রন্থকেও ‘উপনিষৎ’ বলিয়া থাকে? যথা—‘আমরা ‘উপনিষৎ’ অধ্যয়ন করিতেছি এবং অধ্যাপনা করিতেছি; ইত্যাদি। হ্যাঁ, ওরূপ ব্যবহারে দোষ হয় না; কারণ, সংসারের কারণীভূত অবিদ্যাদি দোষ সমূহের বিশরণ বা শৈথিল্য-সম্পাদন প্রভৃতি ‘সদ্’ ধাতুর যে সমুদয় অর্থ উক্ত আছে, শুধু গ্রন্থে তাহার সম্ভব হয় না, পরন্তু বিদ্যাতেই সম্ভব হয়; অথচ সেই ব্রহ্মবিদ্যা প্রতিপাদনই যখন গ্রন্থের উদ্দেশ্য, এইকারণে
“আয়ুর্বৈ ঘৃতম্”, অর্থাৎ ঘৃতই আয়ুঃ, এইস্থলে যেরূপ আয়ুর কারণ বলিয়া ঘৃতকেই ‘আয়ু’ বলা হইয়া থাকে, সেইরূপ ব্রহ্ম-বিদ্যা প্রতি- পাদক গ্রন্থেও তৎপ্রতিপাদ্য বিদ্যা-বোধক ‘উপনিষৎ’ শব্দের প্রয়োগ অসঙ্গত হয় না বা হইতে পারে না। অতএব, ব্রহ্ম-বিদ্যাই উপনিষদের মুখ্য অর্থ, গ্রন্থে তাহার গৌণ অর্থ। ‘উপনিষৎ’ শব্দের উক্ত প্রকার অর্থ নির্ব্বাচনেই ব্রহ্মবিদ্যা সম্বন্ধে অধিকারিগত বিশেষও উক্ত হইল বুঝিতে হইবে। উপনিষদের বিষয় হইল—সর্ব্বভূতের আত্মস্বরূপ পরব্রহ্ম; প্রয়োজন—আত্যন্তিক সংসার-নিবৃত্তিরূপ(যে নিবৃত্তির পর আর জন্ম-মরণাদিরূপ সংসার হয় না,) ব্রহ্মপ্রাপ্তি, এবং উক্ত প্রকার প্রয়োজনের সহিত উপনিষদের প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদকত্বরূপ সম্বন্ধও কথিত হইল। পূর্ব্বোক্ত প্রকার(মুমুক্ষু) অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন-সম্পন্ন এই বিদ্যা, করতল ন্যস্তামলকের ন্যায় আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে, এই কারণে এই কঠোপনিষদের বল্লা বা অধ্যায়সমূহ বিশিষ্ট অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন-সম্পন্ন; অতএব, আমরা (ভাষ্যকার) যথামতি সেই সকল বল্লার ব্যাখ্যা করিব *।
* তাৎপর্য্য,—কথিত আছে যে,—“জ্ঞাতার্থং জ্ঞাতসম্বন্ধং শ্রোতুং শ্রোতা প্রবর্ত্ততে।
শাস্ত্রেণো তেন বক্তব্যঃ সম্বন্ধঃ সপ্রয়োজনঃ॥”
অর্থাৎ পঠনীয় শাস্ত্রের অর্থ—প্রতিপাদ্য বিষয়, সেই বিষয়ের সহিত শাস্ত্রের কিরূপ সম্বন্ধ, তাহা, এবং প্রয়োজন, অর্থাৎ শাস্ত্রপাঠের ফল জানা থাকিলেই শ্রোতা বা পাঠক শাস্ত্র- পাঠে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; এই কারণে শাস্ত্রের প্রারম্ভেই বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন নির্দেশ করা আবশ্যক। অধিকন্তু বেদান্তাদি শাস্ত্রে অধিকারী নির্দেশ করাও নিয়মবদ্ধ আ’ছে। বেদান্তাদি শাস্ত্রে ‘অনুবন্ধ-চতুষ্টয়’ নামে ঐ অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজনের উল্লেখ আছে। যে শাস্ত্রে ঐ অনুবন্ধ-চতুষ্টয় নিরূপিত নাই, সেই শাস্ত্র পাঠ্য নহে এবং ব্যাখ্যেরও নহে। এই কারণে ভাষ্যকার প্রথমেই গ্রন্থের বিষয়, সম্বন্ধ, প্রয়োজন ও অধিকারী নির্দেশ করিলেন।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
শাঙ্করভাষ্য-সমেতা।
-------:o:-------
প্রথমা বল্লী।
ওঁ সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বিনাবধীতমস্ত মা বিদ্বিষাবহৈ ॥ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥
উশন হ বৈ বাজশ্রবসঃ সর্ববেদসন্দদৌ। তস্য হ নচিকেতা নাম পুত্র আস ॥ ১ ॥
প্রণম্য গুরুপাদাজং স্মৃতা শঙ্কর-সম্মতিম্। কঠোপনিষদাং ব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে॥
[অথ ব্রহ্মবিদ্যাং বিবক্ষুঃ বেদঃ শ্রোতুঃ শ্রদ্ধাসমুৎপাদনায় আখ্যায়িকামাহ বেদপুরুষঃ, উশন্নিত্যাদিনা।] বাজশ্রবসঃ(বাজমন্নং, তদ্দানাদিনিমিত্তং শ্রবঃ যশঃ যস্য সঃ বাজশ্রবাঃ, তস্য নপ্তুরূপগোত্রাপত্যং বাজশ্রবসঃ ঔদ্দালকির্নাম ঋষিঃ) [বিশ্বজিতা সর্ব্বমেধেন ঈজে]। স উশন্, হবৈ(হবৈ ইতি ঐতিহ্য- স্মারকৌ নিপাতৌ স্বর্গলোকমিচ্ছন্নিত্যর্থঃ), সর্ব্ববেদসং(সর্ব্বস্বং) দদৌ (ব্রাহ্মণেভ্যো দত্তবান্)। তস্য হ(প্রসিদ্ধস্য বাজশ্রবসস্য) নচিকেতাঃ নাম(নচি- কেতোনাম্না প্রসিদ্ধঃ) পুত্রঃ আস(আসীৎ)।[‘আস’ ইতিপদং ছান্দসং, তিঙন্তপ্রতিরূপকমব্যয়ং, বা] ॥
[ বক্ষ্যমাণ ব্রহ্মবিদ্যায় শ্রোতার শ্রদ্ধা। সমুৎপাদনার্থ বেদ নিজেই একটি
আখ্যায়িকার অবতারণা করিতেছেন, - বাজ অর্থ-অন্ন, সেই অন্নদান করিয়া যিনি যশস্বী হইয়াছিলেন, তিনি ‘বাজশ্রবাঃ’; তাঁহার পৌত্র প্রভৃতি সন্তানকে ‘বাজশ্রবস’ বলা যায়। উদ্দালক-পুত্র সেই বাজশ্রবস মুনি ‘বিশ্বজিৎ’ নামক যজ্ঞ করিয়াছিলেন; তিনি তাহাতে স্বর্গলোক লাভের ইচ্ছায় সমস্ত সম্পত্তি দান করিয়াছিলেন। ‘নচিকেতস্ নামে তাঁহার একটি পুত্র ছিল।
তত্রাখ্যায়িকা বিদ্যাস্তুত্যর্থা। উশন্ কাময়মানঃ, হ বৈ ইতি বৃত্তার্থস্মরণাথৌ নিপাতৌ। বাজমন্নং, তদ্দানাদিনিমিত্তং শ্রবো যশো যস্য, সঃ বাজশ্রবাঃ, রূঢ়িতো বা, তস্যাপত্যং বাজশ্রবসঃ। সঃ বাজশ্রবসঃ কিল থিশ্বজিতা সর্ব্বমেধেনেজে —তৎফলং কাময়মানঃ। স চৈতস্মিন্ ক্রতো সর্ব্ববেদসং সর্ব্বস্বং ধনং দদৌ দত্তবান্। তস্য যজমানস্য ত নচিকেতা-নাম পুত্রঃ কিল অ’স বভূব ॥ ১ ॥
এই উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যার স্তুতি বা প্রশংসার্থ আখ্যায়িকা(গল্প) প্রদত্ত হইয়াছে। ‘উশন্’ অর্থ—ফলকামী, ‘হ’ ও ‘বৈ’ কথা দুইটি নিপাত শব্দ(ব্যাকরণের কোন নিয়মানুযায়ী পদ নহে)। অতীত ঘটনা স্মরণ করান ঐ দুইটি পদের অর্থ। ‘বাজ’ অর্থ—অন্ন; অন্নদানে যাঁহার যশ আছে, তাঁহার নাম ‘বাজশ্রবস্’। অথবা, উহা অর্থহীন নাম মাত্র। বাজশ্রবার পুত্র—‘বাজশ্রবস’ নামক ঋষি যজ্ঞের যথোক্ত ফল পাইবার নিমিত্ত সর্ব্বমেধ(যাহাতে সমস্ত সম্পত্তি দান করিতে হয়; সেই) ‘বিশ্বজিৎ নামক যজ্ঞ করিয়াছিলেন। তিনি এই যজ্ঞে(নিজের) সমস্ত সম্পত্তি দান করিয়াছিলেন। সেই যজমানের(যিনি যজ্ঞ করেন) নচিকেতা নামে এক পুত্র ছিল ॥ ১ ॥
তৎহ কুমারং সন্তং দক্ষিণাসু নীয়মানাসু শ্রদ্ধাবিবেশ সোহমন্যত ॥ ২ ॥
দক্ষিণাসু নীয়মানাসু(পিত্রা জরা-জীর্ণাসু গোষু ব্রাহ্মণেভ্যো দক্ষিণার্থং দীয়মানাস্বিত্যর্থঃ)। তং কুমারং সন্তং(বাল্যে বয়সি স্থিতং নচিকেতসং) শ্রদ্ধা (আস্তিক্যবুদ্ধিঃ) আবিবেশ(প্রবিবেশ, শ্রদ্ধাবান্ বভূবেত্যর্থঃ)।[জরঠ-নির্বীৰ্য্য-
গবাদ্যনুপযুক্তবস্তুদানসময়ে অনুপযুক্তগবাদিকমস্বর্গ্যং কিমর্থং দদাতি পিতা, ন দেয়মিতি বদামীতি পুত্রস্য বুদ্ধিরাসীদিতিভাবঃ] সঃ(নচিকেতাঃ) অমন্যত (মনসি অকরোৎ) ॥
পিতা যজ্ঞ-দক্ষিণা স্বরূপ জরা জার্ণ গোসকল ব্রাহ্মণকে দান করিতেছেন, এমন সময়ে সেই বালক নচিকেতার হৃদয়ে শ্রদ্ধার উদ্রেক হইল; তিনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন ॥ ২ ॥
তং হ নচিকেতসং কুমারং প্রথমবয়সং সন্তমপ্রাপ্তপ্রজননশক্তিং বালমেব শ্রদ্ধা আস্তিক্যবুদ্ধিঃ পিতুহিতকামপ্রযুক্তা আবিবেশ প্রবিষ্টবতা। কস্মিন্ কালে ইত্যাহ? ঋত্বিগ্ভ্যঃ সদস্যেভ্যশ্চ দক্ষিণাসু নীয়মানাসু বিভাগেনোপ- নীয়মানাসু দক্ষিণার্থাসু গোষু স আবিষ্টশ্রদ্ধো-নচিকেতাঃ অমন্যত ॥ ২॥
সেই নচিকেতা কুমার—প্রথমবয়সে স্থিত, অর্থাৎ তখনও সন্তানোৎ- পাদন শক্তি লাভ করে নাই, এরূপ বালক হইলেও পিতার হিতাকাঙ্ক্ষা বশতঃ তাহাতে(তাহার হৃদয়ে) শ্রদ্ধা অর্থাৎ আস্তিক্যবুদ্ধি(শাস্ত্রের ও ঋষিবাক্যের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস) প্রবিষ্ট হইয়াছিল। কোন্ সময়? তাই বলিতেছেন,—পিতা যখন ঋত্বিকগণ ও সদস্যগণের উদ্দেশে দক্ষিণা লইয়া যাইতেছেন,—অর্থাৎ যজ্ঞের ব্রতী ও ক্রিয়ার দোষগুণ পরীক্ষক সদস্যগণের দক্ষিণার্থ যখন পৃথক্ পৃথক্ ভাবে গোসকল উপস্থাপিত করিতেছেন *, সেই সময়—নচিকেতা শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন—॥ ২ ॥
পীতোদকা জঘ্নতৃণা দুগ্ধদোহা নিরিন্দ্রিয়াঃ। অনন্দা নাম তে, লোকাস্তান্ স গচ্ছতি তা দদৎ ॥৩॥
[ শ্রদ্ধাপ্রযুক্তং মননপ্রকারমেব অভিব্যনক্তি-পীতোদকা ইত্যাদিনা।] পীতো- দকাঃ(পীতমেব উদকং যাভিঃ, ন পুনঃ পাতব্যমস্তি, তাঃ)।(জগ্ধতৃণাঃ জগ্ধমেব তৃণং যাভিঃ, ন তু জগ্ধব্যমস্তি, তাঃ, তথোক্তাঃ ভোগশক্তিহীনা ইতি যাবৎ) দুগ্ধদোহাঃ(দুহ্যত ইতি দোহঃ, ক্ষীরম্। দুগ্ধ এব দোহো যাসাং, ন পুনং দোগ্ধব্যমস্তি, তা দুগ্ধহীনাঃ) নিরিন্দ্রিয়াঃ(ইন্দ্রিয়শক্তিশূন্যাঃ বৃদ্ধা ইতি ভাবঃ।) তাঃ (উক্তরূপা গাঃ) দদৎ(প্রযচ্ছন্) সঃ(পুমান্) তান্(লোকান্) গচ্ছতি। তে (প্রসিদ্ধাঃ), অনন্দাঃ(অবিদ্যমানসুখাঃ),[যে লোকাঃ সন্তি ইতি শেষঃ]।
যে সকল গো[জন্মের মত জল পান করিয়াছে, তৃণ ভক্ষণ করিয়াছে, দুগ্ধ দান করিয়াছে, এবং ইন্দ্রিয়রহিত হইয়াছে। যে লোক সেই সকল গো দান করে, সে লোক অনন্দ অর্থাৎ দুঃখ-বহুলরূপে প্রসিদ্ধ লোকে গমন করে ॥৩৷৷
কথম্?—ইত্যুচ্যতে—পীতোদকা ইত্যাদিনা। দক্ষিণার্থা গাবো বিশেষ্যন্তে,— পীতমুদকং যাভিঃ তাঃ পীতোদকাঃ। জগ্ধং ভক্ষিতং তৃণং যাভিঃ তাঃ জগ্ধতৃণাঃ। দুগ্ধোদোহঃ ক্ষারাখ্যো যাসাং তা দুগ্ধদোহাঃ। নিরিন্দ্রিয়াঃ প্রজননাসমর্থাঃ জীর্ণাঃ নিষ্ফলা গাব ইত্যর্থঃ। যাঃ তা এবস্তুতাঃ গাঃ ঋত্বিগ্ভ্যো দক্ষিণাবুদ্ধ্যা দদৎ প্রযচ্ছন্ অনন্দা অনানন্দাঃ অসুখা নামেত্যেতৎ। যে তে লোকাঃ, তান্ স বজমানো গচ্ছতি ॥ ৩ ॥
কিরূপ ভাবনা করিয়াছিলেন? “পীতোদকাঃ” ইত্যাদি বাক্যে তাহা কথিত হইতেছে;—দক্ষিণার্থ প্রদেয় গোসকলের বিশেষণ প্রদত্ত হইতেছে;—যে সকল গো পীতোদক—যাহারা শেষ উদক(জল) পান করিয়াছে,(আর পান করিবে না) জঘ্নতৃণ—যাহারা[জন্মের মত] তৃণ ভক্ষণ করিয়াছে,(আর ভক্ষণ করিবে না), দুগ্ধদোহ যাহাদের শেষ ক্ষীর দোহন করা হইয়াছে(আর দোহন করিতে হইবে না), এবং নিরিন্দ্রিয়—আর সন্তানোৎপাদনে অসমর্থ,—অর্থাৎ জরাজীর্ণ ও নিষ্ফল। যে যজমান(যজ্ঞকর্ত্তা) এবংভূত গোসকলকে দক্ষিণা- বুদ্ধিতে প্রদান করে, সেই যজমান তাদৃশ দানের ফলে সেই যে, প্রসিদ্ধ আনন্দরহিত—অসুখময় লোক, তাহাতে গমন করে॥ ৩॥
[ মননপ্রকারমুপসংহরন্ উক্তপ্রকারমাহ—স হোবাচেতি।] সঃ(নচিকেতাঃ)হ (ঐতিহ্যদ্যোতকমব্যয়ং) পিতরম্[উপগম্য] উবাচ তত,(হে তাত), কস্মৈ (ঋত্বিজে) মাং[দক্ষিণার্থং] দাস্যসি ইতি মাং দত্ত্বাপি যজ্ঞোপকারঃ কথঞ্চিৎ করণীয়- ইত্যভিপ্রায়ঃ]। দ্বিতীয়ং তৃতীয়ম্,-(এবম্প্রকারেণ দ্বিতীয়বারং তৃতীয়বারমপি উবাচ—কস্মৈ মাং দাস্যসীতি)।[অনন্তরং পিতা ক্রুদ্ধঃ সন্] তং(পুত্রং হ কিল) উবাচ, ত্বা(ত্বাং) মৃত্যবে(যমায়; দদামি(ত্বং ম্রিয়স্ব ইতি)[শশাপেত্যর্থঃ]॥
নচিকেতার চিন্তা প্রণালী উপসংহার করতঃ এখন উক্তির প্রণালী নিদ্দেশ করিতেছেন,—সেই নচিকেতা পিতাকে বলিলেন, পিতঃ! আপনি আমাকে কোন্ ঋত্বিকের উদ্দেশে দান করিবেন? অভিপ্রায় এই যে, যদি আমাকে দান করিয়াও যজ্ঞের কথঞ্চিৎ উপকার হইতে পারে, তাহা করা উচিত। নচিকেতা এইরূপে দুইবার, তিনবার পিতাকে বলিলেন;[ অনন্তর, পিতা ক্রুদ্ধ হইয়া] পুত্রকে বলিলেন যে, তোমাকে যমের উদ্দেশে দান করিলাম ॥৪॥
তদেবং ক্রত্বসম্পত্তিনিমিত্তং পিতুরনিষ্টং ফলং ময়া পুত্রেণ সতা নিবারণীয়ম্— আত্মপ্রদানেনাপি ক্রতুসম্পত্তিং কৃত্বা, ইত্যেবং মন্যমানঃ পিতরমুপগম্য স হোবাচ পিতরম্ হে তত তাত কস্মৈ ঋত্বিবিশেষায় দক্ষিণার্থং মাং দাস্যসীতি প্রযচ্ছসীতি। এতদেবমুক্তেনাপি পিত্রা উপেক্ষ্যমাণোহপি দ্বিতীয়ং তৃতীয়মপি উবাচ—কস্মৈ মাং দাস্যসি কস্মৈ মাং দাস্যসীতি। নায়ং কুম রস্বভাব ইতি ক্রুদ্ধঃ সন্ পিতা তং হ পুত্রং কিল উবাচ—মৃত্যবে বৈবস্বতায় ত্বা ত্বাং দদামীতি ॥২॥
নচিকেতা ভাবিতে লাগিলেন--এইরূপে যজ্ঞের অপূর্ণতা বা অঙ্গহীনতা-নিবন্ধন পিতার যে অনিষ্ট ফল হইতেছে, আমি তাঁহার পুত্র; আমার পক্ষে প্রাণ দিয়াও যজ্ঞের পূর্ণতা সম্পাদনপূর্ব্বক সেই অনিষ্ট নিবারণ করা আবশ্যক। নচিকেতা এইরূপ মনে করিয়া পিতার সমীপে উপস্থিত হইলেন এবং পিতাকে বলিতে লাগিলেন,-
২
তত!(পিতঃ!) আমাকে দক্ষিণাস্বরূপ কোন ঋত্বিকের উদ্দেশে প্রদান করিবেন? নচিকেতা এইরূপ বলিলেও পিতা প্রথমতঃ তাহা উপেক্ষা করিলেন। কিন্তু নচিকেতা উপেক্ষিত হইয়াও আবার বলিতে লাগিলেন,-আমাকে কাহার উদ্দেশে দান করিবেন,-আমাকে কাহার উদ্দেশে দান করিবেন? নচিকেতা দুই তিনবার এইরূপ বলিলে পর, পিতা বুঝিলেন যে, ইহার স্বভাব ত বালকের মত নহে[নিতান্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ], তখন ক্রোধ সহকারে পুত্রকে বলিলেন,-বৈবস্বত (সূর্য্য-পুত্র) মৃত্যুর উদ্দেশে তোমাকে দান করিতেছি ॥ ৪ ॥
বহূনামেমি প্রথমো বহূনামেমি মধ্যমঃ।
কিঞ্চিৎ যমস্য কর্ত্তব্যং যন্ময়্যাদ্য করিষ্যতি ॥৫॥
[ পিত্রা এবমুক্তঃ সন্ নচিকেতাঃ এবং চিন্তিতবান্—] বহুনামিতি। বহুনাং (শিষ্য-পুত্রাদীনাং)[মধ্যে][অহং] প্রথমঃ[সন্][প্রথময়া গুরুশুশ্রুষায়াং মুখ্যয়া শিষ্যাদিবৃত্ত্যা] এমি(ভবামি)। বহুনাং(মধ্যমানাং চ) মধ্যে] মধ্যমঃ[বা সন্] [মধ্যময়া শিষ্যাদিবৃত্ত্যা বা] এমি। যমস্য কিংস্বিৎ(কিং বা) কর্তব্যং(তৎ প্রয়োজনং আসীৎ);! পিতা] অদ্য[প্রদত্তেন] ময়া(দ্বারা) যৎ(প্রয়োজনং) করিষ্যতি(সম্পাদয়িষ্যতি)।[কিমপি প্রয়োজনং নাস্তি, কেবলং ক্রোধবশাৎ অহং পিত্রা এবমুক্তোহস্মি ইত্যাশয়ঃ] ॥
পিতার উক্তি শ্রবণের পর নচিকেতা এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন,—বহুর মধ্যে অর্থাৎ পিতার উত্তমশিষ্য-পুত্রাদির মধ্যে গুরুশুশ্রূষা কার্য্যে আমি প্রথম(শ্রেষ্ঠ) হইয়া থাকি; এবং বহু মধ্যমের মধ্যেও আমি[অন্ততঃ] মধ্যম হইয়া থাকি। কিন্তু কখনও অধম(নিকৃষ্ট শ্রেণীভুক্ত) হই না।[তথাপি] যমের নিকট পিতার এমন কি কর্তব্য বা প্রয়োজন ছিল, যাহা অদ্য আমার দ্বারা সম্পাদন করিবেন ॥
স এবমুক্তঃ, পুত্রঃ একান্তে পরিদেবয়াঞ্চকার। কথমিতি উচ্যতে—বহুনাং শিষ্যাণাং পুত্রাণাং বা এমি গচ্ছামি প্রথমঃ সন্ মুখ্যয়া শিষ্যাদিবৃত্ত্যা ইত্যর্থঃ। মধ্যমা- নাঞ্চ বহুনাং মধ্যমো মধ্যময়ৈব বৃত্ত্যা এমি; নাধময়া কদাচিদপি। তমেবং বিশিষ্টগুণমপি পুত্রং “মাং মৃত্যবে ত্বা দদামি” ইত্যুক্তবান্ পিতা। স কিংস্বিদ্ যমস্য
কর্ত্তব্যং প্রয়োজনং ময়া প্রদত্তেন করিষ্যতি, যৎ কর্তব্যমদ্য। নূনং প্রয়োজনমনপে ক্ষ্যৈব ক্রোধবশাদুক্তবান্ পিতা। তথাপি তৎ পিতুর্ব্বচো মৃষা মাভূদিতি ॥৫॥
ভাষ্যানুবাদ।
ক্রুদ্ধ পিতা এইরূপ বলিলে পর, পুত্র নচিকেতা নির্জ্জনে বসিয়া বহুক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিলেন। কি প্রকার চিন্তা, তাহা বলা হই- তেছে,—শিষ্য ও পুত্র প্রভৃতির যাহা উত্তম বৃত্তি(ব্যবহার), সেই ব্যবহারের গুণে বহু শিষ্য বা পুত্রগণের মধ্যে আমি প্রথম স্থান লাভ করিয়া থাকি,[অন্ততঃ] বহুতর মধ্যম-শ্রেণীর শিষ্যাদির মধ্যে মধ্যম বৃত্তির(মাঝামাঝি ব্যবহারের) দ্বারা মধ্যম স্থানও অধিকার করিয়া থাকি; কিন্তু কখনও অধম বৃত্তি দ্বারা[অধম হই না]। * আমি এরূপ বিশিষ্ট গুণসম্পন্ন পুত্র হইলেও পিতা আমাকে ‘মৃত্যুর উদ্দেশে তোমাকে দান করিতেছি’ বলিলেন! তিনি অদ্য আমাকে দান করিয়া, আমার দ্বারা যমের কি প্রয়োজন সম্পাদন করিবেন? নিশ্চয়, পিতা কোন প্রয়োজন চিন্তা না করিয়াই কেবল ক্রোধবশে আমাকে ঐরূপ বলিয়া- ছেন মাত্র।[যাহা হউক,] তথাপি পিতার বাক্য মিথ্যা না হউক ॥৫॥
অনুপশ্য যথা পূর্ব্বে প্রতিপশ্য তথা পরে। শস্যমিব মর্ত্ত্যঃ পচ্যতে শস্যমিবাজায়তে পুনঃ॥৬॥
[কথন-প্রকারমেবাহ অনুপশ্যেত্যাদিনা] অনুপশ্যেতি। পূর্ব্বে(পূর্ব্ববর্ত্তিনঃ পিতৃ * তাৎপয্য,—সেবাধিকারী শিষ্য ও পুত্রাদির মধ্যে তিনট শ্রেণী দৃষ্ট হয়।(১) উত্তম;(২) মধ্যম;(৩) অধম। তন্মধ্যে, যাঁহারা গুরুর অভিপ্রায় বুঝিয়া—আর আদেশের অপেক্ষা না করিয়া, গুরুর অভিপ্রেত শুশ্রূষাদি কায্যে প্রবৃত্ত হন, তাঁহারা উত্তম। আর যাঁহারা গুরুর অভিপ্রায় বুঝিয়াও আদেশের অপেক্ষা করেন, আদেশের পর কায্যে প্রবৃত্ত হন, তাঁহারা মধ্যম। আর যাঁহারা গুরুর অভিপ্রায় বুঝিয়া এবং আদেশ শ্রবণ করিয়াও গুরুর অভিমত শুশ্রূষাদি কার্য্যে সহজে যাইতে চাহেন না, বা যান না, তাঁহারা অধম। নচিকেতার অভিপ্রায় এই যে,—আমি প্রথম শ্রেণীরই অন্তর্গত; অন্ততঃ দ্বিতীয় শ্রেণীর; কখনই অধম তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত নহি। এ অবস্থায় প্রিয়পুত্র আম কে ত ত্যাগকরা কখনই পিতার পক্ষে সম্ভবপর নহে। তথাপি যে, আমাকে যমের উদ্দেশে দান করিয়াছেন; ইহা কেবল ক্রোধেরই ফল; সুতরাং পিতা প্রকৃতপক্ষে আমাকে ত্যা‘গ করেন নাই। এই কারণে পিতাও আমার সম্বন্ধে ঐরূপ কথা বলিয়া নিতান্তই শোকাকুল হইয়াছেন। তথাপি আমার ন্যায় পুত্রের পক্ষে পিতার আদেশ প্রতিপালন করা একান্ত কর্তব্য।
পিতামহাদয়ঃ) যথা(যেন প্রকারেণ) গতাঃ, তান্। অনুপশ্য[পূর্ব্বক্রমেণ আলোচয়) তথা পরে(বর্তমানাঃ সাধবশ্চ)[যথা বর্তন্তে, তান্ অপি] প্রতিপশ্য(বিচারয়)। [আলোচ্য চ ভবানপি তেষামেব চরিত্রমনুসরতু ইত্যাশয়ঃ অসত্যাচরণং তু মাকার্ষীৎ। ইত্যাশয়েনাহ-] মর্ত্যঃ(মরণশীলো মনুষ্যঃ)[যতঃ] শস্যম্ ইব পচ্যতে[কালকৰ্ম্ম- বশাৎ মরণোন্মুখী ভবতি-ম্রিয়তে ইতি যাবৎ]। শস্যম্ ইব পুনঃ আজায়তে(কাল- কৰ্ম্মবশাৎ উৎপদ্যতে চ)।[অতঃ মর্ত্যানাং জন্ম-মরণয়োঃ অবশ্যন্তাবিত্বাৎ যমায় মাং প্রযচ্ছতো ভবতঃ শোকো ন যুক্ত ইতি ভাবঃ] ॥
অনুপশ্য ইত্যাদি শ্লোকে নচিকেতার উক্তি বর্ণিত হইতেছে;- পূর্ব্বতন পিতৃ- পিতামহগণ যেরূপে গিয়াছেন, অর্থাৎ যেপ্রকার আচরণ করিয়াছেন, উত্তমরূপে তাঁহাদের সেই চরিত্র একে একে আলোচনা করিয়া দেখুন, এবং বর্তমান সাধুজনেরাও যেরূপ আচরণ করিয়া থাকেন, তাহাও বেশ করিয়া চিন্তা করিয়া দেখুন। অভি- প্রায়—তাঁহাদের চরিত্র চিন্তা করিয়া আপনিও তদনুরূপ আচরণ করুন, কখনই সত্যভঙ্গ করিবেন না। যেহেতু মরণশীল মনুষ্য শস্যের মত নিজ নিজ কর্মানুসারে সময় বিশেষে মরিয়া যায়, এবং শস্যেরই মত কর্মবশে পুনর্ব্বার জন্মলাভ করে। [ মনুষ্যের জন্মমরণ অবশ্যম্ভাবী; অতএব আমাকে যমের উদ্দেশে দান করায় আপনর শোক করা উচিত হয় না ॥৬॥
এবং মত্বা পরিদেদনা-পূর্ব্বকমাহ পিতরং শোকাবিষ্টং ‘কিং ময়োক্তম্’ইতি অনুপশ্য আলোচয়—বিভাবয় অনুক্রমেণ—যথা যেন প্রকারেণ বৃত্তাঃ পূর্ব্বে অতি- ক্রান্তাঃ পিতৃপিতামহাদয়স্তব; তান্ দৃষ্ট্বা চ তেষাং বৃত্তম্ অস্থাতুম্ অর্হসি। বর্ত্ত- মানাশ্চ অপরে সাধবো যথা বর্ত্তন্তে, তাংশ তথা প্রতিপশ্য আলোচয়। ন চ তেষাং মৃষাকরণং বৃত্তং বর্তমানং বা অস্তি। তদ্বিপরীতমসতাঞ্চ বৃত্তং মৃষাকরণম্। ন চ মৃষাভূতং কৃত্বা কশ্চিদজরামরো ভবতি। যতঃ শস্যমিব মর্ত্যো মনুষ্যঃ পচ্যতে জীর্ণো ম্রিয়তে, মৃত্বা চ শস্যমিব আজায়তে আবিভবতি পুনঃ। এবমনিত্যে জীবলোকে কিং মৃষাকরণেন?—পালয়াত্মনঃ সত্যম্;—প্রেষয় মাং যমায়েত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৬ ॥
এইরূপ মনে করিয়া দীর্ঘ চিন্তার পর, ‘আমি কি বলিয়া ফেলি- লাম!‘—এই ভাবনায় শোকান্বিত পিতাকে বলিতে লাগিলেন
[ হে পিতঃ!] আপনার পূর্বতন পিতৃ-পিতামহগণ যেরূপ বৃত্তি (ব্যবহার) অবলম্বন করিয়া গিয়াছেন, এবং বর্তমান সাধুগণও যেরূপ বৃত্তি বা ব্যবহার অবলম্বন করিয়া থাকেন; এক একটি করিয়া তাহা দর্শন করুন, অর্থাৎ উত্তমরূপে আলোচনা(চিন্তা) করুন। আলোচনা করিয়া আপনারও তাঁহাদেরই চরিত্র(ব্যবহার) অবলম্বন করা উচিত। তাঁহাদের চরিত্রে মিথ্যাচরণ কখনও ছিল না, এবং বর্তমানেও নাই। অসাধু জনেরাই মিথ্যা বা অসত্য আচরণ করিয়া থাকে; কিন্তু সেই মিথ্যা আচরণ করিয়া কেহই জরামরণরহিত-(অজর ও অমর) হইতে পারে না। কারণ, মর্ত্য(মরণশীল) মনুষ্য শস্যের মত(ধান্যাদির ন্যায়) পক্ক হয়, অর্থাৎ জরাজীর্ণ হয় ও মরিয়া যায়; মরিয়া আবার শস্যেরই মত পুনর্বার জন্ম বা আবির্ভাব প্রাপ্ত হয়।[অতএব] এই অনিত্য জীবলোকে(সংসারে) মিথ্যা আচরণের কি প্রয়োজন? নিজের সত্যপালন করুন-আমাকে যমের উদ্দেশে প্রেরণ করুন ॥৬৷৷
[ অথ পিত্রা যমায় প্রেষিতো নচিকেতাঃ যমস্যানুপস্থিতিকালে যমভবনং গত্বা, তত্র যমমপশ্যন্ দিনত্রয়মুপবাসেন তস্থৌ, ততশ্চ প্রবাসাৎ আগতং যমং দৃষ্ট। তদীয়া অমাত্যাদয় উচুঃ,-] বৈশ্বানর ইতি। ব্রাহ্মণঃ অতিথিঃ সন্ বৈশ্বানরঃ(অগ্নিরিব- দহন্ ইব) গৃহান্ প্রবিশতি।[ব্রাহ্মণোহাতিথিঃ গৃহমাগতঃ অনাদৃতঃ সন্ অগ্নিরিব গৃহিণাং সর্ব্বমর্থং দহতি ইত্যাশয়ঃ।] তস্য(অগ্নেরিব প্রবিষ্টস্য অতিথেঃ) এতাং (শাস্ত্রোক্তাং পাদ্যাসনাদি-দানরূপাং) শান্তিং কুর্ব্বন্তি[মহান্তো গৃহিণঃ]।[অতো হেতোঃ।] হে বৈবস্বত!(বিবস্বৎপুত্র যম!) উদকং(পাদ্যার্থং জলং)[অস্মৈ ব্রাহ্মণায়] হর(আহর, এনং পূজয়েত্যর্থঃ) ॥
[নচিকেতা পিতাকর্তৃক যমোদ্দেশে প্রেষিত হইয়া যমভবনে উপস্থিত হইলেন, তখন যম অন্যত্র ছিলেন। নচিকেতা যমকে উপস্থিত না দেখিয়া তিন দিন পর্যন্ত উপবাস করিয়া সেখানে বাস করিতে লাগিলেন; যম প্রবাস হইতে প্রত্যা-
গত হইলে পর তাঁহার মন্ত্রিপ্রভৃতিরা তাঁহাকে বলিতে লাগিলেন,—] ব্রাহ্মণ অতিথি- রূপে:অগ্নির ন্যায় গৃহে প্রবেশ করেন।[সাধু গৃহস্থগণ] তজ্জন্য এই(পাদ্যার্থ্যাদি দানরূপ) শান্তি করিয়া থাকেন। অতএব, হে বৈবস্বত—সূর্য্যপুত্র! তুমি[ইঁহার পাদপ্রক্ষালনার্থ] জল আনয়ন কর।[অভিপ্রায় এই যে, ব্রাহ্মণ অতিথিরূপে গৃহে উপস্থিত হইয়া যদি উপযুক্ত আদর না পান; তাহা হইলে গৃহস্থের অতিশয় অকল্যাণ ঘটান। সেই অকল্যাণ-প্রশমনের নিমিত্ত অতিথির আদর অর্চ্চনা করিতে হয়] ॥ ৭ ॥
স এবমুক্তঃ পিতা আত্মনঃ সত্যতায়ৈ প্রেষয়ামাস। স চ যমভবনং গত্বা তিস্রো রাত্রীরুবাস যমে প্রোষিতে! প্রোষ্যাগতং যমম্ অমাত্যা ভার্য্যা বা উচুর্ব্বো- ধয়ন্তঃ—বৈশ্বানরঃ অগ্নিরেব সাক্ষাৎ প্রবিশত্যতিথিঃ সন্ ব্রাহ্মণো গৃহান্ দহন্নিব; তস্য দাহং শময়ন্ত ইবাগ্নেঃ এতাং পাদ্যাসনাদিদানলক্ষণাং শান্তিং কুর্ব্বন্তি সন্তোহতিথেঃ যতঃ, অতো হর আহর,—হে বৈবস্বত! উদকং নচিকেতসে পাদ্যার্থম্। যতশ্চা করণে প্রত্যবায়ঃ ক্রয়তে ॥৭॥
পিতা(উদ্দালক) পুত্রের ঐ প্রকার বচন শ্রবণ করিয়া নিজের সত্যসংরক্ষণার্থ পুত্রকে যমসদনে প্রেরণ করিলেন। পুত্র নচিকেতা যমভবনে গমন করতঃ সেখানে ত্রিরাত্র বাস করিলেন; তৎকালে যমরাজ প্রবাসে ছিলেন; তিনি প্রবাস হইতে গৃহে প্রত্যাগত হইলে অমাত্যগণ, কিংবা পত্নীগণ তাঁহাকে বুঝাইয়া বলিতে লাগিলেন,- সাক্ষাৎ অগ্নিই ব্রাহ্মণ অতিথিরূপে যেন দগ্ধ করিবার জন্যই গৃহে প্রবেশ করেন; অর্থাৎ গৃহে উপস্থিত হন। যেহেতু সাধুগণ সেই অতিথিরূপ অগ্নির দাহপ্রশমনার্থই যেন এই-পাদ্য ও আসনাদি দানরূপ শান্তি করিয়া থাকেন; অতএব, হে বৈবস্বত(সূর্য্যতনয়- যম!) এই নচিকেতার পাদপ্রক্ষালনার্থ জল আনয়ন করুন; কারণ, এইরূপ না করিলে শাস্ত্রে প্রত্যবায়ের(পাপের) কথা শোনা যায় ॥ ৭ ॥
এতদ্বৃঙ্ক্তে পুরুষস্যাল্পমেধসো।
যস্যানশন্ বসতি ব্রাহ্মণো গৃহে ॥৮॥
[ অতিথিপূজায়া অকরণে অনিষ্টফলমাহ,-] আশেতি। ব্রাহ্মণোহনন্নন্(অভু- ঞ্জানঃ সন্) যস্য গৃহে বসতি;[তস্য, অল্পমেধসঃ(অল্পবুদ্ধেঃ) পুরুষস্য আশা- প্রতীক্ষে(আশা চ প্রতীক্ষা চ-তে; অত্যন্তাপরিজ্ঞাত-সুবর্ণাচলাদিবস্তুপ্রাপ্ত্যর্থং যা বাসনা, সা আশা, বিজ্ঞাতপ্রাপ্যবস্তুবিষয়েচ্ছা প্রতীক্ষা) সঙ্গতং(সুহৃৎসঙ্গতি- ফলম্) সুনৃতাং(সাধুপ্রিয়বার্তাং), ইষ্টাপূর্তে(ইষ্টং চ-তে পুর্ত্তং চ, ইষ্টং যজনং- তৎফলং, পূর্ত্তং তড়াগোদ্যানাদিপ্রদানফলং), সর্ব্বান্ পুত্র-পশূন্ চ(পুত্রান্ পশূংশ্চেত্যর্থঃ)। এতৎ[সর্ব্বম্][অনশনেন ব্রাহ্মণস্য গৃহেহবস্থানং কর্তৃ] বৃঙক্তে,(আবর্জয়তি-সর্ব্বং নাশয়তীতি যাবৎ) ॥
যে অল্পবুদ্ধি পুরুষের গৃহে ব্রাহ্মণ অনশনে বাস করেন; তাহার ফলে তাহার আশা অর্থাৎ যে বিষয়ের প্রাপ্তিতে নিশ্চয় বা স্থিরতা নাই, তাহার প্রার্থনা, আর প্রতীক্ষা অর্থাৎ যে বস্তুর প্রাপ্তিতে নিশ্চয় বা স্থিরতা আছে, সেই বস্তু পাইতে ইচ্ছা, অর্থাৎ তদুভয়ের সফলতা, সঙ্গত—সজ্জন সমাগমের ফল, সুনৃতা—উত্তম প্রিয় সংবাদ, ইষ্ট—যজ্ঞাদি ক্রিয়া, পূর্ত্ত—জলাশয়-উদ্যানাদি দান, অর্থাৎ তদুভয়ের ফল, এবং পুত্র ও পশু, এই সমস্ত বিনষ্ট হইয়া যায় ॥৮৷৷
আশা-প্রতীক্ষে, অনিজ্ঞাতপ্রাপ্যেষ্টার্থপ্রার্থনা--আশা। নির্জাত-প্রাপ্যার্থ- পতীক্ষণং-প্রতীক্ষা, তে আশা-প্রতীক্ষে। সঙ্গতং-সৎসংযোগজং ফলম্। সূনৃতাং চ-সূনৃতা হি প্রিয়া বাক্, তন্নিমিত্তঞ্চ। ইষ্টাপুত্তে-ইষ্টং যাগজং ফলম্, পূর্ত্তম্ আরামাদিক্রিয়াজং ফলম্। পুত্রপশূংশ-পুত্রাংশ পশুংশ, সর্ব্বান্, এতৎ সর্ব্বং যথোক্তং বৃঙক্তে আবর্জয়তি-বিনাশয়তীত্যেতৎ; পুরুষস্য অল্পমেধসঃ অল্পপ্রজ্ঞস্য; যস্য অনশ্নন্ অভুঞ্জানঃ ব্রাহ্মণঃ গৃহে বসতি। তস্মাদনুপেক্ষণীয়ঃ সর্ব্বাবস্থাস্বপি- অতিথিরিত্যর্থঃ ॥ ৮ ॥
অবিজ্ঞাত প্রাপ্য বস্তুর প্রার্থনার নাম আশা, আর বিজ্ঞাতরূপ প্রাপ্য
বস্তু বিষয়ে প্রার্থনার নাম প্রতীক্ষা। এই উভয়—আশা ও প্রতীক্ষা, সঙ্গত—সজ্জনসঙ্গের ফল, সূনৃতা প্রিয় বাক্য কথনের ফল, ইষ্টাপূর্ত্ত —ইষ্ট অর্থ যাগফল, পূর্ত্ত অর্থ উদ্যানাদি দানের ফল, এবং সমস্ত পুত্র ও পশু(গো অশ্বাদি); সেই ব্যক্তি এই সমস্তই বিনষ্ট করে।[কে এবং কাহার? না—] যেই অল্পবুদ্ধি পুরুষের গৃহে ব্রাহ্মণ অতিথি অনশনে বাস করেন।[সেই অনশনে অবস্থিতিই গৃহস্থের ঐ সমস্ত সম্পদ নষ্ট করিয়া দেয়,] অতএব, কোন অবস্থায়ই অতিথি উপেক্ষণীয় নহে * ॥৮॥
তিস্রো রাত্রীর্বদবাৎসীগৃহে মে- হনশন্ ব্রহ্মন্নতিথিনমস্যঃ। নমস্তেহস্তু ব্রহ্মন্, স্বস্তি মেহস্তু, তস্মাৎ প্রতি ত্রীন্ বরান্ বৃণীস্ব ॥৯৷৷
[ এবং প্রবোধিতো যমো নচিকেতসমুপগম্য পূজাপুরঃসর মাহ-] তিস্র ইতি। হে ব্রহ্মন্,[ ত্বং] অতিথিঃ | অতএব] নমস্যঃ(পূজার্হঃ সন্) যৎ মে গৃহে তিস্রঃ রাত্রীঃ(দিনত্রয়:) অনশ্নন্(অভুঞ্জানঃ সন্) অবাৎসীঃ(বাসমকাষীঃ); তস্মাৎ হে ব্রহ্মন্! তে(তুভ্য:) নমোহস্তু। মে মহ্যং স্বস্তি মঙ্গলম্[অস্তু ইতিশেষঃ][তস্য
প্রতীকারায়] প্রতি(তিস্রঃ রাত্রীঃ প্রতি) ত্রীন্ বরান্ বৃণীঘ(একৈকাং রাত্রিং প্রতি একৈকং বরং যথাভিলাষং প্রার্থয়স্ব ইতিভাবঃ)।
[যম এইরূপ উপদেশাত্মক প্রবোধ-বাক্য শ্রবণ করিয়া নচিকেতার সমীপে সমাগত হইয়া পূজাপূর্বক বলিতে লাগিলেন],—হে ব্রহ্মন্! তুমি অতিথি; সুতরাং আমার নমস্য(পূজার্হ); যেহেতু তুমি আমার গৃহে ত্রিরাত্র অনশনে বাস করিয়াছ; অতএব তোমাকে নমস্কার করিতেছি; আমার মঙ্গল হউক। অধিকন্তু, প্রতি অর্থাৎ এক এক রাত্রির জন্য এক একটি করিয়া-- ত্রিরাত্রের জন্য ইচ্ছামত তিনটি বর প্রার্থনা কর॥ ৯॥
এবমুক্তো মৃত্যুরুবাচ নচিকেতসমুপগম্য পূজাপুরঃসরম্, —কিং তৎ? ইত্যাহ— তিস্রো রাত্রীঃ যৎ যস্মাৎ অবাৎসী: উষিতবানসি গৃহে মে মম অনশ্নন্ হে ব্রহ্মন্ অতিথিঃ সন্ নমস্যো নমস্কারার্হশ্চ; তস্মাৎ নমস্তে তুভ্যমস্ত ভবতু। হে ব্রহ্মন্ স্বস্তি ভদ্রং মেহস্ত। তস্মাদ ভবতোহনশনেন মদগৃহবাসনিমিত্তাৎ দোষাৎ তৎ- প্রাপ্ত্যুপশমেন যদ্যপি ভবদনুগ্রহেণ সর্ব্বং মম স্বস্তি স্থাৎ, তথাপি ত্বদধিকসম্প্রসা- দনার্থমনশনেনোপোষিতামেকৈকাং রাত্রিং প্রতি ত্রীন্ বরান্ বৃণীঘাভিপ্রেতার্থ- বিশেষান্ প্রার্থয়স্ব মত্তঃ ॥৯৷৷
মৃত্যু ঐ কথা শ্রবণ করিয়া নচিকেতার সমীপে উপস্থিত হইয়া পূজা বা সম্মান প্রদর্শন পূর্বক বলিতে লাগিলেন। মৃত্যু কি বলিলেন? তাহা বলিতেছেন,-হে ব্রহ্মন্(ব্রাহ্মণ!) তুমি যেহেতু অতিথি, এবং নমস্কারাই হইয়াও ত্রিরাত্র অনশনে(উপবাস করিয়া) আমার গৃহে বাস করিয়াছ। অতএব হে ব্রহ্মন্! তোমাকে নমস্কার; আমার কল্যাণ হউক; অর্থাৎ তুমি আমার গৃহে অনশনে বাস করায় যে দোষপ্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল, তাহার প্রশমনে আমার মঙ্গল হউক। যদিও তোমার অনুগ্রহেই আমার সর্ববিধ মঙ্গল হইবে সত্য; তথাপি তোমার অধিকতর প্রসন্নতা সম্পাদনের জন্য[বলিতেছি যে,] তুমি এখানে অনশনে বা উপবাসে যে কয়েক রাত্রি যাপন করিয়াছ,
৩.
তাহার এক একটি রাত্রির জন্য(ফলতঃ ত্রিরাত্রের জন্য) তিনটি বর বরণ কর, অর্থাৎ তিন বরে নিজের অভিপ্রেত বিষয় সমূহ আমা হইতে প্রার্থনা কর॥ ৯॥
শান্তসঙ্কল্পঃ সুমনা যথা স্যাদ্- বীতমন্যুগৌ তমো মাভি মৃত্যো। ত্বৎপ্রসৃষ্টং মাভিবদেৎ প্রতীতঃ, এতত্রয়াণাং প্রথমং বরং বৃণে ॥ ১০ ॥
[ যমেনৈবমুক্তো নচিকেতাঃ প্রথমমাহ, —শান্তেতি।]—হে মৃত্যো, গৌতমো ( মম পিতা) শান্তসঙ্কল্পঃ(মদনিষ্ট-সম্ভাবনয়া জায়মানঃ সংকল্পঃ শান্তঃ যস্য, সঃ তথা), সুমনাঃ(প্রসন্নমনাঃ) মা অভি(মাং প্রতি) বীতমন্যুঃ(অপগতকোপঃ চ) যথা স্যাৎ প্রতীতঃ(স এবায়ং মম পুত্রঃ সমাগত ইত্যেবং লব্ধস্মৃতিঃ সন্) ত্বৎপ্রসৃষ্টং (ত্বয়া প্রেষিতং) মা অভি(মাং প্রতি) যথা বদেৎ(ময়া সহ আলপেদিত্যর্থঃ) এতৎ ত্রয়াণাং[বরাণাং মধ্যে! প্রথমং বরং বৃণে[পিতুঃ পরিতোষণমেব প্রথমেন বরেণ প্রার্থয়ে ইত্যাশয়ঃ] ॥
যমের কথা শুনিয়া নচিকেতা প্রথমে বলিলেন,—আমার পিতা গৌতম যেন শান্তসংকল্প হন, অর্থাৎ আমার জন্য তাঁহার যে-সকল দুশ্চিন্তা উপস্থিত হইয়াছে, তাহা প্রশমিত হউক; তিনি যেন আমার প্রতি প্রসন্নচিত্ত এবং ক্রোধশূন্য হন। আর আপনি আমাকে পাঠাইলে, অর্থাৎ আপনকার নিকট হইতে গেলে পর তিনি যেন আমাকে চিনিতে পারেন এবং আমার সহিত কথাবার্তা বলেন। বরত্রয়ের মধ্যে ইহাই আমি প্রথম বরে প্রার্থনা করিতেছি॥ ১০॥
অতো নচিকেতাস্তু আহ—যদি দিৎসুপূর্ব্বান্; শান্তসংকল্পঃ—উপশান্তঃ সঙ্কল্লো যস্য মাং প্রতি, ‘যমং প্রাপ্য কিন্নু করিষ্যতি মম পুত্রঃ’ ইতি; স শান্তসঙ্কল্পঃ। সুমনাঃ প্রসন্নমনাশ্চ যথা স্যাৎ বীতমনুর্বিগতরোষশ্চ, গৌতমো মম পিতা, মা অভি মাং প্রতি, হে মৃত্যো। কিঞ্চ, ত্বৎপ্রসৃষ্টং ত্বয়া বিনির্ম্মুক্তং—প্রেষিতং গৃহং প্রতি মা মাম্ অভিবদেৎ, প্রতীতো লব্ধস্মৃতিঃ—স এবায়ং পুত্রো মমাগতঃ ইত্যেবং
প্রত্যভিজানন্ ইত্যর্থঃ। এতৎ প্রয়োজনং ত্রয়াণাং বরাণাং প্রথমমাদ্যং বরং বৃণে প্রার্থয়ে, যৎ পিতুঃ পরিতোষণম্ ॥ ১০ ॥
অতঃপর নচিকেতা বলিলেন, হে মৃত্যু! যদি আপনি বর দিতে ইচ্ছুক হইয়া থাকেন, তাহা হইলে, আমার পিতা গৌতম যাহাতে শান্ত- সংকল্প, সুমনা(প্রসন্নচিত্ত) এবং আমার প্রতি ক্রোধশূন্য হন,[তাহা করুন]।—অর্থাৎ আমার পিতার হৃদয়গত যে সংকল্প—‘আমার পুত্র যমের সমীপে উপস্থিত হইয়া—কি করিবে, ইত্যাদিপ্রকার যে দুশ্চিন্তা, তাহা প্রশমিত হউক; তাঁহার মানসিক উদ্বেগ নিবৃত্ত হউক, এবং আমার প্রতি[যদি তাঁহার ক্রোধ হইয়া থাকে], তাহাও বিদূরিত হউক। আরো এক কথা,—আপনি আমাকে স্বগৃহাভিমুখে প্রেরণ করিলে অর্থাৎ আপনকার নিকট হইতে আমি গৃহে উপস্থিত হইলে, [আমার কথা যেন] তাঁহার স্মরণ হয়, অর্থাৎ ‘এই আমার সেই পুত্র আসিয়াছে’ এই প্রকারে আমাকে যেন চিনিতে পারেন। বরত্রয়ের মধ্যে এই বরই আমি প্রথম প্রার্থনা করিতেছি। পিতার পরিতোষ সম্পাদনই আমার প্রথম প্রয়োজন ॥ ১০ ॥
যথা পুরস্তাদ্ভবিতা প্রতীতঃ, ঔদ্দালকিরারুণিৰ্ম্মৎপ্রসৃষ্টঃ। সুখং রাত্রীঃ শয়িতা বীতমন্যু- স্বাং দদৃশিবান্ মৃত্যুমুখাৎ প্রমুক্তম্ ॥ ১১ ॥
[ এবং প্রার্থিতো মৃত্যুঃ নচিকেতসমাহ]—আরুণিঃ(অরুণস্যাপত্যং পুমান্), ঔদ্দালকিঃ(উদ্দালক এব ঔদ্দালকিঃ, দ্ব্যামুষ্যায়ণো বা,—উদ্দালকস্যাপত্যমিত্যর্থঃ, ন তু জারজঃ)[ তব পিতা] পুরস্তাৎ(মমালয়ে সমাগমাৎ প্রাক্)[ ত্বয়ি] যথা প্রতীতঃ(স্নেহবান্ আসীৎ), মৎপ্রসৃষ্টঃ(ময়া অনুজ্ঞাতঃ সন্, মৎ:প্ররণাবশাদিতি ভাবঃ।)[ অতঃ পরমপি] মৃত্যুমুখাৎ(মম অধিকারাৎ) প্রমুক্তং(নিষ্ক্রান্তং) ত্বাং দদৃশিবান্(দৃষ্টবান্ সন্) বীতমন্যুঃ(বিগতকোপশ্চ) ভবিতা;[ ময়া যমায়
প্রেষিতোহপি নচিকেতাঃ কিমিতি প্রত্যাগত ইত্যেবং ন কুপ্যেদিতি ভাবঃ] [ তথৈব] প্রতীতো[ভবিতা]।[পরা অপি] রাত্রীঃ সুখং শয়িতা(সুখেন নিদ্রিতো ভবিতা) ॥
এইরূপ প্রার্থনায় মৃত্যু নচিকেতাকে বলিলেন,—তোমার পিতা অরুণ-তনয় ঔদ্দালকি(উদ্দালক) পূর্ব্বেও যেরূপ তোমার উপর স্নেহসম্পন্ন ছিলেন, আমার আজ্ঞা বা প্রেরণার ফলে ইতঃপরও সেইরূপই প্রীত ও অভিজ্ঞানবান্ থাকিবেন। [তুমি না যাওয়া পর্য্যন্ত] সকল রাত্রিতেই সুখে নিদ্রা যাইবেন, এবং তোমাকে মৃত্যুর অধিকার হইতে নির্ম্মুক্ত দর্শন করিয়াও তিনি ক্রোধ করিবেন না ॥ ১১ ॥
মৃত্যুরুবাচ, —যথা বুদ্ধিস্থয়ি পুরস্তাৎ পূর্ব্বমাসীৎ স্নেহসমন্বিতা পিতুস্তব, ভবিতা প্রীতিসমন্বিতস্তব পিতা তথৈব, প্রতীতঃ প্রতীতবান্ সন্। ঔদ্দালকিঃ উদ্দালক এব ঔদ্দালকিঃ। অরুণস্যাপত্যম্ আরুণিঃ দ্ব্যামুষ্যায়ণো বা; মৎপ্রসৃষ্টো ময়াহনু- জ্ঞাতঃ সন্ উত্তরা অপি রাত্রীঃ সুখং প্রসন্নমনাঃ শয়িতা স্বপ্তা বীতমন্যুঃ বিগতমন্যুশ্চ ভবিতা স্যাৎ, ত্বাং পুত্রং দদৃশিবান্ দৃষ্টবান্ সন্ মৃত্যুমুখাৎ মৃত্যুগোচরাৎ প্রমুক্তং সন্তম্ ॥ ১১ ॥
মৃত্যু বলিলেন,—ইতঃপূর্ব্বে তোমার পিতার তোমার উপর যেরূপ স্নেহপূর্ণ বুদ্ধি ছিল, অরুণতনয় ঔদ্দালকি তোমার পিতা আমার অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া তোমাকে চিনিতে পারিয়া[তোমার প্রতি] সেইরূপই স্নেহবান্ হইবেন; আগামী রাত্রিসকলেও সুখে—প্রসন্নচিত্তে নিদ্রা যাইবেন, এবং পুত্ররূপী তোমাকে মৃত্যুর কবল অর্থাৎ মৃত্যুর নিকট হইতে নির্ম্মুক্ত দেখিয়াও তিনি ক্রোধ করিবেন না। ‘আরণি’ অর্থ— অরুণনামক কোন ব্যক্তির পুত্র; আর ‘ঔদ্দালকি’ অর্থ—উদ্দালক, স্বার্থে তদ্ধিত প্রত্যয় হইয়াছে। অথবা ঔদ্দালকি দ্ব্যামুষ্যায়ণ পুত্র, * সুতরাং অপত্যার্থেই তদ্ধিত প্রত্যয় বুঝিতে হইবে ॥ ১১ ॥
* তাৎপর্য্য—নচিকেতার পিতার দুইটি বিশেষণ প্রদত্ত হইয়াছে; একটি আরুণি, অপরটি ঔদ্দালকি। এখন ঐ উভয় পদই যদি অপত্যার্থে তদ্ধিত প্রত্যয় দ্বারা নিষ্পন্ন করিতে হয়, তাহা
স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চনাস্তি,
ন তত্র ত্বং, ন জরয়া বিভেতি। উভে তীর্থা অশনায়া-পিপাসে
শোকাতিতগো মোদতে স্বর্গলোকে ॥ ১২ ॥
[স্বর্গ্যাগ্নি-স্বরূপজ্ঞানলক্ষণং দ্বিতীয়ং বরং প্রার্থয়ন্ নচিকেতা আহ],—স্বর্গ- ইতি। স্বর্গে লোকে কিঞ্চন(কিমপি) ভয়ং নাস্তি। তত্র(স্বর্গ-লোকে) ত্বং(মৃত্যুঃ) নাসি(ন প্রভবসি), ন চ জরয়া(জরায়াঃ বাদ্ধক্যাৎ) বিভেতি, অথবা—জরয়া(যক্তঃ সন্ কুতশ্চিৎ অপি) ন বিভেতি ইত্যর্থঃ।[স্বর্গলোকং গত ইতি শেষঃ]। উভে অশনায়া-পিপাসে তীত্বা(অতিক্রম্য) শোকাতিগঃ (শোকান্ অতিক্রান্তঃ সন্) স্বর্গলোকে মোদতে(সুখমনুভবতি)।[স্বর্গলোক ইতি পুনরুক্তিরাদরাতিশয়জ্ঞাপনার্থা]॥
[ নচিকেতা দ্বিতীয় বর প্রার্থনার উদ্দেশে বলিতে লাগিলেন]—হে মৃত্যো! স্বর্গলোকে কিছুমাত্র ভয় নাই; সেখানে আপনি নাই; এবং জরা হইতেও কেহ ভয় পায় না; অথবা জরাক্ত—বৃদ্ধ হইয়া কাহারো নিকট ভয় পায় না। লোক স্বর্গলোকে[যাইয়া] ক্ষুধা ও পিপাসা অতিক্রম করিয়া এবং শোক-দুঃখ-সমুত্তীর্ণ হইয়া আনন্দ ভোগ করিয়া থাকে।। ১২।।
নচিকেতা উবাচ,-স্বর্গে লোকে রোগাদিনিমিত্তং ভয়ং কিঞ্চন কিঞ্চিদপি নাস্তি! ন চ তত্র ত্বং মৃত্যো সহসা প্রভবসি, অতো জরয়া যুক্ত ইহ লোকে ইব তত্তো ন বিভেতি কশ্চিৎ তত্র। কিঞ্চ, তে উভে অশনায়া-পিপাসে তীত্বা অতিক্রম্য শোকমতীত্য গচ্ছতীতি শোকাতিগঃ সন্ মানসেন দুঃখেন বজ্জিতো মোদতে হৃষ্যতি স্বর্গলোকে দিব্যে ॥ ১২ ॥
নচিকেতা বলিলেন, স্বর্গলোকে রোগাদিজনিত কোনও ভয় নাই, হে মৃত্যু! সেখানে আপনিও সহস। প্রভুত্ব করিতে পারেন না; এই কারণে ইহলোকের ন্যায় সেখানে কেহ জরাযুক্ত হইয়া কাহারও নিকট ভয় প্রাপ্ত হয় না। আরও এক কথা; দিব্য(অলৌকিক) স্বর্গলোকে [যাহারা বাস করে, তাহারা] অশনায়া(ভোজনেচ্ছা—ক্ষুধা) ও পিপাসা অতিক্রম করিয়া এবং শোকাতিগ হইয়া অর্থাৎ মানসদুঃখরহিত হইয়া মোদ বা হর্ষ অনুভব করিয়া থাকে। ‘শোকাতিগ’ অর্থ—যাহারা শোককে অতিক্রম করিয়া যায় ॥ ১২ ॥
স ত্বমগ্নিং স্বর্গ্যমধ্যেষি মৃত্যো, প্রক্রহি তং শ্রদ্দধানায় মহ্যম্। স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্তে, এতদ্ দ্বিতীয়েন বৃণে বরেণ ॥ ১৩ ॥
[ এবং স্বর্গ্যাগ্নিজ্ঞানফলং নিরূপ্য অগ্নিস্তুত্যা যমং প্রসাদয়ন্ নচিকেতা আহ],-স ত্বমিতি। হে মৃত্যো! স ত্বং স্বর্গ্যম্(উক্তরূপস্বর্গসাধনম্) অগ্নিম্ (অগ্রগামিতাদিগুণযুক্ততয়া অগ্নিনামকং প্রসিদ্ধমগ্নিং বা) অধ্যেষি(জানাসি)। তম্(অগ্নিং) শ্রদ্দধানায়(শ্রদ্ধাবতে) মহ্যং প্রব্রূহি(কথয়)![ কুতঃ, ন হি স্বর্গ-সাধনত্বমাত্রেণ তদ্বচনমাবশ্যকমিত্যাহ স্বর্গেতি।] স্বর্গলোকাঃ(স্বর্গো লোকো যেষাং, তে তথোক্তাঃ);[ মন্বন্তরপর্য্যন্তং স্বর্গলোকে স্থিত্বা পশ্চাৎ; অমৃতত্বং (দেবত্বম্) ভজন্তে(প্রাপ্নুবন্তি)। এতৎ(অগ্নি-বিজ্ঞানং) দ্বিতীয়েন বরেণ বৃণে(প্রার্থয়েয়মিত্যর্থঃ) ॥
সম্প্রতি নচিকেতা অগ্নির স্তুতি দ্বারা যমের প্রসন্নতা সমুৎপাদনার্থ বলিতে লাগিলেন,—হে মৃত্যো(যম!) আপনি সেই প্রসিদ্ধ স্বর্গ-সাধন(যাহার সেবায় স্বর্গ লাভ হয়,) অগ্নির[যথাযথ স্বরূপটি] অবগত আছেন।[অতএব] শ্রদ্ধাবান্ আমাকে সেই অগ্নিতত্ত্ব উপদেশ দিউন। কারণ, যাহারা স্বর্গলোকে গমন করে, তাহারা অমৃতত্ব ভোগ করে। ইহাই আমি দ্বিতীয় বরে প্রার্থনা করিতেছি ॥১৩৷৷]
এবংগুণবিশিষ্টস্য স্বর্গলোকস্য প্রাপ্তিসাধনভূতমগ্নিং স্বর্গ্যংস ত্বং মৃত্যুরধ্যেষি স্মরসি জানাসীত্যর্থঃ, হে মৃত্যো! যতত্ত্বম্ প্রব্রূহি কথয় শ্রদ্দধানায় শ্রদ্ধাবতে মহ্যং স্বর্গার্থিনে। যেনাগ্নিনা চিতেন স্বর্গলোকাঃ স্বর্গো লোকো যেষাং তে স্বর্গলোকাঃ যজমানাঃ অমৃতত্বম্ অমরণতাং দেবত্বং ভজন্তে প্রাপ্নুবন্তি। তদেতদগ্নি- বিজ্ঞানং দ্বিতীয়েন বরেণ বৃণে ॥ ১৩ ॥
হে মৃত্যো! যেহেতু স্বর্গলোকের প্রাপ্তি-সাধন স্বর্গ্য অগ্নির তত্ত্ব আপনিই স্মরণ করেন—অর্থাৎ অবগত আছেন;[অতএব] শ্রদ্ধাসম্পন্ন এবং স্বর্গার্থী আমাকে তাহা বলুন। যে অগ্নির চয়ন(যজ্ঞ সম্পাদন) করিলে যজমানগণ স্বর্গলোক লাভ করিয়া অমৃতত্ব মরণরাহিত্য—দেবত্ব প্রাপ্ত হন; সেই অগ্নিবিদ্যা আমি দ্বিতীয় বরে প্রার্থনা করিতেছি ॥ ১৩
প্র তে ব্রবীমি, তদু মে নিবোধ স্বর্গ্যমগ্নিং নচিকেতঃ প্রজানন্। অনন্তলোকাপ্তিমথো প্রতিষ্ঠাং, বিদ্ধি ত্বমেতং নিহিতং গুহায়াম্ ॥:৪ ॥
[ এবং যাচিতো যমঃ প্রত্যুবাচ]--প্র তে ইতি।[হে নচিকেতঃ][অহং] স্বর্গ্যম্ অগ্নিং প্রজানন্(বিশেষেণ জানন্) তে(তুভ্যং) প্রব্রবীমি(প্রবচ্মি)। তৎ উ(এব) মে(মৎসকাশাৎ) নিবোধ(একাগ্রচিত্তঃ সন্ শৃণুস)।[হে নচিকেতঃ!] ত্বম্ এতং(উক্তরূপম্ অগ্নিং) অনন্তলোকাপ্তিম্(অনন্তস্য দীর্ঘ- কালস্থায়িনঃ স্বর্গলোকস্য আপ্টিং প্রাপ্তিসাধনম্), অথো(অপি) প্রতিষ্ঠাং
(সর্ব্বলোকস্থিতিহেতুম্), গুহায়াং(সর্ব্বপ্রাণিহৃদয়ে) নিহিতং(নিতরাং স্থিতম্) বিদ্ধি(জানীহি)।
এইরূপ প্রার্থনার পর যম বলিলেন, হে নচিকেতঃ! আমি সেই স্বর্গ-সাধন অগ্নিকে উত্তমরূপে জানি, এবং তোমাকে তাহা বলিতেছি, স্থির চিত্তে শ্রবণ কর। তুমি জানিও,—এই অগ্নিই অনন্ত লোক-(স্বর্গলোক) প্রাপ্তির উপায়, অথচ সর্ব্ব- জগতের বিধারক; অধিকন্তু ইনি সর্ব্বপ্রাণীর হৃদয়রূপ গুহায় বাস করিতে- ছেন॥ ১৪ ॥
মৃত্যোঃ প্রতিজ্ঞেয়ং,-তে তুভ্যং প্রব্রবীমি, যৎ ত্বয়া প্রার্থিতম্, তৎ উ মে মম বচসঃ নিবোধ বুধ্যস্ব একাগ্রমনা: সন্, স্বর্গ্যং-স্বর্গায় হিতং স্বর্গসাধন- মগ্নিং হে নচিকেতঃ প্রজানন্ বিজ্ঞাতবানহং সন্ ইত্যর্থঃ। প্রব্রবীমি, তন্নিবোধেতি চ শিষ্যবুদ্ধিসমাধানার্থং বচনম্। অধুনা অগ্নিং স্তৌ ত,-অনন্তলোকাপ্তিং স্বর্গ- লোক-ফল প্রাপ্তিসাধনমিত্যেতৎ। অথো অপি প্রতিষ্ঠাম্-আশ্রয়ং জগতো বিরাডরূপেণ তমেতমগ্নিং ময়োচ্যমানং বিদ্ধি বিজানীহি ত্বং, নিহিতং স্থিতং গুহায়াং বিদুষাং বুদ্ধৌ নিবিষ্টমিত্যর্থঃ ॥ ১৪ ॥
এটি মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা, অর্থাৎ বক্তব্যনির্দেশ। হে নচিকেতঃ! তুমি যাহা(বলিবার জন্য) প্রার্থনা করিয়াছিলে; আমি সেই স্বর্গহিত, অর্থাৎ স্বর্গ-সাধন অগ্নিকে উত্তমরূপে জানিয়া তোমাকে বলিতেছি; তুমি একাগ্রমনে আমার উপদেশ হইতে তাহা অবগত হও। বক্তব্য বিষয়ে শিষ্যের মনোযোগ সম্পাদনার্থ “প্রব্রবীমি”(প্রকৃষ্টরূপে বলিতেছি) ও “নিবোধ”(অবগত হও), এই দুইটি ক্রিয়াপদ একত্র প্রযুক্ত হইয়াছে। এখন অগ্নির স্তব করিতেছেন,-অনন্তলোকাপ্তি, অর্থাৎ-দীর্ঘকালস্থায়ী স্বর্গলোকের প্রাপ্তিসাধন, এবং বিরাটরূপে সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতির হেতু এই যে অগ্নির কথা বলিতেছি; তুমি জানিও,-সেই অগ্নি পণ্ডিতগণের বুদ্ধিরূপ গুহায় নিহিত বা সন্নিবিষ্ট রহিয়াছেন, অর্থাৎ তাঁহারাই তাঁহার তত্ত্ব জানেন ॥ ১৪
স চাপি তৎ প্রত্যবদদ্ যথোক্ত।
মথাস্য মৃত্যুঃ পুনরেবাহ তুষ্টঃ ॥১৫॥
[যমঃ] তস্মৈ(নচিকেতসে) লোকাদিং(লোকানাম্ আদিং কারণভূতং) তম্ (প্রসিদ্ধং) অগ্নিম্(অগ্নিবিজ্ঞানং) উবাচ(উক্তবান্)।[কিঞ্চ] যাঃ(যৎস্বরূপাঃ), যাবতীঃ(যাবৎসংখ্যকাঃ) বা ইষ্টকাঃ(চেতব্যাঃ), যথা(যেন প্রকারেণ) বা [অগ্নিঃ চীয়তে];[এতৎ সর্ব্বম্ উক্তবান্]। সঃ(নচিকেতাঃ) চ অপি তৎ (মৃত্যুনা কথিতং) যথোক্তং(যথাবৎ) প্রত্যবদৎ(অনূদিতবান্—প্রত্যুচ্চারিতবান্)। অথ(অনন্তরং) মৃত্যুঃ। অস্য যথাবৎ প্রত্যুচ্চারণেন] তুষ্টঃ[সন্। পুনঃ এব (অপি) আহ ॥
যমরাজ নচিকেতাকে লোকাদি—জগৎকারণীভূত, প্রসিদ্ধ অগ্নি-তত্ত্ব উপদেশ করিলেন, এবং যজ্ঞীয় ইষ্টকের স্বরূপ, সংখ্যা(পরিমাণ) এবং অগ্নিচয়নের প্রণালী, এই সমস্তই নচিকেতাকে বলিলেন। নচিকেতাও মৃত্যুর সমস্ত কথা যথাযথরূপে আবৃত্তি করিলেন। অনন্তর মৃত্যু নচিকেতার তাদৃশ প্রত্যুচ্চারণে পরিতুষ্ট হইয়া পুনশ্চ বলিতে লাগিলেন—॥ ১৫ ॥]
ইদং শ্রুতের্ব্বচনম্। লোকাদিং-লোকানামাদিং প্রথমশরীরিত্বাৎ, অগ্নিং তং প্রকৃতং নচিকেতসা প্রার্থিতম্ উবাচ উক্তবান্ মৃত্যুঃ তস্মৈ নচিকেতসে। কিঞ্চ, যা ইষ্টকাঃ চেতব্যাঃ স্বরূপেণ, যাবতীৰ্ব্বা সংখ্যয়া, যথা বা চীয়তেহগ্নিরেন প্রকারেণ; সর্ব্বমেতদুক্তবানিত্যর্থঃ। স চাপি নচিকেতাঃ তৎ প্রত্যবদৎ-তৎ মৃত্যুনোক্তং * যথাবৎ প্রত্যয়েনাবদৎ প্রত্যুচ্চারিতবান্। অথ অস্য + প্রত্যুচ্চারণেন তুষ্টঃ সন্ মৃত্যুঃ পুনরেবাহ-বরত্রয়ব্যতিরেকেণাহন্যং বরং দিৎসুঃ ॥ ১. ॥
এই পঞ্চদশ শ্লোকের কথা শ্রুতির উক্তি।[শ্রুতি বলিতেছেন—]
8
[ মৃত্যু] প্রথম শরীরী অথবা প্রথমোৎপন্নত্ব-নিবন্ধন * সর্বলোকের কারণীভূত, নচিকেতার প্রার্থিত সেই অগ্নিতত্ত্ব নচিকেতাকে বলিলেন। আর, যেরূপ যতগুলি ইষ্টক[ যজ্ঞস্থান প্রস্তুত করণার্থ] চয়ন বা সংগ্রহ করিতে হইবে, এবং যে প্রকারে অগ্নি চয়ন করিতে হয়, এ সমস্ত কথা[ নচিকেতাকে বলিলেন]। নচিকেতাও মৃত্যুর কথিত সেই সমস্ত কথা যথাযথরূপে প্রত্যুচ্চারণ করিলেন। অনন্তর, মৃত্যু নচিকেতার সেই প্রত্যুচ্চারণে পরিতুষ্ট হইয়া( প্রতিশ্রুত) বরত্রয়ের অতিরিক্ত আরও একটি বর প্রদানের ইচ্ছায় পুনশ্চ বলিতে লাগিলেন—॥ ১৫ ॥
তমব্রবীৎ প্রীয়মাণো মহাত্মা বরং তবেহাদ্য দদামি ভূয়ঃ। তবৈব নাম্না ভবিতায়মগ্নিঃ, সৃঙ্কাঞ্চেমামনেকরূপাং গৃহাণ ॥ ১৬ ॥
[অথ যমস্যোক্তিপ্রকারমাহ,-] মহাত্মা(যমঃ)[নচিকেতসঃ শিষ্যযোগ্যতা- বলোকনেন] প্রীয়মাণঃ(প্রীতিমান্ সন্) তং(নচিকেতসম্) অব্রবীৎ- ইহ(অস্মিন্ বিষয়ে) এব অদ্য(ইদানীং) তব ভূয়ঃ(পুনরপি) বরং(বরত্রয়াদন্যং চতুর্থং) দদামি (প্রযচ্ছামি)। অয়ং(ময়া বর্ণিতঃ) অগ্নিঃ তব এব নাম্না(নাচিকেত-সংজ্ঞয়া প্রসিদ্ধঃ) ভবিতা(ভবিষ্যতি)।[কিঞ্চ], ইমাম্ অনেকরূপাং(বিচিত্রাং রত্নময়ীম্) সৃঙ্কাং(শব্দবতীং) মালাং, যদ্বা, সৃঙ্কাং-(অনিন্দিতাং) চ গতিং(কৰ্ম্ম বিজ্ঞানমিত্যর্থঃ) গৃহাণ(স্বীকুরু) ॥
অনন্তর, যমের উক্তিপ্রকার কথিত হইতেছে,—মহাত্মা যম নচিকেতাকে
* তাৎপর্য্য,—এখানে অগ্নি শব্দে বিরাট্ পুরুষ বুঝিতে হইবে। “স বৈ শরীরী প্রথমঃ স বৈ পুরুষ উচ্যতে। আদিকর্ত্তা স ভূতানাং ব্রহ্মাগ্রে সমবর্ত্তত।” এই স্মৃতি শাস্ত্রানুসারে জানা যায় যে, অগ্নিরূপী বিরাট, পুরুষই জীব-সৃষ্টির মধ্যে প্রথম জাত জীব, এবং তাহা দ্বারাই এই জগৎপ্রপঞ্চ প্রাদুর্ভূত হইয়াছে। এই কারণে অগ্নিকে ‘লোকাদি’ বলা হইয়াছে।
উপযুক্ত শিষ্য দেখিয়া প্রীতিসহকারে নচিকেতাকে বলিলেন,—আমি এই বিষয়েই তোমাকে আর একটি(তিনটির অতিরিক্ত—চতুর্থ একটি) বর প্রদান করি- তেছি। আমি তোমাকে যে অগ্নি-বিদ্যা বলিলাম, সেই অগ্নি তোমার নামেই (নাচিকেত নামেই) প্রসিদ্ধ হইবে। অপিচ, বিচিত্ররূপা—রত্নময়ী এই ‘সৃঙ্কা’ (মালা) গ্রহণ কর। অথবা সৃঙ্কা অর্থ অনিন্দিত গতি, অর্থাৎ উত্তম কর্ম্ম-বিদ্যা বিষয়ে উপদেশ গ্রহণ কর ॥১৬৷৷
কথং?—তং নচিকেতসমব্রবীৎ প্রীয়মাণঃ শিষ্যস্য যোগ্যতাং পশ্যন্ প্রীয়মাণঃ প্রীতিমনুভবন্ মহাত্মা অক্ষুদ্রবুদ্ধিঃ বরং তব চতুর্থম্ ইহ প্রীতিনিমিত্তম্ অদ্য—ইদানীং দদামি ভূয়ঃ পুনঃ প্রযচ্ছামি। তবৈব নচিকেতসো নাম্না অভিধানেন প্রসিদ্ধো ভবিতা ময়োচ্যমানোহয়মগ্নিঃ। কিঞ্চ সৃঙ্কাং শব্দবতীং রত্নময়ীং মালাম্ ইমাম্ অনেকরূপাং বিচিত্রাং গৃহাণ স্বীকারু। যদ্বা, সৃঙ্কামকুৎসিতাং গতিং কৰ্ম্মময়ীং গৃহাণ। অন্যদপি কৰ্ম্মবিজ্ঞানমনেকফলহেতুত্বাৎ স্বীকারু ইত্যর্থঃ ॥১৬৷৷
কি প্রকার?[তাহা বলা হইতেছে]-মহাত্মা, অর্থাৎ মহা- বুদ্ধিশালী যম নচিকেতার শিষ্য-যোগ্যতা দর্শন করিয়া প্রীতি অনুভব করিয়া বলিলেন,[আমি] প্রীতিবশতঃ এ বিষয়ে এখনই তোমাকে পুনর্ব্বার চতুর্থ একটি বর প্রদান করিতেছি,-আমি যে অগ্নির কথা বলিতেছি, সেই অগ্নি তোমারই-নচিকেতারই নামে(নাচিকেত সংজ্ঞায়) প্রসিদ্ধ হইবে। অনেকরূপা অর্থাৎ বিচিত্ররূপা শব্দযুক্ত এই রত্নময়ী(সৃঙ্কা) মালা তুমি গ্রহণ কর। অথবা, সৃঙ্কা অর্থ অনিন্দিত কর্মগতি অর্থাৎ অনেকফলপ্রদ অপর একটি কর্মবিদ্যা গ্রহণ কর ॥১৬৷৷
ত্রিণাচিকেতস্ত্রিভিরেত্য সন্ধিং, ত্রিকৰ্ম্মকৃৎ তরতি জন্মমৃত্যু। ব্রহ্মজ-জ্ঞং দেবমীড্যং বিদিত্বা নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি ॥ ১৭ ॥
[অগ্নেঃ ‘নাচিকেত’-নামকরণানন্তরং পুনঃ তদারাধন-ফলমাহ], -ত্রিণাচিকেট- ইতি। ত্রিভিঃ(ত্রিভিঃ বেদৈঃ, মাতৃপিত্রাচার্য্যৈঃ বা সহ) সন্ধিং(সন্ধানং সম্বন্ধং, মাত্রাদ্যনুশাসনং বা) এত্য(প্রাপ্য) ত্রিণাচিকেতঃ(ত্রিঃ-কৃত্বঃ নাচিকেতঃ অগ্নিঃ চিতঃ যেন, সঃ। যদ্বা, ত্রয়ো নাচিকেতা যস্যাসৌ, ত্রিণাচিকেতঃ। নাচিকেতাপ্নেরধ্যয়ন-বিজ্ঞানানুষ্ঠানবান্ বা),[তথা] ত্রিকৰ্ম্মকৃৎ(ইজ্যাধ্যয়ন- দানানাং কর্তা)[পুমান্] জন্ম-মৃত্যু তরতি(অতিক্রামতি)।[কিঞ্চ], ইড্যং(স্তুত্যং), ব্রহ্মজ-জ্ঞং(ব্রহ্ম বেদস্তত্র ব্যক্তত্বাদ ব্রহ্মজো বিষ্ণুঃ, যদা, ব্রহ্মণঃ হিরণ্যগর্ভাজ জাতঃ ব্রহ্মজঃ, সঃ চ অসৌ জ্ঞঃ চ ইতি, ব্রহ্মজজ্ঞঃ-সর্ব্বজ্ঞঃ তং) দেবং(দ্যোতমানং) বিদিত্বা(শাস্ত্রতঃ জ্ঞাত্বা) নিচায্য(আত্মস্বরূপেণ দৃষ্ট! বিচার্য্য বা) ইমাং (স্বানুভবগম্যাং) শান্তিম্ অত্যন্তম্ এতি(অতিশয়েন প্রাপ্নোতি) ॥
[ অগ্নির ‘নাচিকেত’ নাম করণের পর তাঁহার আরাধনার ফল বলা হইতেছে] —যে লোক বেদত্রয়ের সহিত সম্বন্ধ লাভ করিয়া, অথবা মাতা, পিতা ও আচার্য্যের উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া—তিনবার নাচিকেত অগ্নির চয়ন(অর্চ্চনা, করে, অথবা নাচিকেত অগ্নিবিদ্যার অধ্যয়ন, অনুভূতি ও অনুষ্ঠান করে, এবং ইজ্যা (জ্যোতিষ্টোমাদি যাগ), বেদাধ্যয়ন ও দান করে, সে লোক জন্ম ও মৃত্যু অতিক্রম করে। আর হিরণ্যগর্ভসম্ভূত, জ্ঞানাদিগুণসম্পন্ন স্তবনীয় ও স্বপ্রকাশ এই অগ্নিদেবকে শাস্ত্রোপদেশ হইতে অবগত হইয়া এবং আত্মস্বরূপে অনুভূত করিয়া স্বীয় অনুভবগম্য শান্তি সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্ত হয় ॥১৭॥
পুনরপি কৰ্ম্মস্তুতিমেবাহ,-ত্রিণাচিকেতঃ-ত্রিঃকৃত্বো নাচিকেতোহগ্নিশ্চিতো যেন, সঃ ত্রিণাচিকেতঃ, তদ্বিজ্ঞানঃ, তদধ্যয়নঃ, তদনুষ্ঠানবান্ বা। ত্রিভিৰ্মাতৃ- পিত্রাচার্যৈঃ এত্য প্রাপ্য সন্ধিং সন্ধানং সম্বন্ধম্, মাত্রাদ্যনুশাসনং যথাবৎ প্রাপ্যে- ত্যেতৎ। তদ্ধি প্রামাণ্যকারণং শ্রত্যন্তরাদবগম্যতে,-“যথা মাতৃমান্ পিতৃমান্” ইত্যাদেঃ; বেদ-স্মৃতি-শিষ্টৈর্ব্বা, প্রত্যক্ষানুমানাগমৈর্ব্বা, তেভ্যো হি বিশুদ্ধিঃ প্রত্যক্ষা। ত্রিকৰ্ম্মকৃৎ-ইজ্যাধ্যয়নদানানাং কর্তা, তরতি অতিক্রামতি জন্মমৃত্যু।
কিঞ্চ, ব্রহ্মজজ্ঞং—ব্রহ্মণো হিরণ্যগর্ভাৎ জাতো ব্রহ্মজঃ, ব্রহ্মজশ্চাসৌ জ্ঞশ্চেতি ব্রহ্মজজ্ঞঃ, সর্ব্বজ্ঞো হ্যসৌ। তং দেবং দ্যোতনাৎ, জ্ঞানাদিগুণবন্তম্ ঈড্যং স্তুত্যং বিদিত্বা শাস্ত্রতঃ, নিচায্য দৃষ্টা চাত্মভাবেন, ইমাং স্ববুদ্ধিপ্রত্যক্ষাং শান্তিম্ উপরতিম্
অত্যন্তম্ প্রতি অতিশয়েন প্রতি—বৈরাজং পদং জ্ঞান-কর্ম্মসমুচ্চয়ানুষ্ঠানেন প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ ॥১৭॥
পুনশ্চ কৰ্ম্ম-বিজ্ঞানের প্রশংসা অভিহিত হইতেছে,-‘ত্রিণাচিকেত অর্থ-যাঁহারা উক্ত ‘নাচিকেত’-নামক অগ্নির তিনবার চয়ন বা আরা- ধনা করিয়াছেন, অথবা যাঁহারা উক্তপ্রকার অগ্নিবিদ্যা অধ্যয়ন করিয়াছেন, বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম কবিয়াছেন, এবং তদনুযায়ী অনুষ্ঠান করিয়াছেন। পিন্না, মাতা, আচার্য্য এই তিনের সহিত সন্ধি-সম্বন্ধ, অর্থাৎ যথাযথরূপে মাতা, পিতা ও আচার্য্যের উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া- ‘মাতৃমান্ পিতৃমান্’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে,[ধর্মতত্ত্ব- জিজ্ঞাসুর পক্ষে] তাঁহাদের উপদেশই ধৰ্ম্মজ্ঞানে প্রধান প্রমাণ। * অথবা “ত্রিভিঃ” অর্থ-বেদ, স্মৃতি ও শিষ্টজন, কিংবা প্রত্যক্ষ, অনুমান ও অগম বা শাস্ত্র। এ সকল হইতেও চিত্তের বিশুদ্ধি বা নিৰ্ম্মলতা লাভ প্রত্যক্ষসিদ্ধ। ‘ত্রিকৰ্ম্মকৃৎ’ অর্থ-ইজ্যা(যাগ),
শাস্ত্রে আচার্য্যের লক্ষণ এইরূপ লিখিত আছে,—
“আচিনোতি চ শাস্ত্রার্থং আচারে স্থাপয়ত্যপি।
শ্রমচক্রেত যস্মাৎ, আচার্য্যাস্তেন কীর্ত্তিতঃ।”
অর্থাৎ যিনি শাস্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য্য সংগ্রহ করেন, লোককে শাস্ত্রানুযায়ী আচারে সংস্থাপিত করেন, এবং নিজেও শাস্ত্রোক্ত আচার প্রতিপালন করেন; তাঁহাকে ‘আচার্য্য’ বলা হয় ॥
অধ্যয়ন ও দানকর্তা—দাতা; এবংবিধ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি জন্ম ও মৃত্যু অতিক্রম করে।
অপিচ, ব্রহ্ম—হিরণ্যগর্ভ হইতে সমুৎপন্ন—ব্রহ্মজ, এবং সর্বজ্ঞতা নিবন্ধন-জ্ঞ, সুতরাং তিনি ‘ব্রহ্মজ-জ্ঞ’ এবং দ্যোতন বা স্বপ্রকাশতা বশতঃ দেব অর্থাৎ জ্ঞান প্রভৃতিগুণসম্পন্ন। স্তবনীয় সেই অগ্নিদেবকে শাস্ত্র হইতে অবগত হইয়া এবং আত্মস্বরূপে উপলব্ধি করিয়া এই স্বহৃদয়- বেদ্য শান্তি অর্থাৎ ভোগনিবৃত্তি অতিশয়রূপে লাভ করে।—অর্থাৎ জ্ঞান ও কর্ম্মের সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠানের ফলে ‘বৈরাজ’ পদ(বিরাট্- পুরুষের অধিকার প্রাপ্ত হন) ॥ ১৭ ॥
ত্রিণাচিকেতন্ত্রয়মেতদ্ বিদিত্বা য এবং বিদ্বাংশিনুতে নাচিকেতম্।
স মৃত্যুপাশান্ পুরতঃ প্রণোদ্য শোকাতিগো মোদতে স্বর্গলোকে ॥ ১৮ ॥
[ইদানীমগ্নি-বিজ্ঞান-চয়ন-(কৰ্ম্ম)-ফলমুপসংহরন্ আহ]-ত্রিণাচিকেত ইতি। যঃ ত্রিণাচিকেতঃ(বারত্রয়ং নাচিকেতাগ্নিসেবকঃ) এতৎ(যথোক্তং) ত্রয়ং --(যাঃ ইষ্টকাঃ, যাবতীঃ বা, যথা বা ইতি) বিদিত্বা, নাচিকেতম্(অগ্নিম্) এবং(আত্মস্ব- রূপেণ) বিদ্বান্(জানন্) চিনুতে(তদ্বিষয়কং ধ্যানং সম্পাদয়তি, শ্যেন-কুর্মাদ্যাকারেণ ইষ্টকাদিভির্বেদিং করোতি বা), সঃ পুরতঃ(শরীরপাতাৎ পূর্ব্বম্ এব) মৃত্যু-পাশান্ (অধৰ্মাজ্ঞান-রাগ-দ্বেষাদিলক্ষণান্) প্রণোদ্য(প্রণুদ্য-নিরস্য) শোকাতিগঃ(দুঃখ- বর্জিতঃ সন্) স্বর্গলোকে(বৈরাজে ধামনি) মোদতে(সুখমনুভবতি) ॥
এখন পূর্ব্বোক্ত অগ্নিবিদ্যা ও অগ্নিচয়নের ফল প্রদর্শনপূর্ব্বক প্রকরণ পরিসমাপ্ত করিতেছেন,—বারত্রয় নাচিকেত অগ্নির সেবক যে লোক পূর্ব্বোক্ত যজ্ঞীয় ইষ্টকার স্বরূপ, সংখ্যা ও সংগ্রহপ্রণালী অবগত হইয়া নাচিকেত অগ্নিকে আত্মস্বরূপে জানিয়া তদ্বিষয়ে ধ্যান সম্পাদন করেন; তিনি অগ্রে অধৰ্ম্ম অজ্ঞান প্রভৃতি মৃত্যু-পাশ চ্ছিন্ন করিয়া সর্ব্বদুঃখ অতিক্রম করিয়া স্বর্গলোকে আনন্দ উপভোগ করেন ॥১৮৷৷
ইদানীমগ্নিবিজ্ঞান-চয়ন-ফলমুপসংহরতি প্রকরণঞ্চ; ত্রিণাচিকেতঃ—ত্রয়ং যথোক্তং ‘যা ইষ্টকা যাবতীর্ব্বা যথা বা’ ইত্যেতৎ বিদিত্বা অবগম্য যশ্চ এবম্ আত্ম- রূপেণ অগ্নিং বিদ্বান্ চিনুতে নির্ব্বর্ত্তয়তি নাচিকেতমগ্নিং ক্রতুম্; স মৃত্যুপাশান্ অধৰ্ম্মাজ্ঞান-রাগদ্বেষাদিলক্ষণান্ পুরতোহগ্রতঃ পূর্ব্বমেব শরীরপাতাদিত্যর্থঃ। প্রণোদ্য অপহায় শোকাতিগো মানসৈদুঃখৈর্ব্বজ্জিত ইত্যেতৎ। মোদতে স্বর্গলোকে বৈরাজে বিরাড়াత్మস্বরূপ-প্রতিপত্ত্যা ॥১৮৷৷
এখন অগ্নিবিজ্ঞান ও অগ্নিচয়নের ফল এবং এই প্রকরণের উপ- সংহার করিতেছেন,—ত্রিণাচিকেত অর্থাৎ বারত্রয় নাচিকেত অগ্নির সেবক যে লোক পূর্ব্বোক্ত ইষ্টকার স্বরূপ, সংখ্যা ও সংগ্রহণপ্রণালী, এই ত্রিবিধ বিষয় অবগত হইয়া এবং নাচিকেত অগ্নিকে আত্মস্বরূপে জানিয়া তদ্বিষয়ে ক্রতু অর্থাৎ(সংকল্প) ধ্যান করেন, তিনি অগ্রে— দেহপাতের পূর্ব্বেই অধর্ম্ম, অজ্ঞান, রাগ ও দ্বেষাদিরূপ মৃত্যু-পাশ (মৃত্যুর আকর্ষণরজ্জু)-সমূহ ছিন্ন করিয়া মানস দুঃখরূপ শোকরহিত হইয়া বিরাটৃরূপী অগ্নিকে আত্মস্বরূপে উপলব্ধি করিয়া স্বর্গলোকে— বিরাটপদে আনন্দ ভোগ করেন ॥ ১৮ ॥
এষ তেহগ্নির্নচিকেতঃ, স্বর্গ্যো যমবৃণীথা দ্বিতীয়েন বরেণ। এতমগ্নিং তবৈব প্রবক্ষ্যন্তি জনাস- স্তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীঘ ॥ ১৯
[অথ মৃত্যুঃ তৃতীয়ং বরং স্মারয়ন্ প্রকরণমুপসংহরতি] এষ ইতি। হে নচিকেতঃ! তে(তুভ্যম্) এষঃ স্বর্গ্যঃ(স্বর্গসাধনভূতঃ) অগ্নিঃ(তৎসম্বন্ধীয়ঃ বরঃ)[দত্তঃ], যং(বরং.) দ্বিতীয়েন বরেণ অবৃণীথাঃ(বৃতবান্)[অসি], [ত্বম্ ইতি শেষঃ]। জনাসঃ(জনাঃ) এতম্ অগ্নিং তব এব[নাম্না] প্রবক্ষ্যন্তি, (ব্যবহরিষ্যন্তি)।[অধুনা] হে নচিকেতঃ! তৃতীয়ম্(অবশিষ্টং) বরং বৃণীঘ (প্রার্থয়স্ব) ॥
[ অনন্তর, মৃত্যু নচিকেতাকে তৃতীয় বর স্মরণ করাইয়া প্রকরণ পরিসমাপ্ত করিতেছেন],—হে নচিকেতঃ! তোমাকে স্বর্গ-সাধনীভূত এই অগ্নি সম্বন্ধীয় উপদেশ প্রদান করা হইল,—তুমি দ্বিতীয় বরে যাহা প্রার্থনা করিয়া- ছিলে। জনগণ তোমারই নামে এই অগ্নির ব্যবহার করিবে। হে নচিকেতঃ! তুমি এখন অবশিষ্ট তৃতীয় বর প্রার্থনা কর।’ ১৯॥
এষঃ তে তুভ্যমগ্নির্ব্বরো হে নচিকেতঃ স্বর্গাঃ স্বর্গসাধনঃ, যম্ অগ্নিং বরম্ অব- ণীথাঃ বৃতবান্ প্রার্থিতবানসি দ্বিতীয়েন বরেণ, সোহগ্নির্ব্বরো দত্ত ইত্যুক্তোপসংহারঃ। কিঞ্চ, এতম্ অগ্নিং তবৈব নাম্না প্রবক্ষ্যন্তি জনাসো জনা ইত্যেতৎ। এষ বরো দত্তো ময়া চতুর্থঃ তুষ্টেন। তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীঘ। তস্মিন্ হৃদত্তে ঋণবানহ- মিত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১৯ ॥
হে নচিকেতঃ! তুমি দ্বিতীয় বরে যে অগ্নিবিজ্ঞান প্রার্থনা করিয়া- ছিলে, স্বর্গ্য—স্বর্গ-সাধনীভূত এই সেই অগ্নিবিদ্যারূপ দ্বিতীয় বর প্রদত্ত হইল। এটি পূর্ব্বোক্ত কথারই উপসংহার মাত্র। আরও এক কথা, সমস্ত লোকে এই অগ্নিকে তোমারই নামে অভিহিত করিবে। আমি পরি- তুষ্ট হইয়া এই চতুর্থ বর প্রদান করিলাম। হে নচিকেতঃ![ এখন] তৃতীয় বর প্রার্থনা কর। অভিপ্রায় এই যে, পূর্ব্বপ্রতিশ্রুত সেই ( তৃতীয়) বর প্রদান না করিলে আমি ঋণগ্রস্ত থাকিব ॥ ১৯ ॥
যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে অস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি চৈকে। এতদ্ বিদ্যামনুশিষ্টস্ত্বয়াহং, বরাণামেষ বরস্তৃতীয়ঃ ॥ ২০ ॥
[অথ তৃতীয়বর-প্রার্থনা-প্রকারমাহ]—যেয়মিতি।[নচিকেতা আহ— মনুষ্যে(প্রাণিমাত্রে) প্রেতে(মৃতে সতি) যা(সর্ব্বজনবিদিতা) ইয়ং বিচিকিৎসা (সংশয়ঃ)—অয়ং(পরলোকগামী)[আত্মা] অস্তি ইতি একে(কেচন বাদিনঃ বদন্তি),
অয়ং(পরলোকগামী আত্মা) নাস্তি ইতি চ একে(কেচিৎ বাদিনঃ বদন্তি), অহং ত্বয়া অনুশিষ্টঃ(উপদিষ্টঃ সন্) এতৎ(পরলোক-তত্ত্বম্) বিদ্যাং(বিজানীয়াম্)। বরাণাং(মধ্যে) এষঃ তৃতীয়ঃ বরঃ(ময়া বৃতঃ) ॥
[ অনন্তর নচিকেতার তৃতীয় বর প্রার্থনার প্রণালী কথিত হইতেছে],—নচি- কেতা বলিলেন,—মনুষ্য মরিলে পর, কেহ কেহ বলেন, পরলোকগামী আত্মা আছে; আবার কেহ কেহ বলেন—আত্মার পরলোক-গমন নাই; এই যে, সর্ব্বজন- বিদিত সংশয়,[হে মৃত্যো!] আপনকার উপদেশে এই তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করি। ইহাই আমার তৃতীয় বর॥২০॥
এতাবদ্ব্যতিক্রান্তেন বিধি-প্রতিষেধার্থেন মন্ত্র-ব্রাহ্মণেন অবগন্তব্যম্, – যদ্বৎ বরদ্বয়সূচিতং বস্তু নাত্মতত্ত্ববিষয়-যাথাত্ম্যবিজ্ঞানম্। অতো বিধি-প্রতিষেধার্থ- বিষয়স্য আত্মনি ক্রিয়া-কারক-ফলাধ্যারোপলক্ষণস্য স্বাভাবিকস্যাজ্ঞানস্য সংসার- বীজস্য নিবৃত্ত্যর্থং তদ্বিপরীতব্রহ্মাত্মৈকত্ববিজ্ঞানং ক্রিয়া-কারক-ফলাধ্যারোপণ- লক্ষণশূন্যম্ আত্যন্তিকনিঃশ্রেয়সপ্রয়োজনং বক্তব্যম্; ইত্যুত্তরো গ্রন্থ আরভ্যতে। তমেতমর্থং দ্বিতীয়-বরপ্রাপ্ত্যাপি অকৃতার্থত্বং তৃতীয়বরগোচরম্ আত্মজ্ঞানমন্তরেণ ইত্যাখ্যায়িকয়া প্রপঞ্চয়তি।
যতঃ পূর্ব্বস্মাৎ কৰ্ম্মগোচরাৎ সাধ্য-সাধন লক্ষণাদনিত্যাদ্বিরক্তস্য আত্ম- জ্ঞানেহধিকারঃ; ইতি তন্নিন্দার্থং পুত্রাদ্যপন্যাসেন প্রলোভনং ক্রিয়তে। নচিকেতা উবাচ-‘তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীষ’ ইত্যুক্তঃ সন্; যেয়ং বিচিকিৎসা সংশয়ঃ- প্রেতে মৃতে মনুষ্যে, অস্তীত্যেকে-অস্তি শরীরেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধিব্যতিরিক্তো দেহান্তরসম্বন্ধ্যাত্মা ইত্যেকে মন্যন্তে, নায়মস্তীতি চৈকে-নায়মেবংবিধোহস্তীতি চৈকে। অতশ্চাস্মাকং ন প্রত্যক্ষেণ নাপ্যনুমানেন নির্ণয়বিজ্ঞানম্। এতদ্বিজ্ঞানাধীনো হি পরঃ পুরুষার্থ ইত্যত এতৎ বিদ্যাং বিজানীয়াম্ অহম্ অনুশিষ্টঃ জ্ঞাপিতত্ত্বয়া। বরাণামেষ বরস্তৃতীয়োহবশিষ্টঃ ॥ ২০ ॥
বিধি-প্রতিষেধার্থক অর্থাৎ মানবীয় প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তিবোধক অতীত মন্ত্র-ব্রাহ্মণাত্মক গ্রন্থে বরদ্বয় উপলক্ষে যে যে বিষয় উল্লিখিত
হইয়াছে *, বুঝিতে হইবে, তৎসমস্তই(সাংসারিক বিষয়); কোনটিই আত্ম-তত্ত্ব-বিষয়ক যথার্থ জ্ঞান নহে। অতএব বিধি-নিষেধাত্মক শাস্ত্রের বিষয়—যাহা আত্মাতে ক্রিয়া, কারক(কর্তৃত্বাদি) ও তৎফলের অধ্যারোপাত্মক এবং জীবের স্বভাব-সিদ্ধ, সংসার-বীজভূত সেই অজ্ঞানের নিবৃত্তির জন্য, এখন তদ্বিপরীত—ক্রিয়া, কারক ও তৎফলের অধ্যারোপশূন্য এবং আত্যন্তিক মুক্তিসাধন ব্রহ্ম ও আত্মার একত্ব- বিষয়ক জ্ঞানের প্রতিপাদন আবশ্যক; এই উদ্দেশে পরবর্তী গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে। তৃতীয় বরে যে আত্মজ্ঞানের উল্লেখ হইয়াছে, তাহা না পাইলে দ্বিতীয় বর লাভেও যে, কৃতার্থতা হইতে পারে না, এই বিষয়টিই আখ্যায়িকা বা উপস্থিত গল্প দ্বারা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করিতেছেন।
যেহেতু পূর্ব্বোক্ত সাধ্য-সাধনাত্মক অনিত্য কৰ্ম্ম ফল হইতে বিরক্ত অর্থাৎ কৰ্ম্মফলে তৃষ্ণারহিত ব্যক্তিরই আত্মজ্ঞানে অধিকার জন্মে, এই কারণে তাহার নিন্দাপ্রকাশার্থ[প্রথমতঃ] পুত্রাদি ফলের উল্লেখ দ্বারা নচিকেতার লোভোৎপাদন করা হইতেছে;—‘হে নচিকেতঃ! তুমি তৃতীয় বর প্রার্থনা কর, এইরূপে অভিহিত হইয়া নচিকতা বলিলেন, এই যে একটা সংশয় আছে,—এক সম্প্রদায় বলেন মনুষ্য মৃত্যুর পরও বর্তমান থাকে, অর্থাৎ তাঁহারা বলেন যে, শরীর, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি হইতে পৃথক এবং দেহান্তরগামী আত্মা আছে; আবার অন্য সম্প্রদায় বলেন যে, না—ঐ প্রকার আত্মা নাই বা থাকিতে পারে না। এই তত্ত্বটি প্রত্যক্ষ কিংবা অনুমান দ্বারাও আমাদের নিশ্চয়রূপে জানিবার উপায় নাই; অথচ পরম পুরুষার্থ(মুক্তি) লাভ
এই বিজ্ঞানেরই অধীন। অতএব আপনকার উপদেশে আমি এই তত্ত্ব জানিতে চাই। বর সমূহের মধ্যে ইহাই অবশিষ্ট তৃতীয় বর ॥ ২০॥
দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং পুরা,
ন হি সুবিজ্ঞেয়মণুরেষ ধর্ম্মঃ।
অন্যং বরং নচিকেতো বৃণীষ, মা মোপরোৎসীরতি মা সৃজৈনম্ ॥ ২১ ॥
[ যমস্তু নচিকেতসা এবং প্রার্থিতঃ সন্ উবাচ—দেবৈঃ অপি অত্র(অস্মিন্ বিষয়ে) পুরা(পূর্ব্বং) বিচিকিৎসিত(সংশয়িতং)।[ইদং তত্ত্বং শ্রুতমপি প্রাকৃতৈঃ জনৈঃ] নহি সুবিজ্ঞেয়ং চ(নৈব সম্যক্ বিজ্ঞাতুং শক্যং)।[যতঃ] ধৰ্ম্মঃ (জগৎধারকঃ) এষঃ(আত্মা) অণুঃ(অণুবৎ স্বভাবতএব দুর্বিজ্ঞেয়ঃ)।[অতঃ] হে নচিকেতঃ! অন্যং(পরলোকতত্ত্বভিন্নং) বরং বৃণীঘ(প্রার্থয়স্ব)। মা(মাং) মা উপরোৎসীঃ(উপরোধম্ আগ্রহাতিশয়ং মা কার্ষীঃ); মা(মাং প্রতি) এনং (বরং) অতিসৃজ পরিত্যজ);[মাং‘প্রতি নৈবং প্রশ্নঃ কার্য্যত্বয়া, ইত্যাশয়:]।
যম নচিকেতার এইরূপ প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া বলিলেন,—হে নচিকেতঃ! ইত পূর্ব্বে দেবগণও এ বিষয়ে সন্দেহ করিয়াছেন। এই আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়াও সাধারণ লোকে উত্তমরূপে বুঝিতে পারে না; কারণ, ধৰ্ম্ম(জগৎধারক) এই আত্মা স্বভাবতই অণু অর্থাৎ দুর্বিজ্ঞেয়। অতএব হে নচিকেতঃ! তুমি অন্য বর প্রার্থনা কর; এ বিষয়ে আমাকে আর উপরোধ করিও না; আমার সম্বন্ধে এই প্রশ্ন পরিত্যাগ কর ॥ ২.॥]
কিময়মেকান্ততো নিঃশ্রেয়স-সাধনাত্মজ্ঞানার্হো ন বা? ইত্যেতৎ-পরীক্ষার্থমাহ — দেবৈরপি অত্র এতস্মিন্ বস্তুনি বিচিকিৎসিতং সংশয়িতং পুরা পূর্ব্বম্। নহি সুবিজ্ঞেয়ং সুষ্ঠু বিজ্ঞেয়ম্ অসকৃৎ শ্রুতমপি প্রাকৃতৈর্জনৈঃ, যতঃ অণুঃ সূক্ষ্মঃ এষঃ আত্মাখ্যো ধৰ্ম্মঃ। অতঃ অন্যম্ অসন্দিগ্ধফলং বরং নচিকেতঃ বৃণীস। মা মা উপরোৎসীঃ উপরোধং মাকার্ষীরধমর্ণমিবোত্তমর্ণঃ। অতিসৃজ বিমুঞ্চ এনংবরংমা মাং প্রতি ॥২১৷৷
এই নচিকেতা মোক্ষ-সাধন আত্মজ্ঞানের উপযুক্ত পাত্র কি না?
ইহা পরীক্ষা করিবার উদ্দেশে যম বলিতে লাগিলেন,—পূর্ব্বে দেবগণও এই বস্তুবিষয়ে সংশয় করিয়াছেন; অর্থাৎ দেবগণেরও এই বিষয়ে সংশয় আছে। যেহেতু এই সূক্ষ্ম আত্মারূপ ধর্মটি অতীব দুজ্ঞেয়; অজ্ঞ লোকেরা বারংবার শ্রবণ করিয়াও এই তত্ত্ব বুঝিতে পারে না। অতএব, হে নচিকেতঃ! অসন্দিগ্ধ ফলজনক(যাহার ফল বিষয়ে সন্দেহ নাই, এমন) বর প্রার্থনা কর; উত্তমর্ণ(ঋণদাতা) যেমন অধমর্ণকে(ঋণ- গ্রহীতাকে) বাধ্য করে, তেমনি তুমিও আমাকে আর উপরোধ করিও না; আমার নিকট ঐ বর-প্রার্থনা পরিত্যাগ কর ॥২১৷৷
দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং কিল, ত্বঞ্চ মৃত্যো যন্ন সুজ্ঞেয়মাখ। বক্তা চাস্য ত্বাদৃগন্যো ন লভ্যো- নান্যো বরস্তুল্য এতস্য কশ্চিৎ ॥ ২২ ॥
[ অথ নচিকেতাঃ প্রত্যুবাচ;—মৃত্যো! অত্র(বিষয়ে) কিল(কিলেতি ঐতিহ্যসূচকং, পুরা ইত্যাশয়ঃ।) দেবৈঃ অপি বিচিকিৎসিতং, ত্বং চ যৎ ন সুজ্ঞেয়ম্ আথ(কথয়সি)। অন্য(তত্ত্বস্য) বক্তা চ ত্বাদৃক্(ত্বৎসদৃশঃ) অন্যঃ ন লভ্যঃ; [ অতঃ] এতস্য(বরস্য) তুল্যঃ অন্যঃ কশ্চিৎ বরঃ ন। অস্তি ইতি মন্যে।]
অনন্তর নচিকেতা বলিলেন,—হে মৃত্যো! দেবগণও এ বিষয়ে সন্দেহ করিয়াছেন; এবং তুমিও এই বিষয়টি অনায়াসবোধ্য নয় বলিতেছ; অথচ এ বিষয়ে তোমার মত অপর বক্তাও লাভ করা সম্ভবপর নহে। অতএব[আমি মনে করি যে,] ইহার তুল্য অন্য কোন বর নাই, অথবা অন্য কোন বরই ইহার তুল্য হইতে পারে না॥ ২২॥]
এবমুক্তো নচিকেতা আহ,-দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং কিলেতি ভরত এব মুপশ্রুতম্ *; ত্বঞ্চ মৃত্যো যদ্ যস্মাৎ ন সুজ্ঞেয়ম্ আত্মতত্ত্বম্ আথ কথয়সি। অতঃ পণ্ডিতৈরপ্যবেদনীয়ত্বাৎ বক্তা চাস্য ধৰ্ম্মস্য ত্বাদৃক্ ত্বত্তুলোহন্যঃ পণ্ডিতশ্চ ন লভ্যঃ
অন্বিষ্যমাণোহপি। অয়ং তু বরো নিঃশ্রেয়স-প্রাপ্তিহেতুঃ। অতো নান্যো বরস্তল্যঃ সদৃশোহস্তি এতস্য কশ্চিদপি; অনিত্যফলত্বাদন্যস্য সর্ব্বস্যৈবেত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ২২ ॥
এই কথার পর নচিকেতা বলিলেন,—হে মৃত্যো! দেবগণও এবিষয়ে সংশয় করিয়াছেন; অর্থাৎ তাঁহাদেরও যে, এবিষয়ে সংশয় আছে, এইরূপ কথা আপনার নিকটই শ্রবণ করিলাম, আর যেহেতু আপনিও এই আত্ম-তত্ত্বকে সুজ্ঞেয় নয়, বলিতেছেন, অতএব ইহা যখন পণ্ডিতগণেরও অবিজ্ঞেয়, তখন অন্বেষণ করিয়াও এই ধর্মতত্ত্বের বক্তা আপনকার সদৃশ অপর কোন পণ্ডিতকে লাভ করা যাইবে না। অথচ এই বরই নিঃশ্রেয়স-প্রাপ্তির(মোক্ষ-লাভের) [একমাত্র] উপায়; অতএব ইহার তুল্য অন্য কোনও বর নাই। অভিপ্রায় এই যে, অন্য সমস্তেরই ফল যখন অনিত্য; তখন অন্য কোন বরই ইহার সদৃশ হইতে পারে না ॥ ২২ ॥
বহুন্ পশূন্ হস্তি-হিরণ্যমশ্বান্। ভূমেহৃদায়তনং বৃণীষ;
স্বয়ঞ্চ জীব শরদো যাবদিচ্ছসি ॥ ২৩ ॥
[মৃত্যুঃ নচিকেতসম্ আত্মবিদ্যাধিকার-পরীক্ষার্থং পুনরপি প্রলোভয়ন্ আহ],— শতায়ুষ ইত্যাদি।[হে নচিকেতঃ! ত্বং] শতায়ুষঃ(শতং বর্ষাণি আয়ুংষি যেষাং, তান্)—পুত্রপৌত্রান্ বৃণীঘ,(প্রার্থয়স্ব), তথা বহুন্ পশূন্(গবাদীন), হস্তি-হিরণ্যং(হস্তী চ হিরণ্যং চ, তৎ), অশ্বান্, ভূমেঃ(পৃথিব্যাঃ) মহৎ(বিস্তীর্ণম্) আয়তনম্(সাম্রাজ্যমিত্যর্থঃ) বৃণীঘ। স্বয়ং চ(স্বয়মপি) যাবৎ শরদঃ(বর্ষাণি) [জীবিতুম্] ইচ্ছসি,[তাবৎ] জীব(শরীরং ধারয়) ॥
নচিকেতার আত্মবিজ্ঞানে অধিকার আছে কিনা, ইহার পরীক্ষার্থ পুনশ্চ প্রলোভন প্রদর্শনপূর্ব্বক যম বলিতে লাগিলেন,—হে নচিকেতঃ! তুমি শতবর্ষ- জীবী পুত্র-পৌত্র, বহু গবাদি পশু, হস্তী, সুবর্ণ ও অশ্ব সমূহ প্রার্থনা কর। পৃথিবীর
বিশাল আয়তন, অর্থাৎ সাম্রাজ্য প্রার্থনা কর; এবং নিজেও যত বৎসর ইচ্ছা কর, জীবন ধারণ কর ॥২৩৷৷
এবমুক্তোহপি পুনঃ প্রলোভয়ন্ন বাচ মৃত্যুঃ,-শতায়ুষঃ-শতং বর্ষাণি আয়ুংষি যেষাং তান্ শতায়ুষঃ, পুত্রপৌত্রান্ বৃণীঘ। কিঞ্চ, গবাদিলক্ষণান্ বহন্ পশূন্, হস্তিহিরণ্যং-হস্তী চ হিরণ্যঞ্চ হস্তিহিরণ্যম্, অশ্বাংশ। কিঞ্চ, ভূমেঃ পৃথিব্যা: মহৎ বিস্তীর্ণম্ আয়তনম্ আশ্রয়ং-মণ্ডলং সাম্রাজ্যং * বৃণীঘ। কিঞ্চ, সর্ব্বমপি এতদনর্থকং স্বয়ং চেৎ অল্পায়ুরিতাত আহ,-স্বয়ঞ্চ ত্বং জীব-ধাবস শরীরং সমগ্রে ন্দ্রিয়কলাপং, শরদো বর্ষাণি যাবদিচ্ছসি জীবিতুমিত্যর্থঃ। ২৩৷৷
এই কথা শ্রবণ করিয়া মৃত্যু পুনশ্চ প্রলোভন-প্রদর্শনপূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন,—শতবর্ষ পরিমিত যাহাদের আয়ুঃ(জীবনকাল), এবংবিধ অর্থাৎ শতবর্ষজীবী পুত্রপৌত্রগণ প্রার্থনা কর। অপিচ গো প্রভৃতি বহু পশু, হস্তী, হিরণ্য(সুবর্ণ) এবং অশ্বসমূহ(প্রার্থনা কর)। আর ভূমির অর্থাৎ পৃথিবীর বিস্তীর্ণ আয়তন আশ্রয় বা মণ্ডল, অর্থাৎ সাম্রাজ্য প্রার্থনা কর। আরও এক কথা, নিজে অল্পায়ুঃ হইলে এই সমস্তই বৃথা বা বিফল; এই কারণে বলিলেন যে, তুমি নিজেও যত বৎসর জীবন ধারণ করিতে ইচ্ছা কর,[ততবৎসর] বাঁচিয়া থাক, অর্থাৎ সমগ্র ইন্দ্রিয়-সম্পন্ন শরীর ধারণ কর ॥ ২৩ ॥
এতত্তুল্যং যদি মন্যসে বরং, বৃণীষ বিত্তং চিরজীবিকাঞ্চ। মহাভূমৌ নচিকেতত্ত্বমেধি,
কামানাং ত্বা কামভাজং করোমি ॥ ২৪ ॥
হে নচিকেতঃ![ত্বং] যদি এতত্তুল্যং(মৎপ্রদত্ত-বরতুল্যম্, আত্মতত্ত্ব- সদৃশং বা অপরং কঞ্চন) বরং মন্যসে,[তদা তমপি] বৃণীঘ।[অপিচ,] বিত্তং,
চিরজীবিকাং(চিরজীবিত্বং) চ[বৃণীঘ]।[যদ্বা, হে নচিকেতঃ! ত্বং যদি চিরজীবিকাং(দীর্ঘকালজীবনধারণহেতুভূতং) বিত্তং(ধনং) চ এতত্তুল্যং বরং মন্যসে, তর্হি তমপি বৃণীঘ ইত্যর্থঃ]।[আদরাতিশয়খ্যাপনার্থং প্রাগুক্তস্য পুনরুক্তিঃ।] মহাভূমৌ(বিস্তীর্ণভূমিভাগে) ত্বম্ এধি(রাজা ভব ইত্যাশয়ঃ)। ত্বা(ত্বাং) কামানাং (দিব্যানাং মানুষাণাং চ কাম্যমানানাং) কামভাজং(কামভাগিনং) করোমি [অহমিতি শেষঃ]॥
হে নচিকেতঃ! তুমি যদি ইহার অনুরূপ অপর বর(প্রার্থনীয়) আছে, মনে কর; তাহা হইলে তাহাও প্রার্থনা করিতে পার; এবং দীর্ঘজীবন ও জীবন- রক্ষার্থ প্রভূত বিত্তও প্রার্থনা করিতে পার। হে নচিকেতঃ! তুমি বিস্তীর্ণ ভূমিতে থাক, অর্থাৎ ঐরূপ ভূভাগের রাজা হও। আমি তোমাকে স্বর্গীয় ও পার্থিব সমস্ত কাম্যফলের ভোগভাগী করিতেছি ॥২৪৷৷
এতত্তুল্যম্ এতেন যথোপদিষ্টেন সদৃশম্ অন্যমপি যদি মন্যসে বরম্, তমপি বৃণীঘ। কিঞ্চ, বিত্তং প্রভূতং হিরণ্যরত্নাদি, চিরজীবিকাঞ্চ সহ বিত্তেন বৃণীঘেত্যেতৎ। কিং বহুনা, মহাভূমৌ মহত্যাং ভূমৌ রাজা নচিকেতস্থমেধি ভব। কিঞ্চান্যৎ, কামানাং দিব্যানাং মানুষাণাঞ্চ ত্বা ত্বাং কামভাজং কামভাগিনং কামার্হং করোমি; সত্যসঙ্কল্পো হ্যহং দেব ইতি ভাবঃ ॥ ৪।
[হে নচিকেতঃ! তুমি] যদি এতৎ-তুল্য অর্থাৎ কথিত বরের সদৃশ অন্য বরও আছে, মনে কর; তাহাও প্রার্থনা কর। অপিচ, বিত্ত অর্থাৎ প্রভূত সুবর্ণ-রত্নাদি বিত্তের সহিত চিরজীবিকা(দীর্ঘজীবন) অথবা বংশানুক্রমে জীবিকা নির্বাহের উপায় বিত্ত প্রার্থনা কর। আর অধিক কথায় প্রয়োজন কি? হে নচিকেতঃ! তুমি মহাভূমিতে অর্থাৎ বিস্তীর্ণ ভূমিতে রাজা হও। আরও এক কথা, দেবতা ও মনুষ্যের উপভোগ্য যত প্রকার কাম্য পদার্থ আছে, আমি তোমাকে সেই কামভাগী অর্থাৎ কাম ভোগের উপযুক্ত করিতেছি। অভিপ্রায় এই যে, আমি
সত্য-সংকল্প দেবতা, অর্থাৎ তুমি জানিয়া রাখ, আমি ইচ্ছামাত্রে কার্য্য সম্পাদন করিতে পারি ॥ ২৪ ॥
যে যে কামা দুর্লভা মর্ত্যলোকে, সর্ব্বান্ কামাশ্চন্দতঃ প্রার্থয়স্ব। ইমা রামাঃ সরথাঃ সতুর্য্যা ন হীদৃশা লম্ভনীয়া মনুষ্যৈঃ। আভির্মৎ প্রত্তাভিঃ পরিচারয়স্ব, নচিকেতো মরণং মানুপ্রাক্ণাঃ ॥ ২৫ ॥
যে যে ইতি।[অপিচ] মর্ত্যলোকে(ভূলোকে, মানুষদেহে বা)। যে যে কামাঃ(প্রার্থনীয়াঃ) দুর্লভাঃ(দুঃখেন লব্ধং শক্যাঃ), । তান্] সর্ব্বান্ কামান্ (ভোগ্যবস্তুনি) ছন্দতঃ(স্বেচ্ছানুসারেণ) প্রার্থয়স্ব। কিঞ্চ, ইমাঃ রূপশীলাদিগুণবত্যঃ সরথাঃ(রথস্থাঃ), সতুর্য্যাঃ(বাদিত্রাদিসমন্বিতাঃ) রামাঃ(রময়ন্তি প্রীণয়ন্তি পুরুষান্ ইতি রামাঃ স্ত্রিয়ঃ অপ্সরসো বা বর্তন্তে ইতি শেষঃ!! ঈদৃশাঃ(এবংবিধা রামাঃ) [অস্মদাদ্যনুগ্রহং বিনা] মনুষ্যৈঃ(নরৈঃ) নহি লম্ভনীয়াঃ(নৈব লভ্যা ইত্যর্থঃ)। [তদুপযোগম্ আহ]-হে নচিকেতঃ! আভিঃ(রথাদ্যপেতাভিঃ) মৎপ্রত্তাভিঃ (মদ্দত্তাভিঃ স্ত্রীভিঃ) পরিচারয়স্ব(আত্মানং সেবয়)। মরণং(মরণবিষয়কং প্রশ্নং) মানুপ্রাক্ষীঃ(নৈবং পৃচ্ছেত্যর্থঃ)[তস্য দুর্ব্বাচ্যত্বাদিতি ভাবঃ] ॥
অপিচ,[হে নচিকেতঃ!] মর্ত্যলোকে যে সকল পদার্থ প্রার্থনীয় অথচ দুর্লভ; তুমি স্বেচ্ছানুসারে সে সমুদয় প্রার্থনা কর।[দেখ] রথস্থ ও বাদিত্রাদি-সমন্বিত; এই রমণী বা অপ্সরোগণ রহিয়াছে। এরূপ রমণীগণ মনুষ্যের লাভ করা সম্ভব নহে। আমার প্রদত্ত এই রমণীগণ দ্বারা নিজের পরিচর্যা করাও। হে নচিকেতঃ! মরণবিষয়ক প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা করিও না ॥ ২৫ ॥
যে যে কামাঃ প্রার্থনীয়া দুর্লভাশ্চ মর্ত্যলোকে, সর্ব্বান্ তান্ কামান্ ছন্দতঃ ইচ্ছাতঃ প্রার্থয়স্ব। কিঞ্চ, ইমাঃ দিব্যা অপ্সরসঃ, রময়ন্তি পুরুষানিতি রামাঃ, সহ রথৈর্ব্বর্ত্তন্ত- ইতি সরথাঃ, সতুর্য্যাঃ সবাদিত্রাঃ তাশ্চ ন হি লম্ভনীয়াঃ প্রাপণীয়াঃ ঈদৃশা, এবংবিধা
rle.
মনুষ্যৈঃ মর্ত্যৈঃ অস্মদাদিপ্রসাদমন্তরেণ। আভিঃ মৎপ্রত্তাভিঃ ময়া দত্তাভিঃ পরিচারি- কাভিঃ পরিচারয় আত্মানম্—পাদপ্রক্ষালনাদিশুশ্রূষাং কারয় আত্মন ইত্যর্থঃ। হে নচিকেতঃ মরণং মরণসম্বদ্ধং প্রশ্নং—প্রেত্যাস্তি নাস্তীতি কাকদন্তপরীক্ষারূপং মা অনুপ্রাক্ষীঃ মৈবং প্রষ্টুমর্হসি ॥ ২৫ ॥
মর্ত্যলোকে যাহা যাহা ‘কাম্য অর্থাৎ মনুষ্যের প্রার্থনীয়, অথচ দুর্লভ,[হে নচিকেতঃ! তুমি] তৎসমুদয় ইচ্ছামত প্রার্থনা কর। আর[দেখ] পুরুষের প্রীতিকর এই দিব্য অপ্সরোগণ বাদ্যযন্ত্রসহকারে রথের সহিত বর্তমান রহিয়াছে; ঈদৃশ রমণীগণ অস্মদীয় অনুগ্রহ ব্যতীত মনুষ্যগণের লাভযোগ্য হয় না। আমার প্রদত্ত এই সকল পরিচারিকাদ্বারা পরিচর্যা করাও, অর্থাৎ নিজের পাদপ্রক্ষালনাদি শুশ্রূষাকার্য্য করাও। হে নচিকেতঃ! কাকদন্ত-পরীক্ষার ন্যায় অনাবশ্যক, ‘মৃত্যুর পর আত্মা থাকে কি না’ এই মরণ-বিষয়ক প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা করা তোমার উচিত হয় না ॥ ২৫ ॥
[এবং প্রলোভ্যমানোহপি নচিকেতাঃ অক্ষুব্ধ এব শতায়ুষ ইত্যাদেঃ উত্তরমাহ- শ্ব ইত্যাদিনা।]-হে অন্তক!(মৃত্যো)[ত্বয়া উপন্যস্তাঃ পুত্রাপ্সরঃপ্রভৃতয়ঃ ভোগাঃ] শ্বোভাবাঃ(শ্বঃ-আগামিনি দিনে স্থাস্যতি বা নবা ভাবঃ সত্তা যেষাং, তথাভূতাঃ),[তথা] মর্ত্যস্য(মনুষ্যস্য) যদেতৎ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাং তেজঃ(বীর্য্যং),[তৎ] জরয়ন্তি(শিথিলীকুর্ব্বস্তি)।[অতঃ- ত্বয়োক্তা ভোগা অনর্থায় এব সম্পদ্যন্তে ইতি ভাবঃ];[যদপি স্বয়ং চ জীবেত্যাদ্যুক্তং, তস্যোত্তরমাহ],-সর্ব্বম্ অপি[কিং বহুনা- ব্রহ্মণোহপি] জীবিতম্(আয়ুঃ) অল্পমেব[পরিমিতত্বাদিত্যাশয়ঃ]।[ইমা রামা
ইত্যস্যোত্তরমাহ—তবৈবেতি]; বাহাঃ(অশ্বরথাদয়ঃ) তবৈব[সন্তু], নৃত্য-গীতে চ তব[এব স্তাম্]॥
[ নচিকেতা পূর্ব্বোক্তপ্রকারে যমকর্তৃক প্রলোভিত হইয়াও চঞ্চল না হইয়া যমের কথায় উত্তর দিতে লাগিলেন। নচিকেতা বলিলেন],-হে অন্তক! (যম!)[আপনি পুত্র অপ্সরা প্রভৃতি যে সমুদয় ভোগ্যবস্তুর উল্লেখ করিয়াছেন, তৎসমস্তই] শোভাব অর্থাৎ কল্য পর্যন্ত থাকিবে কি না, সন্দেহের বিষয়, এবং মর্ত্যের অর্থাৎ মরণশীল মানবের সমস্ত ইন্দ্রিয়-শক্তিকে জীর্ণ করিয়া দেয়। [ আর যে দীর্ঘজীবনের কথা বলিয়াছেন, সেই] সমস্ত জীবন—এমন কি ব্রহ্মার জীবন পর্য্যন্ত] নিশ্চয়ই অল্প।[অতএব] বাহ অর্থাৎ অশ্ব-রথাদি বাহনসমূহ আপনকারই থাকুক, নৃত্যগীতও আপনকারই থাকুক[আমার ঐ সকলে প্রয়োজন নাই] ॥২৬৷৷]
মৃত্যুনা এবং প্রলোভ্যমানোহপি নচিকেতা মহাহৃদবদক্ষোভ্য আহ,--শ্বো- ভবিষ্যন্তি ন ভবিষ্যন্তি বেতি সন্দিহ্যমান এব যেষাং ভাবো ভবনং, - ত্বয়োপন্য- স্তানাং ভোগানাং, তে শ্বোভাবাঃ। কিঞ্চ, মর্ত্যস্য মনুষ্যস্য অন্তক-হে মৃত্যো যদেতৎ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাং তেজঃ, তং জরয়ন্তি অপক্ষপয়ন্তি। অপ্সরঃপ্রভৃতয়ো ভোগাঃ অনর্থায়ৈবৈতে ধর্মবীর্য্যপ্রজ্ঞাতেজোযশঃপ্রভৃতীনাং ক্ষপয়িতৃত্বাৎ। যাং চাপি দীর্ঘজীবিকাং ত্বং দিৎসসি, তত্রাপি শৃণু,-সর্ব্বং-যদব্রহ্মণোহপি জীবিতম্ আয়ুঃ অল্পমেব, কিমুতাস্মদাদিদীর্ঘজীবিকা। অতস্তবৈব তিষ্ঠন্তু বাহাঃ রথাদয়ঃ, তথা তব নৃত্যগীতে চ ॥ ২৬ ॥
নচিকেতা এইরূপ প্রলোভিত হইয়াও সমুদ্রের ন্যায় অক্ষুব্ধভাবে বলিতে লাগিলেন,—হে অন্তক(যম!) আপনি যে সকল ভোগ্য বস্তুর উপন্যাস করিয়াছেন, সে সকলের ভাব অর্থাৎ সত্তা বা অস্তিত্ব কল্য থাকিবে কি থাকিবে না—সন্দেহের বিষয়;[অতএব সে সকল বস্তু] শোভাব। আরও এক কথা,—অপ্সরা প্রভৃতি ভোগ্যবস্তুসমূহ মর্ত্যের(মনুষ্যের) এই যে সমস্ত ইন্দ্রিয়গত তেজঃ(শক্তি), তাহাকে
জীর্ণ করে, অর্থাৎ ক্ষয়োন্মুখ করে। ধৰ্ম্ম, বীর্য্য, জ্ঞান, তেজঃ ও যশ প্রভৃতিকে ক্ষয় করে বলিয়া, এ সমস্ত বস্তু অনর্থেরই কারণ। আর আপনি যে সুদীর্ঘ জীবন দিতে ইচ্ছা করিয়াছেন, তাহাতেও বলিতেছি শ্রবণ করুন; সমস্ত জীবন, অধিক কি, ব্রহ্মার যে জীবন বা আয়ুঃ, তাহাও যখন নিশ্চয়ই অল্প, তখন আমাদের ন্যায় লোকদিগের আর কথা কি? অতএব, রথাদি বাহনসমূহ আপনকারই থাকুক, এবং নৃত্য-গীতও আপনকারই থাকুক ॥ ২৬ ॥
বরস্তু মে বরণীয়ঃ স এব ॥ ২৭ ॥
[ বৃণীঘ বিত্তমিত্যাদেরুত্তরমাহ-ন বিত্তেনেতি।]--মনুষ্যঃ বিত্তেন(ধনেন) ন তর্পণীয়ঃ(আপ্যায়নীয়ঃ প্রার্থনীয়ঃ)[ ইত্যাহ, লপ্স্যামহ ইতি। ত্বা(ত্বাং) চেদ্ অদ্রাক্ষ্ম(দৃষ্টবন্তঃ স্মঃ) তহি] বিত্তং লপ্স্যামহে। ত্বং যাবৎ ঈশিষ্যসি(যামে পদে প্রভুঃ স্থাস্যসি)। তাবৎ! জীবিষ্যামঃ[বয়মিতি শেষঃ];[তাবৎ তব প্রভু- ত্বাদিতি ভাবঃ][অতঃ তদ্বিষয়ে পৃথক্ প্রার্থনামনুচিতম্।।[তস্মাৎ] বরস্ত (বরঃ পুনঃ) স এব(প্রাগ্যাচিতঃ এব) মে(মম) বরণীয়ঃ(প্রার্থনীয়ঃ),[নান্যঃ সংসারগোচর ইত্যাশয়ঃ][তু শব্দঃ অন্য বরস্য সর্ব্বাতিশায়িতাদ্যোতক:] ॥
[ এখন নচিকেতা যথোক্ত “বৃণীঘ বিত্তম্” ইত্যাদি বাক্যের উত্তর দিতেছেন] -- মনুষ্য বিত্ত বা ধনদ্বারা তর্পণীয়(তৃপ্তিলাভের যোগ্য) হইতে পারে না। [ বিশেষতঃ] আপনাকে যখন দর্শন করিয়াছি, তখন নিশ্চয়ই বিত্তলাভ করিব। আর আপনি যে পর্য্যন্ত যমপদের প্রভু থাকিবেন, আমরা তাবৎকাল নিশ্চয়ই জীবিত থাকিব। তাহার জন্য আর প্রার্থনায় প্রয়োজন নাই]। অতএব, আমার প্রথমোক্ত বরই প্রার্থনীয় ॥ ২৭ ॥}
শাঙ্কর-ভাষ্যম্ কিঞ্চ ন প্রভূতেন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যঃ। ন হি লোকে বিত্তলাভঃ
কস্যচিৎ তৃপ্তিকরো দৃষ্টঃ। যদি নাম অস্মাকং বিত্ততৃষ্ণা স্যাৎ, লপ্স্যামহে প্রাপ্স্যামহে বিত্তম্ অদ্রাক্ষ্ম দৃষ্টবন্তো বয়ং চেৎ ত্বা ত্বাম্; জীবিতমপি তথৈব; জীবিষ্যামঃ যাবদ্ যাম্যে পদে ত্বম্ ঈশিষ্যসি—ঈশিষ্যসে প্রভুঃ স্যাঃ। কথং হি মর্ত্যঃ ত্বয়া সমেত্য অল্পধনাযুর্ভবেৎ? বরস্তু মে বরণীয়ঃ স এব, যদাত্মবিজ্ঞানম্ ॥ ২৭ ॥
আরও এক কথা, মনুষ্য প্রচুরতর ধন দ্বারা তর্পণীয়(হয়) না। কারণ, জগতে বিত্তলাভ কাহারও পক্ষে তৃপ্তিকর হইতে দেখা যায় নাই। আমাদের যদি ধন-তৃষ্ণা থাকে, তবে নিশ্চয়ই আমরা তাহা পাইব; কারণ—আপনাকে দর্শন করিয়াছি; জীবনের সম্বন্ধেও সেইরূপই,—আপনি যে পর্য্যন্ত যম-রাজ্যে ঈশ্বর—প্রভু থাকিবেন; কেন না, মর্ত্যজন আপনার সহিত সাক্ষাৎলাভ করিয়া কেনই বা অল্পধন ও অল্পায়ুঃ হইবে? সেই যে,(পূর্ব্ব কথিত) আত্ম-বিজ্ঞান, তাহাই কিন্তু আমার প্রার্থনীয় বর॥ ২৭॥
অজীর্য্যতামমৃতানামুপেত্য জীৰ্য্যন্মর্ত্যঃ ক্বধঃস্থঃ প্রজানন্। অভিধ্যায়ন্ বর্ণরতি-প্রমোদান্ অতিদীর্ঘে জীবিতে কো রমেত ॥ ২৮ ॥
[পূর্ব্বোক্তমেব বিবৃণোতি – অজীর্য্যতামিতি]।—[হে মৃত্যো!] কধঃস্থঃ(কঃ পৃথিবী, অধঃ অন্তরিক্ষলোকাপেক্ষয়া, তস্যাং তিষ্ঠতীতি কধঃস্থঃ) কো জীর্য্যন্ মর্ত্যঃ (জরামরণসম্পন্নঃ জনঃ) অজীর্যতাং(জরারহিতানাং) অমৃতানাং(দেবানাং) [সকাশম্] উপেত্য প্রজানন্(আত্মনঃ উৎকৃষ্টং প্রয়োজনান্তরং প্রাপ্তব্যমস্তীতি বিদ্বান্ সন্) বর্ণরতি-প্রমোদান্—(বর্ণো ব্রাহ্মণাদিঃ, দেহগতশোভাবিশেষো বা। রতিঃ বিষয়ানুভবজং সুখং প্রমোদঃ প্রকৃষ্টবিষয়ানুভবজং সুখম্ এতান্ পূর্ব্বানুভূতান্ ইদানীং নিবৃত্তান্ বিষয়ান্ অপ্সরঃপ্রভৃতীন্ বা) অভিধ্যায়ন্(চিন্তয়ন্ অনবস্থিততয়া
নিরূপয়ন্) অতিদীর্ঘে জীবিতে রমেত[ন কোহপীত্যর্থঃ]।[বয়োহধিকত্বে জরাদ্যাপত্যা ভোগশক্তিরভাবাৎ প্রত্যুত ক্লেশ এব ভবেদিতি ভাবঃ]॥
নচিকেতা পূর্ব্বোক্ত কথাই পুনর্ব্বার বিবৃত করিতেছেন,—হে মৃত্যো! ভূতলস্থ, জরা-মরণশালী কোন্ লোক জরামরণহীন দেবগণের সান্নিধ্য লাভ করিয়া অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া, অপ্সরা প্রভৃতি বর্ণ-রতি-প্রমোদ সমূহকে অর্থাৎ শরীর- শোভা ক্রীড়া ও তজ্জনিত সুখকে অস্থির অনিত্য বলিয়া হৃদয়ঙ্গম করিতে পারি- তেও অতিশয় দীর্ঘজীবনে আনন্দ অনুভব করে? ॥ ২৮॥]
যতশ্চ অজীর্য্যতাং বয়োহানিমপ্রাপ্ন বতাম্ অমৃতানাং সকাশম্ উপেত্য উপগম্য আত্মন উৎকৃষ্টং প্রয়োজনান্তরং প্রাপ্তব্যম, তেভ্যঃ প্রজানন্ উপলভমানঃ স্বয়ন্ত জাৰ্য্যন্ মর্ত্যঃ-জরামরণবান, কধঃস্থঃ-কুঃ পৃথিবী, অধশ্চাসাবন্তরিক্ষাদিলোকাপেক্ষয়া, তস্যাং তিষ্ঠতীতি কধঃস্থঃ সন্ কথমেবমবিবেকিভিঃ প্রার্থনীয়ং পুত্রবিত্তহিরণ্যাদ্যস্থিরং বৃণীতে। ‘ক তদাস্থঃ’ ইতি বা পাঠান্তরম্। অস্মিন্ পক্ষে চ এবমক্ষরযোজনা- তেষু পুত্রাদিযু আস্থা আস্তিতিঃ তাৎপর্য্যেণ বর্তনং যস্য, স তদাস্থঃ। ততোহধিকতরং পুরুষার্থং দুষ্প্রাপমপি অভিপ্রেপ্সু: ক তদাস্থো ভবেৎ? ন কশ্চিৎ তদসারজ্ঞঃ তদর্থী স্যাদিত্যর্থঃ। সর্ব্বো হি উপর্য্য পর্য্যের বুভূষতি লোকঃ, তস্মান্ন পুত্রবিত্তাদিলোভৈঃ প্রলোভ্যোহহম্। কিঞ্চ অপ্সরঃ প্রমুখান্ বর্ণরতিপ্রমোদান অনবস্থিতরূপতয়া অভিধ্যায়ন্ নিরূপয়ন্ যথাবৎ অতি দীর্ঘে জীবিতে কো বিবেকী রমেত?
যেহেতু অজীর্য্যৎ অর্থাৎ বয়সের হানি(জরাপ্রাপ্তি)-রহিত অমৃত দেবগণের সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের নিকট হইতে নিজের অন্য প্রকার উৎকৃষ্ট প্রয়োজন প্রাপ্ত হওয়া উচিত, ইহা বুঝিতে পারিয়া এবং নিজে জীর্য্যৎ ও মর্ত্য অর্থাৎ জরা-মরণসম্পন্ন ও কধঃস্থ হইয়া,—‘কু’ অর্থ পৃথিবী, উহা অন্তরীক্ষের নিম্নবর্তী; সুতরাং ‘অধঃ’ শব্দবাচ্য, সেই কধে অর্থাৎ পৃথিবীতলে বাস করিয়া কিরূপে অজ্ঞ-জন প্রার্থনীয় ও অনিত্য পুত্র, বিত্ত ও হিরণ্য প্রভৃতি বিষয় প্রার্থনা করিতে পারে?[কধঃস্থ স্থানে] ‘ক তদাস্থঃ’ পাঠান্তর আছে। এই
পক্ষে ইহার শব্দার্থ এইরূপ, সেই সকলে(পুত্রাদিতে) আস্থা—স্থিতি অর্থাৎ তন্ময়ভাবে অবস্থিতি যাহার, সেই লোক ‘তদাস্থ’। সেই পুত্রাদি অপেক্ষাও অধিকতর, অথচ দুর্লভ পুরুষার্থ পাইতে ইচ্ছুক লোক কোথায় ‘তদাস্থ’ হয়? অভিপ্রায় এই যে, যে লোক সার পদার্থ জানে না, সে-ই ঐ সকল বিষয়ের প্রার্থী হইয়া থাকে; কারণ, সমস্ত লোকই উত্তরোত্তর উন্নত হইতে ইচ্ছা করে; অতএব আমি পুত্রাদির প্রলোভনে প্রলোভ্য নহি। আরও কথা,—বর্ণ-রতি-প্রমোদ অর্থাৎ শরীর-শোভা, ক্রীড়া-কৌতুকও প্রমোদ-পরায়ণ অপ্সরাপ্রভৃতিকে যথাযথরূপে অর্থাৎ উৎপত্তি-ধ্বংসশীল অনিত্যরূপে অবগত হইয়া কোন্ বিবেচক পুরুষ অতিদীর্ঘ জীবনে প্রীতি অনুভব করে? ॥ ২৮ ॥
যস্মিন্নিদং বিচিকিৎসন্তি মৃত্যো যৎ সাম্পরায়ে মহতি ক্রহি নস্তৎ। যোহয়ং বরো গূঢ়মনু প্রবিষ্টো নান্যং তস্মান্নচিকেতা বৃণীতে ॥ ২৯ ॥
ইতি কাঠকোপনিষদি প্রথমাধ্যায়ে পথমা বল্লী ॥১॥১॥
[নচিকেতাঃ প্রকৃতপ্রশ্নার্থং স্মারয়ন্ স্বাভিপ্রায়মাহ যস্মিন্নিতি]।—হে মৃত্যো! [ময়া প্রার্থিতং] যস্মিন্(বিষয়ে) ইদম্(আত্মা অস্তি ন বেতি) যৎ(যস্মাৎ) বিচিকিৎসন্তি(সন্দিহতে জনাঃ), তৎ(তদেব আত্মতত্ত্বং) মহতি সাম্পরায়ে (পরলোকবিষয়ে)[মোক্ষার্থং মহাপ্রয়োজনায়’ নঃ(অস্মভ্যং) ব্রূহি(উপদিশ)। [সাম্পরায়পদস্য শ্রেয়োমাত্রসাধারণ্যাৎ মুক্ত্যর্থত্বলাভায় মহতীত্যুক্তম্]। যোহয়ং বরঃ(আত্মতত্ত্বোক্তিপ্রার্থনরূপঃ) গূঢ়ং(গূঢ়ত্বং গোপ্যতাম্) অনুপ্রবিষ্টঃ(প্রাপ্তঃ), তস্মাৎ(বরাৎ) অন্যং(বরং) নচিকেতা ন বৃণীতে ইতি ॥ ২৯ ॥
এখন নচিকেতা প্রকৃত প্রশ্নের কথা যমকে স্মরণ করাইয়া স্বীয় অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিতেছেন,—হে মৃত্যো! যেহেতু আত্মার পরলোকাস্তিত্ব সম্বন্ধে লোক
সংশয় করিয়া থাকে; অতএব পারলৌকিক মহৎ প্রয়োজন সিদ্ধির নিমিত্ত তাহা আপনি আমাদিগকে বলুন; যে আত্ম-তত্ত্ব বিষয়ক বরটি অতিশয় গোপনীয়তা প্রাপ্ত হইয়াছে,—অর্থাৎ গোপন করিতে চেষ্টা করিতেছেন;[জানিবেন], নচিকেতা ঐ বর ভিন্ন অন্য বর প্রার্থনা করে না ॥ ২৯ ॥
অতো বিহায় অনিত্যৈঃ কামৈঃ প্রলোভনং, যৎ ময়া প্রার্থিতম্;—যস্মিন্ প্রেতে ইদং বিচিকিৎসনং বিচিকিৎসন্তি অস্তি নাস্তীত্যেবংপ্রকারম্। হে মৃত্যো সাম্পরায়ে পরলোকবিষয়ে মহতি মহৎপ্রয়োজননিমিত্তে আত্মনো নির্ণয়বিজ্ঞানং যৎ তদ্ব্রূহি কথয় নোহস্মভ্যম্। কিং বহুনা, যোহয়ং প্রকৃতাত্মবিষয়ো বরো গূঢ়ং গহনং দুর্বিবেচনং প্রাপ্তোহনু পবিষ্টঃ, তস্মাৎ বরাদন্যম্ অবিবেকিভিঃ প্রার্থনীয়ম্ অনিত্যবিষয়ং বরং নচিকেতা ন বৃণীতে মনসাপীতি শ্রুতের্ব্বচনমিতি ॥ ২৯ ॥
ইতি শ্রীমদ্ভাগবতভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য-পরমঃস-পারব্রাজকাচার্য্যশ্রীমঙ্কচ্ছর ভগবৎপ্রণীতে কঠোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমাধ্যায়ে প্রথম- বল্লী-ভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ১ ॥
অতএব অনিত্য কাম্যফলে প্রলোভন পরিত্যাগ করিয়া আমি যাহা প্রার্থনা করিয়াছি—সেই প্রেত বা মৃত ব্যক্তি সম্বন্ধে একটা সংশয় আছে; অর্থাৎ[পরলোক] আছে, কি নাই; লোকে এব- প্রকার সংশয় করিয়া থাকে। হে মৃত্যো! পরলোকে মহা প্রয়োজন বা অভীষ্ট সাধনের উপযোগী যে আত্ম-তত্ত্ব-বিজ্ঞান, তাহা আমাদের উদ্দেশে উপদেশ করুন। আর অধিক কথায় প্রয়োজন কি? এই যে প্রস্তাবিত আত্ম-তত্ত্ববিষয়ক বর, যাহা অত্যন্ত গহন বা চিন্তার অগম্যভাবাপন্ন, তদ্ব্যতীত—যাহা বিবেকহীন পুরুষের প্রার্থনাযোগ্য অনিত্য বিষয়ে বর, নচিকেতা তাহা মনে মনেও প্রার্থনা করে না। এই অংশটুকু শ্রুতির কথা ॥ ২৯ ॥
অন্যচ্ছে য়োহন্যদুতৈব প্রেয়- স্তে উভে নানার্থে পুরুষং সিনীতঃ। তয়োঃ শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবতি, হীয়তেহর্থাদ্ য উ প্রেয়ো বৃণীতে ॥ ১ ॥
[ দীয়মানপি পুত্রাদিকামং হিত্বা আত্ম-বিদ্যামের যাচমানস্য নচিকেতসঃ বৈরাগ্যম্ আত্ম বিদ্যাগ্রহণযোগ্যতাংচ অনুভূয় আত্ম-তত্ত্বম্ উপদিদিক্ষুঃ প্রথমং বিদ্যাবিদ্যয়ো; গুণ-দোষৌ আহ যমঃ অন্যদিত্যাদিনা]।—শ্রেয়ঃ(ব্রহ্মজ্ঞানম্) অন্যৎ (পৃথক্), প্রেয়ঃ উত(প্রিয়তমং দারাপত্যাদিকাম্যমানং বস্তুপি) অন্যৎ এব। তে উভে(শ্রেয়ঃপ্রেয়সী) নানার্থে(ভিন্নপ্রয়োজনকে মোক্ষ-ভোগ সাধকে) পুরুষং(দেহিনং) সিনীতঃ(বন্নীতঃ)[মোক্ষায় অভ্যুদয়ায় চ পুরুষপ্রবৃত্তেঃ ইত্যর্থ:]।[ততঃ কিমিত্যত আহ], তয়োঃ(শ্রেয়ঃপ্রেয়সোমধ্যে) শ্রেয়ঃ (ব্রহ্মবিদ্যাম্) আদদানস্য(উপাসীনস্য) সাধু(ভদ্রং সংসারমোচনরূপং) ভবতি। য উ(যঃ পুনঃ) প্রেয়ঃ(দারাপত্যাদিকামং) বৃণীতে(উপাদত্তে) [সঃ] অর্থাৎ(পরমপুরুষার্থাং) হীয়তে(হানো ভবতি),[ভবপাশৈঃ এব বদ্ধো ভবতীত্যাশয়:]।
[ পুত্রাদি কাম্য-পদার্থনিচয় প্রদান করিলেও নচিকেতা তৎসমুদয় পরিত্যাগ- পূর্ব্বক আত্ম বিদ্যাই প্রার্থনা করিতেছে দর্শন করিয়া, যমরাজ আত্ম-বিদ্যা উপদেশের ইচ্ছায় প্রথমতঃ বিদ্যা ও অবিদ্যায় গুণ ও দোষ প্রদর্শন করিয়া বলিতেছেন যে,]—শ্রেয়ঃ অর্থাৎ পরম-কল্যাণময় আত্ম-জ্ঞান নিশ্চয়ই প্রেয়ঃ হইতে পৃথক্ এবং প্রেয়ঃও(পুত্র-বিত্তাদি অর্থও) অন্য বা পৃথক্। তদুভয়ের প্রয়োজনও বিভিন্নরূপ, অর্থাৎ শ্রেয়ের প্রয়োজন মুক্তিলাভ, আর প্রেয়ের প্রয়োজন অভ্যুদয় লাভ। এই উভয়েই পুরুষকে আবদ্ধ করে। যিনি তদুভয়ের মধ্যে শ্রেয়ঃ গ্রহণ করেন, তাঁহার কল্যাণ হয়, আর যিনি প্রেয়ঃ গ্রহণ করেন, তিনি প্রকৃত পুরুষার্থ(মোক্ষ) হইতে বিচ্যুত হন ॥ ৩০। ১॥
পরীক্ষ্য শিষ্যং বিদ্যাযোগ্যতাঞ্চ অবগম্যাহ-অন্যৎ পৃথগেব শ্রেয়ো নিঃশ্রেয়সং, তথা অন্যৎ উতৈব অপি চ প্রেয়ঃ প্রিয়তরমপি; তে প্রেয়ঃশ্রেয়সী উভে নানার্থে ভিন্নপ্রয়োজনে সতী পুরুষমধিকৃতং বর্ণাশ্রমাদিবিশিষ্টং সিনীতঃ বন্নীতঃ; তাভ্যাং বিদ্যাবিদ্যাভ্যাম্ আত্মকর্তব্যতয়া প্রযুজ্যতে সর্ব্বঃ পুরুষঃ। শ্রেয়ঃ-প্রেয়সোর্হি অভ্যু- দয়ামৃতত্বার্থী পুরুষঃ প্রবর্ত্ততে। অতঃ শ্রেয়ঃ-প্রেয়ঃপ্রয়োজন-কর্তব্যতয়া তাভ্যাং বদ্ধ ইত্যুচ্যতে সর্ব্বঃ পুরুষঃ। তে যদ্যপি একৈকপুরুষার্থসম্বন্ধিনী,[তথাপি] বিদ্যা-বিদ্যারূপত্বাদবিরুদ্ধে; ইত্যন্যতরাপরিত্যাগেন একেন পুরুষেণ সহানুষ্ঠাতু- মশক্যত্বাৎ তয়োহিত্বা অবিদ্যারূপং প্রেয়ঃ, শ্রেয় এব কেবলম্ আদদানস্য উপাদানং কুর্ব্বতঃ সাধু শোভনং শিবং ভবতি। বস্তু অদূরদর্শী বিমূঢ়ো হীয়তে বিষুজ্যতে অর্থাৎ পুরুষার্থাৎ পারমার্থিকাৎ প্রয়োজনান্নিত্যাৎ প্রচ্যবত ইত্যর্থঃ। কোহসৌ? য উ প্রেয়ো বৃণীতে উপাদত্তে ইত্যেতৎ ॥ ৩০ ॥ ১ ॥
যমরাজ[এইরূপে] শিষ্যকে পরীক্ষা করিয়া এবং তাহার বিদ্যাগ্রহণের যোগ্যতা দর্শন করিয়া বলিতে লাগিলেন,-শ্রেয়ঃ অর্থাৎ নিঃশ্রেয়স একটি পৃথক্(শ্রেয়ঃ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদার্থ), তেমনি প্রেয়ঃ অর্থাৎ লৌকিক প্রিয় পদার্থ সমূহও[নিঃশ্রেয়স অপেক্ষা] পৃথক্। সেই শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, উভয়ই বিভিন্ন প্রযোজনের সাধক; এই কারণে যিনি আপনাকে বর্ণাশ্রমাদি ধর্মযুক্ত মনে করেন, তাদৃশ অধিকার- সম্পন্ন ব্যক্তিকে আবদ্ধ করিয়া থাকে। বিদ্যা ও অবিদ্যা এবং শ্রেয়ঃ ‘ও প্রেয়ঃ, এতদুভয়ই পুরুষের কর্তব্য নির্দেশ করে; সমস্ত পুরুষ সেই নির্দেশানুসারে নিজ নিজ কর্তব্য-বোধে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন; কেন না, যিনি মোক্ষাভিলাষী, তিনি শ্রেয়ঃ-পথে, আর যিনি অভ্যুদয় অর্থাৎ স্বর্গাদি উন্নত লোকাভিলাষী, তিনি প্রেয়ঃ-পথে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন। অতএব শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ উদ্দেশে পুরুষ প্রবৃত্ত হয় বলিয়া সমস্ত পুরুষকে তদুভয়ের দ্বারা আবদ্ধ বলা হইয়াছে। সেই শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ
৭
যদিও[মোক্ষ ও অভ্যুদয়রূপ] বিভিন্নপ্রকার পুরুষার্থের সাধক হউক, তথাপি উহারা যখন বিদ্যা ও অবিদ্যা-স্বরূপ, তখন নিশ্চয়ই পরস্পরে বিরুদ্ধ; সুতরাং একই ব্যক্তি[ঐ দুইটির মধ্যে] একটি পরিত্যাগ না করিয়া কখনই এক সঙ্গে দুইটিরই অনুষ্ঠান করিতে পারে না; (কাজেই দুইটির মধ্যে একটিকে ত্যাগ করিতে হইবে)। যে লোক তদুভয়ের মধ্যে অবিদ্যাত্মক প্রেয়ঃ পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবলই শ্রেয়ঃ গ্রহণ করে, তাহার মঙ্গল হয়। কিন্তু যিনি অদূরদর্শী মোহগ্রস্ত, তিনি নিত্য ও পারমার্থিক পুরুষার্থরূপ প্রয়োজন হইতে বিযুক্ত হন, অর্থাৎ মোক্ষ হইতে বিচ্যুত হন। ইনি কে? না,-যিনি[শ্রেয়ঃ পরিত্যাগ পূর্ব্বক প্রেয়ঃ গ্রহণ করেন ॥ ৩০ ॥ ১ ॥
শ্রেয়শ্চ প্রেয়শ্চ মনুষ্যমেতঃ, তৌ সম্পরীত্য বিবিনক্তি ধীরঃ। শ্রেয়ো হি ধীরোহভি প্রেয়সো বৃণীতে, প্রেয়ো মন্দো যোগ-ক্ষেমাদ বৃণীতে ॥ ৩১। ২॥
[ বিদ্বদবিদুষোঃ শ্রেয়ঃ-প্রেয়োগ্রহণপ্রভেদমাহ] শ্রেয়শ্চেতি।[ ‘এতঃ’ ইত্যত্র আ+ইতঃ ইতি পদচ্ছেদঃ]।[উক্তরূপং] শ্রেয়শ্চ প্রেয়শ্চ(দ্বে এব) মনুষ্যম্ এতঃ (প্রাপ্য তিষ্ঠতঃ)। ধীরো(জ্ঞানী) তৌ(শ্রেয়ঃ-প্রেয়ঃশব্দিতৌ বিদ্যা-বিদ্যারূপৌ) সম্পরীত্য(সম্যক্ আলোচ্য) বিবিনক্তি(শ্রেয়ঃ মোচকং, প্রেয়শ্চ বন্ধকমিতি নিশ্চিনোতি)।[এবং বিবিচ্য কিং করোতীত্যত আহ,-] ধীরো(বিবেকী) প্রেয়সঃ(প্রিয়তমান্ দারাপত্যাদিকামান্) অভি(অবজ্ঞায়) শ্রেয়ঃ(ব্রহ্মবিদ্যাং) বৃণীতে। মন্দো(বিবেকহীনঃ) যোগক্ষেমাৎ(অপ্রাপ্তকামপ্রাপ্তির্যোগঃ, তস্য পরিরক্ষণং ক্ষেমঃ, তন্নিমিত্ত) প্রেয়ঃ(ধনাদি) বৃণীতে(পার্থয়তে)।[ বিবেকী গুণাতিশয়ং দৃষ্ট্বা শ্রেয়ো গৃহাতি; অবিবেকী তু আপাত রমণীয়ং প্রেয়ঃ এব গৃহ্নাতীতি ভাবঃ] ॥
[ এখন বিদ্বান্ ও অবিদ্বান্, উভয়ের মধ্যে শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ-গ্রহণে পার্থক্য বলিতেছেন,—] শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, উভয়ই মনুষ্যের নিকট উপস্থিত হয়;
জ্ঞানী জন আলোচনা করিয়া উভয়ের স্বরূপ(একটি বিদ্যাত্মক, অপরটি অবিদ্যা- ত্মক; এইরূপ) নির্দ্ধারণ করেন, এবং নির্দ্ধারণ করিয়া প্রেয়ঃ পরিত্যাগ পূর্ব্বক শ্রেয়ঃ গ্রহণ করেন। আর অল্পবুদ্ধি লোক দেহাদি-রক্ষার্থ প্রেয়ঃ গ্রহণ করে। অর্থাৎ বিবেকী গুণাধিক্য দর্শনে শ্রেয়ঃ গ্রহণ করেন, আর অবিবেকী আপাত মনোরম প্রেয়ঃ(ধনাদি) গ্রহণ করে] ॥ ৩২। ২॥
যদ্যুভে অপি কর্ত্তং স্বায়ত্তে পুরুষেণ, কিনর্থং প্রেয় এবাদত্তে বাহুল্যেন লোক ইতি? উচ্যতে-সত্যং স্বায়ত্তে, তথাপি সাধনতঃ ফলতশ্চ মন্দবুদ্ধীনাং দুর্বিবেররূপে সতী ব্যমিশ্রীভূতে ইব মনুষ্যম্ এতঃ পুরুষম্ আ+ইতঃ প্রাপ্নুতঃ শ্রেয়শ প্রেয়শ। অতো হংস ইবান্তসঃ পয়ঃ, তৌ শ্রেয়ঃ-প্রেয়ঃপদার্থো সম্পরীত্য সম্যক্ পরিগম্য মনসা সম্যক্ আলোচ্য গুরুলাঘবং বিবিনক্তি - পৃথক্ করোতি ধীরঃ ধীমান্। বিবিচ্য চ শ্রেয়ো হি শ্রেয় এব অভিবৃণীতে প্রেয়সোহভ্যহিতত্বাৎ শ্রেয়সঃ। কোহসৌ?-ধীরঃ। যস্ত মন্দোহল্পবুদ্ধিঃ, স সদসদ্বিবেকাসামর্থ্যাৎ যোগক্ষেমাদ যোগক্ষেমনিমিত্তং শরীরাদ্যপচয়-রক্ষণনিমিত্তমিত্যেতৎ, প্রেয়ঃ পশুপুত্রাদিলক্ষণং বৃণীতে ॥ ৩১। ২॥
[ ভাল,] শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ উভয়েরই অনুষ্ঠান করা যদি পুরুষের ইচ্ছাধীন হয়, তবে অধিকাংশ লোকই প্রেয়ঃ গ্রহণ করে কেন? [ উত্তর] বলা যাইতেছে,—উভয়ই নিজের আয়ত্ত বটে, কিন্তু আয়ত্ত হইলেও ঐ শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ, সাধন ও ফল উভয়েতেই অবিবিক্তরূপে —পরস্পর মিশ্রিত ভাবেই যেন পুরুষের সমীপে উপস্থিত হয়। অতএব ধীর ব্যক্তি জল হইতে দুগ্ধগ্রাহী হংসের মত সেই শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃপদার্থ দুইটিকে মনে মনে উত্তমরূপে আলোচনা করিয়া উভয়ের উৎকর্ষাপকর্ষ বিচার করেন, অর্থাৎ তদুভয়ের লাঘব ও গৌরবের বিশ্লেষণ করেন। এইরূপ বিচারের পর প্রেয়ঃ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট বলিয়া শ্রেয়ঃই গ্রহণ করেন। ইনি কে? না—ধীরব্যক্তি(ধৈর্য্য- সহকারে যাহার বিচার করিবার ক্ষমতা আছে; সে)। আর যে
লোক অল্পবৃদ্ধি, বিচারশক্তির অভাববশতঃ সে লোক যোগ-ক্ষেমের নিমিত্ত অর্থাৎ শরীর প্রভৃতির বৃদ্ধি ও পরিরক্ষণোদ্দেশে পশু-পুত্রাদি- রূপ প্রেয়ঃ বস্তু প্রার্থনা করে ॥ ৩১ ॥ ২ ॥
স ত্বং প্রিয়ান্ প্রিয়রূপাংশ কামান্ অভিধ্যায়ন্ নচিকেতোহত্যস্রাক্ষীঃ।
নৈতাং সৃঙ্কিং বিভ্রময়ীমবাপ্তো।
গস্যাং গচ্ছন্তি বহবো মনুষ্যাঃ ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
[পুনরপি যমঃ নচিকেতসং প্রশংসন্ আহ- স ত্বমিতি। হে নচিকেতঃ, স ত্বং(ময়া প্রলোভ্যমানোহপি) প্রিয়ান্(সম্বন্ধবশাৎ প্রীতিপ্রদান্ দারাপুত্রা- দীন্), প্রিয়রূপান্ চ(স্বভাবতো রমণীয়ান্ গৃহারামক্ষেত্রাদীন্ চ) কামান্(কাম্য- মানান্) অভিধ্যায়ন্(অস্থিরতয়া চিন্তয়ন্) অত্যস্রাক্ষীঃ(ত্যক্তবানভূরিত্যর্থঃ)। বিত্তময়ীং(সুবর্ণময়ীম্) এতাং(সন্নিহিততখন) সৃঙ্কাং(মালাং)(যদ্বা কুৎসিতাং সংসারগতিং) ন অবাপ্তঃ(ন স্বীকৃতবান্ অসি)।[সৃঙ্কেয়মতিশ্লাঘ্যা, ইত্যাহ,-] বহবো মনুষ্যাঃ যস্যাং মজ্জন্তি(আসক্তা ভবন্তি)।[তাদৃশীমপি ময়া দীয়মানাং ন গৃহীতবান্ অসি, অতত্ত্বং মহাসত্ত্বোহসি, ইতি ভাবঃ।]
[ যমরাজ পুনশ্চ নচিকেতাকে প্রশংসা করিয়া বলিলেন],-হে নচিকেতঃ! সেই তুমি[ আমা দ্বারা প্রলোভিত হইয়াও] স্বভাবসৌন্দর্য্যে ও গুণে রমণীয় স্ত্রীপুত্রাদি কাম্য বিষয় সমূহকে অনিত্য মনে করিয়া পরিত্যাগ করিয়াছ। বহুমূল্য এই সুবর্ণমালা, অথবা ক্লেশবহুল নিকৃষ্ট সংসারগতি প্রাপ্ত হও নাই। সাধারণতঃ বহু মনুষ্য যাহাতে মগ্ন হইয়া থাকে[ অতএব তুমি মহাসত্ত্ব] ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
স ত্বং পুনঃপুনর্ময়া প্রলোভ্যমানোহপি প্রিয়ান্ পুত্রাদীন্ প্রিয়রূপাংশ্চ অপ্সরঃ- প্রভৃতিলক্ষণান্ কামান্ অভিধ্যায়ন্ চিন্তয়ন্—তেষাম্ অনিত্যত্বাসারত্বাদিদোষান্, হে নচিকেতঃ! অত্যস্রাক্ষীঃ অতিসৃষ্টবান্ পরিত্যক্তবানসি; অহো বুদ্ধিমত্তা তব। ন এতাম্ অবাপ্তবানসি সৃঙ্কাং স্মৃতিং কুৎসিতাং মূঢ়জনপ্রবৃত্তাং বিত্তময়ীং ধনপ্রায়াম্। যস্যাং মৃতৌ মজ্জন্তি সীদন্তি বহবঃ অনেকে মূঢ়াঃ মনুষ্যাঃ ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
[ যম বলিলেন;] হে নচিকেতঃ! আমি তোমাকে পুনঃ পুনঃ প্রলোভন দেখাইলেও তুমি যে, প্রিয়(স্বভাবতঃ মনোরম) পুত্র প্রভৃতি ও প্রিয়রূপ(রূপে-গুণে মধুর) অপ্সরঃপ্রভৃতি কাম্যনিচয়কে (ভোগ্যসমূহকে) তাহাদের অনিত্যত্ব ও অসারত্বাদি দোষদর্শনে পরি- ত্যাগ করিয়াছ; অহো তোমার আশ্চর্য্য বুদ্ধি! মূঢ়জনের প্রবৃত্তি- জনক ধনবহুল এই কুৎসিত সৃঙ্কা অর্থাৎ সংসারগতি বা রত্নমাল্য গ্রহণ কর নাই। এই পুথে একজন নহে--বহুতর মূঢ় মনুষ্য নিমগ্ন বা অবসন্ন হইয়াছে ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥
দূরমেতে বিপরীতে বিষুচী অবিদ্যা যা চ বিদ্যেতি জ্ঞাতা।
বিদ্যাভীপ্সিনং নচিকেতসং মন্যে
ন ত্বা কামা বহবোঽলোলুপন্ত ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥
[ শ্রেয়ঃ প্রেয়সোবিপরীতফলত্বং কুত ইত্যাকাঙ্ক্ষয়া তত্র হেতুং প্রদর্শয়ন্ নচি- কেতসং স্তৌতি—] দূরমিতি। যা অবিদ্যা(বিদ্যাভিন্না)[ঐহিকসুখসাধনত্বেন] জ্ঞাতা, যা চ বিদ্যা(অমৃতত্বসাধনম্ ইতি) জ্ঞাতা], এতে দূরম্(অতিশয়েন) বিপরীতে(অন্যোন্যপৃথক্বভাবে)[তদেব স্পষ্টয়তি—] বিষূচী(বিরুদ্ধফলহেতু)। নচিকেতসং ত্বা(ত্বাং) বিদ্যাভীপ্সিনং(বিদ্যাভিকাঙ্ক্ষিণঃ) মন্যে(জানামি)। [ যতঃ] বহবঃ কামাঃ[ত্বাং] ন অলোলুপন্ত(শ্রেয়ঃপথাৎ ন বিচালিতং কৃতবস্তু ইত্যর্থঃ)।[ ত্বং কৈরপি কামৈঃ প্রলুব্ধো ন ভবসীতি ভাবঃ]॥
[শ্রেয়ঃ এবং প্রেয়ঃ, এতদুভয়ে বিরুদ্ধফল সমুৎপাদন করে কেন? ইহার কারণপ্রদর্শনপূর্ব্বক নচিকেতার প্রশংসা করিতেছেন,—] এই যে, অবিদ্যা ও বিদ্যা পরিজ্ঞাত হইল; এই উভয়ই বিপরীতস্বভাব ও বিরুদ্ধফলপ্রদ।[হে নচি- কেতঃ!] তোমাকে আমি বিদ্যাভিলাষী মনে করি; কারণ,[মৎপ্রদর্শিত] বহুতর কাম্য বস্তুও তোমার লোভ সমুৎপাদন করিতে পারে নাই। অর্থাৎ তোমাকে শ্রেয়ঃপথ হইতে ভ্রষ্ট করিতে পারে নাই] ॥ ৩৩॥ ৪ ॥
“তয়োঃ শ্রেয় আদদানস্য সাধু ভবতি, হীয়তেহর্থাদ্ যউ প্রেয়োবৃণীতে” ইত্যুক্তম্। তৎ কস্মাৎ? যতো দূরং দূরেণ মহতা অন্তরেণ এতে বিপরীতে অন্যোন্যব্যাবৃত্তরূপে বিবেকাবিবেকাত্মকত্বাৎ তমঃ-প্রকাশাবিব। বিষূচী বিষূচ্যো নানাগতী ভিন্নফলে সংসার মোক্ষহেতু‘ত্বেন ইত্যেতৎ। কে তে? ইত্যুচ্যতে-যা চ অবিদ্যা প্রেয়োবিষয়া, বিদ্যেতি চ শ্রেয়োবিষয়া জ্ঞাতা নির্জ্ঞাতা অবগতা পণ্ডিতৈঃ। তত্র বিদ্যাভীপ্সিনং বিদ্যার্থিনং নচিকেতসঃ ত্বামহং মন্যে। কস্মাৎ? যস্মাৎ অবিদ্ববুদ্ধি প্রলোভিনঃ কামাঃ অপ্সরঃপ্রভৃতয়ো বহবোহপি ত্বা ত্বাং ন অলো- লুপন্ত ন বিচ্ছেদং কৃতবন্তঃ শ্রেয়োমার্গাৎ আত্মোপভোগাভিবাঞ্ছাসম্পাদনেন। অতো বিদ্যার্থিনং শ্রেয়োভাজনং মন্যে ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥
পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, ‘তদুভয়ের মধ্যে শ্রেয়োগ্রাহীর মঙ্গল হয়, আর প্রেয়োগ্রাহী পরম পুরুষার্থ(মোক্ষ) হইতে ভ্রষ্ট হয়।’ এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, ইহার কারণ কি?[উত্তর],-যেহেতু এই উভয়ই অত্যন্ত ব্যবধানে বিপরীত অর্থাৎ এতদুভয়ের পার্থক্য অত্যন্ত অধিক; কেন না শ্রেয়ঃ বস্তুটি বিবেক-স্বরূপ, আর প্রেয়ঃপদার্থটি অবিবেকস্বরূপ; সুতরাং আলোক ও অন্ধকারের ন্যায় এই উভয়ই(শ্রেয়ঃ ও প্রেয়ঃ) পরস্পর পৃথক্-স্বভাবসম্পন্ন। অধিকন্তু, সংসার ও মোক্ষফল সমুৎপাদন করে বলিয়া উভয়ই বিষুচী অর্থাৎ বিভিন্ন পথে বিভিন্ন ফলপ্রদ। সেই উভয় কে কে? না,- পণ্ডিতগণ প্রেয়োবিষয়ে যাহাকে অবিদ্যা বলিয়া এবং শ্রেয়োবিষয়ে যাহাকে বিদ্যা বলিয়া নিশ্চিতরূপে জানিয়াছেন। তন্মধ্যে নচিকেতা নামক তোমাকে আমি বিদ্যাভিলাষী মনে করিতেছি, কেন না, যেহেতু অজ্ঞজনের চিত্তে প্রলোভজনক অপ্সরা প্রভৃতি বহুতর কাম্য পদার্থও তোমাকে প্রলুব্ধ করিতে পারে নাই। অভিপ্রায় এই যে, স্বীয় সম্ভোগ-বাঞ্ছা সমুৎপাদন দ্বারা শ্রেয়ঃপথ হইতে তোমাকে বিচ্ছিন্ন
করিতে পারে নাই; এই কারণই তোমাকে বিদ্যার্থী—শ্রেয়ঃপাত্র বলিয়া মনে করিতেছি ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥
অবিদ্যায়ামন্তরে বর্তমানাঃ স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতম্মন্যমানাঃ। দন্দ্রম্যমাণাঃ পরিযন্তি মূঢ়া- অন্ধেনৈব নীয়মানা যথান্ধাঃ ৩৪ ॥ ৫ ॥
[অবিদ্যাপরপর্যায়-প্রেয়সঃ ফলপ্রদর্শনেন নিন্দামাহ—। অবিদ্যায়ামিতি। অবিদ্যায়াম্(অবিধেকরূপায়াং) অন্তরে(মধ্যে) বর্তমানাঃ(কেবলং তন্মাত্রোপা- সকাঃ অপি), স্বয়ং ধীরাঃ(স্বয়মেব ধীমন্ত ইতি বদন্তঃ) পণ্ডিতম্মন্যমানাঃ (আত্মানং পণ্ডিতং চ অবগচ্ছন্তঃ), দদ্রুম্যমাণাঃ(বক্রগতয়ঃ, কুটিলস্বভাবাঃ) মূঢ়াঃ (কামভোগেন মোহিতাঃ), পরিযন্তি(পরিতঃ স্বর্গনরকাদীন্ গচ্ছন্তি)।[তত্র দৃষ্টান্তঃ]—অন্ধেন এব নীয়মানাঃ(পরিচালিতাঃ) অন্ধাঃ যথা,[তেহপি তথা ইত্যাশয়ঃ]॥
অবিদ্যা যাহার অপর নাম, সেই প্রেয়ের মন্দফলপ্রদর্শনে নিন্দা বলিতে- ছেন,—অবিবেকরূপ অবিদ্যার অভ্যন্তরে অবস্থিত হইয়াও যাহারা আপনারাই আপনাদিগকে ধীর ও পণ্ডিত বলিয়া মনে করে, সেই বক্রগতি মূঢ়গণ অন্ধ- পরিচালিত অন্ধের ন্যায়[ নানা লোকে] পরিভ্রমণ করিয়া থাকে[ কখনই মুক্তি- লাভ করিতে পারে না] ॥ ৩৪। ৫ ॥
যেতু সংসারভাজো জনাঃ অবিদ্যায়াম্ অন্তরে মধ্যে ঘনীভূতে ইব তমসি বর্তমানাঃ বেষ্ট্যমানাঃ পুত্রপশ্বাদিতৃষ্ণাপাশশতৈঃ, স্বয়ং ধীরাঃ প্রজ্ঞাবন্তঃ পণ্ডিতাঃ শাস্ত্র- কুশলাশ্চেতি মন্যমানাঃ, তে দন্দ্রম্যমাণাঃ অত্যর্থং কুটিলাম্ অনেকরূপাং গতিং গচ্ছন্তো জরামরণরোগাদিদুঃখৈঃ পরিযন্তি পরিগচ্ছন্তি মুঢ়া অবিবেকিনঃ, অন্ধেনৈব দৃষ্টি- বিহীনেনৈব নীয়মানাঃ বিষমে পথি যথা বহবোহন্ধা মহান্তমনর্থমৃচ্ছন্তি, তদ্বৎ ॥৩৪॥৫॥
কিন্তু যে সকল লোক সংসারভাগী এবং গাঢ়তর অন্ধকারের ন্যায়
অবিদ্যামধ্যে অবস্থিত—পুত্র পশু প্রভৃতিবিষয়ক শত শত তৃষ্ণায় সংবেষ্টিত; পরন্তু, আপনারাই আপনাদিগকে ধীর অর্থাৎ প্রকৃষ্ট জ্ঞান- সম্পন্ন ও পণ্ডিত অর্থাৎ শাস্ত্রাভিজ্ঞ বলিয়া মনে করে; বহুতর অন্ধ ব্যক্তি যেরূপ দুর্গম পথে অপর অন্ধ অর্থাৎ দৃষ্টিহীন লোকদ্বারা পরিচালিত হইয়া প্রভূত অনর্থ(দুঃখ) প্রাপ্ত হয়; সেইরূপ, সেই সকল বিবেকহীন মূঢ়গণ জরা, মরণ ও রোগাদিজনিত বহু দুঃখে অত্যন্ত বক্র (দুর্বোধ) বিবিধ কর্মগতি লাভ করতঃ অনর্থ প্রাপ্ত হয় ॥ ৩৪ ॥ ৫ ॥
ন সাম্পরায়ঃ প্রতিভাতি বালং, প্রমাদ্যন্তং বিত্তমোহেন মূঢ়ম্। অয়ং লোকো নাস্তি পর ইতি মানী পুনঃ পুনর্বশমাপদ্যতে মে ॥ ৩৫ ॥ ৬ ॥
[ কুত এবম্? ইত্যাহ-] ন সাম্পরায় ইতি।[সম্(সম্যক্) পরা(পরাক্কালে দেহপাতাদূর্দ্ধমেব) ঈয়তে(গম্যতে ইতি সম্পরায়ঃ পরলোকঃ, তৎপ্রাপ্তিপ্রয়োজনঃ শাস্ত্রীয়সাধনবিশেষঃ) সাম্পরায়ঃ]। স সাম্পরায়ঃ বালম্(বালকসদৃশম্, অবিবে- কিনমিতি যাবৎ), বিত্তমোহেন মূঢ়ম্(অজ্ঞান-তমসাচ্ছন্নম্, অতএব) প্রমাদ্যন্তং (প্রমাদোপেতং-সর্ব্বদা অনবধানং জনং) প্রতি ন ভাতি(প্রতীতিবিষয়ো ন ভবতি)। [তদেব ব্যনক্তি] অয়ং লোক ইতি। অয়ং(দৃশ্যমান এব) লোকঃ(ভূলোকঃ) অস্তি, পরো লোকঃ(আমুষ্মিকঃ স্বর্গাদিঃ) ন অস্তি ইতি মানী(ইত্যেবং মননশীলঃ, অভিমানীতি বা) পুনঃ পুনঃ মে(মম যমস্য) বশম্(অধীনতাম্) আপদ্যতে।[উক্ত- লক্ষণাঃ জনাঃ বিত্তাদিকং নিত্যং মন্নানা মৃত্বা মৃত্বা যমযাতনামেবানুভবন্তীত্যর্থঃ]।
কেন এরূপ হয়? তাহা বলিতেছেন,—যে লোক বালক(বালকের ন্যায়) বিবেকহীন, প্রমাদগ্রস্ত এবং ধন-মোহে বিমূঢ়, তাহার নিকট সাম্পরায় অর্থাৎ পরলোকসাধন বা পরলোক-চিন্তা প্রতিভাত হয় না। এই উপস্থিত লোকই আছে,[এতদতিরিক্ত] পরলোক(মৃত্যুর পরভাবী স্বর্গ-নরকাদি লোক) নাই; এইরূপ অভিমানগ্রস্ত ব্যক্তি পুনঃ পুনঃ আমার বশ্যতা প্রাপ্ত হয় ॥ ৩৫ ॥ ৬॥
অতএব মূঢ়ত্বাৎ, ন সাম্পরায়ঃ প্রতিভাতি। সম্পরেয়ত ইতি সাম্পরায়ঃ পর- লোকঃ, তৎপ্রাপ্তিপ্রয়োজনঃ সাধনবিশেষঃ শাস্ত্রীয়ঃ সাম্পরায়ঃ; স চ বালম্ অবিবে- কিনং প্রতি ন ভাতি ন প্রকাশতে নোপতিষ্ঠত ইত্যেতৎ। প্রমাদ্যন্তং প্রমাদং কুর্ব্বন্তং পুত্রপশ্বাদিপ্রয়োজনেষু আসক্তমনসং, তথা বিত্তমোহেন বিত্তনিমিত্তেন অবিবেকেন মূঢ়ং তমসাচ্ছন্নম্। সতু, অয়মেব লোকঃ—যোহয়ং দৃশ্যমানঃ স্যন্নপা- নাদিবিশিষ্টঃ, নাস্তি পরঃ অদৃষ্টো লোকঃ, ইত্যেবং মননশীলো মানী পুনঃ পুনঃ জনিত্বা বশম্ অধীনতাম্ আপদ্যুতে মে মৃত্যোর্ম্মম। জননমরণাদিলক্ষণ দুঃখপ্রবন্ধারূঢ় এব ভবতীত্যর্থঃ। প্রায়েন হ্যেবংবিধ এব লোকঃ ॥ ৩৫ ॥ ৬ ॥
এবংবিধ মূঢ়তাবশতই সাম্পরায় প্রতিভাত হয় না। দেহপাতের পর যাহা সম্যরূপে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহার নাম ‘সম্পরায়’ (স্বর্গাদি লোক), সেই সম্পরায়-প্রাপ্তিই যাহার প্রয়োজন, শাস্ত্রোক্ত তাদৃশ বিশেষ বিশেষ সাধনের নাম ‘সাম্পরায়’; তাহা বালক অর্থাৎ বিবেকহীন ব্যক্তির নিকট প্রতিভাত হয় ন,-প্রকাশ পায় না, অর্থাৎ উপস্থিত হয় না; প্রমাদী-প্রমাদকারী(অমনোযোগী) অর্থাৎ পুত্র, পশু প্রভৃতির উদ্দেশেই আসক্তচিত্ত; বিত্তজনিত মোহে মূঢ়, অর্থাৎ তমোময় অবিবেকে সমাচ্ছন্ন।[এই প্রকার লোকের নিকট পূর্ব্বোক্ত ‘সাম্পরায়’ প্রতিভাত হয় না]। ‘এই যে স্ত্রী-অন্নপানাদিময় পরিদৃশ্যমান লোক, একমাত্র এই লোকই আছে,[এতদতিরিক্ত] অদৃষ্ট(যাহা প্রত্যক্ষ হয় না, এরূপ) কোনও লোক বর্তমান নাই; এইরূপ চিন্তাশীল অভিমানী ব্যক্তি বারংবার জন্মধারণ করিয়া মৃত্যুরূপী আমার বশ্যতা প্রাপ্ত হয়; অর্থাৎ জন্ম-মরণাদিরূপ দুঃখ-ধারা প্রাপ্ত হয়। প্রায় অধিকাংশ লোকই এই প্রকার ॥ ৩৫ ॥ ৬॥
৮
শ্রবণায়াপি বহুভির্যো ন লভ্যঃ, শৃণ্বন্তোহপি বহবো যং ন বিদ্যুঃ। আশ্চর্য্যোহস্য * বক্তা, কুশলোহস্য লব্ধা, আশ্চর্য্যো জ্ঞাতা কুশলানুশিষ্টঃ ॥ ৩৬ ॥ ৭ ॥
[ সাম্পরায়প্রকাশাভাবে হেত্বন্তরমাহ] শ্রবণায়েতি। যঃ(সাম্পরায়ঃ) বহুভিঃ (জনৈঃ) শ্রবণায় অপি(শ্রোতুমপি) ন লভ্যঃ,[অনেকে এব তচ্ছূবণসৌভাগ্যশালিনো ন ভবন্তি‘।[তর্হি কিং শব্দাবেদ্য এব? নেত্যাহ’-শৃণ্বন্তোহপি(শাস্ত্রাৎ তং জানন্তো- হপি) বহবঃ যং ন বিদ্যুঃ(যথাযথরূপেণ ন জানন্তি)।[কুতো ন বিদ্যুরিত্যত আহ] -অস্য(সাম্পরায়স্য) বক্তা(যথাবৎ তৎস্বরূপোপদেষ্ট) আশ্চর্য্যঃ(বিস্ময়নীয়:- দুর্লভঃ)। অস্য লব্ধা(প্রাপ্তা শ্রোতাপি) কুশলঃ(নিপুণ এব) কুশলানুশিষ্টঃ(কুশলৈঃ আত্মদর্শিভিঃ যথাবদনুশিক্ষিতঃ) জ্ঞাতা(বোদ্ধা চ) আশ্চর্য্যঃ(দুর্লভ ইত্যর্থঃ) ॥
কেন যে পরলোক প্রতিভাত হয় না, তাহার আরও কারণ প্রদর্শিত হইতেছে। —বহু লোকে যে সাম্পরায়কে শ্রবণ করিতেও পায় না, এবং বহু লোকে যাহা শ্রবণ করিয়াও বুঝিতে সমর্থ হয় না; কারণ, ইহার বক্তা আশ্চর্য্যভূত(দুর্লভ)। কুশল বা অভিজ্ঞ লোকই ইহার লব্ধা, অর্থাৎ শ্রোতা হইয়া থাকে এবং কুশলানুশিষ্ট, অর্থাৎ আত্মদর্শী লোকের নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত বক্তিই ইহা জানিতে পারে; তাদৃশ জ্ঞাতাও আশ্চর্য্যভূত ॥ ৩৬৷৭ ॥
যস্ত শ্রেয়োহর্থী, সহস্রেযু কশ্চিদেব আত্মবিদ্ ভবতি ত্বদ্বিধঃ, যস্মাৎ শ্রবণায়াপি শ্রবণার্থং শ্রোতুমপি যো ন লভ্য আত্মা বহুভিঃ অনেকৈঃ, শৃণ্বন্তোহপি বহবঃ অনেকে অন্যে যম্ আত্মানং ন বিদ্যুঃ ন বিদন্তি অভাগিনঃ অসংস্কৃতাত্মানো ন বিজানীয়ুঃ। কিঞ্চ, অস্য বক্তাপি আশ্চর্য্যঃ অদ্ভুতবদেব অনেকেষু কশ্চিদেব ভবতি। তথা শ্রুত্বাপি অস্য আত্মনঃ কুশলো নিপুণ এবানেকেষু লব্ধা কশ্চিদেব ভবতি। যস্মাৎ আশ্চর্য্যো জ্ঞাতা কশ্চিদেব, কুশলানুশিষ্টঃ কুশলেন নিপুণেনাচার্য্যেণানুশিষ্টঃ সন্ ॥৩৬৷৷৭৷৷
যিনি প্রকৃত কল্যাণার্থী; তোমার ন্যায় তাদৃশ আত্মজ্ঞ লোক
সহস্রের মধ্যে কেহ(অতি অল্পই) হইয়া থাকে; যে হেতু, অনেকে যে আত্মাকে শ্রবণ করিতেও পায় না; এবং অপর বহু লোক যে আত্মাকে জানিতে(বুঝিতে) পারে না,-অর্থাৎ ভাগ্যহীন অপরি- শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিরা ইহাকে জানিতেও পারে না। আরও এক কথা, ইহার বক্তাও(স্বরূপপ্রকাশকও) আশ্চর্য্যভূত, অর্থাৎ অনেকের মধ্যে কেহই হইয়া থাকে; সেইরূপ এই আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়া কুশল বা নিপুণ ব্যক্তিই অর্থাৎ অনেকের মধ্যে অতি অল্প লোকই সমর্থ হয়,- যেহেতু কুশল আচার্য্যজন কর্তৃক শিক্ষিত হইয়া যেরূপ লোক ইহা জানিতে পারে, নিশ্চয়ই সেরূপ লোকও অতি অল্প।(খ) ॥ ৩৬ ॥ ৭ ॥
ন নরেণাবরেণ প্রোক্ত এষ সুবিজ্ঞেয়ো বহুধা চিন্ত্যমানঃ। অনন্য-প্রোক্তে গতিরত্র নাস্তি, অণীয়ান্ হ্যতর্ক্যমণুপ্রমাণাৎ ॥৩৭॥৮৷৷
[ পদ-পদার্থ-জ্ঞানবতা আচার্য্যেণ অনুশিষ্টঃ শিষ্যঃ কুতো ন জ্ঞাতা? ন বা লব্ধা ভবতি? ইত্যত আহ}-ন নরেণেতি। অবরেণ(প্রাকৃতবুদ্ধিশালিনা) নরেণ(মনুষ্যেণ) প্রোক্তঃ(উপদিষ্টঃ)[অপি] সু(সম্যক্ যথাবত্তথা) বিজ্ঞেয়ো ন(ভবতি)। বহুধা(অস্তি, নাস্তি, কর্তা অকর্তা ইত্যাদ্যনেকপ্রকারেণ) চিন্ত্যমানঃ(প্রতীয়মানঃ) এষঃ(আত্মা) অনন্যপ্রোক্তে(অহং ব্রহ্মণোহনন্যঃ অপৃথক্ ইতেব্যং জ্ঞানবতা আচার্য্যেণ উপদিষ্টে) অত্র(আত্মনি) গতিঃ(পূর্ব্বোক্তো বিকল্পঃ) নাস্তি(ন প্রসরতি)।[অথবা, অত্র আত্মনি অনন্যত্বেন স্বস্বরূপেণ প্রোক্তে সতি
[জগদ্ভেদস্য] গতিঃ অবগতিঃ নাস্তীত্যর্থঃ]।[ননু ব্যাখ্যাতৃবচনত আত্মজ্ঞানা- ভাবেহপি প্রত্যক্ষানুমানাভ্যাং স্যাৎ ইত্যত আহ],—অণীয়ানিতি। অণুপ্রমাণাৎ (অণুপরিমাণতোহপি) অণীয়ান্(অতিসূক্ষ্মঃ)[অতো ন প্রত্যক্ষঃ] অতর্ক্যঃ(তর্ক- স্যাবিষয়ঃ)[অনুমানাগোচরশ্চ, কেবলানুমানস্য প্রতিপক্ষাদিবাধিতত্বাদিতি ভাবঃ!] ॥
[ভালকথা, পদ ও পদার্থ-জ্ঞানসম্পন্ন আচার্য্যের উপদেশে শিষ্য আত্মাকে জানিতে ও বুঝিতে সমর্থ হয় না কেন? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন],—অবর (সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন) নর বা মনুষ্যরূপী আচার্য্যকর্তৃক উপদিষ্ট হইলেও এই আত্মা সম্যরূপে জ্ঞানগোচর হয় না; কারণ, এই আত্মা ‘আছে, নাই; কর্তা অকর্তা’ ইত্যাদি বহু প্রকার তর্কে সমাক্রান্ত। যিনি ব্রহ্মকে অনন্য বা অপৃথরূপে জানিয়া- ছেন, তাদৃশ আচার্য্যকর্তৃক এই আত্মা উপদিষ্ট হইলে[শিষ্যের নিকট] পূর্ব্বোক্ত বিতর্কের গতি বা সম্ভাবনা থাকে না। অধিকন্তু, এই আত্মা অণুপরিমাণ হইতেও অতিশয় অণু—অণীয়ান্(অতিসূক্ষ্ম),(সুতরাং প্রত্যক্ষের অবিষয়) এবং অতর্ক্য অর্থাৎ তর্ক বা অনুমানেরও অগম্য ॥৩৭॥৮৷৷
কস্মাৎ? ন হি নরেণ মনুষ্যেণ অবরেণ প্রোক্তোহবরেণ হীনেন প্রাকৃতবুদ্ধিনা ইত্যেতৎ, উক্তঃ এষঃ আত্মা, যং ত্বং মাং পৃচ্ছসি। নহি সুষ্ঠু সম্যক্ বিজ্ঞেয়ো বিজ্ঞাতুং শক্যঃ, যস্মাৎ বহুধা—অস্তি নাস্তি, কর্তা অকর্তা, শুদ্ধোহশুদ্ধ ইত্যাদ্যনে- কথা চিন্ত্যমানো বাদিভিঃ।
কথং পুনঃ সুবিজ্ঞয়ঃ? ইত্যুচ্যতে-অনন্যপ্রোক্তে অনন্যেন অপৃথগ্দর্শিনা আচার্য্যেণ প্রতিপাদ্য-ব্রহ্মাত্মভূতেন প্রোক্তে উক্তে আত্মনি গতিঃ অনেকধা-অস্তি- নাস্তীত্যাদিলক্ষণা চিন্তা গতিরস্মিন্নাত্মনি নাস্তি ন বিদ্যতে, সর্ববিকল্পগতিপ্রত্যস্তমিত- রূপত্বাদাত্মনঃ। অথবা, স্বাত্মভূতে অনন্যস্মিন্ আত্মনি প্রোক্তে-অনন্যপ্রোক্তে গতিঃ অত্র অন্যস্যাবগতির্নাস্তি জ্ঞেয়স্যান্যস্যাভাবাৎ। জ্ঞানস্য হোষা পরা নিষ্ঠা, যদাত্মৈকত্ব- বিজ্ঞানম্। অতঃ অবগন্তব্যাভাবাৎ ন গতিরত্রাবশিষ্যতে। সংসারগতির্বাত্র নাস্তি, অনন্য আত্মনি প্রোক্তে নান্তরীয়কত্বাৎ তদ্বিজ্ঞানফলস্য মোক্ষস্য। অথবা, প্রোচ্যমান- ব্রহ্মাত্মভূতেনাচার্য্যেণ অনন্যতয়া প্রোক্তে আত্মনি অগতিঃ অনববোধোহপরিজ্ঞানমত্র নাস্তি; ভবত্যেবাবগতিস্তদ্বিষয়া শ্রোতুঃ ‘তদনন্যোহহমিতি’ আচার্য্যস্যেবেত্যর্থঃ।
এবং সুবিজ্ঞেয় আত্মা আগমবতা আচার্য্যেণ অনন্যতয়া প্রোক্ত ইত্যর্থঃ। ইতরথা, অণীয়ান্ অণুপ্রমাণাদপি সম্পদ্যতে আত্মা। অতর্ক্যম্ অতর্ক্যঃ স্ববুদ্ধ্যভ্যুহেন, কেবলেন তর্কেণ তর্ক্যমাণোহণুপরিমাণে কেনচিৎ স্থাপিতে আত্মনি ততোহণুতর- মন্যোহভ্যুহতি, ততোহপ্যন্যোহণুতমমিতি। ন হি তর্কস্য নিষ্ঠা কচিদ্ বিদ্যতে ॥৩৭৷৮৷৷
কারণ কি? না,—তুমি আমাকে যে আত্ম-বিষয়ে প্রশ্ন করিতেছ, সেই আত্মা অবর অর্থাৎ বিবেকহীন, সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মনুষ্যকর্তৃক উক্ত বা ব্যাখ্যাত হইলে নিশ্চয়ই সু=সুষ্ঠু—সম্যরূপে(যথাযথরূপে) বিজ্ঞেয় অর্থাৎ জানিবার যোগ্য হয় না; কারণ, বাদিগণ কর্তৃক(বিভিন্ন মতাবলম্বিগণ কর্তৃক)[এই আত্মা] আছে, নাই, কর্তা ও অকর্তা(কর্তা নহে), ইত্যাদি বহুবিধরূপে চিন্তিত(বিতর্কিত) হইয়া থাকে।
তাহা হইলে, কিরূপে সুবিজ্ঞেয় হয়? এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন যে,-অনন্য অর্থাৎ সর্বত্র অভেদদর্শী এবং(যাহার কথা প্রতিপাদন করিতে হইবে, সেই) প্রতিপাদ্য ব্রহ্ম যাহার আত্মস্বরূপ, অর্থাৎ যিনি ব্রহ্মে ও আত্মায় ভেদ দর্শন করেন না, এবংবিধ আচার্য্যকর্তৃক কথিত হইলেই এই আত্মাতে ‘আছে, নাই’ ইত্যাদিরূপ বহুবিধ চিন্তার গতি বা সম্ভাবনা থাকে না; কারণ, সর্বপ্রকার বিকল্প বা ভেদপ্রতীতি- রাহিত্যই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ। অথবা, অনন্য বা অভিন্ন আত্মা উপদিষ্ট হইলে পর এ জগতে অপর কোন বস্তুরই প্রতীতি হয় না; কারণ, তখন জানিবার যোগ্য অন্য কোন বস্তুই থাকে না। কেন না; আত্মায় একত্ব বিজ্ঞান উপস্থিত হইলে জ্ঞানের(বুদ্ধিবৃত্তির) পরি- সমাপ্তি হইয়া যায়। অতএব, জ্ঞাতব্য বিষয়ের অভাববশতই আর কোনও জ্ঞান অবশিষ্ট থাকে না। অথবা,[‘গতিরত্র নাস্তি’ কথার অর্থ]-সংসারগতি আর থাকে না, অর্থাৎ তাহার আর পুনর্ব্বার জন্ম হয় না। কেননা, আত্মা ব্রহ্ম হইতে অনন্য বা অভিন্ন, এই
উপদেশ উক্ত হইলে পর, মোক্ষলাভ সেই বিজ্ঞানের অবশ্যম্ভাবী ফল। অথবা, যে আচার্য্য বক্ষ্যমাণ ব্রহ্মকে আত্মস্বরূপে অবগত হইয়াছেন; সেই আচার্য্য আত্ম-তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিলে, তদ্বিষয়ে আর অনবগতি বা জ্ঞানের অভাব থাকে না, অর্থাৎ আচার্য্যের ন্যায় শ্রোতারও তদ্বিষয়ে ‘আমি ব্রহ্ম হইতে অনন্য বা অপৃথক্’, এই জ্ঞান নিশ্চয়ই সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, এইপ্রকার শাস্ত্রজ্ঞান- সম্পন্ন আচার্য্যকর্তৃক অনন্যরূপে অভিহিত হইলে, আত্মা সম্যক্ জ্ঞানের বিষয়ীভূত হয়। নচেৎ, আত্মা অণুপ্রমাণ বা সূক্ষ্ম বস্তু অপেক্ষাও অণীয়ান্ অতিশয় সূক্ষ্ম(দুর্বিবজ্ঞেয়) হইয়া পড়ে।[উক্ত আত্মা] কেবল স্বীয় বুদ্ধির-বলে সম্ভাবিত তর্ক দ্বারা বিচারণীয় হইতে পারে না; কারণ, কোন ব্যক্তি তর্ক-সাহায্যে আত্মাকে অণুপরিমাণ সাব্যস্ত করিলে, অপরে আবার তদপেক্ষাও ‘অণু’তর বলিয়া তর্ক করিতে পারে, অপরে আবার তদপেক্ষাও সুক্ষ্ম অণু বলিয়া অণুতম সম্ভাবিত করিতে পারে। কেন না তর্কের ত কখনও কোথাও বিশ্রাম বা শেষ নাই বা হইতে পারে না)(গ) ॥ ৩৭৷৮৷৷
নৈষা তর্কেণ মতিরাপনেয়া, প্রোক্তান্যেনৈব সুজ্ঞানায় প্রেষ্ঠ। যাং ত্বমাপঃ, সত্যধৃতির্বতাসি, ত্বাদৃনো ভূয়ান্নচিকেতঃ প্রষ্টা ॥৩৮॥৯৷৷
[ইদানীমাত্মজ্ঞানোপায়ং বক্ত মুপক্রমতে] নৈষেতি। হে প্রেষ্ঠ(প্রিয়তম) ত্বং যাং(মতিং) আপঃ(প্রাপ্তবানসি), এষা(ব্রহ্মগোচরা) মতিঃ তর্কেণ(স্ববুদ্ধি- পরিকল্পিতেন বিচারেণ) ন[আ+অপ+নেয়া ইতি পদচ্ছেদঃ] আপনেয়া(প্রাপ্যা ন ভবতি]। অথবা, তর্কেণ ন আ—সম্যক্ অপনেয়া(নৈব দূরীকর্তব্যা)।[পরন্তু] অন্যেন(‘ব্রহ্মণোহনন্যোহহমিতি’ জানতা) প্রোক্তা(তদুপদেশজন্যা সতী) সুজ্ঞানায় (সম্যক্ জ্ঞানায়)[ভবতি]। হে নচিকেতঃ![ত্বং, সত্যধৃতিঃ(সত্যসঙ্কল্পঃ, অচাল্য- ধৈর্য্যবানিতি বা) অসি(ভবসি)। বত[বতেত্যনুকম্পায়াং, নানাপ্রকারেণ প্রলো- ভিতোহপি ব্রহ্মস্বরূপবোধবিষয়ে ধৈর্য্যং ন মুক্তবানসি ইত্যভিপ্রায়ঃ] ত্বাদৃক্ (ত্বত্তুল্যঃ) প্রষ্টা(পৃচ্ছকঃ) নো ভূয়াৎ(ন ভবেৎ)। নঃ(অস্মভ্যং) ত্বাদৃক্ প্রষ্টা ভূয়াদিতি বা]॥
এখন আত্মজ্ঞানের উপায় নিরূপণার্থ বলিতেছেন—হে প্রেষ্ঠ(প্রিয়তম!) তুমি যে মতি(সদ্বুদ্ধি) প্রাপ্ত হইয়াছে; তর্ক দ্বারা এই মতি লাভ করা যায় না; অথবা তর্কের সাহায্যে এই সদ্বুদ্ধি অপনীত করা উচিত হয় না।[পরন্তু] অন্য অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মদর্শী আচার্য্য কর্তৃক উপদিষ্ট হইলেই(আত্মা) যথাযথরূপে জ্ঞানের যোগ্য হয়। হে নচিকেতঃ! তুমি সত্যসন্ধ আছ; তোমার ন্যায় প্রশ্নকারী(জিজ্ঞাসু) আর হয় না। অথবা আমাদের নিকট তোমার ন্যায় প্রষ্টা(আরও) হউক ॥৩৮৷৷৯৷৷
অতোহনন্যপ্রোক্তে আত্মনি উৎপন্না যেয়মাগমপ্রতিপাদ্যা আত্ম-মতিঃ, নৈষা তর্কেণ স্ববুদ্ধ্যভ্যূহমাত্রেণ আপনেয়া নাপনীয়া ন প্রাপণীয়েত্যর্থঃ। নাপনেতব্যা বা নোপহন্তব্যা। তার্কিকো হনাগমজ্ঞঃ স্ববুদ্ধিপরিকল্পিতং যৎকিঞ্চিদেব কল্পয়তি। অত এব চ যেয়মাগমপ্রসূতা মতিঃ অন্যেনৈব আগমাভিজ্ঞেন আচার্য্যেণৈব তার্কিকাৎ প্রোক্তা সতী সুজ্ঞানায় ভবতি, হে প্রেষ্ঠ প্রিয়তম! কা পুনঃ সা তর্কাগম্যা মতি- রিতি? উচ্যতে—যাং ত্বং মতিং মদ্বরপ্রদানেন আপঃ প্রাপ্তবানসি। সত্যা অবি-
তথবিষয়া ধৃতির্যস্য তব, স ত্বং সত্যধৃতিঃ, বতাসীত্যনুকম্পয়ন্নাহ মৃত্যুর্নচিকেতসম্,- বক্ষ্যমাণবিজ্ঞানস্তুতয়ে, ত্বাদৃক্ ত্বত্তুল্যো নোহস্মভ্যং ভূয়াৎ ভবতাৎ। ভবতু অন্যঃ পুত্রঃ শিষ্যো বা প্রষ্টা। কীদৃক্? যাদৃক্ ত্বং হে নচিকেতঃ প্রষ্টা ॥৩৮৷৷৯৷৷
ভাষ্যানুবাদ।
অতএব, অনন্য-কর্তৃক অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মদর্শী আচার্য্যকর্তৃক উক্ত আত্মা বিষয়ে এই যে, আগম-গম্য বুদ্ধি সমুৎপন্ন হইয়াছে;[শাস্ত্র- নিরপেক্ষ] কেবল স্বীয় বুদ্ধিপ্রসূত তর্ক দ্বারা এই বুদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া যায় না; অথবা[এই বুদ্ধি] অপনীত বা নিহত করা কর্তব্য নহে। শাস্ত্রজ্ঞান-রহিত তার্কিক ব্যক্তি স্বীয় বুদ্ধিবৃত্তি অনুসারে যে কোন একটাকে(আত্মা বলিয়া) কল্পনা করিয়া থাকে। অতএব, হে প্রিয়তম! তার্কিক অপেক্ষা আগমাভিজ্ঞ আচার্য্যকর্তৃক অভিহিত হইলেই উক্ত মতি সম্যরূপে হৃদয়ঙ্গম হইবার যোগ্য হয় *। ভাল, তর্কের অগম্য সেই মতিটি কি? তাহা বলা যাইতেছে,-তুমি আমার বরপ্রদান অনুসারে যে মতি প্রাপ্ত হইয়াছ। তুমি সত্যধৃতি অর্থাৎ তোমার ধৃতি বা ধারণাশক্তি সত্য-যথার্থ বিষয়ে সমুৎপন্ন হইয়াছে। অনন্তরোক্ত বিদ্যার প্রশংসার্থ ‘বত’ ও ‘অসি’শব্দ প্রয়োগে মৃত্যু নচিকেতার
প্রতি দয়া প্রকাশপূর্ব্বক বলিতেছেন—আমাদের নিকট অপর পুত্র বা শিষ্যও তোমার ন্যায় প্রষ্টা(প্রশ্নকর্তা) হউক। কিরূপ প্রষ্টা? না, হে নচিকেতঃ! তুমি আমার নিকট যেরূপ প্রশ্ন করিয়াছ ॥ ৩৮৷৯৷৷
জানাম্যহং শেবধিরিত্যনিত্যং, ন হ্যধ্রুবৈঃ প্রাপ্যতে হি ধ্রুবং তৎ।
ততো ময়া নাচিকেতশ্চিতোহগ্নি- রনিট্যৈর্দ্রব্যৈঃ প্রাপ্তবানস্মি নিত্যম্ ॥৩৯॥১০॥
[ মৃত্যুঃ নচিকেতসং প্রোৎসাহয়ন্ পুনরপ্যাহ—] জানামীতি। শেবধিঃ(নিধিঃ কৰ্ম্মফললক্ষণঃ) অনিত্যম্(অনিত্যঃ) ইতি অহং জানামি। হি(যস্মাৎ) ধ্রুবং (শাশ্বতং তৎ ব্রহ্ম) অধ্রুবৈঃ(অনিত্যৈঃ,)[ যদ্বা ন বিদ্যতে ধ্রুবং ব্রহ্ম যেষাং, তৈঃ অধ্রুবৈঃ জ্ঞানরহিতৈঃ সাধনৈঃ] নহি প্রাপ্যতে। ততঃ(তস্মাৎ হেতোঃ) ময়া অনিত্যৈদ্রব্যৈঃ(চয়নসাধনৈঃ) নাচিকেতঃ অগ্নিঃ(ইষ্টকাচিতস্থোহগ্নিঃ) চিতঃ (গৃহীতঃ আরাধিতঃ)।[তেন চ’অহমধিকারাপন্নঃ সন্] নিত্যম্(আপেক্ষিক- সত্যং যাম্যপদং) প্রাপ্তবান্ অস্মি ॥
যম নচিকেতার উৎসাহ সংবর্দ্ধনার্থ পুনর্ব্বার বলিতে লাগিলেন, শেবধি অর্থাৎ কৰ্ম্মফলরূপ স্বর্গাদি সম্পৎ যে অনিত্য, ইহা আমি জানি। যে হেতু অনিত্য সাধনের দ্বারা ধ্রুব(নিত্য বস্তু) সেই আত্মাকে প্রাপ্ত হওয়া যায় না; সেই কারণেই আমি অনিত্য দ্রব্যময় সাধন দ্বারা নাচিকেত অগ্নির চয়ন করায়, অর্থাৎ অনিদ্র্য দ্রব্য দ্বারা অগ্নি চয়ন পূর্ব্বক যজ্ঞ সম্পাদন করায় আপেক্ষিক নিত্য[এই যমাধিকার] প্রাপ্ত হইয়াছি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥
পুনরপি তুষ্ট আহ—জানাম্যহং শেবধিঃ নিধিঃ কৰ্ম্মফললক্ষণঃ নিধিরিব প্রার্থ্যত- ইতি। অসৌ অনিত্যম্ অনিত্য ইতি জানামি। ন হি যস্মাদ অনিত্যৈঃ অধ্রুবৈঃ যৎ নিত্যং ধ্রুবং তৎ প্রাপ্যতে পরমাত্মাখ্যঃ শেবধিঃ। যস্তু অনিত্য-সুখাত্মকঃ শেবধিঃ, স এব অনিত্যৈঃ দ্রব্যৈঃ প্রাপ্যতে হি যতঃ, ততঃ তস্মাৎ ময়া জানতাপি নিত্যম্ অনিত্যসাধনৈ’ প্রাপ্যতইতি, নাচিকেতঃ চিতঃ অগ্নিঃ অনিত্যৈঃ দ্রব্যৈঃ
পশ্বাদিভিঃ স্বর্গসুখসাধনভূতোহগ্নিঃ নির্ব্বর্তিত ইত্যর্থঃ। তেনাহম্ অধিকারাপন্নো নিত্যং যাম্যং স্থানং স্বর্গাখাং নিত্যম্ আপেক্ষিকং প্রাপ্তবানস্মি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥
ভাষ্যানুবাদ।
যম সন্তুষ্ট হইয়া পুনর্বার বলিতে লাগিলেন, শেবধি অর্থ—নিধি (ধনরাশি), কৰ্ম্মফলও নিধিরই মত প্রার্থিত হয়, এই কারণে কৰ্ম্ম- ফলকেও ‘নিধি’বলা হইয়া থাকে, ইহা যে অনিত্য, তাহা আমি জানি। (হি) যেহেতু অধ্রুব বা অনিত্য সাধন দ্বারা নিত্য সেই পরমাত্ম-নামক শেবধি প্রাপ্ত হওয়া যায় না; পরন্তু, যাহা অনিত্য সুখাত্মক শেবধি, অনিত্য দ্রব্য দ্বারা তাহাই প্রাপ্ত হওয়া যায়। অনিত্য সাধনে নিত্য বস্তু লাভ করা যায় না, ইহা জনিয়াও আমি অনিত্য পশু প্রভৃতি দ্রব্য দ্বারা স্বর্গসাধন নাচিকেত অগ্নি চয়ন করিয়াছি, এবং তাহা দ্বারা অধিকার প্রাপ্ত হইয়া আপেক্ষিক নিত্য(অপর পদার্থ অপেক্ষা দীর্ঘকালস্থায়ী), স্বর্গসংজ্ঞক এই যমপদ প্রাপ্ত হইয়াছি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥
কামস্যাপ্তিং জগতঃ প্রতিষ্ঠাং,
ক্রতোরনন্ত্যমভয়স্য পারম্।
স্তোমমহদুরুগায়ং প্রতিষ্ঠাং, দৃষ্ট্বা। ধৃত্যা ধীরো নচিকেতোহত্যস্রাক্ষীঃ॥৪০॥১১॥
[ন কেবলমহমেব জানামি, মৎপ্রসাদাৎ ত্বমপি জানাসি, ইত্যাহ]—কামস্যেতি। হে নচিকেতঃ![ত্বং] ধৃত্যা(ধৈর্য্যেণ মনোদার্য্যেন) ধীরঃ(ধীমান্ সন্) কামস্য (অভিলষিতার্থস্য) আপ্টিং(সমাপ্তিং) জগতঃ প্রতিষ্ঠাং(আশ্রয়ং), ক্রতোঃ (যজ্ঞস্য) অনন্ত্যম্(অনন্তফলম্) অভয়স্য পারং(পরাং নিষ্ঠাং), স্তোমমহৎ(স্তোমং স্তুত্যং, মহৎ - অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যাদ্যনেকগুণযুক্তম্), উরুগায়ং(প্রশস্তং বৈরাজং পদং), প্রতিষ্ঠাম্(আত্মন উত্তমাং স্থিতিঞ্চ) দৃষ্ট্বা(বিচার্য্য)-[সর্ব্বমেতৎ সংসার- ভোগজাতম্] অত্যস্রাক্ষীঃ(ত্যক্তবান্ অসি)। “অনন্তলোকাপ্তিমথো ‘প্রতিষ্ঠাম্’ ইতি প্রাগুক্তদ্বয়স্য “জগতঃ প্রতিষ্ঠাং, ক্রতোরনন্ত্যম্” ইতি বিশেষণদ্বয়েনানুবাদঃ। “স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্তে” ইত্যস্য “অভয়স্য পারম্” ইত্যনেনানুবাদঃ।
“ব্রহ্মজজ্ঞং দেবমীড্যম্” ইত্যাদিনোক্তং “স্তোমমহদুরুগায়ম্” ইত্যনেনানূদিতমিতি জ্ঞেয়ম্ ॥
[কেবল যে, আমিই ইহা জানি, তাহা নহে, আমার অনুগ্রহে তুমিও জানিয়াছ; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন]—হে নচিকেতঃ! তুমি স্বীয় ধৈর্য্যগুণে সুবুদ্ধি সম্পন্ন হইয়া অভিলষিত বিষয়ের পরাকাষ্ঠা, জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতিসাধন, যজ্ঞের অনন্ত ফল, সর্বভয়-বিনিবারক, স্তবনীয় ও মহৎ বৈরাজ পদ বা হিরণ্য- গর্ভাধিকার এবং নিজের অত্যুত্তম গতিলাভ; এই সমস্ত ভোগ্য বস্তু বিচারপূর্ব্বক পরিত্যাগ করিয়াছ ॥ ৪০৷৷১১৷৷
ত্বং তু কামস্য আপ্টিং সমাপ্তিম্, অত্র হি সর্ব্বে কামাঃ পরিসমাপ্তাঃ, জগতঃ সাধ্যা- স্মাধিভূতাধিদৈবাদেঃ, প্রতিষ্ঠাম্ আশ্রয়ং সর্ব্বাত্মকত্বাৎ, ক্রতোঃ উপাসনায়াঃ ফলং হৈরণ্যগর্ভং পদং অনন্ত্যম্ আনন্ত্যম্। অভয়স্য চ পারং পরাং নিষ্ঠাম্। স্তোমং স্তুত্যং, মহৎ--অণিমাদ্যৈশ্বর্য্যাদ্যনেকগুণসহিতম্, স্তোমঞ্চ তন্মহচ্চ নিরতিশয়ত্বাৎ— স্তোমমহৎ। উরুগায়ং বিস্তীর্ণাং গতিম্। প্রতিষ্ঠাং স্থিতিমাত্মনঃ অনুত্তমামপি দৃষ্ট্বা, ধৃত্যা ধৈর্য্যেণ ধীরো ধীমান্ সন্ নচিকেতঃ! অত্যস্রাক্ষীঃ—পরমেবাকাঙ্ক্ষন্ অতি- সৃষ্টবান্ অসি সর্ব্বমেতৎ সংসারভোগজাতম্। অহো বত অনুত্তমগুণোহসি! ॥৪০৷৷১১
হে নচিকেতঃ! তুমি কিন্তু ধৈর্য্যগুণে ধীর হইয়া যাহাতে সমস্ত কাম বা অভিলাষের পরিসমাপ্তি হয়, সেই কামাপ্তি, অধ্যাত্ম, অধিভূত ও অধিদৈবতাত্মক সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আশ্রয়; কারণ, ইহাই সর্বাত্মক বা সববময়; সর্বভয় নিবৃত্তির পরা- কাষ্ঠা, স্তোম অর্থ—স্তবনীয়(প্রশংসার্হ), ‘মহৎ’ অর্থ—অণিমাদি ঐশ্বর্য্য প্রভৃতি অনেক গুণসমন্বিত, সর্বাপেক্ষা অতিশয় বলিয়া স্তোম-মহৎ এবং উরুগায়—বিস্তীর্ণা(সুদীর্ঘ) গতি(শুভফল), অনন্ত ক্রতুফল—হিরণ্যগর্ভাধিকার এবং প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ নিজের অত্যুত্তম গতি বা পরিণাম বিচারপূর্ব্বক পরিত্যাগ করিয়াছ; অর্থাৎ পরম পদ পাইবার আকাঙ্ক্ষায় পূর্ব্বোক্ত সাংসারিক ভোগ্য বস্তুসমূহ
পরিত্যাগ করিয়াছ। বড় আহলাদের বিষয় যে, তুমি অত্যুত্তম গুণসম্পন্ন হইয়াছ ॥৪০॥১১৷৷
তং দুর্দর্শং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টং, গুহাহিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম্।
যথাঃ-যোঽপ্যপিহন্তেন(দেবঃ)
মজ্ঞা ধীরো হর্ষ-শোকৌ জহাতি ॥৪১॥১২॥
[ইদানীং দেহব্যতিরিক্তাত্মদর্শিনঃ ফলকথনেন প্রশংসামাহ}-তমিতি। দুৰ্দ্দর্শং(দুঃখেন প্রযত্নাতিশয়েন দ্রষ্টুং শক্যং জ্ঞেয়মিতি যাবৎ), গূঢ়ম্(অনভি- ব্যক্তস্বরূপম্), অনু প্রবিষ্টং(প্রেরকতয়া সর্ব্বজগদন্তঃ প্রবিষ্টং), গুহাহিতং(গুহায়াং প্রাণিবুদ্ধৌ আহিতং সংস্থিতং), গহ্বরেষ্ঠ(গহ্বরে-রাগদ্বেষাদ্যনর্থসংকুলে দেহে স্থিতম্), পুরাণং(সনাতনম্) তং দেবং(দ্যোতমানং স্বপ্রকাশং বা আত্মানং)[অত্র গূঢ়ত্বমনুপ্রবিষ্টত্বং গুহাহিতত্বং চ গহ্বরেষ্ঠত্বে হেতুঃ, তচ্চ দুর্দ্দর্শত্বে হেতুরিতি জ্ঞেয়ম্]। অধ্যাত্মযোগাধিগমেন(অধ্যাত্মযোগেন আত্মবিষয়ক- সমাধি-যোগেন জাতো যোহধিগমঃ, তেন) মত্বা(জ্ঞাত্বা) ধীরো হর্ষশোকৌ জহাতি।[সংসারাৎ মুচ্যতে ইতি ভাবঃ]।
দুৰ্দ্দশ(অতিশয় প্রয়াসবেদ্য—দুর্বিজ্ঞেয়), গূঢ়(অব্যক্ত-স্বরূপ), সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট, সকলের বুদ্ধিরূপ গুহায় অবস্থিত, রাগদ্বেষ প্রভৃতি অনর্থসমাকুল দেহরূপ গহ্বরে অধিষ্ঠিত এবং পুরাণ অর্থাৎ নিত্য ও প্রকাশময় সেই পরমাত্মাকে সমাধিযোগ দ্বারা অবগত হইয়া ধীরব্যক্তি হর্ষ ও শোক অর্থাৎ সুখ ও দুঃখ অতিক্রম করে। অর্থাৎ হর্ষ-শোকময় সংসার হইতে মুক্তিলাভ করে ॥৪১৷৷১২৷৷
যং ত্বং জ্ঞাতুমিচ্ছসি আত্মানং, তং দুৰ্দ্দর্শং-দুঃখেন দর্শনমস্যেতি দুর্দ্দর্শম্, অতি- সুক্ষ্মত্বাৎ। গূঢ়ং গহনম্, অনুপ্রবিষ্টং প্রাকৃতবিষয়বিকারবিজ্ঞানৈঃ প্রচ্ছন্নমিত্যেতৎ। গুহাহিতং-গুহায়াং বুদ্ধৌ হিতং নিহিতং স্থিতং, তত্রোপলভ্যমানত্বাৎ। গহ্বরেষ্ঠং -গহ্বরে বিষমে অনেকানর্থসঙ্কটে তিষ্ঠতীতি গহ্বরেষ্ঠম্। যত এবং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টো গুহাহিতশ্চ, অতোহসৌ গহ্বরেইঃ, অতো দুৰ্দ্দর্শঃ। তং পুরাণং পুরাতনম্ অধ্যাত্ম- যোগাধিগমেন-বিষয়েভ্যঃ প্রতিসংহৃত্য চেতস আত্মনি সমাধানম্ অধ্যাত্মযোগঃ,
তস্যাধিগমঃ, প্রাপ্তিঃ তেন মত্বা দেবম্ আত্মানং ধীরো হর্ষ-শোকৌ আত্মন উৎকর্ষাপ- কর্ষয়োরভাবাৎ জহাতি ॥৪১৷৷১২৷৷
ভাষ্যানুবাদ।
[হে নচিকেতঃ!] তুমি যে আত্মাকে জানিতে ইচ্ছা করিয়াছ, সেই আত্মা দুর্দ্দর্শ অর্থাৎ অতিশয় সূক্ষ্মতাহেতু অতি কষ্টে তাহার দর্শন হয়; গূঢ়(দুজ্ঞেয়) ও অনুপ্রবিষ্ট, অর্থাৎ লৌকিক শব্দাদি-বিষয়গ্রাহী বিজ্ঞানে সমাচ্ছন্ন; গুহাহিত অর্থাৎ বুদ্ধিরূপ গুহায় অবস্থিত; কেন না, সেই স্থানেই আত্মার উপলব্ধি হইয়া থাকে। আর রাগ-দ্বেষাদি অনেকপ্রকার অনর্থসঙ্কুল দেহাদিতে অবস্থান বা প্রতীযমান হয় বলিয়া গহ্বরেষ্ঠ, পুরাণ অর্থ—পুরাতন, সেই দেব-আত্মাকে অধ্যাত্ম- যোগাধিগম দ্বারা(অর্থাৎ বিষয় হইতে চিত্তকে প্রত্যাহৃত করিয়া আত্মাতে স্থিরীকরণের নাম অধ্যাত্মযোগ, তাহার যে অধিগম অর্থাৎ আয়ত্তীকরণ, তাহা দ্বারা) মনন বা ধ্যান করিয়া ধীর ব্যক্তি হর্ষ ও শোক পরিত্যাগ করেন; কারণ, আত্মাতে[হর্ষ ও শোকের কারণীভূত] উৎকর্ষ বা অপকর্ষ, কিছুই নাই ॥৪১৷৷১২৷৷
এতৎ শ্রুত্বা সম্পরিগৃহ্য মর্ত্যঃ প্রবৃহ্য ধর্ম্ম্যমণুমেনমাপ্য। স মোদতে মোদনীয়ং হি লব্ধা, বিবৃতং সদ্ম নচিকেতসং মন্যে ॥৪২॥১৩৷৷
[কিঞ্চ],[যো] মর্ত্যঃ(মনুষ্যঃ) এতৎ(ব্রহ্ম)[আচার্য্যেভ্যঃ] শ্রুত্বা, ধৰ্ম্ম্যং(জগ- দ্ধারকং) অণুং(সূক্ষ্মং)[আত্মানং] প্রবৃহ্য(শরীরাদেঃ জড়বর্গাৎ পৃথকৃত্য) সম্পরিগৃহ্য(সম্যক্ আত্মভাবেন জ্ঞাত্বা)[আস্তে], স এনং মোদনীয়ম্(আত্মানং) আপ্য(প্রাপ্য) মোদতে, হি(নিশ্চয়ে)।[এনং আত্মানং] লব্ধ।[স্থিতং] নচিকেতসং(ত্বাং প্রতি) সন্ম(ব্রহ্মস্থানং) বিবৃতং(অপাবৃতদ্বারং) মন্যে(জানামি)। [ত্বং হি ব্রহ্মজ্ঞতয়া সর্ব্বকামত্যাগেন বিশেষতো মোক্ষার্হোহসীতি ভাবঃ]॥ যে মনুষ্য আচার্য্যের নিকট এই ব্রহ্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়া ধর্ম্মানুযোজিত এই সূক্ষ্ম
আত্মাকে দেহাদি জড় পদার্থ হইতে পৃথক্ করিয়া এবং সম্যকরূপে আত্মস্বরূপে জানিয়া থাকে, সেই মর্ত্য এই মোদনীয়(আনন্দকর) আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া নিশ্চয়ই আনন্দ লাভ করে। নচিকেতার(তোমার) আশ্রয়(ব্রহ্মসদন) বিবৃতদ্বার বলিয়া মনে করি ॥ ৪২৷৷১৩॥]
কিঞ্চ, এতদাত্মতত্ত্বং, যদহং বক্ষ্যামি, তৎ শ্রুত্বা আ’চার্য্যসকাশাৎ সম্যগাত্ম- ভাবেন পরিগৃহ্য উপাদায় মর্ত্যো মরণধৰ্ম্মা ধৰ্ম্মাদনপেতং ধর্ম্যং প্রবৃহ্য উদ্যম্য পৃথকৃত্য শরীরাদেঃ, অণুং সূক্ষ্মম্ এতমাত্মানমাপ্য প্রাপ্য, স মর্ত্যো বিদ্বান্ মোদতে মোদনীয়ং হি হর্ষণীয়মাত্মানং লব্ধ। তদেতদেবংবিধং ব্রহ্ম সদ্ম ভবনং নচিকেতসং ত্বাং প্রতি অপাবৃতদ্বারং বিবৃতম্ অভিমুখীভূতং মন্যে; মোক্ষার্হং ত্বাং মন্যে ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৪২৷৷১৩।
আমি যে আত্মতত্ত্বের কথা বলিব; মরণধর্মশীল মনুষ্য সেই আত্মতত্ত্ব আচার্য্য-সমীপে শ্রবণ করিয়া—পরে আত্মরূপে তাহা স্বীকার করিয়া—ধৰ্ম্মসম্মত এই সূক্ষ্ম আত্মাকে শরীর প্রভৃতি[ অনাত্ম পদার্থ] হইতে পৃথক্ করিয়া—মোদনীয় অর্থাৎ হর্ষের করণীভূত সেই আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া সেই বিদ্বান্ মনুষ্য আনন্দ লাভ করেন। এবংবিধ সেই ব্রহ্মরূপ ভবনকে(আশ্রয় স্থানকে) নচিকেতার—তোমার পক্ষে বিবৃতদ্বার বা তোমার অভিমুখীভূত বলিয়া মনে করি। অর্থাৎ তোমাকে মোক্ষের উপযুক্ত পাত্র মনে করি ॥৪২৷৷১৩৷৷
অন্যত্র ধর্ম্মাদন্যত্রাধর্ম্মা-
দন্যত্রাস্মাৎ কৃতাকৃতাৎ।
অন্যত্র ভূতাচ্চ তব্যাচ্চ
যত্তং পশ্যসি, তদ্বদ ॥৪॥১৪॥
অলং মৎপ্রশংসয়া, তত্ত্বং ব্রূহীত্যাহ নচিকেতাঃ] অন্যত্রেতি। ধৰ্মাৎ (শাস্ত্রোক্তাৎ ধর্মানুষ্ঠানাদেঃ) অন্যত্র, অধর্মাৎ অন্যত্র(ধৰ্ম্মাধৰ্মাতীতমিতি
যাবৎ)। অস্মাৎ কৃতাক্বতাৎ(কৃতং কার্য্যং, অকৃতং কারণং, তস্মাৎ) অন্যত্র (তদুভয়বিলক্ষণমিতি যাবৎ)। ভূতাৎ(অতীতাৎ) চ, ভব্যাৎ(আগামিনশ্চ) [চকারাৎ বর্তমানাৎ অপি] অন্যত্র(তন্ত্রিতয়বিলক্ষণমিতি যাবৎ)।[কৃতা- কৃতাদিত্যস্য বিবরণং বা ভূতাচ্চেত্যাদি]। তৎ(লোকবিলক্ষণতয়া প্রসিদ্ধং) যৎ(বস্তু) পশ্যসি(জানাসি); তৎ বদ[মহ্যামিতি শেষঃ]॥
[নচিকেতা বলিলেন, আমার প্রশংসায় আর প্রয়োজন নাই]; ধৰ্ম্ম ও অধর্ম্মের অতীত, কার্য্য ও কারণ হইতে পৃথক্ এবং অতীত, অনাগত ও বর্তমান হইতেও ভিন্ন, যে বস্তু আপনি জানেন, তাহা আমাকে বলুন ॥৪৩ ॥১৪ ॥]
এতৎ শ্রুত্বা নচিকেতাঃ পুনরাহ—যদ্যহং যোগ্যঃ প্রসন্নশ্চাসি ভগবন্ মাং প্রতি, অন্যত্র ধর্মাৎ শাস্ত্রীয়াৎ ধৰ্ম্মানুষ্ঠানাৎ, তৎফলাৎ তৎকারকেভ্যশ্চ পৃথগ্বুতমিত্যর্থঃ। তথা অন্যত্র অধর্মাৎ বিহিতাকরণরূপাৎ পাপাৎ, তথা অন্যত্রাস্মাৎ কৃতাকৃতাৎ; কৃতং কার্য্যম্, অকৃতং কারণম্, অস্মাদন্যত্র। কিঞ্চ, অন্যত্র ভূতাচ্চ অতিক্রান্তাৎ কালাৎ, ভব্যাচ্চ ভবিষ্যতশ্চ, তথা অন্যত্র বর্তমানাৎ, কালত্রয়েণ যন্ন পরিচ্ছিদ্যত ইত্যর্থঃ। যৎ ঈদৃশং বস্তু সর্ব্ব-ব্যবহারগোচরাতীতং পশ্যসি জানাসি, তৎ বদ মহ্যম্ ॥১৪ ॥৪৩ ॥
নচিকেতা পুনর্বার বলিলেন, আমি যদি(উপদেশের) যোগ্য হইয়া থাকি, এবং আপনিও যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন; [তাহা হইলে] ধৰ্ম্ম হইতে অর্থাৎ শাস্ত্রেোক্ত ধর্মানুষ্ঠান, ধর্ম-ফল ও ধৰ্ম্ম-সাধন হইতে পৃথক্, সেইরূপ অধর্ম্ম হইতে পৃথক্, আর এই কৃত ও অকৃত হইতে পৃথক্, অর্থাৎ কৃত অর্থ—কার্য্য, অকৃত অর্থ—কারণ, তদুভয় হইতেও পৃথক্। আরও এক কথা, ভূত—অতীত কাল, ভব্য —ভবিষ্যৎকাল এবং বর্তমান কাল হইতে ভিন্ন; অর্থাৎ উক্ত কাল- ত্রয়ের দ্বারা যাহা পরিচ্ছিন্ন হয় না; সর্ব্বপ্রকার লৌকিক ব্যবহারের অগোচর এবংবিধ যে বস্তু আপনি দর্শন করেন অর্থাৎ জানেন; তাহা আমায় বলুন ॥৪৩৷৷১৪৷৷
সর্ব্বে বেদা যৎ পদমামনন্তি, তপাস্সি সর্ব্বাণি চ যদ্ বদন্তি। যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য্যং চরন্তি, তত্তে পদসংগ্রহেণ ব্রবীম্যোমিত্যেতৎ ॥৪৪॥১৫॥
[ নচিকেতসা পৃষ্টং ব্রহ্মস্বরূপং তন্মহিমোক্তিপূর্ব্বকং বক্ত মুপক্রমতে]-সর্ব্ব- ইতি। সর্ব্বে বেদাঃ(বেদৈকদেশাঃ উপনিষদঃ) যৎ(বস্তু) পদং(পদনীয়ং প্রাপ্তব্যমিত্যর্থঃ), আমনন্তি(মুখ্যবৃত্ত্যা বোধয়ন্তি); সর্ব্বাণি তপাংসি(কর্ম্মাণি) চ যৎ বদন্তি(যৎপ্রাপ্তয়ে বিহিতানি); যৎ ইচ্ছন্তঃ ব্রহ্মচর্য্যং(গুরুগৃহবাসাদিরূপং ঊর্দ্ধরেতস্থাদিব্রতং বা) চরন্তি(অনুতিষ্ঠন্তি)[ সাধবইতি শেষঃ]। তৎ পদং তে(তুভ্যং) সংগ্রহেণ(সক্ষেপেণ) ব্রবীমি-‘ওম্’ইতি এতৎ।[তৎ পদং- ‘ওম্’ ইত্যুচ্যত ইত্যর্থঃ] ॥
সমস্ত বেদ(বেদের একদেশ—উপনিষৎসমূহ) যাহাকে পদ বা প্রাপ্তব্য বলিয়া নির্দেশ করেন, সমস্ত তপস্যা(কর্ম্মসমূহও) যাহা প্রতিপাদন করিয়া থাকে,[এবং] সাধুগণ যাহার ইচ্ছায় ব্রহ্মচর্য্য(গুরুগৃহে বাস ও ইন্দ্রিয়সংযমাদি) আচরণ করেন, আমি সংক্ষেপে সেই পদ বলিতেছি—‘ওম্’-ই সেই পদ ॥৪৪॥১৫॥
ইত্যেবং পৃষ্টবতে মৃত্যুরুবাচ পৃষ্টং বস্তু বিশেষণান্তরঞ্চ বিবক্ষন্,-সর্ব্বে বেদাঃ যৎ পদং পদনীয়ং গমনীয়ম্ অবিভাগেন অবিরোধেন আমনন্তি প্রতিপাদয়ন্তি, তপাংসি সর্ব্বাণি চ যৎ বদন্তি, যৎপ্রাপ্ত্যর্থানীত্যর্থঃ। যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য্যং গুরুকুল- বাসলক্ষণম্ অন্যদ্বা ব্রহ্মপ্রাপ্ত্যর্থং চরন্তি; তৎ তে তুভ্যং পদং যজ্ঞাতুমিচ্ছসি, সংগ্রহেণ সঙ্ক্ষেপতো ব্রবীমি,-ওম্ ইত্যেতৎ; তদেতৎ পদং যৎবুভূৎসিতং ত্বয়া, তদেতদোমিতি ওম্ শব্দবাচ্যম্, ওমশব্দপ্রতীকঞ্চ ॥৪৪ ॥১৫ ॥
এইপ্রকার প্রশ্নকারী নচিকেতাকে জিজ্ঞাসিত বস্তু ও তদ্বিষয়ক অপরাপর বিশেষণ বলিবার অভিপ্রায়ে যম বলিতে লাগিলেন যে, সমস্ত বেদ(বেদাংশ উপনিষৎ শাস্ত্রসমূহ) যাহাকে অভিন্নরূপে পদ অর্থাৎ
পদনীয়(প্রাপ্তব্য) বলিয়া থাকেন; সমস্ত তপস্যাও(কর্মরাশিও) যাহাকে বলিয়া থাকেন; অর্থাৎ যাহার প্রাপ্তির উদ্দেশে তপস্যা(অভি- হিত হইয়াছে)।[সাধুগণ] যাহার প্রাপ্তির ইচ্ছায় গুরুগৃহে বাসরূপ অথবা অন্যপ্রকার ব্রহ্মচর্য্য আচরণ করিয়া থাকেন; তুমি যাহা জানিতে ইচ্ছা করিতেছ; আমি সংক্ষেপে তোমাকে সেই পদ বলিতেছি—‘ওম্’, ইহাই তোমার বুভুৎসিত(যাহা বুঝিতে ইচ্ছা করিয়াছ,) সেই পদ; অর্থাৎ এই যে, ‘ওম্’ শব্দের অর্থ ও ব্রহ্ম-প্রতীক ‘ওম্’ শব্দ; এই উভয়কেই সেই ‘পদ’ বলিয়া জানিবে * ॥৪৪॥১৫৷৷
এতদ্যোবাক্ষরং ব্রহ্ম এতদ্যোবাক্ষরং পরম্।
এতদ্যাবাক্ষরং জ্ঞাথ। যো যদিচ্ছতি তস্য তৎ ॥৪৫॥১৬॥
[ ওঙ্কারস্য উপাসনাং বিধায় তৎফলং প্রদর্শয়ন্ স্তুতিমাহ—] এতদ্ধ্যেবেতি। এতৎ(ওঙ্কাররূপং) অক্ষরম্ এব হি ব্রহ্ম(অপরং ব্রহ্ম)। এতদেব হি অক্ষরং পরম্[ব্রহ্ম—পরমাত্মাখ্যং,।[হি শব্দৌ উভয়ত্র প্রসিদ্ধিদ্যোতকৌ]। এতৎ এব হি অক্ষরং জ্ঞাত্বা যঃ(অধিকারী) যৎ ইচ্ছতি(কাময়তে), তস্য তৎ[সিধ্যতীতিশেষঃ]॥
এই অক্ষরই(ওঙ্কারই) প্রসিদ্ধ[অপর। ব্রহ্ম স্বরূপ এবং এই অক্ষরই প্রসিদ্ধ পর ব্রহ্মস্বরূপ। এই অক্ষরকে জানিয়া যে যাহা ইচ্ছা করে, তাহার তাহাই সিদ্ধ হয় ॥ ৪৫ ॥ ১৬॥]
অত এতদ্ব্যেবাক্ষরং ব্রহ্ম অপরম্, এতদ্ব্যেবাক্ষরং পরঞ্চ। তয়োর্হি প্রতীক- মেতদক্ষরম্। এতদ্ব্যেবাক্ষরং জ্ঞাত্বা উপাস্য ব্রহ্মেতি, যো যদিচ্ছতি পরমপরং বা, তস্য তদ্ভবতি,-পরং চেৎ-জ্ঞাতব্যম্, অপরং চেৎ-প্রাপ্তব্যম্ ॥ ৪৫ ॥ ১৬ ॥
১০
ভাষ্যানুবাদ।
অতএব প্রসিদ্ধ এই অক্ষরই(ওঙ্কারই) অপর ব্রহ্মস্বরূপ(কার্য্য ব্রহ্মস্বরূপ) এবং এই অক্ষরই পর ব্রহ্মস্বরূপও; কারণ এই অক্ষরই উক্ত উভয়প্রকার ব্রহ্মের প্রতীক বা আলম্বন। এই অক্ষরকেই ব্রহ্মরূপে জানিয়া—উপাসনা করিয়া যে যাহা ইচ্ছা করে— পর বা অপর ব্রহ্ম পাইতে ইচ্ছা করেন, তাহার তাহাই সিদ্ধ হয়, অর্থাৎ পর ব্রহ্মকে যদি[আলম্বন করেন, তবে] তিনি জ্ঞাতব্যরূপে সিদ্ধ হন], আর অপর ব্রহ্মকে যদি[আলম্বন করেন, তাহা হইলে] তিনি প্রাপ্তব্যরূপে(গন্তব্যরূপে)[সিদ্ধ হন] * ॥৪৫॥১৬৷৷
এতদালম্বনং শ্রেষ্ঠমেতদালম্বনং পরম্।
এতদালম্বনং জ্ঞাখ্যা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে ॥৪৬॥১৭॥
এতৎ(ওঙ্কাররূপং) আলম্বনং শ্রেষ্ঠম্(অপরব্রহ্মপ্রাপ্তিসাধনানাং মধ্যে প্রশস্যতমম্)। এতৎ আলম্বনং পরং[পরব্রহ্মবিষয়ত্বাদিতি ভাবঃ]। এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে[ব্রহ্মভূতো ব্রহ্মবৎ পূজ্যো ভবতীতি ভাবঃ] ॥
এই ওঙ্কারই[অপর ব্রহ্মপ্রাপ্তিসাধন আলম্বনের মধ্যে] শ্রেষ্ঠ আলম্বন; [এবং] এই আলম্বনই[পরব্রহ্মের প্রাপ্তি সাধন বলিয়া] পর। এই আলম্বন অবগত হইয়া ব্রহ্মলোকে[ব্রহ্মের ন্যায়] পূজ্য হয় ॥ ৪৬ ॥ ১৭ ॥]
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।
যত এবম্, অতএব এতৎ আলম্বনম্ এতদ্ ব্রহ্মপ্রাপ্ত্যালম্বনানাং শ্রেষ্ঠং প্রশস্য- তমম্। এতদালম্বনং পরম্ অপরঞ্চ, পরাপরব্রহ্মবিষয়ত্বাৎ। অতঃ এতদালম্বনং জ্ঞাত্বা ব্রহ্মলোকে মহীয়তে। পরস্মিন্ ব্রহ্মণি অপরস্মিংশ্চ ব্রহ্মভূতো ব্রহ্মবদুপাস্যো ভবতীত্যর্থঃ ॥ ৪৬ ॥ ১৭ ॥
যেহেতু এই অক্ষরই পর ও অপর ব্রহ্মের প্রাপ্তিসাধন; অতএব এই আলম্বনই ব্রহ্ম-প্রাপ্তি-সাধন আলম্বন সমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ— অতিশয় প্রশংসনীয় আলম্বন, এবং এই আলম্বনই পর ও অপর ব্রহ্ম- বিষয়ত্ব নিবন্ধন পর ও অপর। অতএব, সাধক এই আলম্বন জানিয়া ব্রহ্মলোকে পূজিত হন। ‘পরব্রহ্মেই হউক বা অপর ব্রহ্মেই হউক, নিজে ব্রহ্মস্বরূপ হইয়া ব্রহ্মেরই ন্যায় উপাস্য হন ॥৪৬৷৷১৭৷৷
ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিৎ, নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ। অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণে ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥৪৭৷১৮৷৷
[ ইদানীং আত্মনঃ স্বরূপং নিৰ্দ্দিশন্ আহ]-ন জায়তে ইতি।[নেত্যগ্রহ- প্যন্নেতি। বিপশ্চিৎ(আত্মজ্ঞঃ) ন জায়তে(ন উৎপদ্যতে), ম্রিয়তে বা (ন চ নশ্যতি),[দেহযোগ বিয়োগনিবন্ধন-জনিমৃতিযুক্তো ন ভবতীত্যর্থ:]। [কুতইত্যতো হেতুদ্বয়মাহ-] অয়ং(আত্মা) কুতশ্চিৎ(কারণাৎ) ন বভূব, [অস্মাচ্চ আত্মনঃ] কশ্চিৎ(অন্যঃ) ন বভূব।[জন্ম-মৃত্যুহীনত্ব ৎ] পুরাণঃ(পুরং দেহম্ অণতি গচ্ছতীতি পুরাণঃ, সদাতনো বা)।[অতঃ] অজো নিত্যঃ(স্বরূপেণ জন্ম-মরণহীনঃ), শাশ্বতঃ(অবিকারশ্চ) অয়ং(আত্মা) শরীরে(আত্মন উপাধিভূতে দেহে) হন্যমানে(সতি, স্বয়ং) ন হন্যতে(ন হিংস্যতে) ॥
বিপশ্চিৎ(আত্ম-তত্ত্বাভিজ্ঞ) ব্যক্তি[জানেন যে,] এই আত্মা জন্মে না, অথবা মরে না;[আত্মাও] কোন কিছু হইতে হয় নাই এবং ইহা হইতেও কেহ জন্মে নাই। এই হেতু এই আত্মা অজ(জন্মরহিত), নিত্য, শাশ্বত(নির্বিকার) ও পুরাণ অর্থাৎ দেহপ্রবিষ্ট বা চিরবর্তমান। দেহ নিহত হইলেও সে নিহত হয় না ॥ ৪৭ ॥ ১৮ ॥]
অত্র ধর্ম্মাদিত্যাদিনা পৃষ্ঠ্য আত্মনোহশেষবিশেষরহিতস্য আনুষঙ্গেন
প্রতীকত্বেন চোঙ্কারো নিদ্দিষ্টঃ; অপরস্য চ ব্রহ্মণো মন্দ-মধ্যমপ্রতিপত্তূন্ প্রতি। অথেদানীং তস্যোঙ্কারালম্বনস্যাত্মনঃ সাক্ষাৎস্বরূপনিদ্দিধারয়িষয়া ইদমুচ্যতে, ন জায়তে নোৎপদ্যতে, ম্রিয়তে বা ন ম্রিয়তে চ, উৎপত্তিমতো বস্তুনোহনিত্য- স্যানেকা বিক্রিয়াঃ, তাসামাদ্যন্তে জন্ম-বিনাশলক্ষণে বিক্রিয়ে ইহাত্মনি প্রতিষিদ্ধ্যেতে প্রথমং সর্ব্ববিক্রিয়াপ্রতিষেধার্থং “ন জায়তে ম্রিয়তে বা” ইতি। বিপশ্চিৎ মেধাবী সর্ব্বজ্ঞঃ, অপরিলুপ্তচৈতন্যস্বভাবত্বাৎ।
কিঞ্চ, নায়মাত্মা কুতশ্চিৎ কারণান্তরাৎ বভূব ন প্রভূতঃ। স্বস্মাচ্চ আত্মনো ন বভূব কশ্চিদর্থান্তরভূতঃ। অতোহয়মাত্মা অজো নিত্যঃ, শাশ্বতোহপক্ষয়বিবজিতঃ। যো হ্যশাশ্বতঃ, সোহপক্ষীয়তে; অয়ন্তু শাশ্বতঃ; অতএব পুরাণঃ পুরাপি নব এবেতি; যো হ্যবয়বোপচয়দ্বারেণ অভিনির্বর্ত্যতে, স ইদানীং নবঃ, যথা—কুম্ভাদিঃ, তদ্বিপরী- তস্তু আত্মা পুরাণো বৃদ্ধিবিবর্জিত ইত্যর্থঃ। যত এবম্, অতো ন হন্যতে ন হিংস্যতে হন্যমানে শস্ত্রাদিভিঃ শরীরে; তৎস্থোহপ্যাকাশবদেব ॥৪৭৷১৮৷৷
[ইতঃপূর্ব্বে] “অন্যত্র ধর্মাৎ” ইত্যাদি বাক্যে যে নির্বিবশেষ আত্মা জিজ্ঞাসিত হইয়াছিল; তাহার আলম্বন(বিষয়) ও প্রতীক- রূপে ওঙ্কার নির্দিষ্ট হইয়াছে; এবং মধ্যম ও অধম বোদ্ধাদের জন্যও অ-পর ব্রহ্মের[আলম্বন ও প্রতীকরূপে ওঙ্কার নির্দিষ্ট হইয়াছে]। অতঃপর এখন সেই ওঙ্কারের আলম্বনীভূত আত্মার সাক্ষাৎসম্বন্ধে স্বরূপ নির্দ্ধারণেচ্ছায় ইহা কথিত হইতেছে,—
বিপশ্চিৎ অর্থ ধারণাশক্তিসম্পন্ন—সর্বজ্ঞ, যেহেতু তাহার স্বভাব- সিদ্ধ চৈতন্য বা জ্ঞানস্বভাব বিলুপ্ত(বিস্মৃত) হয় না;[অতএব সে] জন্মে না—উৎপন্ন হয় না; অথবা মরে না। উৎপত্তিশালী বস্তু- মাত্রেরই অনেকপ্রকার(ছয় প্রকার) বিকার[আছে]। তন্মধ্যে, জন্ম ও মরণরূপ দুইটিমাত্র বিকারের প্রতিষেধেই অন্য সমস্ত বিকারেরও প্রতিষেধ হইতে পারে, এই কারণে এখানে “ন জায়তে ম্রিয়তে বা” কথায় প্রথমতঃ জন্ম ও মরণরূপ আদি ও অন্ত বিকারদ্বয়ের প্রতিষেধ করা হইল।
আরও এক কথা, এই আত্মা অপর কোনও কারণ হইতে সম্ভূত হয় নাই, এই আত্মা হইতেও অপর কোন পদার্থ জন্মে নাই। অতএব, এই আত্মা অজ(জন্মরহিত), নিত্য ও শাশ্বত—ক্ষয়রহিত; কেন না, যাহা শাশ্বত নহে, তাহা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; কিন্তু এই আত্মা শাশ্বত, অতএব পুরাণ, অর্থাৎ পূর্ব্বেও নূতনই(ছিল); কারণ, অবয়ব-বৃদ্ধির দ্বারা যে বস্তু নিষ্পন্ন হয়(অভিব্যক্ত হয়), তাহাই ‘এখন নূতন’(বলিয়া ব্যবহৃত হয়), যেমন—কলস প্রভৃতি। কিন্তু আত্মা ঠিক তাহার বিপরীত--পুরাণ অর্থাৎ বৃদ্ধিরহিত। যেহেতু আত্মা এইরূপ; অতএব, শস্ত্রাদি দ্বারা শরীর নিহত হইলেও শরীরস্থ আকা- শের ন্যায় আত্মা নিহত বা হিংসার বিষয় হয় না * ॥৪৭৷১৮॥
হন্তা চেন্মন্যতে হন্তুং হতশ্চেন্মন্যতে হতম্।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নাযং হন্তি ন হন্যতে ॥৪৮॥১৯॥
[নন্নেবং হন্তা হতশ্চাহমিতি প্রততিঃ কথং সম্পদ্যতে? ভ্রান্ত্যা; ইত্যাহ], — হন্তেতি। দেহাত্মবুদ্ধিসম্পন্নঃ] হন্তা(হননকারী জনঃ) চেৎ(যদি) হন্তুং(হনিষ্যামি এনম্, ইতি) মন্যতে(চিন্তয়তি),[তথা] হতঃ[অপি] চেৎ(যদি)[আত্মানং] হতং(অন্যেন বিনাশিতং) মন্যতে;[তহি] তৌ উভৌ[অপি] ন বিজানীতঃ (সামান্যতো জানন্তৌ অপি বিশেষেণ ন জানীতঃ)।[যতঃ] অয়ং(আত্মা) ন হন্তি[কঞ্চিৎ, স্বয়ং চ পরৈঃ] ন হন্যতে।[অয়মাত্মা হননক্রিয়ায়াঃ কর্তা কর্ম্ম চ ন ভবতীত্যাশয়ঃ] ॥
হত্যাকারী ব্যক্তি যদি মনে করে যে, আমি(অমুককে) হনন করিব; এবং হত ব্যক্তিও যদি মনে করে যে, আমি হত হইয়াছি। তাহারা ভয়েই বিশেষরূপে[আত্মতত্ত্ব] জানে না। কারণ, এই আত্মা[অপরকে] হনন করে না, এবং নিজেও অপর কর্তৃক[হত হয় না ॥৪৮৷৷১৯৷৷]
এবস্তূতমপ্যাত্মানং শরীরমাত্রাত্মদৃষ্টিঃ হন্তা চেদ্ যদি মন্যতে চিন্তয়তি ইচ্ছতি হন্তুং—হনিষ্যাম্যেনমিতি; যোহপ্যন্যো হতঃ, সোহপি চেৎ মন্যতে হতমাত্মানং — হতোহহমিতি; উভাবপি তৌ ন বিজানীতঃ স্বমাত্মানম্। যতো নায়ং হন্তি অবি- ক্রিয়ত্বাদাত্মনঃ। তথা ন হন্যতে আকাশবদবিক্রিয়ত্বাদেব। অতোহনাম্মজ্ঞবিষয় এব ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মাদিলক্ষণঃ সংসারো ন ব্রহ্মজ্ঞস্য, শ্রুতিপ্রামাণ্যাৎ ন্যায়াচ্চ ধৰ্ম্মাহধৰ্ম্মাদ্যনু- পপত্তেঃ ॥৪৮৷৷১৯৷৷
যে লোক কেবল দেহকেই আত্মা বলিয়া জানে, তাদৃশ হন্তা ব্যক্তি যদি হনন করিতে, অর্থাৎ ‘আমি ইহাকে বধ করিব’ এইরূপ মনে করে বা চিন্তা করে; আর অপর যে লোক হত হয়, সেও যদি ‘আমি হত’ বলিয়া আত্মাকে হত মনে করে, তাহারা উভয়েই স্বীয় আত্মাকে বিশেষরূপে জানে না; যেহেতু অবিক্রিয়ত্বনিবন্ধন এই আত্মা(কাহা- কেও) বধ করে না, সেইরূপ আকাশের ন্যায় নির্বিকারত্ব হেতু(অপর- কর্তৃক) হতও হয় না। অতএব, আত্মজ্ঞান-রহিত ব্যক্তির পক্ষেই ধৰ্মাধর্মাদিময় সংসার, কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞের পক্ষে নহে। কারণ, শ্রুতি প্রামাণ্য এবং ন্যায় বা যুক্তি অনুসারে জানা যায় যে, আত্মাতে ধৰ্ম্মা- ধর্মাদিময় সংসার সম্ভবপর হয় না * ॥৪৮৷৷১৯৷৷
[বিপশ্চিত আত্মদর্শন প্রকারমাহ-] অণোরণীয়ানিতি। অণোঃ(সূক্ষ্মাৎ পরমাণুপ্রভৃতেঃ) অণীয়ান্(অতিশয়েন সূক্ষ্মঃ),[তথা] মহতঃ(আকাশাদেরপি) মহীয়ান্(অতিশয়েন মহান্) আত্মা(পূর্ব্বোক্তলক্ষণঃ), অন্য জন্তোঃ(প্রাণিনঃ) গুহায়াং(হৃদয়ে) নিহিতঃ(নিয়তং স্থিতঃ)[অস্তি]।[নাস্তি ক্রতুঃ সংকল্পঃ -- কামনা যস্য, সঃ] অক্রতুঃ(বীতরাগঃ)[অতএব] বীতশোকঃ(বিগতদুঃখশ্চ সন্) ধাতুপ্রসাদাৎ(ধাতুনাং মনআদি-করণানাং নৈর্মল্যাং) আত্মনঃ তং(পূর্ব্বোক্তং) মহিমানং(অবিক্রিয়ত্বাদিকং) পশ্যতি(সাক্ষাৎ করোতি) ॥
বিপশ্চিৎ ব্যক্তি যে প্রকারে আত্মদর্শন করেন, তাহা বলা হইতেছে,—পরমাণু প্রভৃতি অণু(সূক্ষ্ম) বস্তু অপেক্ষাও ‘অণীয়ান্(অতিশয় সূক্ষ্ম) এবং আকাশাদি মহৎ পদার্থ অপেক্ষাও অতিশয় মহান্, আত্মা এই প্রাণিগণের হৃদয়-গুহায় নিহিত আছেন। নিষ্কাম ব্যক্তি শোকরহিত হইয়া মন প্রভৃতি ধাতুর(ইন্দ্রিয়ের) প্রসন্নতা লাভ করেন, তাহার ফলে আত্মার সেই মহিমা(নির্বিকারত্বাদি ভাব) সাক্ষাৎ- কার করিয়া থাকেন ॥৪৯৷৷০॥]
কথং পুনরাত্মানং জানাতীত্যুচ্যতে, -অণোঃ সূক্ষ্মা অণীয়ান্ শ্যামাকাদেরণুতরঃ। মহতো মহৎপরিমাণাৎ মহীয়ান্ মহত্তরঃ পৃথিব্যাদেঃ, অণু মহদ্বা যদস্তি লোকে বস্তু, তৎ তেনৈবাত্মনা নিত্যেনাত্মবৎ সম্ভবতি; তদাত্মনা বিনির্ম্মুক্তমসৎ সম্পদ্যতে। তস্মাদসাবেবাত্মা অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ সর্ব্ব-নাম রূপবস্তু পাধিকত্বাৎ। স চাত্মা অন্য জন্তোঃ ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তস্য প্রাণিজাতস্য গুহায়াং হৃদয়ে নিহিতঃ আত্মভূতঃ স্থিত ইত্যর্থঃ। তম:আত্মানং দর্শন-শ্রবণ-মননবিজ্ঞানলিঙ্গং অক্রতুঃ অকামঃ দৃষ্টাদৃষ্ট- বাহ্যবিষয়েভ্য উপরতবুদ্ধিরিত্যর্থঃ। যদা চৈবং তদা মনআদীনি করণানি ধাতবঃ শরীরস্থ্য ধারণাৎ প্রসীদন্তীতি, এষাং ধাতুনাং প্রসাদাৎ আত্মনো মহিমানং কৰ্ম্ম..
নিমিত্তবৃদ্ধি-ক্ষয়রহিতং পশ্যতি বীতশোকঃ। ধাতু প্রসাদান্মহিমানমাত্মনঃ ‘অয়মহমস্মি’ ইতি সাক্ষাৎ বিজানাতি; ততো বিগতশোকো ভবতি ॥৪৯৷২০৷৷
ভাষ্যানুবাদ।
[ পণ্ডিতগণ] আত্মাকে কি প্রকার দর্শন করেন, তাহা বলা হইতেছে,—শ্যামাক(শস্যবিশেষ) প্রভৃতি অণু বা সূক্ষ্ম পদার্থ হইতেও অণীয়ান্ অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম এবং পৃথিব্যাদি মহৎ পদার্থ হইতেও মহত্তর, অর্থাৎ অণু বা মহৎ যে কোন বস্তু আছে, তৎসমস্তই সেই নিত্য আত্মা দ্বারা আত্মবান্ অর্থাৎ সত্তাবান্ হয়; আর সেই আত্ম- বিরহিত হইলেই অসৎ হইয়া পড়ে। অতএব, এই আত্মাই সমস্ত নাম ও রূপময় উপাধি সম্পন্ন হওয়ায় অণু অপেক্ষাও অণু এবং মহৎ অপেক্ষাও মহৎ বলিয়া পরিচিত হন। * সেই আত্মাই জন্তুর অর্থাৎ ব্রহ্মাদি স্তম্ভপর্য্যন্ত প্রাণিগণের হৃদয়রূপ গুহায় নিহিত বা আত্মরূপে অবস্থিত আছেন। পুরুষ যখন অক্রতু—অকাম, অর্থাৎ ঐহিক ও পারলৌকিক বাহ্য বিষয়ে বিরক্তচিত্ত হয়, তখন তাহার ধাতু অর্থাৎ শরীর-ধারক মনঃপ্রভৃতি করণবর্গ প্রসন্ন বা নির্মূল হয়; এই সকল ধাতুর প্রসন্নতানিবন্ধন কর্মজনিত বৃদ্ধি-ক্ষয়রহিত আত্ম- মহিমা দর্শন করেন। অর্থাৎ ধাতুপ্রসন্নতা-বশতঃ ‘আমি হই এইরূপ’ ইত্যাকারে আত্মার মহিমা সাক্ষাৎকার করেন, তাহার পর বীতশোক অর্থাৎ শোক-দুঃখ বিনির্ম্মুক্ত হন ॥৪৯৷৷২০॥
আসীনো দূরং ব্রজতি শয়ানো যাতি সর্ব্বতঃ। কস্তং মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি ॥৫০॥২১॥
[ পুনশ্চ আত্মনো মহিমানমেবাহ] আসীন ইতি।[অয়ম্ আত্মা] আসীনঃ (অচল এব সন্) দূরং ব্রজতি(গচ্ছতি)।[তথা] শয়ানঃ(উপরতক্রিয়ঃ চ সন্) সর্ব্বতঃ যাতি। মদামদং(মদো হর্ষঃ, অমদঃ হর্ষাভাবঃ, তদ্বিশিষ্টং, এবং বিরুদ্ধধৰ্ম্মবন্তং) দেবং(প্রকাশমানং) তং(আত্মানং) মদন্যঃ(মাং বিনা) কঃ জ্ঞাতুং(তত্ত্বতঃ অনুভবিতুং) অর্হতি শক্নোতি ॥
উক্ত আত্মা একত্র অবস্থিত থাকিয়াও দূরগামী, এবং শয়ান অর্থাৎ ক্রিয়া- রহিত হইয়াও সর্ব্বত্র গামী; মদামদ অর্থাৎ হর্ষ ও তদভাববান্ সেই প্রকাশ- মান্ আত্মাকে আমি ভিন্ন আর কে জানিতে সমর্থ হয়? ॥৫০॥২১॥]
অন্যথা দুর্বিজ্ঞেয়োহয়মাত্মা কামিভিঃ প্রাকৃতপুরুষৈঃ, যস্মাৎ আসীনঃ অবস্থি- তোহচল এব সন্ দূরং ব্রজতি; শয়ানো যাতি সর্ব্বতঃ; এবমসৌ আত্মা দেবো মদা- মদঃ, সমদোহমদশ সহর্ষোহহর্ষশ্চ বিরুদ্ধধৰ্ম্মবান্, অতোহশক্যত্বাজ জ্ঞাতুং কঃ তং মদামদং দেবং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতি। অস্মদাদেরেব সূক্ষ্মবুদ্ধেঃ পণ্ডিতস্য সুবিজ্ঞেয়ো- হয়মাত্মা স্থিতিগতিনিত্যানিত্যাদিবিরুদ্ধানেকবিধ ধর্মোপাধিকত্বাদ বিরুদ্ধধর্মবত্ত্বাদ বিশ্বরূপইব চিন্তামণিবদবভাসতে। অতো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বং দর্শয়তি, কস্তং মদন্যো জ্ঞাতুমর্হতীতি। করণানামুপশমঃ শয়নং, করণজনিতস্যৈকদেশবিজ্ঞানস্যোপশমঃ শয়ানস্য ভবতি। যদা চৈবং কেবলসামান্যবিজ্ঞানত্বাৎ সর্ব্বতো যাতীব, যদা বিশেষবিজ্ঞানস্থঃ স্বেন রূপেণ স্থিত এব সন্ মনআদিগতিষু তদুপাধিকত্বাদ দূরং ব্রজতীব। স চেহৈব বর্ত্ততে ॥৫০৷৷২১৷৷
যেহেতু এই আত্মা আসীন(অবস্থিত) অর্থাৎ নিশ্চল থাকিয়াও দূরে গমন করে, এবং শয়ান থাকিয়াও সর্বত্র গমন করে; প্রকাশমান এই আত্মা সমদ—সহর্ষও বটে এবং অমদ—অহর্ষও (হর্ষহীনও) বটে; এইরূপ বিরুদ্ধধর্ম্মসম্পন্ন; অতএব, তাহাকে জানিবার শক্তি নাই; সুতরাং সেই মদামদ দেবকে আমি ভিন্ন আর কে জানিতে সমর্থ হয়? ফলকথা, স্থিতি, গতি, নিত্যত্ব ও অনিত্যত্ব প্রভৃতি বহুবিধ বিরুদ্ধ ধর্ম্ম উপস্থিত থাকায়—বিরুদ্ধ-ধর্ম্মবত্তা-নিবন্ধন
১১
‘চিন্তামণির’ ন্যায় বহুরূপে প্রকাশমান আত্মা আমাদের ন্যায় সূক্ষ্ম, বুদ্ধিসম্পন্ন পণ্ডিতের পক্ষেই একমাত্র সুবিজ্ঞেয়-(অন্যের পক্ষে নহে)। অতএব ‘আমি ভিন্ন আর কে জানিতে পারে?’ এই কথায় সেই দুর্বিবজ্ঞেয়তাই প্রদর্শন করা হইয়াছে। শয়ন অর্থ-ইন্দ্রিয়গণের উপশম বা বৃত্তিরোধ; শয়ান ব্যক্তির ইন্দ্রিয়জাত একদেশ বিজ্ঞানের (‘আমি মনুষ্য’ ইত্যাদি পরিচ্ছিন্ন জ্ঞানের) উপশম বা নিবৃত্তি হইয়া থাকে। আত্মা যখন বিশেষ জ্ঞান হইতে উপরত হয়, তখন কেবলই সামান্য বিজ্ঞান সম্বন্ধ থাকায় যেন সর্বতোভাবে গমনই করে; আর যখন স্ব-স্বরূপে অবস্থিত থাকিয়াই বিশেষ-বিজ্ঞানস্থ হয়, তখন মনঃ প্রভৃতি করণের গতিতে তদুপাধিক আত্মাও যেন দূরেই গমন করে। বস্তুতঃ আত্মা এখানেই থাকে, কোথাও যায় না ॥৫০॥২১৷৷
অশরীরং শরীরেযু অনবস্থেষ্ববস্থিতম্।
মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি ॥ ৫১॥২২
[ পুনস্তন্মহিমোক্তিপূর্ব্বকং তজজ্ঞানফলমাহ]—অশরীরমিতি ॥ অনবস্থেযু ( নশ্বরেষু) শরীরেষু( প্রাণিদেহেষু) অবস্থিতং[ স্বয়ং তু] অশরীরং( তৎশরীর- নিমিত্তক-বিকাররহিতং) মহান্তং( দেশতঃ কালতঃ গুণতশ্চ অপরিচ্ছিন্নং বিভুং সর্ব্বব্যাপিনম্ আত্মানং( দেহিনং) মত্বা ধীরো ন শোচতি( মুক্তো ভবতি)।
অস্থির বা অনিত্য শরীরে অবস্থিত, অথচ স্বয়ং শরীর-রহিত, মহৎ ও বিভু আত্মাকে অবগত হইয়া ধীর ব্যক্তি শোক(দুঃখ) করে না ॥৫১৷৷২১৷৷]
তদ্বিজ্ঞানাচ্চ শোকাত্যয় ইত্যপি দর্শয়তি—অশরীরং স্বেন রূপেণ আকাশকল্প আত্মা, তম্ অশরীরং, শরীরেষু দেব-পিতৃ-মনুষ্যাদিশরীরেযু অনবস্থেযু অনিত্যেযু অবস্থিতিরহিতেষু অবস্থিতঃ—নিত্যম্ অবিকৃতমিত্যেতৎ। মহান্তম্, মহত্ত্বস্য আপেক্ষিকত্বশঙ্কায়ামাহ – বিভুং ব্যাপিনন্ আত্মানম্। আত্মগ্রহণং স্বতোহনন্যত্ব- প্রদর্শনার্থম্; আত্মশব্দঃ প্রত্যগাত্মবিষয় এব মুখ্যঃ, তমীদৃশমাত্মানং মত্বা ‘অয়মহম্’ ইতি ধীরো ধীমান্ ন শোচতি। ন হেবংবিধস্য আত্মবিদঃ শোকোপপত্তিঃ ॥৫১৷৷২২৷৷
সেই আত্মতত্ত্ব অবগত হইলে যে, শোকের অবসান হয়; ইহাও প্রদর্শিত হইতেছে,—আত্মা স্বরূপতঃ আকাশের ন্যায়; অতএব, অশরীর, অথচ অনবস্থিত অর্থাৎ স্থিরতা-রহিত ও অনিত্য—দেবগণ, পিতৃগণ ও মনুষ্যাদি দেহে অবস্থিত[ স্বয়ং কিন্তু] নিত্য—অবিকৃত ও মহৎ, ঘটপটাদি পদার্থ অপেক্ষা-মহত্ত্ব-শঙ্কা নিরাসার্থ বলিলেন—বিভু অর্থাৎ সর্বব্যাপী; সেই আত্মাকে অবগত হইয়া অর্থাৎ ‘আমি এইরূপই’, ইহা জানিয়া ধীর ব্যক্তি আর শোক করেন না। কেন না, এবংবিধ আত্মজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে শোক সম্ভব হয় না। ‘আত্মা’ শব্দের প্রত্যগাত্মা(জীব) অর্থই মুখ্য, অর্থাৎ প্রথম প্রতীতির বিষয়। জীব যে, স্বভাবতই ব্রহ্ম হইতে অন্য বা পৃথক্ নহে, তাহা জ্ঞাপনার্থ এখানে ‘আত্মা’-শব্দের প্রয়োগ করা হইয়াছে ॥৫১৷২২৷
নায়মাত্মা প্ররচনেন লভ্যো।
ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন।
যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্য- স্তস্যৈষ আজ্ঞা! বিবৃণুতে তনূং স্বাম্ ॥৫২॥২৩
[ আত্মনো দুব্বিজ্ঞেয়ত্বেহপি সুবিজ্ঞানোপায়মাহ] নায়মিতি। অয়ম্ আত্মা প্রবচনেন(শাস্ত্র-ব্যাখ্যানেন অধ্যয়নাদিনা বা) লভ্যো(দর্শনীয়ো) ন(ভবতি), মেধয়া(স্বকীয়প্রজ্ঞাবলেন) ন[লভ্যঃ], বহুনা শ্রুতেন(শাস্ত্র-শ্রবণেন বা) [লভ্যঃ]।[কিন্তু] এষঃ(মুমুক্ষুঃ) যম্ এব(স্বস্বরূপম্ আত্মানং) বৃণুতে(প্রাপ্যতয়া প্রার্থয়তে), তেন(আত্মনা) এব[সঃ মুমুক্ষুঃ] লভ্যঃ। অথবা এষঃ(ঈশ্বরঃ ভক্ত্যারাধিতঃ সন্) যম্ এব সেবকং বৃণুতে(আত্মদর্শনায় বরয়তি যস্মৈ প্রসীদতীতি যাবৎ) তেনৈব(বৃতেনৈব) লভ্যো(দর্শনীয়ঃ)। কথম্? এষ আত্মা স্বাং (স্বকীয়াং পারমার্থিকীং) তনুং(মূর্তিং) তস্য(সাধকস্য সমীপে) বিবৃণুতে (প্রদর্শয়তি।
আজ্ঞা স্বভাবতঃ দুর্ব্বিজ্ঞেয় হইলেও তাঁহাকে জানিবার উপায় আছে, সেই
উপায় কথিত হইতেছে—প্রবচন অর্থাৎ কেবল শাস্ত্রাধ্যয়ন বা শাস্ত্র ব্যাখ্যা দ্বারা এই আত্মাকে লাভ করা যায় না, অর্থাৎ আত্ম-তত্ত্ব জানা যায় না; কেবল মেধা (ধারণাশক্তি) দ্বারা কিংবা বহুল শাস্ত্র শ্রবণেও আত্মাকে লাভ করা যায় না। পরন্তু, এই সাধক স্বস্বরূপে যে আত্মাকে বরণ করেন, অর্থাৎ পাইবার নিমিত্ত প্রার্থনা করেন, সেই আত্মা কর্তৃক এই সাধক লভ্য হন; অথবা এই অংশের অর্থ এইরূপ,—এই ঈশ্বর ভক্তিভরে আরাধিত হইয়া যাঁহাকে বরণ করেন, অর্থাৎ আত্মদর্শনের উপযুক্ত পাত্র বলিয়া স্বীকার করেন, তিনিই তাঁহাকে লাভ করিতে পারেন; কারণ, তিনি(ঈশ্বর) তাঁহার নিকটই স্বীয় প্রকৃত স্বরূপ বিবৃত বা প্রকটিত করেন ॥ ৫২॥২৩৷৷
যদ্যপি দুর্বিজ্ঞেয়োহয়মাত্মা, তথাপ্যপায়েন সুবিজ্ঞেয় এব. ইত্যাহ নায়মাত্মা প্রবচনেন অনেকবেদস্বীকরণেন লভ্যো জ্ঞেয়ঃ, নাপি মেধয়া গ্রন্থার্থধারণশক্ত্যা, ন বহুনা শ্রুতেন কেবলেন। কেন তহি লভ্যঃ? ইত্যুচ্যতে,-যমেব স্বমাত্মানম্ এষ সাধকো বৃণুতে প্রার্থয়তে, তেনৈবাত্মনা বরিত্রা স্বয়মাত্মা লভ্যো জ্ঞায়ত ইত্যেতৎ। নিষ্কামশ্চাত্মানমের প্রার্থয়তে; আত্মনৈবাত্মা লভ্যত ইত্যর্থঃ। কথং লভ্যতে? ইত্যুচ্যতে,-তস্য আত্মকামস্য এষ আত্মা বিবৃণুতে প্রকাশয়তি পারমা- থিকীং স্বাং তনুং স্বকীয়ং যাথাত্ম্যমিত্যর্থঃ ॥৫২৷৩৷
যদিও এই আত্মা[স্বভাবতঃ] দুর্বিবজ্ঞেয়ই বটে, তথাপি উপায়- বিশেষে নিশ্চয়ই সুবিজ্ঞেয়; এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন,-এই আত্মা প্রবচন অর্থাৎ বহুতর বেদ অধ্যয়ন দ্বারা লভ্য(বিজ্ঞেয়) হন না; মেধা-শাস্ত্রার্থ-ধারণাশক্তি দ্বারাও(লভ্য) হন না; কেবল বহু শাস্ত্রশ্রবণেও[লভ্য হন] না। তবে কি উপায়ে লভ্য? তদুত্তরে বলা হইতেছে,-এই সাধক স্বকীয় যে আত্মাকে বরণ করেন, অর্থাৎ প্রার্থনা করেন, বরণকারী সেই আত্মাকর্তৃক আত্মাই অর্থাৎ নিজেই নিজের লভ্য-জ্ঞেয় হন। নিষ্কাম পুরুষ আত্মাকেই প্রার্থনা করেন; এবং আত্মাই(নিজেই) আত্মার(নিজের) লভ্য’হয়। কি প্রকারে
তাঁহাকে লাভ করা যায়? তাই বলিতেছেন,—স্বীয় আত্মাই যাহার [একমাত্র] কামনার বিষয় হয়, সেই আত্মকামের নিকট আত্মা আপ- নার পারমার্থিক তনু, অর্থাৎ যথার্থ স্বরূপ বিবৃত বা প্রকটিত করিয়া থাকেন ॥ ৫২॥২৩৷৷
নাবিরতো দুশ্চরিতান্নাশান্তো নাসমাহিতঃ। নাশান্তমানসো বাপি প্রজ্ঞানেনৈনমাপ্নুয়াৎ॥৫৩॥২৪
[আত্মলাভস্য পরিপন্থিদোষং প্রদর্শয়ন্ তদুপায়ান্ আহ] নাবিরত ইতি। দুশ্চরিতাৎ(নিন্দিতাৎ শাস্ত্রনিষিদ্ধাৎ আচারাৎ) অবিরতঃ(অনিবৃত্তঃ দুরাচারীতি যাবৎ) ন, অশান্তঃ(শ্রবণ-মনন-ধ্যানৈঃ অসম্পাদিতেন্দ্রিয়নিগ্রহঃ) ন, অসমাহিতঃ (একাগ্রতারহিতঃ, বিক্ষিপ্তচিত্তঃ) ন, অশান্তমানসঃ(বিষয়ভোগে অলংবুদ্ধিরহিতঃ বিষয়লম্পট ইতি যাবৎ) চ প্রজ্ঞানেন(ব্রহ্মবিজ্ঞানেন) এনম্ আত্মানং) ন আপ্নুয়াৎ(ন প্রাপ্নোতি)।[অথবা প্রাগুক্তদোষ-দূষিতঃ কোহপি এনং ন আপ্নুয়াৎ; পরন্তু কেবলং প্রজ্ঞানেন(তত্ত্বজ্ঞানাধিগমেন এনম্ আত্মানং আপ্নয়াদিত্যর্থঃ)।
যে লোক দুশ্চরিত হইতে(শাস্ত্রনিষিদ্ধ ব্যবহার হইতে) বিরত নহে, সংযতে- ন্দ্রিয় নহে, সমাহিতচিত্ত নহে এবং ভোগস্পৃহারহিতও নহে; সে লোক ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা এই আত্মাকে জানিতে পারে না। অথবা, পূর্ব্বোক্ত কেহই আত্মাকে প্রাপ্ত হয় না, কেবল প্রজ্ঞান অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারাই আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৫৩ ॥ ২৪ ॥]
কিঞ্চান্যৎ, ন দুশ্চরিতাৎ প্রতিষিদ্ধাৎ শ্রুতিস্মৃত্যবিহিতাৎ পাপকর্মণঃ অবিরতঃ অনুপরতঃ। নাপি ইন্দ্রিয়লৌল্যাৎ অশান্তঃ, অনুপরতঃ। নাপি অসমাহিতঃ অনেকা- গমনা বিক্ষিপ্তচিত্তঃ। সমাহিতচিত্তোহপি সন্ সমাধানফলার্থিত্বাৎ নাপি অশান্তমানসো ব্যাপৃতচিত্তো বা আত্মানং প্রাপ্নুয়াৎ। কেন প্রাপ্নুয়াৎ? ইত্যুচ্যতে,-প্রজ্ঞানেন ব্রহ্মবিজ্ঞানেন এনং প্রকৃতমাত্মানম্ আপ্নুয়াৎ। যস্তু দুশ্চরিতাদবিরত ইন্দ্রিয়লৌল্যাচ্চ, সমাহিতচিত্তঃ সমাধানফলাদপি উপশান্তমানসশ্চ আচার্য্যবান্ প্রজ্ঞানেন এনং যথোক্তমাত্মানং প্রাপ্নোতীত্যর্থঃ ॥ ৫৩ ॥ ২৪ ॥
ভাষ্যানুবাদ।
, আরও এক কথা,[যে লোক] দুশ্চরিত হইতে অর্থাৎ যাহা শ্রুতি- স্মৃতি শাস্ত্রবিহিত নহে, এমন প্রতিষিদ্ধ পাপকর্ম্ম হইতে বিরত নহে; ইন্দ্রিয়-লৌল্য—অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের ঔৎসুক্য বশতঃ অশান্ত বা উপরত নহে; আর অসমাহিত অর্থাৎ একাগ্রতারহিত—বিক্ষিপ্ত বা চঞ্চলচিত্ত; এবং সমাহিতচিত্ত হইয়াও ফল কামনায় অশান্ত-মানস অর্থাৎ বিষযাসক্ত- চিত্ত; সে লোক পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হয় না। তবে কি উপায়ে প্রাপ্ত হয়? এই নিমিত্ত বলা হইতেছে,—প্রজ্ঞান অর্থাৎ ব্রহ্ম-বিজ্ঞান দ্বারা এই প্রস্তাবিত আত্মাকে প্রাপ্ত হয়। পরন্তু, যে লোক দুষ্ট ব্যবহার ও ইন্দ্রিয়-লালসা হইতে বিরত, সমাহিতচিত্ত ও সমাধি-ফল লাভে বীতস্পৃহ, এবং উপযুক্ত আচার্য্যবান্, সেই লোকই প্রজ্ঞানের দ্বারা উক্তপ্রকার আত্মাকে প্রাপ্ত হয় ॥৫৩৷৷২৪৷৷
যস্য ব্রহ্ম চ ক্ষত্রঞ্চ উভে ভবত ওদনঃ। মৃত্যুর্যস্যোপসেচনং, ক ইথা বেদ যত্র সঃ ॥ ৫৪॥২৫ মৃত্যুর্যস্যোপসেচনং, ক ইথা বেদ যত্র সঃ ॥ ৫৪॥২৫ ইতি কাঠকোপনিষদি প্রথমাধ্যায়ে দ্বিতীয়া বল্লী ॥১॥২॥
[ যথোক্তসাধনশূন্যস্য দুর্বিজ্ঞেয়ত্বং বক্তুমাহ—] যস্যেতি। যস্য(আত্মনঃ) ব্রহ্ম(ব্রাহ্মণত্বজাতিঃ) চ ক্ষত্রং(ক্ষত্রিয়ত্বজাতিঃ) চ(ইতরেতরবস্তুসমুচ্চয়ে চ দ্বয়ং) উভে ওদনঃ(অন্নং) ভবতঃ। মৃত্যুঃ(সর্ব্বপ্রাণিনাং মারকঃ) যস্য উপ- সেচনম্(উপকরণং শাকস্থানীয়ং ব্যঞ্জনরূপমিত্যর্থঃ), সঃ(এবং জগৎসংহর্তৃত্ব- গুণকঃ) যত্র[তিষ্ঠতি][তৎ] ইথা(ইখম্ এবংপ্রকারেণ) কো বেদ? (ন কোহপীতি ভাবঃ)॥
উক্ত সাধন-রহিত ব্যক্তির পক্ষে আত্মার দুর্বিজ্ঞেয়ত্ব জ্ঞাপনার্থ বলিতেছেন যে, —ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতি(অর্থাৎ জগতের সমস্ত বস্তুই) যাঁহার ওদন(অন্ন), অর্থাৎ অন্নের ন্যায় সংহার্য্য বস্তু; এবং সর্বপ্রাণি-সংহারক মৃত্যুও যাঁহার উপসেচন (ব্যঞ্জনস্থানীয়); তিনি যেখানে থাকেন, তাহা বিশেষরূপে কে জানে? ॥৫৪॥২৫৷৷
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।
যস্তনেবংভূতঃ, যস্য আত্মনঃ ব্রহ্ম চ ক্ষত্রঞ্চ—ব্রহ্মক্ষত্রে সর্ব্বধর্মবিধারকে অপি সর্ব্বপ্রাণভূতে উভে ওদনঃ অশনং ভবতঃ—স্যাতাম্। সর্ব্বহরোহপি মৃত্যুঃ যস্য উপসেচনমেব ওদনস্য অশনত্বেহপ্যপর্যাপ্তঃ, তং প্রকৃতবুদ্ধির্যথোক্তসাধনরহিতঃ সন্ কঃ ইথা ইত্থমেবং যথোক্তসাধনবানিবেত্যর্থঃ। বেদ বিজানাতি, যত্র সঃ আত্মেতি ॥ ৫৪ ॥ ২৫ ॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য- শ্রীমচ্ছঙ্করভগবৎপ্রণীতে কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমাধ্যায়ে • দ্বিতীয়বল্লীভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ২ ॥
ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়, অর্থাৎ.সর্বধর্মের পরিরক্ষক এবং সকলের প্রাণস্বরূপ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়, এই উভয় যাঁহার ওদন অর্থাৎ খাদ্য হয়; আর সর্বসংহারক মৃত্যুও যাঁহার উপসেচন(শাক বা ব্যঞ্জনস্থানীয়); অর্থাৎ ওদন ভক্ষণেও পর্যাপ্ত বা যথেষ্ট নহে; * পূর্বোক্ত সদাচার প্রভৃতি সাধনশূন্য ও প্রাকৃত-বুদ্ধিসম্পন্ন কোন লোক উক্ত সাধন-সম্পন্নের ন্যায় তাহা জানিতে পারে?—যেখানে সেই আত্মা অবস্থিত আছেন ॥৫৪॥২৫৷৷
ইতি কঠোপনিষদ্ভাষ্যের প্রথমাধ্যায়ে দ্বিতীয় বল্লী সমাপ্ত।
খাতং পিবন্তৌ সুকৃতস্য লোকে,
গুহাং প্রবিষ্টৌ পরমে পরার্দ্ধে।
ছায়াতপৌ ব্রহ্মবিদো বদন্তি,
পঞ্চমঃ। যে চ ত্রিণাচিকেতাঃ॥৫৫॥১
[ইদানীং প্রাপ্য-প্রাপকবিবেকার্থং পরমাত্ম-জীবাত্মনোঃ স্বরূপভেদমাহ]- ঋতমিতি। লোকে(অস্মিন্ শরীরে) সুকৃতস্য[কর্মণঃ] ঋতং(অবশ্যম্ভাবিত্বাৎ সত্যং ফলং-সুখ-দুঃখাদিকং) পিবন্তৌ(ভুঞ্জানৌ),[সুষ্কৃতস্য লোকে পুণ্যলব্ধ- স্বর্গাদিস্থানে বা]। গুহাং(গুহায়াং বুদ্ধৌ) পরমে(বাহ্যাকাশাপেক্ষয়া উৎকৃষ্টে) পরার্দ্ধে(পরস্য ব্রহ্মণঃ অর্দ্ধস্থানকল্পে হৃদয়াকাশে)[পরমত্যন্তং পরেভ্যঃ বা আ-সমন্তাৎ ঋদ্ধে অভিবৃদ্ধে মুখ্যপ্রাণে ইতি বা] প্রবিষ্টৌ,[পরমে পরার্দ্ধে গুহাং(হৃদয়গহ্বরঃ) প্রবিষ্টৌ ইতি বা]। ব্রহ্মবিদঃ[জীব-পরমাত্মানো] ছায়া- তপৌ(তমঃপ্রকাশৌ,[ইব] বদন্তি(কথয়ন্তি)।[অপিচ] যে চ পঞ্চাগ্নয়ঃ (গার্হপত্যাহবনীয়দক্ষিণাগ্নিসভ্যাবসথ্যাঃ পঞ্চ অগ্নয়ো যেযাং তে; দ্যুপর্জন্যপৃথিবী পুরুষস্ত্রীরূপ-পঞ্চাগ্নিবিদ্যানিষ্ঠা বা গৃহস্থাঃ) ত্রিণাচিকেতাঃ(ত্রিঃকৃত্বঃ নাচিকেতো- হগ্নিশ্চিতো যৈঃ, তে ত্রিবারকৃতনাচিকেতাগ্নয়ঃ যে, তে চ বদন্তি)।[‘ব্রহ্মবিদঃ’ ইত্যনেন জ্ঞানিনাং, ‘পঞ্চাগ্নয়ঃ’ ইত্যনেন উপাসকানাং ‘ত্রিণাচিকেতাঃ’ ইত্যনেন কর্মিণাং বা পৃথগেব উদ্দেশঃ কৃত ইতি বোদ্ধব্যম্ ইতি। অত্র জীবঃ সাক্ষাৎ পিবতি, পরমাত্মা তু স্বয়ং অপিবন্ অপি জীব: পায়য়তি, অতঃ চ পানপ্রযোজক- স্যাপি তস্য কর্তৃত্বম্ উপর্যতে ইত্যাশয়ঃ] ॥
সম্প্রতি পাপ্য ও প্রাপকের পার্থক্য-জ্ঞাপনার্থ জীব ও পরমাত্মার স্বরূপগত ভেদ বলিতেছেন,—যাঁহারা ব্রহ্মবিৎ এবং যাহারা পঞ্চাগ্নিসম্পন্ন, অথবা পঞ্চাগ্নি- বিদ্যানিষ্ঠ ও তিনবার নাচিকেত অগ্নির চয়ন বা আরাধনা করিয়াছেন, তাঁহারা বলিয়া থাকেন যে, সংসারে স্বানুষ্ঠিত কর্ম্ম ফলের ভোক্তা এবং বুদ্ধিরূপ গুহায় উত্তম, ব্রহ্মবাসের যোগ্য হৃদয়াকাশে অবস্থিত বা অভিব্যক্ত[ জীব ও পরমাত্মা] ছায়া ও আতপের ন্যায় অর্থাৎ অন্ধকার ও আলোকের ন্যায় পরস্পর বিভিন্ন- স্বভাবসম্পন্ন ॥ ৫৫ ॥ ১ ॥]
ঋতং পিবন্তৌ ইত্যস্যা বল্ল্যাঃ’ সম্বন্ধঃ-বিদ্যাবিদ্যে নানাবিরুদ্ধফলে ইত্যুপ- ন্যস্তে, ন তু সফলে তে যথাবৎ নির্নীতে। তন্নির্ণয়ার্থা রথরূপক-কল্পনা; তথা চ প্রতিপত্তি-সৌকর্য্যম্। এবঞ্চ প্রাপ্ত-প্রাপ্য-গন্ত-গন্তব্যবিবেকার্থং রথরূপকদ্বারা দ্বৌ আত্মানৌ উপন্যস্যেতে-ঋতমিতি। ঋতং সত্যম্ অবশ্যম্ভাবিত্বাৎ কৰ্ম্মফলং পিবন্তৌ; একস্তত্র কৰ্ম্মফলং পিবতি ভুঙক্তে নেতরঃ, তথাপি পাতৃসম্বন্ধাৎ পিবন্তৌ ইত্যুচ্যেতে ছত্রিন্যায়েন। সুকৃতস্য স্বয়ং কৃতস্য কর্মণঃ ঋতমিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। লোকে অস্মিন্ শরীরে, ‘গুহাং গুহায়াং বুদ্ধৌ প্রবিষ্টৌ। পরমে-বাহ্যপুরুষা কাশ- সংস্থানাপেক্ষয়া পরমম্। পরার্দ্ধে পরস্থ ব্রহ্মণোহদ্ধং স্থানং পরার্দ্ধং হার্দাকাশং, তস্মিন্ হি পরং ব্রহ্মোপলভ্যতে। ততঃ তস্মিন্ পরমে পরাদ্ধে হার্দাকাশে প্রবিষ্টো ইত্যর্থঃ। তৌ চ চ্ছায়াতপাবিব বিলক্ষণৌ সংসারিত্বাসংসারিত্বেন, ব্রহ্মবিদো বদস্তি কথয়ন্তি। ন কেবলমকর্মিণ এব বদন্তি; পঞ্চাগ্নয়ো গৃহস্থাঃ; যে চ ত্রিণাচিকেতাঃ ত্রিঃকৃত্বো নাচিকেতোহগ্নিশ্চিতো যৈঃ, তে ত্রিণাচিকেতাঃ ॥ ৫৫ ॥ ১ ॥
“ঋতং পিবন্তৌ” ইত্যাদি তৃতীয় বল্লীর সহিত পূর্ববল্লীর সম্বন্ধ এইরূপ,-নানাপ্রকার বিরুদ্ধ ফলপ্রদ বিদ্যা ও অবিদ্যা বিষয় ইতঃ- পূর্ব উল্লিখিতমাত্র হইয়াছে; কিন্তু ফলের সহিত যথাযথরূপে নিরূপিত হয় নাই; তাহারই নিরূপণার্থ ‘রথ’ রূপকের কল্পনা; ঐরূপে নিরূপণ করিলেই বুঝিবার সুবিধা হয়। এইরূপ সুবিধা হয় বলিয়াই প্রথমতঃ প্রাপক ও প্রাপ্য এবং গন্তা(মুমুক্ষু) ও গন্তব্য(পরমাত্মা), এতদু- ভয়ের বিবেক বা পার্থক্য প্রদর্শনার্থ “ঋতং” ইত্যাদিমন্ত্রে[জীব ও পরম] উভয় আত্মাই উপন্যস্ত হইতেছে। ‘ঋত’ অর্থ-সত্য, কর্ম্মের ফলও অবশ্যম্ভাবী বলিয়া সত্য,[এই কারণে এখানে ‘ঋত’ শব্দে কর্মফল বুঝিতে হইবে]।[যদিও] এক জীবই কেবল কৰ্ম্মফল পান করে-ভোগ করে, অপরে(পরমাত্মা ভোগ করে) না সত্য, তথাপি ‘ছত্রি’-ন্যায় অনুসারে পানকর্তা জীবের সহিত সম্বন্ধ থাকায় উভয়কেই
১২
পানকর্তা(পিবন্তৌ) বলা হইয়াছে *। লোকে অর্থাৎ এই শরীরে স্বকৃত কর্ম্মের ফলভোক্তা, বুদ্ধিরূপ গুহাতে—পরম অর্থাৎ বহিঃস্থিত ভৌতিক আকাশ ও দেহস্থ অধ্যাত্মাকাশ অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট এবং পরব্রহ্মের অভিব্যক্তি বা উপলব্ধি হয় বলিয়া ব্রহ্মের অর্দ্ধস্থান-যোগ্য— পরার্দ্ধ যে হার্দাকাশ(হৃদয়াকীশ বা দহরাকাশ), সেই পরম পরার্দ্ধ হার্দাকাশে প্রবিষ্ট। উভয়ের মধ্যে একটি সংসারী—জন্ম-মরণাদি-দুঃখ- ভাগী, অপরটি তদ্বিপরীত। এজন্য সেই উভয়কে(জীব ও পরমাত্মাকে) ছায়া ও আতপের ন্যায়(অন্ধকার ও আলোকের ন্যায়) বিভিন্নস্বরূপ বলিয়া ব্রহ্মবিদ্গণ বর্ণনা করেন। কেবল যে, অকর্ম্মিগণই(জ্ঞানিগণই) বলিয়া থাকেন, তাহা নহে; পঞ্চাগ্নি অর্থাৎ পঞ্চপ্রকার অগ্নির ণ সেবক গৃহস্থগণ এবং যাঁহারা তিনবার করিয়া নাচিকেতসংজ্ঞক অগ্নির চয়ন করিয়াছেন, সেই ত্রিণাচিকেতগণও[বলিয়া থাকেন] ॥ ৫৫ ॥ ১ ॥
অভয়ং তিতীর্ষতাং পারং নাচিকেতং শকেমহি ॥৫৬॥২
[ইদানীমপি অগ্নিবিদ্যা ব্রহ্মবিদ্যা চ নাত্যন্তং দুর্লভা, ইত্যাহ]—যঃ সেতুরিতি। ঈজানানাং(যজনশীলানাং কর্ম্মিণাং) যঃ(নাচিকেতঃ অগ্নিঃ) সেতুঃ(দুঃখোত্তর- ণার্থত্বাৎ সেতুরিব),[তং] নাচিকেতং(অগ্নিং) শকেমহি(চেতুং জ্ঞাতুং চ
শক্রুমঃ)[বয়মিতি শেষঃ]। অভয়ং(ভয়রহিতং) পারং[সংসারার্ণবস্যেতি শেষঃ] তিতীর্যতাং(তর্ত্তমিচ্ছতাং জ্ঞানিনাং)[আশ্রয়ভূতং] যৎ অক্ষরং(অবিকারি) পরং ব্রহ্ম;[তদপি জ্ঞাতুং শকেমহি]।[কৰ্ম্ম-জ্ঞানগম্যে পরাপরে ব্রহ্মণী জ্ঞাতব্যে ইত্যাশয়:]
এখনও যে, অগ্নিবিদ্যা ও ব্রহ্মবিদ্যা নিতান্ত দুর্লভ নহে, এই মন্ত্রে তাহাই প্রদর্শিত হইতেছে,—ঈজান অর্থাৎ যজ্ঞকারিগণের যাহা দুঃখ-পারের উপায়ীভূত সেতুস্বরূপ,[আমরা] সেই নাচিকেত অগ্নিকে জানিতে ও চয়ন করিতে সমর্থ। আর[সংসার-সাগরের] অভয় পার পাইতে ইচ্ছুক জ্ঞানিগণের পরম আশ্রয়স্বরূপ যে, অক্ষর(নিব্বিকার) পরব্রহ্ম,[তাহাকেও আমরা জানিতে সমর্থ]। অভিপ্রায় এই যে, কর্ম্ম দ্বারা অপর ব্রহ্মকে এবং জ্ঞানের দ্বারা পরব্রহ্মকে অবগত হওয়া আবশ্যক ॥৫৬৷৷২॥]
যঃ সেতুঃ সেতুরিব সেতুঃ, ঈজানানাং যজমানানাং কর্ম্মিণাং দুঃখসন্তরণার্থত্বাৎ, নাচিকেতং নাচিকেতোহগ্নিঃ তং, বয়ং জ্ঞাতুং চেতুঞ্চ শকেমহি শত্রুবন্তঃ। কিঞ্চ, যচ্চ অভয়ং ভয়শূন্যং সংসারস্য পারং তিতীর্ষতাং তর্ত্তমিচ্ছতাং ব্রহ্মবিদাং যৎ পরম্ আশ্রয়ম্ অক্ষরম্ আত্মাখ্যং ব্রহ্ম, তচ্চ জ্ঞাতুং শকেমহি শত্রুবন্তঃ। পরাপরে ব্রহ্মণী কর্ম্মি-ব্রহ্মবিদাশ্রয়ে বেদিতব্যে ইতি বাক্যার্থঃ। এতয়োরেব হ্যপন্যাসঃ কৃতঃ “ঋতং পিবন্তৌ” ইতি ॥৫৬৷৷২৷৷
ঈজান অর্থাৎ যজ্ঞশীল কর্ম্মিগণের সেতু(বাঁধ), অর্থাৎ দুঃখসাগর পার হইবার উপায় বলিয়া সেতু সদৃশ যে নাচিকেত অগ্নি, তাঁহাকে অমরা জানিতে এবং চয়ন করিতে সমর্থ হই। অপিচ, অভয় অর্থাৎ ভয়-শূন্য, সংসার-সাগরের পার সমুত্তরণাভিলাষী ব্রহ্মবিদ্গণের পরম আশ্রয়স্বরূপ পরমাত্ম-নামক যে পরব্রহ্ম, তাঁহাকেও জানিতে সমর্থ হই। এই বাক্যের অভিপ্রায় এই যে, কর্মী ও ব্রহ্মবিদ্গণের আশ্রয় বা অবলম্বনীয় পর ও অপর ব্রহ্মকে জানা আবশ্যক। পূর্ব্বে ‘ঋতং পিবন্তৌ’ বলিয়া এই পরাপর ব্রহ্মেরই উল্লেখ করা হইয়াছে ॥ ৫৬ ॥২॥
[ বিদ্যাবিদ্যাবশাৎ সংসার-মোক্ষলাভসাধনং শরীরং রথরূপক-কল্পনয়া আহ— ‘আত্মানম্’ ইত্যাদিশ্লোকদ্বয়েন] আত্মানমিতি। আত্মানং(শরীরাধিষ্ঠাতারং জীবং) রথিনং(রথস্বামিনং)[এব] বিদ্ধি(জানীহি)। শরীরং(জীবদেহং) তু(পুনঃ) রথং ( ইন্দ্রিয়াশ্ব-পরিচালিতত্বাৎ রথস্থানীয়ং) এব[বিদ্ধি]। বুদ্ধিং(নিশ্চয়াত্মকম্ অন্তঃকরণং) তু সারথিং(শরীর-রথচালকং) বিদ্ধি। মনঃ(সংকল্প-বিকল্পস্বভাবম্ অন্তঃকরণং) চ(অপি) প্রগ্রহং(ইন্দ্রিয়াশ্বসংযমনরজ্জুং)[বিদ্ধি]॥
[ যাহা দ্বারা বিদ্যাফলে মোক্ষ ও অবিদ্যাবশে সংসার লাভ হয়, সেই শরীরকে রথরূপে কল্পনা করিয়া দুই শ্লোকে বর্ণনা করিতেছেন,]—শরীরাধিষ্ঠাতা আত্মাকে (জীবকে) রথী(রথের মালিক) বলিয়া জানিবে; জীবাধিষ্ঠিত শরীরকে রথ বলিয়া—বুদ্ধিকে সারথি বলিয়া এবং মনকে প্রগ্রহ(লাগাম) বলিয়া জানিবে ॥৫৭৷৩॥]
তত্র য উপাধিকৃতঃ সংসারী বিদ্যাবিদ্যয়োরধিক্বতো মোক্ষগমনায় সংসারগমনায় চ, তস্য তদুভয়গমনে সাধনো রথঃ কল্প্যতে। তত্র আত্মানম্ ঋতপং সংসারিণং রথিনং রথস্বামিনং বিদ্ধি বিজানীহি। শরীরং রথম্ এব তু রথবদ্ধ-হয়স্থানীয়ৈঃ ইন্দ্রিয়ৈঃ ‘আক্বষ্যমাণত্বাৎ শরীরস্য। বুদ্ধিং তু অধ্যবসায়লক্ষণাং সারথিং বিদ্ধি, বুদ্ধিনেতৃপ্রধান- দ্বাৎ শরীরস্য; সারথিনেতৃপ্রধান ইব রথঃ। সর্ব্বং হি দেহগতং কার্য্যং বুদ্ধিকর্তব্য- মেব প্রায়েণ। মনঃ সঙ্কল্পবিকল্পাদিলক্ষণং প্রগ্রহমেব চ রশনাং বিদ্ধি। মনসা হি প্রগৃহীতানি শ্রোত্রাদীনি করণানি প্রবর্তন্তে, রশনয়ের অশ্বাঃ ॥৫৭৷৷৩৷৷
পূর্ব্বোক্ত উভয়ের মধ্যে যিনি উপাধিকৃত সংসার লাভ করিয়া বিদ্যা ও অবিদ্যার বশে মোক্ষ ও সংসারলাভে অধিকারী হন, তাঁহার সেই উভয় স্থানে গমনোপযোগী রথের কল্পনা করা হইতেছে,— পূর্ব্বোক্ত ঋতপানকারী সংসারী আত্মাকে রথী অর্থাৎ রথস্বামী বলিয়া জানিও; রথ-সংযোজিত অশ্বের ন্যায় ইন্দ্রিয়গণকর্তৃক আকৃষ্ট বা পরি-
চালিত হয় বলিয়া শরীরকে নিশ্চয়ই রথ[বলিয়া জানিও]। রথ- পরিচালকের মধ্যে যেমন সারথিই প্রধান, তেমন শরীর-পরিচালকের মধ্যে বুদ্ধিই প্রধান; কেন না, দেহগত যত প্রকার কার্য্য আছে, তন্মধ্যে অধিকাংশই বুদ্ধিনিষ্পাদ্য; এই কারণে অধ্যবসায় বা নিশ্চয়স্বভাব বুদ্ধিকে সারথি[বলিয়া] জানিও এবং শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়-নিচয় মনের দ্বারা পরিচালিত হইয়াই[স্ব স্ব বিষয়ে] প্রবৃত্ত হয়; এই কারণে সংকল্প-বিকল্প স্বভাব(সংশয়াত্মক) মনকে প্রগ্রহ অর্থাৎ রশনা (লাগাম)[বলিয়া] নিশ্চয়[জানিও] ॥ ৫৭ ॥৩॥
মনীষিণঃ(প্রাজ্ঞাঃ) ইন্দ্রিয়াণি(শ্রোত্রাদীনি) হয়ান্(শরীর-রথবাহান্ অশ্বান্) আহুঃ; বিষয়ান্(শব্দাদীন্) তেষু(তেষাং ইন্দ্রিয়াশ্বানাং) গোচরান্(বিষয়ভূতান্ সঞ্চরণদেশান্)[আহুরিত্যর্থঃ] আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তং(শরীরেন্দ্রিয়-মনোভিঃ সমন্বিতং) [আত্মানঞ্চ] ভোক্তা(সুখদুঃখানুভবকর্তা) ইতি আহুঃ[মনীষিণঃ ইতি শেষঃ] ॥
মনীষিগণ শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয় সমূহকে হয় অর্থাৎ শরীররূপ রথের চালক অশ্ব বলিয়া থাকেন; শব্দাদি বিষয় সমূহকে সেই ইন্দ্রিয়াশ্বগণের গোচর অর্থাৎ বিচরণস্থান বলিয়া থাকেন, এবং শরীর, ইন্দ্রিয় ও মনোযুক্ত আত্মাকে[সুখ- দুঃখাদির] ভোক্তা বা অনুভবিতা বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন ॥ ৫৮ ॥ ৪ ॥
ইন্দ্রিয়াণি চক্ষুরাদীনি হয়ানাহুঃ রথকল্পনাকুশলাঃ, শরীররথাকর্ষণসামান্যাৎ। তেঘেব ইন্দ্রিয়েষু হয়ত্বেন পরিকল্পিতেষু গোচরান্ মার্গান্ রূপাদীন্ বিষয়ান্ বিদ্ধি। আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তং শরীরেন্দ্রিয়মনোভিঃ সহিতং সংযুক্তমাত্মানং ভোক্তেতি সংসারীত্যাহুঃ মনীষিণো বিবেকিনঃ। ন হি কেবলস্যাত্মনো ভোক্ত ত্বমস্তি, বুদ্ধ্যাদ্যপাধিকৃতমেব তস্য ভোক্ত ত্বম্। তথা চ শ্রুত্যন্তরং কেবলস্যাভোক্তত্বমেব দর্শয়তি,-“ধ্যায়তীব লেলায়তীব” ইত্যাদি। এবঞ্চ সতি বক্ষ্যমাণ-রথ-কল্পনয়া বৈষ্ণবস্য পদস্য আত্মতয়া প্রতিপত্তিরুপপদ্যতে, নান্যথা, স্বভাবানতিক্রমাৎ ॥৫৮৷৷৪৷৷
ভাষ্যানুবাদ।
রথ-কল্পনায় কুশল পণ্ডিতগণ শরীররূপ রথের আকর্ষণ-সাদৃশ্য থাকায় চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণকে অশ্ব বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন। রূপাদি বিষয়সমূহকে অশ্বরূপে পরিকল্পিত ইন্দ্রিয়গণের গোচর অর্থাৎ বিচরণ-পথ বলিয়া জানিও; মনীষী অর্থাৎ বিবেকিগণ শরীর, ইন্দ্রিয় ও মনঃসমন্বিত আত্মাকে ভোক্তা—সংসারী বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। কেন না, বুদ্ধিপ্রভৃতি উপাধি-সহযোগেই আত্মার ভোক্তৃত্ব উপস্থিত হইয়া থাকে, কেবল অর্থাৎ উপাধিরহিত আত্মার কখনই ভোক্তৃত্ব নাই।[আত্মা] যেন ধ্যানই করে এবং যেন গমনাগমনই করে, ইত্যাদি অপর শ্রুতিও উপাধিরহিত—কেবল আত্মার অভোক্তত্বই প্রদর্শন করিতেছেন। এইরূপ হইলেই বক্ষ্যমাণ (পরে যাহা বলা হইবে, সেই) রথ-কল্পনা দ্বারা যে বিষ্ণুপদকে আত্ম- স্বরূপে লাভ, তাহাও সঙ্গত হইতে পারে; নচেৎ স্বভাব যখন বিনষ্ট হয় না,[তখন সংসারীর পক্ষে আত্মস্বরূপে বৈষ্ণব-পদ- প্রাপ্তি কখনই সঙ্গত হইতে পারে না; অর্থাৎ সংসারী কখনই অসংসারীকে অভিন্ন বলিয়া গ্রহণ করিতে পারে না; কারণ, সংসারী আত্মার ভোক্তৃত্বাদি স্বভাব কখনই বিনষ্ট হয় না ॥ ৫৮ ॥ ৪ ॥
যস্তু বিজ্ঞানবান্ ভবত্যযুক্তেন মনসা সদা।
তস্যেন্দ্রিয়াণবশ্যানি দুষ্টাশ্বা ইব সারথেঃ ॥৫৯॥৫
[ ইদানীং বুদ্ধ্যাদীনামসংযমে দোষমাহ—য ইত্যাদিনা]—যঃ(বুদ্ধিরূপ- সারথিঃ) তু(পুনঃ) অযুক্তেন(অনিগৃহীতেন) মনসা[যুক্তঃ সন্] সদা অবিজ্ঞান- বান্(প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি-বিষয়ে বিবেকহীনঃ) ভবতি, সারথেঃ দুষ্টাশ্বা ইব তস্য(বুদ্ধি- সারথেঃ) ইন্দ্রিয়াণি(চক্ষুরাদীনি) অবশ্যানি(উন্মার্গগামীনি)[ভবন্তি]॥
কিন্তু, যে বুদ্ধিরূপ সারথি সর্ব্বদা অসংশত মনের সহিত সম্বদ্ধ, অপর সারথির দুষ্ট অশ্বের ন্যায় তাহার ইন্দ্রিয়গণও বশীভূত থাকে না, অর্থাৎ(বিপথগামী হয়) ॥৫৯৷৷৫॥]
তত্রৈবং সতি যস্তু বুদ্ধ্যাখ্যঃ সারথিঃ অবিজ্ঞানবান্ অনিপুণোহবিবেকী প্রবৃত্তৌ চ নিবৃত্তৌ চ ভবতি। যথেতরো রথচর্য্যায়াম্, অযুক্তেন অপ্রগৃহীতেন অসমাহিতেন মনসা প্রগ্রহস্থানীয়েন সদা যুক্তো ভবতি, তস্য অকুশলস্য বুদ্ধিসারথেঃ ইন্দ্রিয়াণি অশ্বস্থানীয়ানি অবশ্যানি অশক্যনিবারণানি দুষ্টাশ্বা অদান্তাশ্বা ইব ইতরসারথে- র্ভবন্তি ॥ ৫৯৷৫৷৷
এই অবস্থায় কিন্তু যে বুদ্ধিনামক সারথি রথ-চালননিযুক্ত অপরাপর সারথির ন্যায় অবিজ্ঞানবান্—নৈপুণ্যরহিত, অর্থাৎ প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির বিষয় অবধারণে বিবেকবিহীন হয়;[এবং] অযুক্ত অর্থাৎ অসংযত বা একাগ্রতাহীন[ইন্দ্রিয়াশ্বের] প্রগ্রহস্থানীয় মনের সহিত সর্বদা সংযুক্ত থাকে; লোকপ্রসিদ্ধ সারথির দুষ্ট বা অশিক্ষিত অশ্বের ন্যায় সেই কৌশলহীন বুদ্ধি-সারথির অশ্বস্থানীয় ইন্দ্রিয়গণ বশবর্তী বা শক্তির আয়ত্ত থাকে না, অর্থাৎ নিবারণের অযোগ্য হইয়া পড়ে ॥ ৫৯ ॥ ৫ ॥
[ ইদানীং সংযম-ফলমাহ—যস্তু ইত্যাদিনা]—যঃ(বুদ্ধিসারথিঃ) তু(তু শব্দঃ পূর্ব্বপক্ষাৎ বিশেষজ্ঞাপনার্থঃ)। সদা যুক্তেন(নিগৃহীতেন) মনসা বিজ্ঞানবান্ (হেয়োপাদেয়-বিবেকবান্) ভবতি, তস্য ইন্দ্রিয়াণি সারথেঃ সদশ্বা(শিক্ষিতা অশ্বাঃ) ইব বশ্যানি[ভবন্তি]॥
[ এখন ইন্দ্রিয় সংযমের গুণ বলিতেছেন]—কিন্তু, যিনি সর্ব্বদা সংযতমনে বিজ্ঞানবান্ হন, অর্থাৎ কোন্টি ত্যাজ্য আর কোনটি গ্রাহ্য, ইহার প্রভেদ বুঝেন, সারথির সদশ্ব অর্থাৎ শিক্ষিত অশ্বগণের ন্যায় তাঁহার ইন্দ্রিয়গণ বশবর্তী থাকে ॥৬০৷৷৬৷৷]
[ যস্তু পুনঃ পূর্ব্বোক্তবিপরীত-সারথির্ভবতি তস্য ফলমাহ]—যস্তু বিজ্ঞানবান্
নিপুণঃ বিবেকবান্ যুক্তেন মনসা প্রগৃহীতমনাঃ সমাহিতচিত্তঃ সদা, তস্য অশ্বস্থানীয়ানি ইন্দ্রিয়াণি প্রবর্ত্তয়িতুং নিবর্ত্তয়িতুং বা শক্যানি বশ্যানি দান্তাঃ সদশ্বা ইবেতরসারথেঃ ॥৬০৷৷৬৷৷
[কিন্তু যিনি পূর্ব্বোক্ত বিপরীতভাবাপন্ন সারথি তাঁহার ফল বলিতেছেন]—কিন্তু যিনি যুক্ত অর্থাৎ সংযত মনের সাহায্যে বিজ্ঞান- বান্—হেয়োপাদেয় বিবেকসম্পন্ন হন। অর্থাৎ যিনি সদা সংযতমনা ও সমাহিতচিত্ত থাকেন; অপর সারথির সৎ(শিক্ষিত) অশ্বগণের ন্যায় তাহার অশ্বস্থানীয় ইন্দ্রিয়গণ বশ্য হয়। অর্থাৎ[ইচ্ছামত] নিবৃত্তি বা প্রবৃত্তি বিষয়ে যথেচ্ছরূপে পরিচালন যোগ্য হয় ॥ ৬০৷৷৬৷৷
যস্ত্ববিজ্ঞানবান্ ভবত্যমনস্কঃ সদাশুচিঃ। ন স তৎপদমাপ্নোতি সংসারং চাধিগচ্ছতি ॥৬১॥৭॥
[ইদানীং সংযমাভাবস্য দোষমাহ যস্তিত্যাদিনা মন্ত্রদ্বয়েন]—যঃ(বুদ্ধিসারথি:) তু(পুনঃ) অবিজ্ঞানবান্(বিবেকহীনঃ) অমনস্কঃ(অবশীকৃতমনাঃ, অসমা- হিতমনা বা)।[অতএব] সদা অশুচিঃ(মলিনান্তঃকরণঃ) ভবতি। সঃ তৎ(“সর্ব্বে বেদা যৎ” ‘ইত্যুক্তলক্ষণং) পদং(ব্রহ্মস্বরূপং) ন আপ্নোতি, সংসারং জন্ম-মরণরূপম্ অধিগচ্ছতি চ ॥
এখন সংযমাভাবের দোষ বলিতেছেন,—আবার যে সারথি পূর্ব্বোক্ত বিবেক- হীন অসংযত-মনা এবং তজ্জন্য ফলে সর্ব্বদা অশুচি(অবিশুদ্ধচিত্ত)[সেই সারথি দ্বারা] রথী সেই পদ(ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হয় না, পরন্তু সংসার লাভ করে ॥৬১॥৭॥]
তত্র পূর্ব্বোক্তস্য অবিজ্ঞানবতো বুদ্ধিসারথেরিদং ফলমাহ; যস্তু অবিজ্ঞানবান্ ভবতি, অমনস্কঃ অপ্রগৃহীতমনস্কঃ, সঃ তত এব অশুচিঃ সদৈব। ন সঃ রথী তৎ পূর্ব্বোক্তমক্ষরং যৎ পরং পদম্ আপ্নোতি তেন সারথিনা। ন কেবলং তৎ নাগ্নোতি—সংসারঞ্চ জন্মমরণলক্ষণম্ অধিগচ্ছতি ॥৬১॥৭॥
তন্মধ্যে এখন পূর্ব্বোক্ত অবিজ্ঞানবান্ বুদ্ধি-সারথির ফল কথিত হইতেছে,—যিনি অবিজ্ঞানবান্ বা পূর্ব্বোক্ত বিজ্ঞানহীন, অসংযতমনা এবং সেই কারণেই সর্বদা অশুচি(অশুদ্ধান্তঃকরণ), সেই রথী সেই সারথি দ্বারা(বুদ্ধি দ্বারা) সেই পূর্ব্বকথিত ‘অক্ষর’-সংজ্ঞক পরম পদ(ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হন না। কেবল যে, সেই পদই প্রাপ্ত হন না, তাহা নহে—[অধিকন্তু] জন্ম-মরণাদিরূপ সংসারকেও প্রাপ্ত হন* ॥৬১॥৭
যস্তু বিজ্ঞানবান্ ভবতি সমনস্কঃ সদা শুচিঃ।
স তু তৎ পদমাধোতি যস্মাদভূয়ো ন জায়তে ॥৬২॥৮॥
যঃ(রথী) তু(পুনঃ) বিজ্ঞানবান্(বিবেকবদ্বুদ্ধিরূপসারথিযুক্তঃ), সমনস্কঃ (বশীকৃতমনস্কঃ),[তত এব] সদা শুচিশ্চ ভবতি যস্মাৎ(প্রাপ্তাৎ পদাৎ ব্রহ্মরূপাৎ) [ভ্রষ্টঃ সন্] ভূয়ঃ(পুনরপি, সংসারে) ন জায়তে, সঃ তু তৎপদম্ আপ্নোতি(লভতে) ॥ পক্ষান্তরে, যে রথী বিজ্ঞান-সম্পন্ন ‘বুদ্ধিসারথিসমন্বিত, সংযতমনাঃ এবং সর্ব্বদা শুচি(বিশুদ্ধান্তঃকরণ), সেই রথীই সেই পদ প্রাপ্ত হন—যে পদ হইতে চ্যুত হইয়া আর পুনর্ব্বার জন্ম ধারণ করিতে না হয় ॥৬২৷৷৮৷৷
বস্তু দ্বিতীয়ো বিজ্ঞানবান্ ভবতি বিজ্ঞানবৎসারথ্যুপেতো রথী, বিদ্বানিত্যেতৎ। যুক্তমনাঃ সমনস্কঃ, সঃ তত এব সদা শুচিঃ; সতু তৎপদমাপ্নোতি। যম্মাদাপ্তাৎ পদাৎ অপ্রচ্যুতঃ সন্ ভূয়ঃ পুনঃ ন জায়তে সংসাবে!! ৬২৷৷৮ ॥
কিন্তু দ্বিতীয়(অপর) যে রথী বিজ্ঞানসম্পন্ন সারথিযুক্ত অর্থাৎ
১৩
বিদ্বান, সমনস্ক অর্থাৎ সমাহিতচিত্ত এবং সেই কারণে সর্বদাই শুচি থাকেন; তিনি কিন্তু সেই পদ প্রাপ্ত হন—যে প্রাপ্ত পদ হইতে বিচ্যুত হইয়া পুনর্ব্বার আর সংসারে জন্মিতে না হয় ॥৬২৷৮॥
বিজ্ঞানসারথির্য্যস্তু মনঃপ্রগ্রহবান্ নরঃ।
সোহধ্বনঃ পারমাপ্নোতি—তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদম্ ॥৬৩॥৯॥
[ অথ পূর্ব্বোক্তং পদং প্রদর্শয়ন্ তৎপ্রাপকমপ্যাহ!—বিজ্ঞানেতি। যঃ নরঃ বিজ্ঞানসারথিঃ(বিবেকসম্পন্না বুদ্ধিঃ সারথিঃ যস্য, সঃ তথোক্তঃ) মনঃপ্রগ্রহবান্ (মনএব প্রগ্রহঃ ইন্দ্রিয়াশ্বসংযমনরজ্জুঃ যস্য, সঃ তথোত্তঃ, সমাহিতমনা ইত্যর্থঃ)। [ চ ভবতি]। সঃ অধ্বনঃ(সংসারগতেঃ) পারং(অবসানং) বিষ্ণোঃ(ব্যাপকস্য ব্রহ্মণঃ) তৎ(প্রসিদ্ধং) পরমং পদং(স্থানং, ব্রহ্মত্বমিত্যর্থঃ),[অত্র ‘রাহোঃ শিরঃ’ ইত্যাদিবৎ অভেদে ষষ্ঠী] আপ্নোতি[সংসারাৎ মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ]॥
এখন পূর্ব্বোক্ত ‘পদ’ বস্তু নির্দেশপূর্ব্বক তৎপ্রাপক ব্যক্তির নির্দেশ করিতে- ছেন,—বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধি যাহার সারথি, এবং মন যাহার ইন্দ্রিয়রূপ-অশ্ব- সংযমনের রজ্জু, তিনি সংসার-গতির পরিসমাপ্তিরূপ সর্ব্বব্যাপী বিষ্ণুর সেই প্রসিদ্ধ পদ প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ বিষ্ণুস্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া সংসার হইতে বিমুক্ত হন ॥৬৩৷৷৯৷৷
কিং তৎপদম্ ইত্যাহ,-বিজ্ঞানসারথির্যস্ত যো বিবেকবুদ্ধিসারথিঃ পূর্ব্বোক্তঃ মনঃ-প্রগ্রহবান্ প্রগৃহীতমনাঃ সমাহিতচিত্তঃ সন্ শুচিনরো বিদ্বান্; সঃ অধ্বনঃ সংসারগতেঃ পারং পরমেব অধিগন্তব্যমিত্যেতৎ, আপ্নোতি মুচ্যতে সর্ব্ব-সংসার- বন্ধনৈঃ। তৎ বিষ্ণোঃ ব্যাপনশীলস্য ব্রহ্মণঃ পরমাত্মনো বাসুদেবাখ্যস্য পরমং প্রকৃষ্টং পদং স্থানং সতত্ত্বমিত্যেতৎ। যৎ অসৌ আপ্নোতি বিদ্বান্ ॥৬:৷৯ ॥
সেই পদ কি? তাহা বলিতেছেন,—কিন্তু যে বিদ্বান্ নর, অর্থাৎ বিজ্ঞান-সারথি, বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধি যাহার সারথি, এবস্তৃত এবং পূর্ব্বোক্ত মনোরূপ প্রগ্রহসম্পন্ন অর্থাৎ বশীকৃতমনা—সমাহিতচিত্ত ও শুচি হন, তিনি অধ্বের(পথের) অর্থাৎ সংসারগতির পরপার—যাহা অবশ্য
প্রাপ্তব্য, তাহা প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ সমস্ত সংসার বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন। বিষ্ণুর অর্থাৎ ব্যাপনস্বভাব(সর্বব্যাপী) ব্রহ্মস্বরূপ বাসুদেব- সংজ্ঞক পরমাত্মার যাহা পরম অর্থাৎ উৎকৃষ্ট পদ—স্থান(সতত্ত্ব), এই বিদ্বান্ ব্যক্তি তাহা প্রাপ্ত হন ॥৬৩৷৯॥
[ইদানীং পরমাত্মাখ্য-তৎপদস্য প্রত্যগাত্মতয়া অধিগমার্থম্ ইন্দ্রিয়াদিভ্যঃ তদ্বিবেকপ্রকার উচ্যতে] - ইন্দ্রিয়েভ্য ইতি। ইন্দ্রিয়েভ্যঃ(শ্রোত্র-ত্বক্-চক্ষু-রসন- ঘ্রাণ পাদ-পায়ুপস্থেভ্যঃ) অর্থাঃ(শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধাখ্যাঃ বিষয়াঃ স্থূলাঃ সূক্ষ্মাশ্চ) পরাঃ[স্থূলাঃ শব্দাদয় ইন্দ্রিয়াকর্ষকত্বাৎ, সূক্ষ্মাশ্চ তন্মাত্রাত্মকা ইন্দ্রিয়াণাং কারণত্বাৎ পরাঃ, ইত্যভিপ্রায়ঃ]। অর্থেভ্যঃ(শব্দাদিভ্যঃ) চ(অপি) মনঃ (সংকল্প-বিকল্পাত্মকম্ অন্তঃকরণং) পরম্।[বিষয়েন্দ্রিয়-ব্যবহারস্য মনোহধীন- ত্বাদিত্যভিপ্রায়ঃ]। মনসঃ(সংশয়াত্মকাঁৎ) তু বুদ্ধিঃ(নিশ্চয়াত্মিকা অন্তঃকরণ- বৃত্তিঃ) তু(পুনঃ) পরা।[বিষয়ভোগস্য নিশ্চয়পূর্ব্বকত্বাৎ]। বুদ্ধেঃ[অপি] মহান্(দেহেন্দ্রিয়ান্তঃকরণস্বামী) আত্মা(জীবঃ) পরঃ।[বুদ্ধিব্যাপারস্যাপি আত্মার্থত্বাদিত্যাশয়ঃ] ॥
[ এখন, পূর্ব্বোক্ত পরমাত্ম-রূপ ‘পদকে’ জীবাভিন্নরূপে পাইতে হইবে; এই কারণ ইন্দ্রিয় হইতে পৃথক্ করিয়া আত্মার উপদেশ দিতেছেন,]—শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় অপেক্ষা অর্থ(স্থূল ও সূক্ষ্ম শব্দাদি বিষয়সমূহ শ্রেষ্ঠ; তন্মধ্যে স্থূল শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের আকর্ষক বলিয়া, আর সূক্ষ্ম শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের কারণ বা উৎপাদক বলিয়া শ্রেষ্ঠ। কারণ, ইন্দ্রিয়ের প্রয়োগ মনের অধীন। মন অপেক্ষা বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ; কারণ, বিষয়- ভোগ কার্য্যাট বুদ্ধিকৃত নিশ্চয়েরই অধীন। মহান্ ইন্দ্রিয়াদির অধীশ্বর আত্মা(জীব) বুদ্ধি অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ; কারণ, আত্মার জন্যই বুদ্ধির চেষ্টা হইয়া থাকে ॥৬৪৷১০৷
অধুনা যৎপদং গন্তব্যম, তস্যেন্দ্রিয়াণি স্থূলানি আরভ্য সূক্ষ্মতারতম্যক্রমেণ প্রত্যগাত্মতয়াহধিগমঃ কর্ত্তব্যঃ, ইত্যেবমর্থমিদমারভ্যতে। স্থূলানি তাবদিন্দ্রিয়াণি,
তানি যৈঃ অর্থৈরাত্মপ্রকাশনায় আরন্ধানি, তেভ্য ইন্দ্রিয়েভ্যঃ স্বকার্য্যেভ্যঃ তে পরা হি অর্থাঃ সূক্ষ্মা মহান্তশ্চ প্রত্যগাত্মভূতাশ্চ। তেভ্যো হ্যর্থেভ্যশ্চ পরং সূক্ষ্মতরং মহৎ প্রত্যগাত্মভূতঞ্চ মনঃ। মনঃশব্দবাচ্যং মনস আরম্ভকং ভূতসূক্ষ্মম্। সঙ্কল্পবিকল্পাদ্যা- রম্ভকত্বাৎ। মনসোহপি পরা সূক্ষ্মতরা মহত্তরা প্রত্যগাত্মভূতা চ বুদ্ধিঃ। বুদ্ধিশব্দ- বাচ্যমধ্যবসায়াদ্যারম্ভকং ভূতসূক্ষ্মম্। বুদ্ধেরাত্মা সর্ব্বপ্রাণিবুদ্ধীনাং প্রত্যগাত্ম- ভূতত্বাদাত্মা মহান্ সর্ব্বমহত্ত্বাৎ অব্যক্তাৎ যৎ প্রথমং জাতং হৈরণ্যগর্ভং তত্ত্বং বোধা- বোধাত্মকং, মহানাত্মা বুদ্ধেঃ পর ইত্যুচ্যতে ॥৬৪৷১০৷৷
[ পূর্ব্বে যে পদকে ‘প্রাপ্তব্য’ বলিয়া নির্দেশ ‘করা হইয়াছে,]- সেই পদকেই প্রত্যগাত্মা জীবরূপে অধিগত হইতে হইবে; তাহাও আবার স্থূল ইন্দ্রিয় হইতে আরম্ভ করিয়া উত্তরোত্তর সূক্ষমত্বের তারতম্য ক্রমে(সূক্ষম, সূক্ষমতর সূক্ষমতম ইত্যাদি রূপে) প্রত্য- গাত্ম-বিষয়ক বিবেক জ্ঞান সাপেক্ষ। এখন সেই বিবেক প্রদর্শনার্থ [ এই শ্লোক] আরব্ধ হইতেছে,-ইন্দ্রিয় সমূহ[স্বভাবতই অর্থ অপেক্ষা] স্থূল; যে শব্দাদি-অর্থসমূহ[ইন্দ্রিয় সংযোগে] আপনা- দিগকে প্রকাশিত বা জ্ঞানগম্য করিবার জন্য সেই ইন্দ্রিয়গণকে উৎপাদন করিয়াছে, সেই অর্থসমূহ স্বোৎপাদিত ইন্দ্রিয় সমুদয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; অর্থাৎ সূক্ষম, মহৎ(ব্যাপক) এবং প্রত্যগাত্ম- স্বরূপ। সেই অর্থ অপেক্ষাও মনঃ পর-সূক্ষমতর, মহৎ ও প্রত্যগাত্ম-স্বরূপ। এখানে ‘মনঃ’শব্দে মনের উৎপাদক ভূত- সূক্ষম(তন্মাত্র) বুঝিতে হইবে। বুদ্ধিই সংকল্প-বিকল্পাদির আরম্ভক বা প্রবর্তক; এই কারণে মন অপেক্ষাও বুদ্ধি পরা; অর্থাৎ তদপেক্ষা সূক্ষমতর, অতিশয় মহৎ এবং প্রত্যগাত্মস্বরূপ। ‘বুদ্ধি’ শব্দেও অধ্যবসায় প্রভৃতি বুদ্ধি ধর্ম্মের উৎপাদক সূক্ষমভূত বুঝিতে হইবে। সমস্ত প্রাণি-বুদ্ধির আত্মস্বরূপ বলিয়া আত্মা, এবং সর্বাপেক্ষা মহৎ বলিয়া মহান্-অব্যক্ত(প্রকৃতি) হইতে প্রথম-
জাত যে, বোধাবোধ স্বরূপ হিরণ্য-গর্ভতত্ত্ব; সেই মহান্ আত্মা বুদ্ধি অপেক্ষাও পর বলিয়া কথিত হন(৩) ॥৬৪৷১০৷৷
মহতঃ পরমব্যক্তমব্যক্তাৎ পুরুষঃ পরঃ। পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ, সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ ॥৬৫৷৷১১৷৷
[পুনরপ্যাৎ—] মহতঃ(পূর্ব্বোক্তাৎ হিরণ্যগর্ভতত্ত্বাৎ) অব্যক্তং(সর্ব্বজগদ্- বীজভূতং প্রধানং) পরম্। অব্যক্তাৎ(প্রকৃতেঃ) পুরুষঃ(পূর্ণঃ পরমাত্মা) পরঃ।
(৩) তাৎপর্য্য-সাধারণতঃ প্রাকৃতবুদ্ধি-সম্পন্ন জনসমাজ দেহকে আত্মা বলিয়া মনে না করিলেও নিজনিজ বোধানুসারে ইন্দ্রিয় প্রভৃতি সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর ও সূক্ষ্মতম পদার্থে আত্মবুদ্ধি স্থাপন করিয়া নিশ্চিন্ত থাকে। প্রকৃত প্রত্যগাত্মা(জীব) পদার্থকে জানে না। অথচ পূর্ব্বোল্লিখিত ‘পরম পদ’ পাইতে হইলে প্রত্যগাত্মার যথার্থ স্বরূপটি জানা একান্ত আবশ্যক। তাই শ্রুতি নিজেই প্রাকৃত-বুদ্ধি লোকের কল্পিত প্রত্যগাত্মা হইতে পৃথক্ করিয়া যথার্থ আত্মতত্ত্ব বুঝাইবার উদ্দেশে ক্রমে সুক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম অনাগ্ন-পদার্থের আপেক্ষিক উৎকর্ষ প্রদর্শন করিতেছেন। প্রথমতঃ অব্যক্তসংজ্ঞক মারা হইতে আকাশাদি পঞ্চভূত উৎপন্ন হইল। এই পঞ্চভূত অবিমিশ্র এবং অতিশয় সূক্ষ্ম, এই কারণে ইহাদিগকে ‘সূক্ষ্মভূত’, ‘তন্মাত্র’,(শব্দ তন্মাত্র, স্পর্শ তন্মাত্র, রূপ তন্মাত্র, রসতন্মাত্র ও গন্ধতন্মাত্র) ও ‘অপঞ্চ, কৃত ভূতনামেও অভিহিত করা হয়। পরে ঐ পঞ্চভূতেরই পরস্পর সংমিশ্রণে যে অবস্থা ঘটে, তাহ’কেই ‘স্কুলভুত’(ব্যবহারিক আকাশাদি) বলা হয়; সেই স্কুলভূত সমূহে আবার তৎকারণ শব্দাদি তন্মাত্র সমূহও স্কুলতাপ্রাপ্ত হইয়া ইন্দ্রিয়- গ্রাহ্য শব্দাদি সংজ্ঞা ধারণ করে; স্কুলই হউক, আর সুক্ষ্মই হউক-জগতে এই পাঁচটির অতিরিক্ত কোন ‘অর্থ’-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নাই। ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণের অভাবে এই সকল অর্থ(শব্দাদি বিষয়) থাকিয়াও প্রকাশ পাইতে পারে না; এই কারণে ঐ পাঁচপ্রকার ‘অর্থ’ হইতে স্ব স্ব গ্রাহক পাঁচটি ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির সৃষ্টি হইল। মহাভারতে মোক্ষধৰ্ম্ম পর্ব্বাধ্যায়ে উক্ত আছে যে, “শব্দরাগাৎ শ্রোত্রমস্য জায়তে ভাবিতাত্মনঃ। রূপরাগাদভূৎ চক্ষুরাণ-গন্ধ-জিঘ্নক্ষয়া।”শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় নিচয় যে, শব্দাদি বিষয় গ্রহণের জন্যই হইয়াছে, তাহা উক্ত বাক্য হইতে স্পষ্টই প্রমাণিত হয়। এই কারণে কারণীভূত অর্থ সমূহ তৎকাৰ্য্য ইন্দ্রিয়গণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, ব্যাপকও বটে, এবং উহাদের আত্মস্বরূপও বটে। ‘পর’ শব্দ এই তিন প্রকার অর্থই ভাষ্যে প্রদর্শিত হইয়াছে। জীবভাব যেমন অবিনশ্বর, ইন্দ্রিয়ের নিকট তৎকারণীভূত বিষয় সমূহও সেইরূপ অবিনশ্বর; এই কারণে আত্মভূত বলা হইয়াছে। ইন্দ্রিয়ের ন্যায় মনও ভূতসূক্ষ্ম হইতে উৎপন্ন; সুতরাং ‘অর্থ’ অপেক্ষা মনের পরত্ব হইতে পারে না; এই কারণে ‘মনঃ’ শব্দে তৎকারণ ‘ভূতসূক্ষ্ম’ অর্থ করা হইয়াস্থে। কেহ কেহ বুদ্ধিকেই ‘আত্মা’ বলিয়া মনে করেন, তাঁহাদের সেই ধারণানিবৃত্তির জন্য বুদ্ধি শব্দের ‘অধ্যবসায়’ সম্পন্ন ভূত-সুক্ষ্ম অর্থ করা হইয়াছে। বিশেষতঃ বুদ্ধিকৃত অধ্যবসায় বা নিশ্চয় না থাকিলে, মনের সংকল্প বিকল্প কোন কার্য্যকর হয় না; এজন্য মন অপেক্ষা বুদ্ধির পরত্ব। হিরণ্যগর্ভের বুদ্ধিই সমস্ত বুদ্ধির সমষ্টি স্বরূপ, অর্থাৎ তাঁহার বুদ্ধি হইতেই জীবগণের ভিন্ন ভিন্ন বুদ্ধি অভিব্যক্ত হয়; সুতরাং তাহা সূক্ষ্মতমও বটে, মহৎও বটে, এবং সর্ব্ববুদ্ধির স্বরূপ- নির্বাহক আত্মস্বরূপও বটে। যে যাহার কারণ, সে তাহা অপেক্ষা সুক্ষ্ম, মহৎ ও তদাত্মভূত হয়; এই মতের উপর নির্ভর করিয়া, এখানে ‘পর’ শব্দে ঐরূপ তিনটি অর্থ গ্রহণ করা হইয়াছে।
পুরুষাৎ(পুরুষাপেক্ষয়া) পরং কিঞ্চিৎ ন[অস্তি]; সা(স পুরুষঃ) কাষ্ঠা(অবধিঃ,) [সূক্ষ্মত্ব-মহত্ত্ব-প্রত্যগাত্মভাবানাং পর্য্যবসানং]।[সেতি বিধেয়াপেক্ষয়া স্ত্রীলিঙ্গোক্তিঃ]। সা পরা গতিঃ(পরং বিশ্রামস্থানম্) ॥
(স পুরুষঃ) সর্ব্বজগতের বীজভূত অব্যক্ত(প্রকৃতি) পূর্ব্বোক্ত মহৎ অপেক্ষা পর, অব্যক্ত হইতেও পুরুষ(পরমাত্মা) পর; কিন্তু পুরুষ অপেক্ষা আর কিছুই পর নাই; তিনিই কাষ্ঠা, অর্থাৎ সূক্ষ্মত্ব, মহত্ত্ব ও আত্মভাবের চরম সীমা, এবং সেই পুরুষই(জীবের) পরা(সর্ব্বোত্তমা) গতি বা গন্তব্যস্থান ॥৬৫৷৷১১৷৷
মহতোহপি পরং সূক্ষ্মতরং প্রত্যগাত্মভূতং সর্ব্বমহত্তরং চ অব্যক্তং সর্ব্বস্থ্য জগতো বীজভূতম্ অব্যাকৃতনাম-রূপং সতত্ত্বং সর্ব্বকার্য্য-কারণ শক্তি-সমাহার-রূপম্ অব্যক্তম্ অব্যাকৃতাকাশাদি-নামবাচ্যং পরমাত্মনি ‘ওতপ্রোতভাবেন সমাশ্রিতং বটকণিকায়ামিব বটবৃক্ষশক্তিঃ। তস্মাৎ অব্যক্তাৎ পরঃ সূক্ষ্মতরঃ সর্ব্বকারণ- কারণত্বাৎ প্রত্যগাত্মত্বাচ্চ, মহাংশ, অতএব পুরুষঃ সর্ব্বপূরণাৎ। ততোহন্যস্য পরস্য প্রসঙ্গং নিবারয়ন্নাহ—পুরুষাৎ ন পরং কিঞ্চিদিতি। যস্মাৎ নাস্তি পুরুষাৎ চিন্মাত্র- ঘনাৎ পরং কিঞ্চিদপি বস্তুন্তরম্; তস্মাৎ সূক্ষ্মত্ব-মহত্ত্ব-প্রত্যগাত্মত্বানাং সা কাষ্ঠা নিষ্ঠা পর্যবসানম্। অত্র হি ইন্দ্রিয়েভ্য আরভ্য সূক্ষ্মত্বাদি পরিসমাপ্তম্। অতএব চ গন্তৃণাং সর্ব্বগতিমতাং সংসারিণাং সা পরা প্রকৃষ্টা গতিঃ। “যদ গত্বা ন নিবর্তন্তে” ইতি স্মতেঃ ॥৬৫৷৷১১৷
সমস্ত জগতের বীজস্বরূপ অনভিব্যক্ত-নাম-রূপাত্মক, সর্বপ্রকার কার্য্য-কারণশক্তির সমষ্টিস্বরূপ, অব্যক্ত, অব্যাকৃত(অস্ফুট) ও আকাশাদি শব্দ-বাচ্য এবং ক্ষুদ্র বটবীজে যেরূপ বটবৃক্ষোৎপাদিকা শক্তি নিহিত থাকে, সেইরূপ পরমাত্মাতে(ব্রহ্মেতে) ওত-প্রোতভাবে (সর্বতোভাবে) আশ্রিত আছে। উক্ত অব্যক্ত(প্রকৃতি) পূর্ব্বোক্ত ‘মহৎ’ অপেক্ষাও পর—সূক্ষ্ম, মহত্তর ও প্রত্যগাত্মস্বরূপ। সমস্ত কারণেরও কারণ এবং প্রত্যগাত্মস্বরূপ, এই নিমিত্ত আত্মা। সেই অব্যক্ত অপেক্ষাও সূক্ষ্মতম ও মহান্ এবং সমস্ত বস্তুর পূরণের কারণ
বলিয়া ‘পুরুষ’ পদবাচ্য। তদ্ভিন্ন অপর ‘পর’ বস্তুর সম্ভাবনা-নিবারণার্থ বলিতেছেন,-পুরুষ অপেক্ষা আর কিছু ‘পর’ নাই। যেহেতু কেবলই চিন্ময় স্বরূপ সেই পুরুষ অপেক্ষা ‘পর’ অন্য কোনও বস্তু নাই; সেই হেতু উহাই সূক্ষমত্ব, মহত্ত্ব ও প্রত্যগাত্মত্ব ধর্ম্মের একমাত্র কাষ্ঠা বা পর্যবসান স্থান। কারণ, ইন্দ্রিয় সমূহ হইতে সূক্ষমত্বাদি পর্যন্ত ধর্ম্মের ইহাঁতেই পরিসমাপ্তি বা শেষ হইয়াছে; এই নিমিত্ত সর্বত্র গমনশীল সংসারিগণের সেই পুরুষই ‘পরা’ অর্থাৎ সর্বোত্তম গতি বা গন্তব্য স্থান। ভগবদগীতারূপ স্মৃতিশাস্ত্রেও উক্ত হইয়াছে যে, ‘[ জীব] যাহা প্রাপ্ত হইলে, আর ফিরিয়া আইসে না;[তাহাই আমার ধাম’] ॥৬৫৷৷১১৷৷
[পরমগতিত্বেন কথিতস্য পুরুষস্য উপলব্ধি প্রকারমাহ]—এষ ইতি। সর্ব্বেযু ভূতেষু(ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তেষু) গূঢ়ঃ(দর্শন-স্পর্শনাদিবিষয়-বিজ্ঞানজনিত-মোহাচ্ছন্নঃ) এষ আত্মা[ভূগর্ভনিহিত-রত্নরাশিবৎ] ন প্রকাশতে(স্বরূপতঃ ন বিভাতি)।[সর্ব্বেযু (পুরুষেষু) ন প্রকাশতে, অপিতু কস্যচিদেব সকাশে প্রকাশতে ইত্যর্থো বা]। [কৈঃ কেন উপায়েন দৃশ্যতে? ইত্যত আহ]—সূক্ষ্মদর্শিভিঃ(সূক্ষ্মত্বাদিবিশ্রাম- স্থানত্বেন যে আত্মানং পশ্যন্তি তৈঃ) অগ্র্যয়া(একাগ্রতা-সম্পন্নয়া) সূক্ষ্ময়া (যোগোপাসনাদি-সংস্কৃতয়া) বুদ্ধ্যা তু(নতু বহিরিন্দ্রিয়ৈঃ)[এষ আত্মা] দৃশ্যতে [যথাযথরূপং গৃহ্যতে]॥
পূর্ব্ব শ্লোকে ‘পরা গতি’ বলিয়া যাহাকে বলা হইয়াছে; এখন তাহার প্রাপ্তির উপায় বলিতেছেন,—ইনি সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে গূঢ়ভাবে নিহিত থাকায় প্রকাশ পান না, অথবা সকলের নিকট প্রকাশ পান না।[কাহার নিকট কি উপায়ে প্রকাশ পান? তাহা বলিতেছেন]—পূর্ব্বকথিত প্রকারে পরম সূক্ষ্মত্বদর্শী পুরুষ একাগ্রতাযুক্ত ও সূক্ষ্ম বা যোগাদিসাধনে পরিশোধিত বুদ্ধি দ্বারা দেখিতে পান, অপর ইন্দ্রিয় দ্বারা নহে ॥৬৬৷৷১২৷৷
ননু গতিশ্চেদাগত্যাপি ভবিতব্যং, কথং ‘যস্মা ভূয়ো ন জায়তে” ইতি? নৈষ দোষঃ। সর্ব্বস্য প্রত্যগাত্মত্বাৎ অবগতিরেব গতিরিত্যুপচর্য্যতে। প্রত্যগাত্মত্বঞ্চ দর্শিতম্ ইন্দ্রিয়-মনোবুদ্ধিপরত্বেন। যো হি গন্তা, সোহয়ম্ অপ্রত্যরূপং পুরুষং গচ্ছতি অনাত্মভূতং, ন বিন্দতি স্বরূপেণ। তথা চ শ্রুতিঃ; -“অনধ্বগা অধ্বসু পারয়িষ্ণবঃ”, ইত্যাদ্যা। তথাচ দর্শয়তি প্রত্যগাত্মত্বং সর্ব্বস্য,-এষ পুরুষঃ সর্ব্বেযু ব্রহ্মাদিস্তম্ব-পর্য্যন্তেষু ভূতেষু গূঢ়ঃ সংবৃতো দর্শনশ্রবণাদিকৰ্ম্মা অবিদ্যা-মায়াচ্ছন্নঃ, অতএব আত্মা ন প্রকাশতে আত্মত্বেন কস্যচিৎ। অহো অতিগম্ভীরা দুরবগাহ্যা বিচিত্রা মায়া চেয়ম্; যদয়ং সর্ব্বো জন্তুঃ পরমার্থতঃ পরমার্থসতত্ত্বোহপ্যেবং বোধ্য মানোহহং পরমাত্মেতি ন গৃহ্লাতি, অনাত্মানং দেহেন্দ্রিয়াদিসঙ্ঘাতম্ আত্মনো দৃশ্যমান- মপি ঘটাদিবদাত্মত্বেন ‘অহমমুষ্য পুত্রঃ’ ইত্যনুচ্যমানোইপি গৃহ্লাতি। নূনং পরস্যৈব মায়য়া মোমুহ্যমানঃ সর্ব্বো লোকোহয়ং বংভ্রমীতি। তথাচ স্মরণম্,-“নাহং প্রকাশঃ সর্বস্থ্য যোগমায়াসমাবৃতঃ” ইত্যাদি।
ননু বিরুদ্ধমিদমুচ্যতে,-“মত্বা ধীরো ন শোচতি,” “ন প্রকাশতে” ইতি চ। নৈতদেবম্। অসংস্কৃতবুদ্ধেরবিজ্ঞেয়ত্বাৎ ন প্রকাশত ইত্যুক্তম্। দৃশ্যতে তু সংস্কৃতয়া অগ্রয়া অগ্রমিবাগ্র্যা তয়া, একাগ্রতয়া উপেতয়া ইত্যেতৎ, সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্মবস্তু- নিরূপণপরয়া। কৈঃ?—সূক্ষ্মদশিভিঃ “ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যর্থা’:’ ইত্যাদিপ্রকারেণ সূক্ষ্মতাপারম্পর্য্যদর্শনেন পরং সূক্ষ্মং দ্রষ্টুং শীলং যেষাং, তে সূক্ষ্মদর্শিনঃ, তৈঃ সূক্ষ্ম- দশিভিঃ পণ্ডিতৈরিত্যেতৎ ॥৬৬৷৷১২৷৷
এখন প্রশ্ন হইতেছে, যদি গতি হয়, তবে আগতি বা প্রত্যাগমন ও অবশ্যই হইবে; তবে ‘যাহা হইতে পুনর্ব্বার আর জন্ম হয় না,’ বলা হয় কিরূপে? না—ইহাতে দোষ হয় না; সর্ব্বভূতের প্রত্যগাত্ম-রূপে যে, অবগতি(জ্ঞান), তাহাকেই এখানে ‘গতি’ বলিয়া উপচার বা গৌণ-প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি অপেক্ষা পরত্ব- নিবন্ধন যে, প্রত্যগাত্মত্ব, তাহা পূর্ব্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে। যে লোক গমন করে, সে অপ্রাপ্ত অপ্রত্যরূপী—অনাত্মভূত পদার্থকেই
প্রাপ্ত হয়, ইহার বিপর্যয় হয় না। অর্থাৎ পূর্ব্বে যাহাকে ‘আত্মা’ বলিয়া জানিত না, তাহাকে ‘আত্মা’ বলিয়া জানিতে পারে। বাস্তবিক পক্ষে ‘যাহারা ব্যবহারিক পথগামী না হইয়াও পথের পার পায়; অর্থাৎ সংসারের পর পারে যায়,’ ইত্যাদি শ্রুতিও এই কথাই বলিতেছেন। এই কারণ এই শ্রুতিও সর্ববস্তুর প্রত্যগাত্মভাব প্রদর্শন করিতেছে,-ব্রহ্মাদি স্তম্বপর্য্যন্ত সর্বভূতে গূঢ়--আবৃত অর্থাৎ দর্শন-শ্রবণাদি ব্যাপারও অবিদ্যা বা অজ্ঞানাত্মক মায়া দ্বারা সমাচ্ছন্ন, এই পুরুষসংজ্ঞক আত্মা ‘আত্মা’রূপে কাহারো নিকট প্রকাশ পায় না। অতএব,[বুঝিতে হইবে] বিচিত্ররূপা এই মায়া অতি গভীর ও দুরবগাহ্য, অর্থাৎ বুদ্ধির অগম্য; যেহেতু এই প্রাণিসমূহ পরমার্থতঃ পরমাত্মস্বরূপ হইয়াও এবং ‘তুমি পরমাত্মস্বরূপ’ এইরূপ উপদেশ প্রাপ্ত হইয়াও ‘আমি পরমাত্মা’, ইহা বুঝিতে পারে না; অথচ, অনাত্মা দেহেন্দ্রিয়াদি-সমষ্টি ঘটাদির ন্যায় আত্ম-দৃশ্য হইলেও অর্থাৎ আত্মা হইতে ভিন্ন হইলেও এবং[‘তুমি অমুকের পুত্র’] এইরূপ উপদেশ না পাইয়াও ‘আমি অমুকের পুত্র’ এইরূপে ‘আত্মা’ বলিয়া গ্রহণ করিয়া থাকে। ‘আমি(ভগবান্) যোগমায়া দ্বারা সম্যরূপে আবৃত হইয়া সকলের নিকট প্রকাশ পাই না।’ ইত্যাদি স্মৃতিবাক্য(ভগবদগীতা) উক্তার্থের অনুরূপ।
ভাল, ‘ধারব্যক্তি তাঁহাকে মনন করিয়া শোক মুক্ত হন।’ আবার ‘তিনি প্রকাশ পান না।’ এইরূপ বিরুদ্ধ কথা বলা হইতেছে কেন? না—ইহা এরূপ(বিরুদ্ধ) নহে; কারণ, অসংস্কৃত বা অবিশুদ্ধবুদ্ধির অজ্ঞেয় বলিয়াই “ন প্রকাশতে” বলা হইয়াছে। পরন্তু, সংস্কৃত, অগ্র্য—যেন অগ্রবর্তী(শ্রেষ্ঠ), অর্থাৎ একাগ্রতাযুক্ত, এবং সূক্ষ্ম অর্থাৎ সূক্ষ্ম-বস্তু গ্রহণে তৎপরা বুদ্ধি দ্বারা দৃষ্ট হয়। কাহারা দেখেন?—সূক্ষমদর্শী অর্থাৎ “ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরা হ্যর্থাঃ” ইত্যাদি শ্রুতি- কথিত নিয়মানুসারে সূক্ষ্মতার তর-তমভাব ক্রমে পরম সূক্ষ্ম তত্ত্ব
১৪
দর্শন করিতে যাহাদের স্বভাব, তাঁহারা সূক্ষ্মদর্শী, সেই সূক্ষ্মদর্শী পণ্ডিতগণ কর্তৃক[ দৃষ্ট হয়] ॥৬৬৷১২॥
যচ্ছেদ্বাত্মনসী প্রাজ্ঞস্তদ্ যচ্ছেজ্জ্ঞান আত্মনি। জ্ঞানমাত্মনি মহতি তদ্যচ্ছেচ্ছান্ত আত্মনি ॥৬৭॥১৩॥ *
[ পুনঃ স্তৎপ্রাপ্ত্যুপায়মাহ] যচ্ছেদিতি। প্রাজ্ঞঃ(বিবেকী জনঃ) বাক্(বাচং) মনসী(মনসি)[ ছান্দসং দীর্ঘত্বং] যচ্ছেৎ(নিযচ্ছেৎ, মনসোহধীনাং কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ)। [ বাক্-শব্দোহত্র সর্ব্বেষামিন্দ্রিয়াণামুপলক্ষণার্থঃ; তেন সর্ব্বাণীন্দ্রিয়াণি নিযচ্ছেদি- ত্যর্থঃ।] তৎ(মনঃ) জ্ঞানে(প্রকাশস্বরূপে) আত্মনি(বুদ্ধৌ) যচ্ছেৎ। জ্ঞানং (বুদ্ধিং) মহতি আত্মনি(মহত্তত্ত্বাখ্যায়াং হিরণ্যগর্ভবুদ্ধৌ জীবাত্মনি বা) যচ্ছেৎ। তৎ(জ্ঞানং চ) শান্তে(সর্ব্ববিকাররহিতে) আত্মনি(পরমাত্মনি) যচ্ছেৎ ॥
[ পুনশ্চ আত্মলাভের উপায় বলিতেছেন], প্রাজ্ঞ(বিবেকশালী) লোক বাগিন্দ্রিয়কে মনে সংযত করিবেন; এখানে ‘বাক্’ শব্দটি উপলক্ষণমাত্র, অর্থাৎ সমস্ত ইন্দ্রিয়কে মনের অধীন করিবেন; সেই মনকে ‘জ্ঞান’ শব্দ বাচ্য বুদ্ধিরূপ আত্মাতে সংযত করিবেন; সেই বুদ্ধিকেও আবার হিরণ্যগর্ভের উপাধিস্বরূপ মহত্তত্বে নিয়মিত রাখিবেন, এবং তাহাকেও আবার শান্ত(নিষ্ক্রিয়) আত্মাতে (পরমাত্মাতে) নিয়মিত করিবেন। ৬৭ ॥ ১৩॥]
তৎপ্রতিপত্ত্যুপায়মাহ, -যচ্ছেন্নিয়চ্ছেদুপসংহরেৎ প্রাজ্ঞো বিবেকী। কিম্? বাক্-বাচম্; বাগত্রোপলক্ষণার্থা সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাম্। ক? মনসী মনসি। ছান্দসং দৈর্ঘ্যম্। তচ্চ মনো যচ্ছেৎ জ্ঞানে প্রকাশস্বরূপে বুদ্ধাবাত্মনি। বুদ্ধিহি মনআদিকরণানি আপ্নোতি, ইত্যাত্মা; প্রত্যক্ তেষাম্। জ্ঞানং বুদ্ধিমাত্মনি মহতি প্রথমজে নিযচ্ছেৎ। প্রথমজবৎ স্বচ্ছস্বভাবমাত্মনো বিজ্ঞানমাপাদয়েদিত্যর্থঃ। তঞ্চ মহান্তমাত্মানং যচ্ছেৎ শান্তে সর্ব্ববিশেষ-প্রত্যস্তমিতরূপেইবিক্রিয়ে সর্ব্বান্তরে সর্ব্ব- বুদ্ধিপ্রত্যয়সাক্ষিণি মুখ্যে আত্মনি ॥ ৬৭ ॥ ১৩ ॥
পূর্ব্বোক্ত আত্মজ্ঞানের উপায় বলিতেছেন, প্রাজ্ঞ অর্থাৎ বিবেক- বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি বাক্ অর্থাৎ বাগিন্দ্রিয়কে সংযমিত করিবেন, অর্থাৎ অন্য বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া স্থাপন করিবেন। কোথায়? না—মনে। এখানে ‘বাক্’ শব্দটি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের উপলক্ষণার্থক অর্থাৎ সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বোধক;[সুতরাং সমস্ত ইন্দ্রিয়েরই মনে সংযমন করা বুঝাইতেছে।] ‘মনসী’ এখানে ছন্দের অনুরোধে বা বৈদিক নিয়মানুসারে দীর্ঘ হইয়াছে;[কিন্তু ‘মনসি’ বুঝিতে হইবে। সেই মনকেও জ্ঞান, অর্থাৎ প্রকাশস্বভাব[বুদ্ধি সাত্ত্বিক বলিয়া বিষয় প্রকাশ করাই উহার স্বভাব, সেই] বুদ্ধিরূপ আত্মাতে নিয়মিত করিবেন। বুদ্ধিই মন প্রভৃতি করণবর্গকে[বিষয়-গ্রহণোদ্দেশে] প্রাপ্ত হয়, এই কারণে বুদ্ধি ইন্দ্রিয়গণের প্রত্যগাত্ম-স্বরূপ! * সেই জ্ঞানপদবাচ্য বুদ্ধিকে প্রথমজাত মহৎ(মহত্তত্বরূপ) আত্মাতে নিয়োজিত করিবেন; অর্থাৎ স্বীয় বুদ্ধি-বিজ্ঞানকে প্রথমজাত(হিরণ্যগর্ভের উপাধিভূত) বুদ্ধির ন্যায় স্বচ্ছ—নির্ম্মল করিবেন: সেই মহৎ আত্মাকেও আবার সর্ব্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্ম-রহিত, বিকারশূন্য, সর্ব্বান্তরবর্তী ও সর্ব্বপ্রকার বুদ্ধি বিজ্ঞানের সাক্ষিস্বরূপ মুখ্য আত্মাতে(চৈতন্যময়ে) নিযোজিত করিবেন ॥ ৬৭৷৷১৩
প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।
দুর্গং পথস্তুং কবয়ো বদন্তি ॥৬৯॥১৪॥
[এবমাত্মদর্শনোপায়ং নিদ্দিশ্য মুমুক্ষন্ প্রত্যুপদিশতি]—উত্তিষ্ঠতেতি।[হে মুমুক্ষবঃ! যুয়ম্] উত্তিষ্ঠত(নানাবিধবিষয়চিন্তাং হিত্বা আত্মজ্ঞানোন্মুখা ভবত)। জাগ্রত(জাগৃত, অজ্ঞান-মোহ-নিদ্রাং মুঞ্চত)। বরান্(শ্রেষ্ঠান্ আর্য্যান্) প্রাপ্য (আচার্য্যসমীপং গত্বা) নিবোধত(নিতরাং বুধ্যধ্বম্)।[তত্র সাবধানেন ভবিতব্যমিত্যত আহ,] ক্ষুরস্যেতি। নিশিতা(তীক্ষ্ণীকৃতা) দুরত্যয়া(দুঃখেন অত্যেতুম্ অতিক্রামিতুং শক্যা, দৃঢ়তর-সাধনং বিনা অত্যেতুমশক্যা ইত্যর্থঃ।) ক্ষুরস্য(কেশনিকৃন্তনসাধনস্য) ধারা(ধারামিব প্রান্তভাগমিব) দুর্গং(দুঃখেন গন্তুং শক্যং, দুর্গমমিতি যাবৎ)। তৎ(তং) পথঃ(পন্থানং তত্ত্বজ্ঞান-লক্ষণং), কবয়ঃ(ক্রান্তদর্শিনঃ, বিবেকিন ইতি যাবৎ) বদন্তি(কথয়ন্তি)। অত উত্তিষ্ঠত—জাগ্রতেত্যাদ্যুক্তিযুক্তেতি ॥
[এইরূপে আত্মদর্শনের উপায় নির্দেশের পর মুমুক্ষুগণকে উপদেশ দিতেছেন যে, হে মুমুক্ষুগণ! তোমরা] উত্থিত হও অর্থাৎ বিবিধ বিষয় চিন্তা ত্যাগ করিয়া আত্মজ্ঞান লাভে উদ্যোগী হও;[মোহনিদ্রা ত্যাগ করিয়া] জাগ্রত হও; এবং শ্রেষ্ঠ আচার্য্য-সমীপে উপস্থিত হইয়া সম্যক্ জ্ঞান লাভ কর; বিবেকিগণ সেই আত্মজ্ঞানরূপ পথকে দুরতিক্রমণীয় তীক্ষ্ণ ক্ষুরধারার ন্যায় দুর্গম বলিয়া বর্ণনা করিয়া থাকেন ॥৬৮৷১৪॥]
এবং পুরুষে আত্মনি সর্ব্বং প্রবিলাপ্য নাম-রূপ-কৰ্ম্মত্রয়ং যং মিথ্যাজ্ঞানবিজৃম্ভিতঃ ক্রিয়া-কারক-ফললক্ষণং স্বাত্মযাথাত্ম্যজ্ঞানেন, মরীচ্যুদক-রজ্জুসর্প-গগনমলানীব মরীচিরজ্জু-গগনস্বরূপদর্শনেনৈব স্বস্থঃ প্রশান্তঃ কৃতকৃত্যো ভবতি যতঃ, অত- স্তদ্দর্শনার্থমনাদ্যবিদ্যাপ্রসুপ্তা উত্তিষ্ঠত হে জন্তবঃ! আত্মজ্ঞানাভিমুখা ভরত; জাগ্রত অজ্ঞাননিদ্রায়া ঘোররূপায়া: সর্ব্বানর্থবীজভূতায়াঃ ক্ষয়ং কুরুত। কথম্? প্রাপ্য উপগম্য বরান্—প্রকৃষ্টান্ আচার্য্যান্ তদ্বিদঃ তদুপদিষ্টং সর্ব্বান্তরমাত্মানম্ “অহমস্মি” ইতি নিবোধত অবগচ্ছত। ন হ্যপেক্ষিতব্যমিতি শ্রুতিরনুকম্পয়াহ— মাতৃবৎ, অতিসূক্ষ্মবুদ্ধিবিষয়ত্বাদ্বিজ্ঞেয়স্য। কিমিব সূক্ষ্মবুদ্ধিরিতি, উচ্যতে—ক্ষুরস্য
ধারা অগ্রং, নিশিতা তীক্ষ্ণীকৃতা দুরত্যয়া দুঃখেন অত্যয়ো যস্যাঃ, সা দুরত্যয়া, যথা সা পভ্যাং দুর্গমনীয়া, তথা দুর্গং দুঃসম্পাদ্যমিত্যেতৎ, পথঃ পন্থানং তত্ত্বজ্ঞানলক্ষণং মার্গং কবয়ো মেধাবিনো বদন্তি, জ্ঞেয়স্যাতিসূক্ষ্মত্বাৎ তদ্বিষয়স্য জ্ঞানমার্গস্য দুঃসম্পা- দ্যত্বং বদন্তীত্যভিপ্রায়ঃ ॥৬৮৷১৪৷৷
সূর্যকিরণ, রজ্জু ও গগনের প্রকৃত স্বরূপ জ্ঞানে সূর্যকিরণে উদক, রজ্জুতে সর্প, এবং গগনে মালিন্য ভ্রম দূরীকরণের ন্যায় যেহেতু[জ্ঞানী] পুরুষ, অজ্ঞান-সমুপাদিত এবং ক্রিয়া, কারকও ফলাত্মক, নাম (সংজ্ঞা),(আকৃতি) রূপ ও কৰ্ম্ম(ক্রিয়া), এই তিনকে ‘আত্মা’- যার্থ্য জ্ঞানের দ্বারা আত্মাতে বিলীন করিয়া প্রকৃতিস্থ, প্রশান্ত (অনুদ্বিগ্ন) ও কৃতকৃত্য হন; অতএব হে অনাদি অবিদ্যা-নিদ্রায় প্রসুপ্ত জীবগণ!(প্রাণিগণ) সেই আত্মতত্ত্ব দর্শনার্থ উত্থিত হও, অর্থাৎ আত্ম- জ্ঞানে অভিমুখী হও, এবং জাগ্রৎ হও, অর্থাৎ সমস্ত অনর্থের বীজভূত, ভয়ঙ্কর অজ্ঞান-নিদ্রার ক্ষয় কর। কি উপায়ে?-আত্মতত্ত্বজ্ঞ উত্তম আচার্য্যগণের সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের উপদেশ-লব্ধ, সর্বান্তরস্থ আত্মাকে ‘অহম্ অস্মি’(আমিই এই আত্মা) এইরূপে অবগত হও। ইহা উপেক্ষা করা উচিত নহে, এইকথা শ্রুতি মাতার ন্যায় দয়াপূর্বক বলিতেছেন,-কারণ, এই বেদিতব্য বিষয়টি(আত্মতত্ত্ব) অতিসূক্ষ্ম বা পরিমার্জিত বুদ্ধিগম্য; এই কারণে শ্রুতি নিজেই মাতার ন্যায় দয়া পরবশ হইয়া বলিতেছেন যে, ‘এ বিষয়ে উপেক্ষা করা উচিত নহে। কাহার ন্যায় সূক্ষ্মবুদ্ধি? তাই বলিতেছেন,-নিশিত- তীক্ষ্ণীকৃত, দুরত্যয় অর্থাৎ দুঃখে যাহাকে অতিক্রম করা যায়; সেই ক্ষুরধারা যেমন পাদদ্বয় দ্বারা দুর্গমনীয়, কবিগণ-মেধা বা ধারণাবতী বুদ্ধিযুক্ত পণ্ডিতগণ তেমনি সেই তত্ত্বজ্ঞানরূপ পথকে দুর্গ অর্থাৎ দুঃসম্পাদ্য(দুর্লভ) বলিয়া বর্ণনা করেন। অভিপ্রায় এই যে,
বিজ্ঞেয় পদার্থটি অতিসূক্ষ্ম বলিয়াই তদ্বিষয়ে জ্ঞান সম্পাদনকে দুর্লভ বলিয়া বর্ণনা করেন ॥৬৮॥১৪
অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ং তথারসং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ। অনাদ্যনন্তং মহতঃ পরং ধ্রুবং নিচায্য তং মৃত্যুমুখাৎপ্রমুচ্যতে ॥৬ ॥১৫॥
[ইদানীম্ আত্মনোদুজ্ঞেয়ত্বে হেতুমুপন্যস্যতি] -অশব্দমিতি। যদ্(ব্রহ্ম) অশব্দং(শব্দগুণহীনম্, ইথমিতি শব্দাবেদ্যঞ্চ), অস্পর্শং(স্পর্শগুণহীনম্; অতএব ন ত্বগ্নিষয়ঃ); অরূপম্(অতএব ন চক্ষুর্গোচরম্), অব্যয়ং(নিব্বিকারং); তথা অরসং(রসগুণবর্জিতম্, অতএব রসনেন্দ্রিয়াবিষয়ঃ); নিত্যম্(জন্ম-নাশ- রহিতম্), অগন্ধবৎ(অত এব ঘ্রাণেন্দ্রিয়াবিষয়শ্চ) ভবতি।[তজজ্ঞানং কেন মার্গেণ ভবতীত্যত আহ]-অনাদীতি। অনাদ্যনন্তম্(আদ্যন্ত-বর্জিতম্), মহতঃ(মহত্তত্ত্বাভিমানিনঃ হিরণ্যগর্ভাৎ) পরং ধ্রুবং(শশ্বদেকপ্রকারং) তং (প্রাগুক্তম্ আত্মানং) নিচায্য(বিচার্য্য শ্রবণাদিভিনিশ্চিত্য তৎপরোক্ষজ্ঞান- দ্বারা) মৃত্যুমুখাৎ(সংসৃতিবন্ধাৎ) প্রমুচ্যতে(প্রকর্ষেণ মুচ্যতে)।[শব্দাদ্যবেদ্যো- হপি সন্ আচার্য্যসহায়লব্ধশ্রবণমননধ্যানাবৃত্ত্যা প্রসন্নঃ স্বাপরোক্ষ্যং সম্পাদ্য বন্ধা- মোচয়তীতি ভাবঃ ॥
[ এখন আত্মার দুর্বিজ্ঞেয়ত্বের কারণ প্রদর্শন করিতেছেন],—যিনি শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধবর্জিত এবং নিত্য(জন্ম-মরণরহিত), আদি-অন্তহীন ও মহত্তত্ব বা হিরণ্যগর্ভের উপাধি হইতেও পর(উৎকৃষ্ট)। সেই ধ্রুব(চিরদিন একরূপ) আত্মাকে চিন্তা করিয়া অর্থাৎ তদ্বিষয়ে বিচার করিয়া(তজ্জনিত সাক্ষাৎকারের ফলে)[মুমুক্ষু ব্যক্তি] মৃত্যুর মুখস্বরূপ সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন ॥ ৬৯ ॥ ১৫ ॥]
তৎকথমতিসূক্ষ্মত্বং জ্ঞেয়স্যেতি উচ্যতে,-স্থূলা তাবদিয়ং মেদিনী শব্দস্পর্শরূপ- রসগন্ধোপচিতা সর্ব্বেন্দ্রিয়বিষয়ভূতা; তথা শরীরম্। তত্র একৈক গুণাপকর্ষেণ
গন্ধাদীনাং সূক্ষ্মত্ব-মহত্ত্ব-বিশুদ্ধত্ব-নিত্যত্বাদিতারতম্যং দৃষ্টমবাদিযু যাবদাকাশম্,ইতি তে গন্ধাদয়ঃ সর্ব্ব এব স্থূলত্বাদ্বিকারাঃ শব্দান্তা যত্র ন সন্তি, কিমু তস্য সূক্ষ্মত্বাদি- নিরতিশয়ত্বং বক্তব্যম, ইত্যেতদ্দর্শয়তি শ্রুতিঃ,-অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ং তথাহরসং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ।
এতদ্ব্যাখ্যাতং ব্রহ্ম। অব্যয়ং যদ্ধি শব্দাদিমৎ, তৎ ব্যেতি; ইদত্ত অশব্দাদিমত্ত্বাৎ অব্যয়ং-ন ব্যেতি ন ক্ষীয়তে, অতএব চ নিত্যং; যদ্ধি ব্যেতি তদনিত্যম্; ইদন্তু ন ব্যেতি, অতো নিত্যম্। ইতশ্চ নিত্যম্-অনাদি অবিদ্যমান আদিঃ কারণমস্য, তদিদমনাদি। যচ্চ আদিমৎ, তৎ কার্য্যত্বাদনিত্যং কারণে প্রলীয়তে,-যথা পৃথিব্যাদি। ইদন্তু সর্ব্বকারণত্বাদকার্য্যম্; অকার্য্যত্বান্নিত্যং, ন তস্য কারণমস্তি যস্মিন্ লীয়েত। তথা অনন্তম্-অবিদ্যমানোহন্তঃ কার্য্যং যস্য, তদনন্তম্। যথা কদল্যাদেঃ ফলাদি কার্য্যোৎপাদনেনাপ্যনিত্যত্বং দৃষ্টম্; ন চ তথাপ্যন্তবত্ত্বং ব্রহ্মণঃ; অতোহপি নিত্যম্। মহতো মহত্তত্ত্বাদ বুদ্ধ্যাখ্যাৎ পরং বিলক্ষণং নিত্যবিজ্ঞপ্তিস্বরূপত্বাৎ; সর্ব্বসাক্ষি হি সর্ব্বভূতাত্মত্বাদ ব্রহ্ম। উক্তং হি “এষ সর্ব্বেষু ভূতেষু” ইত্যাদি। ধ্রুবঞ্চ কূটস্থং নিত্যং, ন পৃথিব্যাদিবদাপেক্ষিকং নিত্যত্বম্। তদেবস্তুতং ব্রহ্ম আত্মানং নিচায্য অবগম্য তম্ আত্মানং, মৃত্যুমুখাৎ মৃত্যুগোচরাৎ অবিদ্যাকামক’লক্ষণাৎ প্রমুচ্যতে বিসজ্যতে ॥ ৬৯৷১৫ ॥
সেই জ্ঞেয় ব্রহ্ম পদার্থের অতি সূক্ষমতা কেন?[ইহার উত্তরে] বলা হইতেছে যে,—শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধগুণে পরিপুষ্ট এই স্কুল পৃথিবী সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বিষয়(গ্রহণ-যোগ্য); শরীরও ঠিক সেই- রূপ। জল হইতে আকাশ পর্য্যন্ত ভূত চতুষ্টয়ে গন্ধাদি গুণের এক একটির অভাবে সূক্ষমত্ব, মহত্ত্ব, বিশুদ্ধত্ব ও নিত্যত্ব প্রভৃতি ধর্ম্মের তারতম্য পরিদৃষ্ট হয়। অতএব স্থূলতানিবন্ধন বিকারাত্মক গন্ধাদি শব্দ পর্য্যন্ত গুণ সমুদয় যাহাতে বিদ্যমান নাই, তাহার যে সর্বাধিক সূক্ষমত্বাদি থাকিবে; তাহাও কি আর বলিতে হয়? “অশব্দম্, অস্পর্শম, অরূপম্, অব্যয়ং, তথারসং নিত্যম্ অগন্ধবচ্চ যৎ” এই শ্রুতি ঐ অর্থই প্রতিপাদন করিতেছেন,—
এই ব্যাখ্যাত ব্রহ্ম অব্যয়; কারণ, যাহা শব্দাদি-গুণবিশিষ্ট, তাহাই বিশেষ রূপ(অর্থাৎ বিকার) প্রাপ্ত হয়; কিন্তু এই ব্রহ্ম শব্দাদি গুণহীন বলিয়া অব্যয়, অর্থাৎ ক্ষয়প্রাপ্ত হন না। এই কারণে নিত্যও বটে; কারণ, যাহা বিকার প্রাপ্ত হয়, তাহাই অনিত্য হয়, কিন্তু আত্মা যেহেতু বিকারপ্রাপ্ত হয় না, অতএব নিত্য। আর এই কারণেও নিত্য,-তিনি অনাদি; যাহার আদি-কারণ নাই, তিনি অনাদি; যাহা আদিমান, তাহাই কার্য্য(উৎপন্ন), কার্য্যত্ব হেতুই অনিত্য, অনিত্য বস্তুমাত্রই কারণে বিলীন হইযা থাকে; যেমন[অনিত্য] পৃথিবী প্রভৃতি। কিন্তু, এই ব্রহ্ম সমস্ত বস্তুরই কারণ’; সুতরাং’ অকার্য্য; অকার্য্যত্ব হেতুই নিত্য-তাহার এমন কোনও কারণ নাই, যাহাতে বিলীন হইতে পারেন। সেইরূপ[তিনি] অনন্ত; যাহার অন্ত বা বিনাশ নাই, তাহা অনন্ত; কদলী প্রভৃতি বৃক্ষের যেরূপ ফলোৎপাদনের পরে(বিনাশ হওয়ায়) অনিত্যত্ব দৃষ্ট হয়, ব্রহ্মের সেরূপও অন্ত (বিনাশও) নাই, এই কারণেও তিনি নিত্য। মহৎ অর্থাৎ মহত্তত্ত্ব অপেক্ষাও পর অর্থাৎ ভিন্ন প্রকার; কারণ তিনি নিত্য জ্ঞান স্বরূপ। বিশেষতঃ ব্রহ্ম সর্বভূতের আত্মা, এই কারণে সর্বসাক্ষী বা সর্বান্ত- র্যামী। ‘সর্বভূতে গূঢ় বা অন্তর্নিহিত এই আত্মা,’ ইত্যাদি বাক্যেও ইহা উক্ত হইয়াছে। ধ্রুব অর্থাৎ কূটস্থ নিত্য, পৃথিব্যাদির ন্যায় তাঁহার নিত্যত্ব আপেক্ষিক নহে। এবস্তুত সেই ব্রহ্মস্বরূপ আত্মাকে অবগত হইয়া মৃত্যুমুখ অর্থাৎ মৃত্যুর অধিকারস্থ অবিদ্যা, কামনা ও কৰ্ম্ম হইতে প্রমুক্ত হয়, অর্থাৎ বিযুক্ত হয় ॥৬৯৷৷১৫৷৷
নাচিকেতমুপাখ্যানং মৃত্যুপ্রোক্তং সনাতনম্। উক্ত্বা শ্রুত্বা চ মেধাবী ব্রহ্মলোকে মহীয়তে ॥৭০॥১৬॥
[ এবং বেদপুরুষঃ যম-নচিকেতঃসংবাদমনুদ্য সাধুশিক্ষায়ৈ এতদ্বিদ্যাপ্রবচন- শ্রবণয়োঃ ফলোক্তিপূর্ব্বকমুপসংহরতি]—নাচিকেতমিতি। মেধাবী(পণ্ডিতঃ)
মৃত্যুপ্রোক্তং(যমেন কথিতং)[বস্তুতন্ত] সনাতনং(অনাদিকালপ্রবৃত্তং, বেদস্য অনাদিত্বাদিত্যাশয়ঃ)। নাচিকেতম্(নচিকেতঃসম্বন্ধি, যম-নচিকেতঃসংবাদরূপম্) উপাখ্যানন্(চরিতম্) উক্ত্বা(জিজ্ঞাসবে ব্যাখ্যায়,[স্বয়ং] চ শ্রুত্বা ব্রহ্মলোকে(ব্রহ্ম এব লোকঃ—ব্রহ্মলোকঃ, তস্মিন্) মহীয়তে(উপাস্যতে)।
মেধাবী(বিবেকী) ব্যক্তি মৃত্যু—যম কর্তৃক কথিত, সনাতন(অনাদি) এই ‘নাচিকেত’ উপাখ্যান(চরিত্র) অপরের নিকট ব্যাখ্যা করিয়া এবং নিজেও শ্রবণ করিয়া ব্রহ্মলোকে(ব্রহ্মবৎ) পূজিত হন ॥৭০॥১৬৷৷
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।
প্রস্তুতবিজ্ঞানস্তুত্যর্থমাহ শ্রুতিঃ—নাচিকেতং নচিকেতসা প্রাপ্তং নাচিকেতং, মৃত্যুনা প্রোক্তং মৃত্যুপ্রোক্তম্ ইদমুপাখ্যানমাখ্যানং বল্লীত্রয়লক্ষণং সনাতনং চিরন্তনং বৈদিকত্বাৎ, উক্ত্বা ব্রাহ্মণেভ্যঃ, শ্রুত্বা চ আচার্য্যেভ্যঃ মেধাবী, ব্রহ্মৈব লোকো ব্রহ্মলোকস্তস্মিন্ ব্রহ্মলোকে মহীয়তে আত্মভূত উপাস্যো ভবতীত্যর্থঃ ॥৭০॥১৬৷৷
বর্ণিত বিজ্ঞান প্রশংসার্থ শ্রুতি বলিতেছেন,—নাচিকেত অর্থাৎ নাচিকেতা কর্তৃক প্রাপ্ত—‘নাচিকেত’ এবং মৃত্যু কর্তৃক যাহা উক্ত, সেই মৃত্যুপ্রোক্ত এই বল্লীত্রয়রূপ উপাখ্যানটি সনাতন, অর্থাৎ বেদোক্ত বলিয়া চিরন্তন(অনাদি); ইহা ব্রাহ্মণগণের উদ্দেশে বলিয়া এবং আচার্য্যগণের নিকট শ্রবণ করিয়া মেধাবী(বিবেকী) ব্যক্তির ব্রহ্ম- স্বরূপ যে লোক ব্রহ্মলোক, তাহাতে মহিত হন অর্থাৎ আত্মস্বরূপ হইয়া[সকলের] উপাস্য হন ॥৭০॥১॥
য ইমং * পরমং গুহ্যং শ্রাবয়েদ্ ব্রহ্মসংসদি। প্রযতঃ শ্রাদ্ধকালে বা তদানন্ত্যায় কল্পতে ॥
তদানন্ত্যায় কল্পত ইতি ॥৭॥১৭॥
ইতি কাঠকোপনিষদি তৃতীয়া বল্লী সমাপ্তা ॥১॥৭॥ ইতি প্রথমোহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥
[পুনশ্চ ফলান্তরকথনেন অধ্যায়মুপসংহরতি]—যঃ(জনঃ) প্রযতঃ (সংযতচিত্তঃ সন্) পরমং(নিরতিশয়ং) গুহ্যম্(যস্মৈ কস্মৈচিৎ অবাচ্যম্) ইমং(উপাখ্যান রূপং গ্রন্থং) ব্রহ্মসংসদি(ব্রহ্মণ-সভায়াং) শ্রাদ্ধকালে বা শ্রাবয়েৎ(গ্রন্থং তদর্থং চ বোধয়েৎ), তৎ(শ্রাবণং) আনন্ত্যায়(অনন্তফলোৎ- পত্তয়ে) কল্পতে(সমর্থং ভবতি) ॥
যিনি সংযতচিত্তে পরম গুহ্য(গোপনীয়) এই উপাখ্যান ব্রাহ্মণ-সভায় কিংবা শ্রাদ্ধকালে শ্রবণ করান, অর্থাৎ এই উপাখ্যান পাঠ করেন, কিংবা ইহার অর্থ বুঝাইয়া দেন; তাহা[তাহার] অনন্ত ফলোৎপাদনে সমর্থ হয় ॥৭১৷১৭৷
ইতি কাঠকোপনিষদি প্রথমাধ্যায়স্য তৃতীয়বল্লী-ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥১॥৩॥
যঃ কশ্চিদিমং গ্রন্থং পরমং প্রকৃষ্টং, গুহ্যং গোপ্যং শ্রাবয়েৎ গ্রন্থতোহর্থতশ্চ, ব্রাহ্মণানাং সংসদি ব্রহ্মসংসদি, প্রযতঃ শুচির্ভূত্বা, শ্রাদ্ধকালে বা শ্রাবয়েৎ, ভুঞ্জানান্ তৎ শ্রাদ্ধম্ অস্য আনন্ত্যায় অনন্তফলায় কল্পতে সম্পদ্যতে। দ্বির্বচন- মধ্যায়পরিসমাপ্ত্যর্থম্ ॥৭১৷১৭৷৷
ইতি শ্রীমৎপরমহ স পরিব্রাজকাচার্য্য-গোবিন্দ-ভগবৎ-পূজ্যপাদ-শিষ্য- শ্রীমচ্ছঙ্করাচার্য্য-বিরচিত-কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমোহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥
ভাষ্যানুবাদ।
যে কোন লোক প্রযত অর্থাৎ শুচি হইয়া পরম অর্থাৎ উৎকৃষ্ট ও গুহ্য অর্থাৎ গোপনীয় এই গ্রন্থ ও গ্রন্থার্থ ব্রাহ্মণের সভায় কিংবা শ্রাদ্ধ- কালে ভোক্তাদিগকে শ্রবণ করান, ইহার সেই শ্রাদ্ধ অনন্ত ফলের নিমিত্ত সম্পন্ন হয়। শ্রুতিতে “তদানন্ত্যায় কল্পতে” কথার দ্বিরুক্তি অধ্যায় সমাপ্তি-সূচক ॥৭১৷১৭৷
ইতি কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যের প্রথমাধ্যায়ে তৃতীয়বল্লী সমাপ্ত ॥
-
দ্বিতীয়োঽধ্যায়ঃ।
——:*——
প্রথমা বল্লী।
পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভূ- স্তস্মাৎ পরাঙ পশ্যতি নান্তরাত্মন্। কশ্চিদ্ধীরঃ প্রত্যগাত্মানমৈক্ষ- দাবৃত্তচক্ষুরমৃতত্বমিচ্ছন্ ॥৭২॥১॥
[আত্মনো দুরধিগমত্ব-কারণং বক্তমুপক্রমতে,]—পরাঞ্চীতি। স্বয়ম্ভূঃ (স্বয়মেব ভবতীতি স্বতন্ত্রঃ পরমেশ্বরঃ), খানি(ইন্দ্রিয়াণি) পরাঞ্চি(পরাণি বাহ্য-বস্তুনি অঞ্চন্তি গচ্ছন্তি ইতি,—পরাত্মখানি)[অতএব] ব্যতৃণং (কুৎসিতান্যকরোৎ,—হিংসিতবানিত্যর্থো বা)। তস্মাৎ(কারণাৎ)[জীবঃ] পরাঙ্(বাহ্যান্ বিষয়ান্) পশ্যতি। অন্তরাত্মন্(অন্তরাত্মানম্) ন[পশ্যতি]। কশ্চিৎ(কশ্চিদেব) ধীরঃ(জ্ঞানী) অমৃতত্বং(মুক্তিম্) ইচ্ছন আবৃত্তচক্ষুঃ (চক্ষুরিত্যুপলক্ষণং, তেন বিষয়েভ্যঃ প্রত্যাহৃত-সর্ব্বেন্দ্রিয়ঃ সন্) প্রত্যগাত্মানম্ (ব্রহ্মস্বরূপম্ আত্মানম্) ঐক্ষৎ(ঐক্ষত - সাক্ষাৎ পশ্যতীত্যর্থঃ)॥ আত্মার দুজ্ঞেয়ত্বের কারণ বলা হইতেছে—স্বয়ম্ভু অর্থাৎ স্বাধীন পরমেশ্বর ইন্দ্রিয়গণকে বাহ্যপদার্থদর্শী করিয়া নির্মাণ করিয়াছেন; সেই কারণে জীব বাহ্য বস্তুই দর্শন করে, অন্তরাত্মাকে দর্শন করে না। অল্পমাত্র ধীর ব্যক্তিই মুক্তি- লাভের ইচ্ছায় ইন্দ্রিয়গণকে বাহ্য বিষয় হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া পরমাত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন ॥৭২৷৷১৷৷
“এষ সর্ব্বেষু ভূতেষু গূঢ়োত্মা ন প্রকাশতে। দৃশ্যতে ত্বগ্র্যয়া বুদ্ধ্যা” ইত্যুক্তম্। কঃ পুনঃ প্রতিবন্ধোহগ্র্যায়া বুদ্ধেঃ, যেন তদভাবাদাত্মা ন দৃশ্যতে? ইতি তদদর্শনকারণপ্রদর্শনার্থা বল্লী আরভ্যতে। বিজ্ঞাতে হি শ্রেয়ঃ-প্রতিবন্ধ-কারণে তদপনয়নায় যত্ন আরব্ধং শক্যতে নান্যথেতি।
পরাঞ্চি পরাক্ অঞ্চন্তি গচ্ছন্তীতি খানি তদুপলক্ষিতানি শ্রোত্রাদীনি ইন্দ্রিয়াণি খানি ইত্যুচ্যন্তে। তানি পরাঞ্চ্যেব শব্দাদিবিষয়-প্রকাশনায় প্রবর্তন্তে। যস্মাদেবং- স্বভাবকানি তানি ব্যতৃণৎ হিংসিতবান্ হননং কৃতবানিত্যর্থঃ। কোহসৌ? স্বয়ম্ভুঃ যঃ পরমেশ্বরঃ-স্বয়মেব স্বতন্ত্রো ভবতি সর্ব্বদা, ন পরতন্ত্র ইতি। তস্মাৎ পরাঙ প্রত্যগ্রুপান্ অনাত্মভূতান্ শব্দাদীন্ পশ্যতি উপলভতে উপলব্ধা, ন অন্ত- রাত্মন্-ন অন্তরাত্মানমিত্যর্থঃ। এবংস্বভাবেহপি সতি লোকস্য, * কশ্চিৎ নদ্যাঃ প্রতিস্রোতঃপ্রবর্তনমিব ধীরো ধীমান্ বিবেকী প্রত্যগাত্মানং প্রত্যক্ চাসাবাত্মা চেতি প্রত্যগাত্মা, প্রতীচ্যেবাত্মশব্দো রূঢ়ো লোকে নান্যস্মিন্; ব্যুৎপত্তিপক্ষেহপি তত্রৈবাত্মশব্দো বর্ত্ততে,-“যচ্চাপ্নোতি যদাদত্তে যচ্চাত্তি বিষয়ানিহ। যচ্চাস্য সন্ততো ভাবস্তম্মাদাত্মেতি কীর্ত্যতে” ইতি আত্মশব্দব্যুৎপত্তিস্মরণাৎ। তং প্রত্যগাত্মানং স্বস্বভাবমৈক্ষৎ অপশ্যৎ পশ্যতীত্যর্থঃ, ছন্দসি কালানিয়মাৎ। কথং পশ্যতি? ইত্যুচ্যতে,-আবৃত্তচক্ষুঃ আবৃত্তং ব্যাবৃত্তং চক্ষুঃ শ্রোত্রাদিকমিন্ড্রিয়জাতম্ অশেষবিষয়াদ যস্য, স আবৃত্তচক্ষুঃ, স এবং সংস্কৃতঃ প্রত্যগাত্মানং পশ্যতি; নহি বাহ্যবিষয়ালোচনপরত্বং প্রত্যগাত্মেক্ষণঞ্চৈকস্য সম্ভবতীতি। কিমিচ্ছন্ পুনরিখং মহতা প্রয়াসেন স্বভাবপ্রবৃত্তিনিরোধং কৃত্বা ধীরঃ প্রত্যগাত্মানং পশ্যতীতি? উচ্যতে,-অমৃতত্বম্ অমরণধৰ্ম্মত্বং নিত্যস্বভাবতামিচ্ছন্ আত্মন ইত্যর্থঃ ॥৭২৷১৷৷
পূর্ব্ববল্লীতে কথিত হইয়াছে যে, ‘এই আত্মা সর্ব্বভূতে নিগূঢ়
আছেন,[ এই কারণে সকলের নিকট] প্রকাশ পান না; কিন্তু একাগ্রতা-সম্পন্ন, সূক্ষ্ম বুদ্ধি দ্বারা দৃষ্ট হন।’ এখন জিজ্ঞাস্য হইতেছে যে, সেই একাগ্রতাসম্পন্ন বুদ্ধি লাভের প্রতিবন্ধক বা বাধক কি আছে? যাহাতে তাহার অভাবে আত্মা দৃষ্ট হইতেছে না। এইহেতু সেই অদর্শনের কারণ প্রদর্শনার্থ এই বল্লী আরব্ধ হইতেছে। কারণ, শ্রেয়োলাভের প্রতিবন্ধক কারণটি জানিতে পারিলেই তাহার অপসারণের জন্য যত্ন আরম্ভ করা যাইতে পারে, না জানিলে পারা যায় না।
বাহ্য বিষয়ে গমন করে বলিয়া ইন্দ্রিয়গণকে ‘পরাঞ্চি’(পরাক্) বলা হইয়াছে। এখানে ‘খানি’ কথাটি শ্রোত্রাদি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের উপলক্ষক; এইকারণে ‘খানি’ পদে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়গণ উক্ত হইল। সেই ইন্দ্রিয়গণ শব্দাদি বিষয়ের প্রকাশার্থ বহির্মুখ হইয়াই প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; যে হেতু,[পরমেশ্বর] এবংবিধ স্বভাবসম্পন্ন করিয়া ইন্দ্রিয়-সমূহকে হিংসা বা হনন করিয়াছেন। ইনি(হিংসাকারী) কে? —স্বয়ম্ভূ—পরমেশ্বর; যিনি স্বয়ংই সর্বদা স্বতন্ত্রভাবে(স্বাধীন ভাবে) থাকেন, কখনও পরতন্ত্র বা পরাধীন হন না। সেই হেতুই(জীব) পরাক্ অর্থাৎ বাহ্য—অনাত্মভূত শব্দাদি-বিষয়-সমুহই দর্শন করে— অর্থাৎ উপলব্ধি করিয়া থাকে; অন্তরাত্মন্ অর্থাৎ অন্তরাত্মাকে দর্শন করিতে পারে না। সাধারণ জীবলোকের এইরূপ স্বভাব হইলেও সকলে যেমন নদীর স্রোতকে বিপরীতগামী করিতে পারে না, [ অতি অল্প লোকেই পারে,] তেমন কোনও ধীর অর্থাৎ বিবেকশালী পুরুষই প্রত্যস্বরূপ আত্মাকে অর্থাৎ স্বীয় প্রকৃত স্বরূপ দর্শন করিয়াছেন; বেদেতে কালের নিয়ম না থাকায় এখানে দর্শন করিয়া থাকেন, এইরূপই অর্থ করিতে হইবে। কিরূপে দর্শন করেন? তদুত্তরে বলিতেছেন—‘আবৃত্তচক্ষুঃ’। যাহার চক্ষুঃ অর্থাৎ শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়সমূহ সর্ব্ববিষয় হইতে আবৃত্ত—প্রত্যাহৃত হইয়াছে, তিনিই
‘আবৃত্তচক্ষুঃ’; তিনি এইরূপে সংস্কারসম্পন্ন হইয়া প্রত্যগাত্মাকে দর্শন করেন। কারণ, একই ব্যক্তির পক্ষে বাহ্য বিষয়ের আলোচনা ও পরমাত্ম-সন্দর্শন সম্ভবপর হয় না। ভাল, ধীরব্যক্তি কি কারণে এরূপ মহাপ্রযত্নে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির নিরোধ সম্পাদন করিয়া, প্রত্যগাত্মাকে দর্শন করেন? এই আশঙ্কায় বলা হইতেছে যে, অমৃতত্ব—মরণ-রাহিত্য অর্থাৎ নিজের নিত্যসিদ্ধ স্বভাব বা স্বরূপ পাইবার ইচ্ছায়। লোকব্যবহারে ‘আত্ম’-শব্দটি প্রত্যক্ অর্থেই (ব্যাপক চৈতন্য অর্থেই) প্রসিদ্ধ; তদ্ভিন্ন(দেহাদি) অর্থে প্রসিদ্ধ নহে। এই কারণে “প্রত্যগাত্মানং” কথায় ‘প্রত্যক্স্বরূপ ‘আত্মা’ অর্থই বুঝিতে হইবে। আর যৌগিকার্থানুসারেও ‘আত্ম’ শব্দে সেই ‘প্রত্যক্’ অর্থই প্রতিপাদন করে। কারণ, স্মৃতিতে আছে— “যেহেতু ব্যাপিয়া থাকে, যেহেতু আদান বা গ্রহণ করে, যেহেতু জগতে বিষয় ভোগ করে এবং যেহেতু ইহার ভাব বা সত্তা চিরদিন সন্তত বা অবিচ্ছিন্ন ভাবে থাকে, সেইহেতু ‘আত্মা’ বলিয়া কথিত হয় ॥” স্মৃতি শাস্ত্রোক্ত এই ব্যুৎপত্তি অনুসারেও আত্মশব্দে দেহাদি অর্থ না বুঝিয়া ব্যাপক চৈতন্য অর্থ বুঝিতে হইবে ॥ ৭২॥১॥
পরাচঃ কামাননুষন্তি বালাঃ, তে মৃত্যোর্যন্তি বিততস্য পাশম্। অথ ধীরা অমৃতত্বং বিদিত্বা ধ্রুবমধ্রুবেষিহ ন প্রার্থয়ন্তে ॥ ৭৩॥২॥
[মুমুক্ষুঃ সর্ব্বথা অপ্রমাদী স্যাদিত্যাহ, পরাচ ইতি। যে বালাঃ(বালবৎ অবিবে- কিনঃ) পরাচঃ(বাহ্যান্) কামান্(স্রক্-চন্দন-বনিতাদিবিষয়ান্) অনুযন্তি(অনুসরন্তি) তে বিততস্য(বহুকালব্যাপিনঃ) মৃত্যোঃ(অবিদ্যাকামকৰ্ম্মাদেঃ) পাশং(বন্ধং— তৎকৃত-জনন-মরণাদিক্লেশং) যন্তি(প্রাপ্নুবন্তি)। অথ(তস্মাৎ) ইহ(লোকে) ধীরাঃ(বিবেকিনঃ) ধ্রুবং(কূটস্থং) অমৃতত্বং(মোক্ষং) বিদিত্বা(জ্ঞাত্বা)
অধ্রবেষু(বিত্তাদিষু বিষয়ে) ন প্রার্থয়ন্তে[কিঞ্চিৎ ইতি শেষঃ]। যদ্বা, অধ্রবেষু(অনিত্যেষু পদার্থেযু মধ্যে) ধ্রুবং(‘নিত্যং-স্থিরমিদম্’ ইতি মত্বা) ন প্রার্থয়ন্তে ইত্যর্থঃ ॥
মুমুক্ষু ব্যক্তির যে, সর্ব্বতোভাবে সাবধান থাকা আবশ্যক, তাহা বলিতেছেন,— বালকগণ অর্থাৎ বালকের ন্যায় অবিবেকসম্পন্ন যে সকল লোক বাহ্য শব্দাদি বিষয়ের অনুসরণ করিয়া থাকে, তাহারা অতি মহৎ(বহুকালব্যাপী) অবিদ্যা- বাসনাদিরূপ মৃত্যুর পাশ অর্থাৎ জন্ম-মরণাদি ক্লেশ প্রাপ্ত হয়। এই কারণে ধীরগণ ধ্রুব অর্থাৎ প্রকৃত সত্য মোক্ষের স্বরূপ অবগত হইয়া এই জগতে অধ্রুব বা মিথ্যা বস্তু বিষয়ে কিছুই প্রার্থনা বা পাইতে ইচ্ছা করে না ॥ ৭৩।২ ॥
যৎ তাবং স্বাভাবিকং পরাগেবানাত্মদর্শনং, তদাত্মদর্শনস্য প্রতিবন্ধকারণমবিদ্যা, তৎপ্রতিকূলত্বাৎ যা চ পরাক্ষু এবাবিদ্যোপ প্রদর্শিতেষু দৃষ্টাদৃষ্টেষু ভোগেযু তৃষ্ণা, তাভ্যামবিদ্যা-তৃষ্ণাভ্যাং প্রতিবন্ধাত্মদর্শনাঃ পরাচো বহির্গতানেব কামান্ কাম্যান্ বিষয়ান্ অনুষন্তি অনুগচ্ছন্তি, বালা অল্প প্রজ্ঞাঃ। তে তেন কারণেন মৃত্যোরবিদ্যা- কামকৰ্ম্মসমুদায়স্য যন্তি গচ্ছন্তি বিততস্য বিস্তীর্ণস্য সর্ব্বতো ব্যাপ্তস্থ্য পাশং-পাশ্যতে বধ্যতে যেন, তং পাশং-দেহেন্দ্রিয়াদিসংযোগ-বিয়োগলক্ষণম্ অনবরতং জন্ম-মরণ- জরা-রোগাদ্যনেকানর্থব্রতং প্রতিপদ্যন্ত ইত্যর্থঃ। যত এবম্, অথ তস্মাৎ ধীরা বিবেকিনঃ প্রত্যগাত্মস্বরূপাবস্থানলক্ষণম্ অমৃতত্বম্ ধ্রুবং বিদিত্বা। দেবাদ্যমৃতত্বং হ্রধ্রবম্, ইদন্তু প্রত্যগাত্মস্বরূপাবস্থানলক্ষণং ধ্রুবম্, “ন কৰ্ম্মণা বর্দ্ধতে, নো কনীয়ান্ ইতি শ্রুতেঃ। তদেবস্তুতং কূটস্থম্ অবিচাল্যম্ অমৃতত্বং বিদিত্বা অধ্রবেষু সর্ব্বপদার্থেষু অনিত্যেষু নির্দ্ধার্য্য ব্রাহ্মণা ইহ সংসারেহনর্থপ্রায়ে ন প্রার্থয়ন্তে কিঞ্চিদপি; প্রত্যগাত্মদর্শন প্রতিকূলত্বাৎ। পুত্র-বিত্ত-লোকৈষণাভ্যো ব্যুটিষ্ঠন্ত্যে- বেত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৭৩॥ ২॥
লোকের স্বভাবসিদ্ধ যে, বাহ্য অনাত্ম-পদার্থ দর্শন, আত্মদর্শনের প্রতিকূল বলিয়া, তাহাই অবিদ্যা পদবাচ্য; সেই অবিদ্যা এবং আত্ম- দর্শনের প্রতিকূলাত্মক অবিদ্যা-সম্পাদিত যে ঐহিক ও পারলৌকিক বাহ্য-বিষয়ে ভোগ-তৃষ্ণা, এতদুভয়ের দ্বারা যে সকল বালক বা অল্পবুদ্ধি
লোক আত্মদৃষ্টি-রহিত হইয়া পরাক্ অর্থাৎ কেবল অনাত্ম-বাহ্য বিষয় সমুহেরই অনুগমন বা অনুসরণ করে, তাহারা সেই কারণেই বিতত অর্থাৎ বিস্তীর্ণ-সর্বতোভাবে পরিব্যাপ্ত অবিদ্যা, কামনা ও কৰ্ম্ম, এতৎসমুদয়াত্মক মৃত্যুর-যাহা দ্বারা[জীবগণ] আবদ্ধ হয়, সেই দেহেন্দ্রিয়াদির সংযোগ-বিয়োগাত্মক, পাশ অর্থাৎ নিরন্তর জন্ম, মরণ, জরা ও রোগ প্রভৃতি বহুবিধ অনর্থরাশি প্রাপ্ত হয়। যেহেতু[অবি- বেকে] এইরূপ হয়, সেই হেতুই ধীর অর্থাৎ বিবেকিগণ, ব্রহ্মাত্মভাবে অবস্থানরূপ অমৃতত্বকে(মোক্ষকে) ‘ধ্রুব’ জানিয়া,(অর্থাৎ দেবাদি- ভাবরূপ যে অমৃতত্ব, উহা অধ্রুব(চিরস্থায়ী নহে), কিন্তু এই ব্রহ্মাত্ম- স্বরূপে অবস্থিতিরূপ অমৃতত্বই ধ্রুব; কারণ, শ্রুতি বলিয়াছেন-‘ইহা কৰ্ম্ম দ্বারা বৃদ্ধিও পায় না, হ্রাসও পায় না‘। এইরূপ কূটস্থ(যাহা চিরকাল একরূপে থাকে, এমন) এবং কোন কর্মের স্বরূপ ফল নহে; ইহা জানিয়া ব্রাহ্মণগণ) এই অনর্থবহুল সংসারে অনিত্য সর্বপদার্থ মধ্যে কিছুই প্রার্থনা করেন না। কারণ, তৎসমস্তই পরমাত্ম-দর্শনের প্রতিকূল; এইজন্য তাঁহারা পুত্র, বিত্ত ও লোকবিষয়ক কামনা হইতে ব্যুত্থান করেন; অর্থাৎ সেই সমুদয়ের কামনা পরিত্যাগ করেন ॥ ৭৩৷৷২৷৷
এতদ্বৈ তৎ ॥৭৪॥৩॥
[ যদধিগমে অন্যত্র প্রার্থনানিবৃত্তির্ভবতি, তৎস্বরূপ-বিবক্ষয়া আহ] — যেনেতি। যেন এতেনৈব(জ্ঞানস্বরূপেণ আত্মনা প্রেরিতো জীবঃ) রূপং, রসং, গন্ধং, শব্দান্, মৈথুনান্(পরস্পর-সংযোগজান্) স্পর্শান্ চ বিজানাতি; অত্র(আত্মনি, আত্মস্বরূপাবস্থিতিরূপে মোক্ষে ইত্যর্থঃ।)[জ্ঞাতব্যতয়া] কিং পরিশিষ্যতে?[ন কিঞ্চিদপীত্যর্থঃ][স সর্ব্বজ্ঞো ভবতীত্যভিপ্রায়ঃ]। এতৎ বৈ(এতদেব নচিকেতসা পৃষ্টং যৎ) তৎ(বিষ্ণোঃ পরমং পদমিত্যর্থঃ ॥
যাহার লাভে অন্য সর্ব্ববিষয়ে তৃষ্ণার নিবৃত্তি হইয়া যায়, তাহার স্বরূপ নির্দেশের অভিপ্রায়ে বলিতেছেন,[জীব] এই যে জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মার[প্রেরণায় প্রেরিত হইয়া] রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও পরস্পরের সংযোগ-জাত স্পর্শ অবগত হয়। ইহাতে অর্থাৎ সেই আত্মাধিগমাত্মক মোক্ষে আর কি[জ্ঞাতব্য] অবশিষ্ট থাকে? অর্থাৎ সে অবস্থায় কিছুই আর জ্ঞাতব্য থাকে না, তখন আত্মা সর্ব্বজ্ঞতা লাভ করে ॥৭৪॥৩৷৷
যদ্বিজ্ঞানাৎ ন কিঞ্চিদন্যৎ প্রার্থয়ন্তে ব্রাহ্মণাঃ, কথং তদধিগম ইতি? উচ্যতে- যেন বিজ্ঞানস্বভাবেন আত্মনা রূপং রসং গন্ধং শব্দান্ স্পর্শান্ চ মৈথুনান্ মৈথুননিমি- ত্তান্ সুখপ্রত্যয়ান্ বিজানাতি বিস্পষ্টং জানাতি সর্ব্বো লোকঃ। ননু নৈবং প্রসিদ্ধি- র্লোকস্য ‘আত্মনা দেহাদিবিলক্ষণেনাহং জানানামি’ ইতি; ‘দেহাদিসঙ্ঘাতোহহং বিজানামি’ ইতি তু সর্ব্বো লোকোহবগচ্ছতি। নমু, দেহাদিসঙ্ঘাতস্যাপি শব্দাদি- স্বরূপত্বাবিশেষাদবিজ্ঞেয়ত্বাবিশেষাচ্চ ন যুক্তং বিজ্ঞাতৃত্বম্। যদি হি দেহাদিসঙ্ঘাতো রূপাদ্যাত্মকঃ সন্ রূপাদীন্ বিজানীয়াৎ, তর্হি বাহ্যা অপি রূপাদয়োহন্যোন্যং স্বং স্বং রূপঞ্চ বিজানীযুঃ; ন চৈতদস্তি। তস্মাৎ দেহাদিলক্ষণাংশ রূপাদীন্ এতেনৈব দেহাদিব্যতিরিক্তেনৈব বিজ্ঞানস্বভাবেন আত্মনা বিজানাতি লোকঃ। যথা, যেন লৌহো দহতি, সোহগ্নিরিতি তদ্বৎ। আত্মনোহবিজ্ঞেয়ং কিমত্র অস্মিন্ লোকে পরিশিষ্যতে, ন কিঞ্চিৎ পরিশিষ্যতে, সর্ব্বমেব ত্বাত্মনা বিজ্ঞেয়ম্। যস্যা- ত্মনোহবিজ্ঞেয়ং ন কিঞ্চিৎ পরিশিষ্যতে, স আত্মা সর্ব্বজ্ঞঃ। এতদ্বৈ তৎ। কিং তৎ? যৎ নচিকেতসা পৃষ্টং, দেবাদিভিরপি বিচিকিৎসিতং, ধর্মাদিভ্যোহন্যৎ রিষ্ণোঃ পরমং পদং, যস্মাৎ পরং নাস্তি, তদ্বৈ এতদধিগতমিত্যর্থঃ ॥ ৭৪ ॥ ৩॥
যাহাকে জানিলে পর ব্রাহ্মণগণ অন্য কিছুই প্রার্থনা করেন না; তাহাকে জানা যায় কি উপায়ে? তাহা বলিতেছেন,—সমস্ত লোক যেই বিজ্ঞানস্বরূপ আত্মা দ্বারা রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ ও মৈথুন অর্থাৎ পরস্পর সংযোগ-জাত সুখানুভূতি বিস্পষ্টরূপে জানিতে পারে। ভাল, আমরা যে,দেহাদি-ব্যতিরিক্ত বা দেহাদি জড় পদার্থ হইতে সম্পূর্ণ
পৃথক্ স্বভাব আত্মা দ্বারা সমস্ত বিষয় জানিতেছি, এ-রূপ ত লোক- প্রসিদ্ধি নাই; অর্থাৎ কেহই ঐরূপ মনে করে না; পরন্তু ‘দেহেন্দ্রিয়া- দির সংঘাতরূপী আমি জানিতেছি’, এইরূপই সকলে মনে করিয়া থাকে।[বেশ কথা,] জিজ্ঞাসা করি,[অচেতন] দেহাদি-সমষ্টির যখন শব্দাদি বিষয় হইতে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য নাই, এবং জ্ঞেয়ত্ব অংশেও যখন উভয়ের মধ্যে কিছুমাত্র বিশেষ নাই, অর্থাৎ শব্দাদি বিষয়ের ন্যায় দেহাদি-সংঘাতও যখন অচেতন এবং জ্ঞেয় পদার্থ; তখন দেহাদি- সংঘাতেরও জ্ঞাতৃত্ব সঙ্গত হইতে পারে না। আর দেহাদি-সংঘাত যদি রূপাদির স্বরূপ বা অনুরূপ হইয়াও রূপাদি বিষয়সমূহকে জানিতে পারে, তাহা হইলে স্বয়ং দৃশ্যরূপাদি বিষয়সমূহও পরস্পরে পরস্পরকে জানিতে পারিত; অথচ তাহা কখনই হয়না। অতএব লোকে দেহে- ন্দ্রিয়াদিগত শব্দাদি বিষয়সমূহকেও দেহাদি হইতে পৃথক-এই বিজ্ঞান- স্বরূপ আত্মার সাহায্যেই অবগত হইয়া থাকে। যেমন লৌহ যাহার সাহায্যে দাহ হয়, তাহার নাম অগ্নি; এখানেও তেমনি ভাব বুঝিতে হয়। এই জগতে আত্মার অবিজ্ঞেয় কি পদার্থ আছে? কিছুই নাই; সমস্ত বস্তুই আত্মার বিজ্ঞেয়। যে আত্মার অবিজ্ঞেয় কিছুই অবশিষ্ট নাই; অর্থাৎ যে আত্মার কিছুই জানিতে বাকি নাই; সেই আত্মাই সর্বজ্ঞ। ইহাই সেই বস্তু; সেইটি কি, না-যাহা নচিকেতার জিজ্ঞাসিত, দেবতা প্রভৃতিরও সংশয় স্থল ও ধর্মাদি হইতে পৃথক্ বিষ্ণুর পরম পদ এবং যাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কিছু নাই; তাহাই এই পরিজ্ঞাত বস্তু ॥৭৪॥৩৷৷
স্বপ্নান্তং জাগরিতান্তং চোভৌ যেনানুপশ্যতি। মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি ॥৭৫॥৪॥
[পুনরপি তমেবার্থং ব্যক্তীকরোতি স্বপ্নান্তমিত্যাদিনা]—স্বপ্নান্তং(সুষুপ্তিং) জাগরিতান্তং(স্বপ্নং), যদ্বা, স্বপ্নান্তং(স্বপ্নদৃশ্যং) জাগরিতান্তং(জাগ্রদৃশ্যং)
চ, উভৌ(সুযুপ্তি-স্বপ্নৌ) যেন(চৈতন্যাত্মনা)[প্রেরিতো জীবঃ] অনুপশ্যতি। [তং] মহান্তং বিভুম্ আত্মানং মত্বা-(বিদিত্বা) ধীরঃ(বিবেকী) ন শোচতি [‘স মুচ্যতে ইতি ভাবঃ]॥
জীব, স্বপ্নান্ত অর্থাৎ স্বপ্নকালীন দৃশ্য ও জাগরিতান্ত অর্থাৎ জাগ্রদবস্থায় দৃশ্য বস্তু, এই উভয়প্রকার দৃশ্য বস্তু যাহা দ্বারা দর্শন করে, ধীর ব্যক্তি সেই মহান্, বিভু আত্মাকে মনন করার পর আর দুঃখ বোধ করেন না ॥৭৫৷৪॥]
অতি সূক্ষ্মত্বাৎ দুর্বিজ্ঞেয়মিতি মত্বা এতমেবার্থং পুনঃ পুনরাহ—স্বপ্নান্তং স্বপ্নমধ্যং স্বপ্নবিজ্ঞেয়মিত্যর্থঃ। তথা জাগরিতান্তং জাগরিতমধ্যং জাগরিতবিজ্ঞেয়ং চ, উভৌ স্বপ্ন-জাগরিতান্তৌ যেনাত্মনা অনুপশ্যতি লোক ইতি সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ। তং মহান্তং বিভুম্ আত্মানং মত্বা অবগম্য আত্মভাবেন সাক্ষাৎ ‘অহমস্মি পরমাত্মা’ ইতি, ধীরো ন শোচতি ॥৭৫॥৪॥
[ পরমাত্মার] অতিসূক্ষমতাই, দুর্বিজ্ঞেয়তার কারণ; ইহা মনে করিয়া এই একই বিষয়কে বারংবার বলিতেছেন,—স্বপ্নান্ত অর্থ—স্বপ্ন- মধ্য অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থায় দৃশ্য; সেইরূপ, জাগরিতান্ত অর্থ—জাগরিত-মধ্য অর্থাৎ জাগ্রৎ অবস্থায় যাহা বিজ্ঞেয়। লোকে যে আত্মার সাহায্যে এই উভয়বিধ স্বপ্নান্ত ও জাগরিতান্ত বস্তুনিচয় দর্শন করে। অন্যান্য কথা সমস্তই পূর্ববৎ। ধীর ব্যক্তি সেই মহান্ বিভু(ব্যাপক) আত্মাকে মনন করিয়া—অর্থাৎ আমিই পরমাত্মস্বরূপ, এইরূপে আত্ম-সাক্ষাৎ- কার করিয়া আর শোক করেন না ॥৭৫॥৪॥
য ইমং মধবদং বেদ আজ্ঞানং জীবমন্তিকাৎ।
ঈশানং ভূত-ভব্যস্য ন ততো বিজুগুপ্সতে ॥
এতদ্বৈ তৎ ॥ ৭৬ ॥ ৫ ॥
যঃ(অধিকারী) ইমং মধ্বদং(মধু-কর্মফলং অভীতি-মধ্বদঃ, তং সংসারিণ- মিতি যাবৎ) জীবং(প্রাণাদিধারকং) আত্মানং ভূত-ভব্যস্য(দ্বন্দৈকবদ্ভাবঃ,
১৭
ভূত-ভাবিনোঃ) ঈশানম(প্রেরকং) অন্তিকাৎ(স্বসমীপে অস্মিন্নেব দেহে) বেদ (জানাতি)।[সঃ] ততঃ[অদ্বিতীয় ব্রহ্মাত্মৈকত্ববিজ্ঞানাৎ] ন বিজুগুপ্সতে [আত্মৈকত্ব-দর্শিনঃ ভেদজ্ঞানাভাবাৎ অন্যতো ভয়েন আত্মানং রক্ষিতুং নেচ্ছ- তীতি ভাবঃ]। এতদ্বৈ তৎ, যৎ ত্বয়া পৃষ্টং। যদ্বা, ততঃ(তস্মাৎ ব্রহ্মাত্মৈকত্বদর্শিনঃ সকাশাৎ অন্যঃ কশ্চিৎ ভয়েন আত্মানং গোপায়িতুং নেচ্ছতীতি ভাবঃ)। অন্যৎ সমানম্ ॥
যে অধিকারী পুরুষ কর্ম্মফলভোক্তা ও প্রাণধারক এই আত্মাকে এই দেহেই অতীত ও অনাগত বিষয়ের ঈশান অর্থাৎ প্রেরক বলিয়া জানেন; তিনি সেই জ্ঞানবশতঃ[ভয়ে] আত্মাকে গোপন করিয়া রাখেন না। অর্থাৎ সর্ব্বত্র এক ব্রহ্মসত্তা দর্শন করায় তাঁহার ভয় থাকে না; সুতরাং আত্মগোপনেরও প্রয়োজন হয় না। অথবা তাঁহার নিকটও কেহ আত্মগোপন করা আবশ্যক মনে করে না ॥৭৬৷৫ ॥]
কিঞ্চ, যঃ কশ্চিৎ ইমং মধ্বদং কৰ্ম্মফলভুজং জীবং প্রাণাদিকলাপস্য ধারয়ি- তারম্ আত্মানং বেদ বিজানাতি, অন্তিকাৎ অন্তিকে সমীপে ঈশানম্ ঈশিতারং ভূত- ভব্যস্য কালত্রয়স্য, ততঃ তদ্বিজ্ঞানাৎ ঊর্দ্ধমাত্মান’ ন বিজুগুপ্সতে-ন গোপায়িতু- মিচ্ছতি অভয়প্রাপ্তত্বাৎ। যাবৎ হি ভয়মধ্যস্থোহনিত্যম্ আত্মানং মন্যতে, তাবৎ গোপায়িতুমিচ্ছতি আত্মানম্। যদা তু নিত্যম্ অদ্বৈতম্ আত্মানং বিজানাতি, তদা কিং কঃ কুতো বা গোপায়িতুমিচ্ছেৎ। এতদ্বৈ তদিতি পূর্ব্ববৎ ॥ ৭৬ ॥ ৫ ॥
আরও এক কথা,—যে কোন লোক মধ্বদ অর্থাৎ কৰ্ম্ম-ফল- ভোক্তা ও প্রাণাদিসমুদায়ের ধারক—জীব আত্মাকে স্বসমীপে ভূত-ভব্যের অর্থাৎ ত্রিকালের ঈশান বা ঈশ্বর বলিয়া জানেন,(তিনি) সেই বিজ্ঞানের পর আত্মাকে গোপন করিতে ইচ্ছা করেন না; কারণ, তিনি অভয়(ভয়রহিত ব্রহ্মভাব) প্রাপ্ত হইয়াছেন। জীব যে পর্য্যন্ত ভয়মধ্যবর্তী থাকিয়া আত্মাকে অনিত্য মনে করে; সেই পর্য্যন্তই আত্মাকে গোপন করিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু, যখন অদ্বৈত আত্ম-তত্ত্ব জানিতে পারে, তখন কে কাহার নিকট হইতে কেন বা কি
গোপন করিবে? * ‘ইহাই সেই জিজ্ঞাসিত বিষয়;’ ইহার ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ ॥ ৭৬ ॥ ৫ ॥
যঃ পূর্ব্বং তপসো জাতমদ্যুঃ পূর্ব্বমজায়ত। গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তং যো ভূতেভিব্যপশ্যত। এতদ্বৈ তৎ ॥৭৭॥৬৷৷
যঃ(পরমপুরুষঃ) পূর্ব্বং(প্রথমং) তপসঃ(জ্ঞানময়াৎ ব্রহ্মণঃ) জাতম্(উৎ- পন্নং সৎ) অদ্যুঃ[অত্র অপ্ শব্দঃ পঞ্চভূতোপলক্ষকঃ],[ততশ্চ—পঞ্চভূতেভ্যঃ] পূর্ব্বম্(অগ্রে) অজায়ত। গুহাং(সর্ব্বপ্রাণি-হৃদয়ং) প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তং(তত্র স্থিত্বা শব্দাদি-বিষয়ান্ উপভুঞ্জানং) ভূতেভিঃ(ভূতৈঃ—ভূতকার্য্যেঃ দেহেন্দ্রিয়াদিভিঃ উপলক্ষিতং)[তং; যঃ(মুমুক্ষুঃ) ব্যপশ্যত(বিশেষেণ পশ্যতি ইত্যর্থঃ)। “এতৎ বৈ তৎ” ইত্যেতৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ ॥
তপ অর্থাৎ তপোময়(জ্ঞানময় ব্রহ্ম) হইতে প্রথমজাত যে পুরুষ(হিরণ্যগর্ভ) জলের(বস্তুতঃ সমস্ত ভূতের) পূর্ব্বে জন্মলাভ করিয়াছেন, প্রাণিগণের হৃদয়রূপ গুহায় প্রবিষ্ট এবং পঞ্চভূতের পরিণাম দেহেন্দ্রিয়াদি-সমন্বিত সেই পুরুষকে যে
মুমুক্ষু ব্যক্তি দর্শন করেন; বস্তুতঃ তিনিই সেই আত্মাকে দর্শন করেন। ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই আত্মতত্ত্ব ॥৭৭৷৷৬৷৷
শঙ্করভাষ্যম্।
যঃ প্রত্যগাত্মা ঈশ্বরভাবেন নির্দিষ্টঃ, স সর্ব্বাত্মা, ইত্যেতৎ দর্শয়তি,-যঃ কশ্চিৎ মুমুক্ষুঃ পূর্ব্বং প্রথমং তপসো জ্ঞানাদিলক্ষণাৎ ব্রহ্মণ ইত্যেতৎ, জাতমুৎপন্নং হিরণ্য- গর্ভম্। কিমপেক্ষ্য পূর্ব্বম্? ইত্যাহ-অদ্যঃ পূর্ব্বম্, অপ্ সহিতেভ্যঃ পঞ্চভূতেভ্যঃ, ন কেবলাভ্যোহদ্ভ্য ইত্যভিপ্রায়ঃ। অজায়ত, উৎপন্নো যঃ, তং প্রথমজং, দেবাদি- শরীরাণি উৎপাদ্য সর্ব্বপ্রাণিগুহাং হৃদয়াকাশং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তং শব্দাদীন্ উপলভ- মানং, ভূতেভির্ভূতৈঃ কার্য্য-কারণলক্ষণৈঃ সহ তিষ্ঠন্তং যো ব্যপশ্যত-যঃ পশ্য- তীত্যর্থঃ। যঃ এবং পশ্যতি, স এতদেব পশ্যতি-যৎ তৎ প্রকৃতং ব্রহ্ম ॥৭৭৷৬৷৷
পূর্ব্বে যাহাকে প্রত্যক্-আত্মা পরমেশ্বর বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে; তিনিই যে, সকলের আত্মস্বরূপ; এখন তাহা প্রদর্শন করিতেছেন,-প্রথমে তপ অর্থাৎ জ্ঞানাদিময় ব্রহ্ম হইতে জাত- হিরণ্যগর্ভকে-, কাহার পূর্ব্বে জাত? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিলেন- জলের পূর্ব্বে; অভিপ্রায় এই যে, কেবল জলেরই পূর্ব্বে নহে-জল ও অপর চারি ভূত, এই পঞ্চভূতেরই পূর্ব্বে যিনি জন্মধারণ করিয়াছেন এবং দেবতাপ্রভৃতির শরীর সমুৎপাদন পূর্ব্বক সমস্ত প্রাণীর গুহা বা হৃদয়াকাশে প্রবিষ্ট হইয়া অবস্থান করিতেছেন; অর্থাৎ শব্দাদি বিষয় সমূহ ভোগ করিতেছেন। ‘ভূত’ অর্থ কার্য্য-কারণময় দেহেন্দ্রিয়াদি- সমষ্টি; তৎসহযোগে বর্তমান সেই প্রথমজাত হিরণ্যগর্ভকে যে মুমুক্ষু পুরুষ দর্শন করেন। যিনি উক্তপ্রকার আত্মভাব দর্শন করেন; তিনি বস্তুতঃ পূর্ব্বকথিত সেই ব্রহ্মকেই দর্শন করেন ॥৭৭৷৬৷৷
যা প্রাণেন সংভবতি অদিতর্দেবতাময়ী।
গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তীং যা ভূতেভিব্যজায়ত।
এতদ্বৈ তং ॥৭৮॥৭॥
পুনরপি হিরণ্যগর্ভদেব বিশিষ্যাহ—যা ইতি। যা দেবতাময়ী(সর্ব্বদেবতা-
ত্মিকা)[অত্র প্রাধান্যাৎ দেবতোল্লেখঃ।] অদিতিঃ(অদনাৎ-সর্ব্বজগদ্- ভোক্তৃত্বাৎ ‘অদিতি’-শব্দ-বাচ্যা দেবতা) প্রাণেন(হিরণ্যগর্ভরূপেণ) সংভবতি (অভিব্যজ্যতে)। যা[চ] ভূতেভিঃ(ভূতৈঃ সহিতা) ব্যজায়ত(উৎপন্না)। গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তীং[তাং যঃ পশ্যতি সঃ] এতৎ এব[পশ্যতি; যৎ তৎ নচিকেতসা পৃষ্টং ইত্যাদি সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ]
সর্ব্বদেবতাময়ী যে অদিতি সর্ব্বজগদ্ভোক্ত্রী) প্রাণরূপে অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভরূপে সম্ভূত হইয়াছিলেন; এবং যিনি সর্ব্বভূত-সমন্বিত হইয়া প্রকটিত হইয়াছেন; গুহাবস্থিত তাঁহাকে যিনি দর্শন করেন, তিনিই প্রকৃতপক্ষে নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই আত্মস্বরূপ দর্শন করেন ॥৭৮৷৷৭৷৷
কিঞ্চ, যা সর্বদেবতাময়ী সর্ব্বদেবাত্মিকা প্রাণেন হিরণ্যগর্ভরূপেণ পরস্মাদব্রহ্মণঃ সম্ভবতি, শব্দাদীনাম্ অদনাৎ অদিতিঃ, তাং পূর্ব্ববদ্ গুহাং প্রবিশ্য তিষ্ঠন্তীম্ অদিতিম্। তামের বিশিনষ্টি,—যা ভূতেভিঃ ভূতৈঃ সমন্বিতা ব্যজায়ত - উৎপন্নেত্যেতৎ ॥৭৮॥৭৷৷
সর্বদেবাত্মিকা যে অদিতি প্রাণ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভরূপে পরব্রহ্ম হইতে সম্ভূত হন, শব্দাদি বিষয়সমূহ ভোগ করেন বলিয়া তাঁহাকে অদিতি বলা হয়। পূর্ব্বোক্ত গুহায় প্রবিষ্ট হইয়া অবস্থিত সেই অদিতিকে[ যিনি জানেন] সেই অদিতিকেই বিশেষ করিয়া বলিতে- ছেন যে, যেই অদিতি ভূতবর্গসমন্বিত হইয়া উৎপন্ন হইয়াছেন। [ অন্যান্য অংশ পূর্ব্বোক্ত শ্লোকের ব্যাখ্যারই অনুরূপ] ॥৭৮॥৭॥
অরণ্যোনিহিতো জাতবেদা- গর্ভ ইব সুভূতো গর্ভিণীভিঃ। দিবে দিব ঈড্যো জাগৃবদ্ভি- র্হবিস্মত্তির্মনুয্যেভিরগ্নিঃ ॥ এতদ্বৈ তৎ ॥৭৯৷৷৮৷৷
গর্ভিণীভিঃ(গর্ভবতীভিঃ) সুভৃতঃ(সুপথ্যভোজনাদিনা পরিপোষিতঃ) গর্ভ ইব
অরণ্যোঃ(উত্তরাধয়ারণ্যোঃ, তৎসদৃশে যজ্ঞে হৃদয়ে চ) নিহিতঃ(স্থিতঃ;[যঃ] জাতবেদাঃ(অগ্নিঃ, জাতং সর্ব্বং বেত্তীতি জাতবেদাঃ-সর্ব্বজ্ঞঃ বিরাট্ পুরুষশ্চ) মনুষ্যেভিঃ জাগৃবদ্ভিঃ(জাগরণশীলৈঃ, প্রমাদরহিতৈঃ যোগিভিঃ) হবিষ্মদ্ভিঃ(হবন- কর্তৃভিশ্চ কর্মিভিঃ চ সদ্ভিঃ ইত্যর্থঃ) দিবেদিবে(প্রত্যহং) ঈড্যঃ(যজ্ঞে স্তবনীয়ঃ, হৃদয়ে চ ধ্যাতঃ)[ভবতি]; এতৎ বৈ তৎ ইতি পূর্ব্ববৎ ॥
গর্ভিণীগণ গর্ভস্থ শিশুকে যেরূপ উপযুক্ত অন্নপানাদি দ্বারা পরিপুষ্ট করিয়া থাকেন, সেইরূপ জাগৃবান্ অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞান বিষয়ে প্রমাদরহিত ও হবিস্মৎ (যাঁহারা যজ্ঞে হোম করেন,) মনুষ্যগণ দ্বিবিধ অরণীতে,(উত্তরারণী ও অধরারণীতে, অর্থাৎ হৃদয়ে ও যজ্ঞে) নিহিত বা অবস্থিত যে জাতবেদা—অগ্নিকে (ভৌতিক অগ্নি ও বিরাট, পুরুষ, এই উভয়কে)[উপযুক্ত ক্রিয়া ও সদাচার দ্বারা] পরিপুষ্ট করেন, এবং প্রত্যহ[হৃদয়ে] ধ্যান ও[যজ্ঞে] স্তব করেন; তিনি সেই বস্তু ॥৭৯৷৷৮৷৷]
কিঞ্চ; যোহধিযজ্ঞে উত্তরাধরারণ্যোনিহিতঃ স্থিতো জাতবেদা অগ্নিঃ; পুনঃ সর্ব্বহবিষাং ভোক্তা, অধ্যাত্মঞ্চ যোগিভির্গর্ভ ইব গর্ভিণীভিরন্তর্ব্বত্নীভিঃ অগর্হিতান্ন- পান-ভোজনাদিনা যথা গর্ভঃ সুভৃতঃ সুষ্ঠু সম্যগ্ ভূতো লোক ইব, ইথমেব ঋত্বিগ্ভির্যোগিভিশ্চ সুভৃত ইত্যেতৎ।
কিঞ্চ, দিবে দিবে অহন্যহনি ঈড্যঃ স্তুত্যো বন্দ্যশ্চ কস্মিভির্যোগিভিশ্চ—অধ্বরে হৃদয়ে চ, জাগৃবভির্জাগরণশীলৈঃ অপ্রমত্তৈরিত্যেতৎ; হবিষ্মদ্ভিঃ আজ্যাদিমস্তিঃ ধ্যানভাবনাবভিশ্চ, মনুষ্যেভির্ম নুষ্যৈরগ্নিঃ। এতদ্বৈ তৎ—তদেব প্রকৃতং ব্রহ্ম ॥৭৯৷৷৮৷৷ ভাষ্যানুবাদ।
আরও এক কথা,—অধিযজ্ঞে অর্থাৎ অগ্নিসাধ্য যজ্ঞে উত্তর ও অধর অরণীতে * স্থিত অগ্নি সমস্ত হবিঃ(যজ্ঞে প্রদেয় বস্তুকে ‘হবিঃ, বলা হয়) ভোগ করেন, এবং অধ্যাত্ম বিষয়ে—গর্ভিণীগণ কর্তৃক
গর্ভ(গর্ভস্থ সন্তান) যেরূপ অদূষিত অন্নপানাদি দ্বারা যথোপযুক্তরূপে পরিপোষিত হয়, সেইরূপ যোগিগণ কর্তৃক সম্যরূপে পরিপোষিত হন অর্থাৎ ঋত্বিক্(যাজ্ঞিক) ও যোগিগণ কর্তৃক সুভূত হন।
আরও এক কথা, এই অগ্নি জাগৃবান্—জাগরণশীল অর্থাৎ প্রমাদ- শূন্য যোগিগণকর্তৃক হৃদয়ে বন্দনীয় এবং হবিস্মৎ অর্থাৎ আজ্যাদি যজ্ঞোপকরণ-সম্পন্নগণকর্তৃক যজ্ঞে অর্চ্চনীয়।[অভিপ্রায় এই যে,] তিনি যাজ্ঞিক ও ধ্যানী, উভয়প্রকার মনুষ্যেরই সেবনীয়। এই বিরাট্- রূপী অগ্নিই সেই প্রস্তাবিত ব্রহ্ম স্বরূপ ॥ ৭৯ ॥ ৮ ॥
যতশৌচাদেবতি সূর্য্যঃ অস্তং যত্র চ গচ্ছতি।
তং দেবাঃ সর্ব্বে অপিতান্তদু নাভ্যোতি কশ্চন।
এতদ্বৈ তৎ ॥৮০॥৯॥
[ পুনশ্চ মহিমোক্তিপূর্ব্বকং তৎ পৃষ্টং বিশিষ্যাহ, যতশ্চোদেতীতি]—সূর্য্যঃ [ প্রত্যহং। যতঃ(যস্মাৎ, উদেতি, প্রাণাৎ)[ প্রলয়কালে চ] যত্র(যস্মিন্ চ) অস্তং(অদর্শনং) গচ্ছতি। সর্ব্বে দেবাঃ(প্রকাশন-স্বভাবানি ইন্দ্রিয়াণি) তং (প্রাণং) অপিতাঃ,(তমাশ্রিত্য স্থিতা ইত্যর্থঃ)। তৎ(তং সর্ব্বদেবাশ্রয়ং) কশ্চন (কোহপি)[গুণতঃ স্বরূপতো বা] ন উ(নৈব) অত্যেতি(অতিক্রামতি)। এতদ্বৈ তৎ, যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্ ॥
[পুনশ্চ মহিমা প্রদর্শন পূর্ব্বক নচিকেতার জিজ্ঞাসিত বিষয়ের স্বরূপ নির্দেশ করিতেছেন]—সূর্য্যদেব সৃষ্টিকালে যাঁহা হইতে উদিত হন, এবং প্রলয়- কালেও যাঁহাতে অস্তমিত হন, সমস্ত দেবতাগণ অর্থাৎ প্রকাশশীল ইন্দ্রিয়গণ সেই প্রাণকে আশ্রয় করিয়া রহিয়াছে; কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না, অর্থাৎ কেহই তৎস্বরূপাতিরিক্ত নহে। ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই বস্তু ॥ ৮০ ॥ ৯ ॥
কিঞ্চ; যতশ্চ যস্মাৎ প্রাণাৎ উদেতি উত্তিষ্ঠতি সূর্য্যঃ, অস্তং নিম্নোচনং তিরোধানং যত্র যস্মিন্নেব চ প্রাণে অহন্যহনি গচ্ছতি; তং প্রাণমাত্মানং দেবাঃ সর্ব্বেহগ্ল্যাদয়ঃ অধিদৈবং, বাগাদয়শ্চাধ্যাত্মং, সর্ব্বে বিশ্বে অরা ইব রথনাভৌ অর্পিতাঃ সম্প্রবেশিতাঃ
স্থিতিকালে; সোহপি ব্রহ্মৈব; তদেতৎ সর্ব্বাত্মকং ব্রহ্ম। তৎ উ নাত্যেতি নাতীত্য তদাত্মকতাং তদন্যত্বং গচ্ছতি কশ্চন কশ্চিদপি। এতদ্বৈ তৎ ॥ ৮০ ॥ ৯ ॥
আরও এক কথা,—সূর্য্য প্রতিদিন যে প্রাণ হইতে উদয় লাভ করেন, এবং যে প্রাণে অস্তমিত অর্থাৎ অদর্শন প্রাপ্ত হন। সমস্ত দেবগণ অর্থাৎ দেবাধিকারে অগ্নি প্রভৃতি দেবগণ, আর দেহাধিকারে বাগাদি ইন্দ্রিয়গণ সেই প্রাণরূপী আত্মাতে অর্পিত আছে, অর্থাৎ অব- স্থিতি কালে তাঁহারই মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট রহিয়াছে। উল্লিখিত প্রাণও নিশ্চয়ই ব্রহ্মস্বরূপ; সেই ব্রহ্মই সর্বাত্মক বা সর্বময়;[অতএব] কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না; অর্থাৎ তদাত্মকতা ত্যাগ করিয়া তদ্ভিন্নত্ব প্রাপ্ত হয় না। ইহাই সেই—॥৮০॥৯৷৷
যদেবেহ তদমূত্র, যদমুত্র তদন্বিহ।
মৃত্যোঃ ন মৃত্যুমাশ্নোতি য ইহ নানের পশ্যতি ॥৮১॥১০॥
[ইদানীম্ আত্মনঃ সার্ব্বকালিকমেকত্বং দর্শয়িতুমাহ যদিতি]। ইহ(অস্মিন্ লোকে) যৎ(আত্মবস্তু), অমুত্র(পরকালেহপি) তৎ(তদেব, ন তু ততঃ পৃথগিত্যর্থঃ।)[তথা] অমুত্র(পরলোকে) যৎ(আত্মবস্তু), ইহ (অস্মিন্ লোকেহপি) তৎ অনু(অনুগতং; ন ততঃ ভিন্নমিত্যর্থঃ।) অথবা,- ইহ(প্রত্যক্ষপরিদৃশ্যে কার্য্যোপাধৌ দেহে) যৎ(চৈতন্যং), অমুত্র(অদৃশ্যে কারণোপাধৌ মায়ায়াম্ অপি) তদেব, ন ততোহন্যদিত্যর্থঃ।)[তথা] অমুত্র (কারণোপাধৌ) যৎ(চৈতন্যং), ইহ(কার্য্যোপাধৌ অপি) তৎ(তদেব চৈতন্যং) অনু(অনুগতং)। যঃ(জনঃ) ইহ(আত্ম-চৈতন্যয়োঃ) নানা ইব (উপাধিভেদাৎ ভেদমিব) পশ্যতি। সঃ(ভেদদর্শী), মৃত্যোঃ মৃত্যুং(মরণাৎ পরমপি মরণং, ভূয়োভূয়ো মরণমনুভবতীত্যর্থঃ) ॥
এখন আত্মচৈতন্যের সার্ব্বকালিক একত্ব প্রদর্শন করিতেছেন, ইহ লোকে যে আত্মা, স্বর্গাদি পরলোকেও সেই আত্মাই, এবং পরলোকে যে আত্মা, ইহ লোকেও সেই আত্মাই অনুগত থাকে। অথবা, এই কার্য্যোপাধি দেহে যে
চৈতন্য, অদৃশ্য কারণোপাধি(ঈশ্বরোপাধি) মায়াতেও সেই চৈতন্যই; আর সেই কারণোপাধিতে যে চৈতন্য, এই কার্য্যোপাধি দেহেও সেই একই চৈতন্য অনুস্যুত রহিয়াছেন। যে লোক এই চৈতন্যে নানাভাবের ন্যায় দর্শন করে, সে লোক মৃত্যুর পর মৃত্যু প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ বারংবার জন্ম-মরণ-প্রবাহ লাভ করে ॥ ৮১ ॥ ১০ ॥
যদ্ ব্রহ্মাদি-স্থাবরাস্তেষু বর্ত্তমানং তত্তদুপাধিত্বাদব্রহ্মবদবভাসমানং সংসার্য্যন্যৎ পরস্মাদ্ব্রহ্মণ ইতি মাভূৎ কস্যচিদাশঙ্কা, ইতীদমাহ—
যদেবেহ কার্য্যকারণোপাধিসমন্বিতং সংসারধৰ্ম্মবৎ অবভাসমানম্ অবিবেকিনাং, তদেব স্বাত্মস্থম্ অমুত্র নিত্যবিজ্ঞানঘনস্বভাবংসর্ব্বসংসারধর্মবর্জিতং ব্রহ্ম। যচ্চ অমুত্র অমুস্মিন্ আত্মনি স্থিতং, তদন্বিহ-তদেবেহ নাম-রূপ-কার্য্য-কারণোপাধিমনু বিভাব্যমানং নান্যৎ। তত্রৈবং সতি উপাধিস্বভাব-ভেদদৃষ্টিলক্ষণয়াহবিদ্যয়া মোহিতঃ সন্ য ইহ ব্রহ্মণি অনানাভূতে ‘পরস্মাদন্যোহহং, মত্তোহন্যৎ পরং ব্রহ্ম, ইতি নানেব ভিন্নমিব পশ্যতি উপলভতে; স মৃত্যোঃ মরণাৎ মৃত্যুং মরণং পুনঃ পুনর্জন্ম-মরণ- ভাবম্ আপ্নোতি প্রতিপদ্যতে। তস্মাৎ তথা ন পশ্যেৎ। বিজ্ঞানৈকরসং নৈরন্তর্য্যেণ’ আকাশবৎ পরিপূর্ণং ব্রহ্মৈবাহমস্মাতি পশ্যেদিতি বাক্যার্থঃ ॥ ৮১ ॥ ১০ ॥
ব্রহ্মাদি স্তম্ব পর্য্যন্ত সর্ব বস্তুতে অবস্থিত এবং বিভিন্ন উপাধি- যোগে অব্রহ্মভাবে প্রতীয়মান যে সংসারী বা জীব-চৈতন্য, সেই সংসারী চৈতন্য পরব্রহ্ম হইতে পৃথক্; এইরূপ কাহারো আশঙ্কা হইতে পারে, সেই আশঙ্কা-নিবৃত্তির উদ্দেশে এই কথা বলিতেছেন— এখানে দেহেন্দ্রিয়াদিরূপ কার্য্য-কারণ-উপাধিসমন্বিত থাকায়(১)
১৮
বিবেকবিহীন জনগণের নিকট যে চৈতন্য[জন্ম-মরণাদিরূপ] সংসার ধৰ্ম্মবিশিষ্ট বলিয়া প্রতীত হন; স্বহৃদয়াভিব্যক্ত সেই চৈতন্যই পশ্চাৎ নিত্য বিজ্ঞানময় ও সর্ববিধ সংসার-ধর্মরহিত ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন। পক্ষান্তরে, সেই কারণোপাধিতে(অমুত্র) যে চৈতন্য অবস্থিত, সেই চৈতন্যই আবার এই নাম-রূপ ও কার্যকারণাত্মক উপাধিতে অনুগতভাবে প্রতীত হন, কিন্তু[তাহা হইতে] অন্য নহে। জীব ও ঈশ্বরোপাধিতে যখন চৈতন্যের একত্বই নির্দ্ধারিত হইল, তখন যে ব্যক্তি উপাধিসম্বন্ধ ও ভেদজ্ঞানের কারণীভূত অবিদ্যা দ্বারা বিমোহিত হইয়া অভিন্নস্বরূপ এই ব্রহ্মে ‘আমি পরব্রহ্ম হইতে অন্য, এবং পর- ব্রহ্মও আমা হইতে পৃথক্’ এইভাবে যেন নানাত্বই দর্শন করে, অর্থাৎ ভেদবৎ উপলব্ধি করে; সে ব্যক্তি মৃত্যুর পর মৃত্যু—মরণকে অর্থাৎ পুনঃপুনঃ জন্ম-মরণভাব প্রাপ্ত হয়। অতএব, ঐরূপ ভেদদর্শন করিবে না; পরন্তু, ‘আমি আকাশবৎ পরিপূর্ণ ব্রহ্মস্বরূপই বটে,’ এইরূপে দর্শন করিবে ॥ ৮১ ॥ ১০ ॥
মনসৈবেদমাপ্তব্যং নেহ নানাস্তি কিঞ্চন।
এতদ্বৈ তৎ ॥ ৮২॥ ১১॥.
[ ইদানীং চৈতন্যৈকত্বদর্শনোপায়ং বিবক্ষন্ ভেদদর্শনম্ অপবদতি]—মন- সৈবেতি। মনসা(শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশ-সংশোধিতেন অন্তঃকরণেন) এব ইদম্ (ব্রহ্মৈকত্বম্) আপ্তব্যম্(উপলভ্যম্)[নান্যেন কেনচিৎ, ইত্যভিপ্রায়ঃ।] ইহ (ব্রহ্মণি) কিঞ্চন(কিঞ্চিদপি অত্যল্পমপি ইত্যর্থঃ) নানা(ভেদঃ) নাস্তি, [ইত্যেতৎ ব্রহ্মাবগতৌ বুধ্যতে, ইতি বাক্যশেষঃ।] য ইহ নানা ইব[নতু নানাত্বমস্তি] পশ্যতি; স মৃত্যোঃ[পরং] মৃত্যুং গচ্ছতি।[অন্য-ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥
একমাত্র মনের দ্বারাই এই ব্রহ্মৈকত্ব(ব্রহ্মের একত্ব) প্রাপ্ত বা অবগত হইতে হইবে। এই ব্রহ্মে কিছুমাত্র ভেদ বা নানাত্ব নাই। শেষাংশের অর্থ পূর্ব্ববৎ ॥ ৮২ ॥ ১১ ॥
প্রাগে কত্ববিজ্ঞানাৎ আচার্য্যাগন-সংস্কৃতেন মনসৈব ইদং ব্রহ্ম একরসমাপ্তব্যম্— ‘আত্মৈব নান্যদস্তি’ ইতি। আপ্তে চ নানাত্বপ্রত্যুপস্থাপিকায়া অবিদ্যায়া নিবৃত্তত্বাৎ ইহ ব্রহ্মণি নানা নাস্তি কিঞ্চন—অণুমাত্রমপি। যস্তু পুনরবিদ্যা-তিমিরদৃষ্টিং ন মুঞ্চতি—ইহ ব্রহ্মণি নানের পশ্যতি; স মৃত্যোমৃত্যুং গচ্ছত্যেব—স্বল্পমপি ভেদমধ্যারোপয়ন্নিত্যর্থঃ ॥ ৮২ ॥ ১১ ॥
ব্রহ্মৈকত্ব জ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বে আচার্য্য ও শাস্ত্রের উপদেশে মনের সংস্কার বা নিৰ্ম্মলতা সম্পাদন করিয়া সেই সংস্কৃত মনের দ্বারাই এক রস(এক—অখণ্ড) ব্রহ্মকে পাইতে হইবে, অর্থাৎ একমাত্র আত্মাই (ব্রহ্মই) সৎ, তদ্ভিন্ন আর সমস্তই অসৎ,[ইহা বুঝিতে হইবে]। এই ব্রহ্মৈকত্ব বিজ্ঞাত হইলে নানাত্ব বা ভেদবুদ্ধি সমুৎপাদক অবিদ্যা নিবৃত্ত হইয়া যায়; সুতরাং তখন এই ব্রহ্মে কোনরূপ অর্থাৎ অত্যল্প- মাত্রও নানা(ভেদ) থাকে না বা প্রতীতির বিষয় হয় না। কিন্তু, যে লোক অবিদ্যা-তিমিরদৃষ্টি(অবিদ্যাময় মোহদর্শন) ত্যাগ করে না, এই ব্রহ্মে যেন নানাভাবই দর্শন করে, সে লোক সেই অত্যল্পমাত্র ভেদ আরোপণের ফলেও নিশ্চয়ই মৃত্যুর পর মৃত্যু প্রাপ্ত হয় ॥ ৮২ ॥ ১১ ॥
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।
ঈশানো ভূতভব্যস্য ন ততো বিজুগুপ্সতে। *
এতদ্বৈ তৎ ॥ ৮৩ ॥ ১২ ॥
[ আত্মনঃ দুজ্ঞেয়ত্বাৎ পুনরপি তৎস্বরূপমেবাহ]—অঙ্গুষ্ঠমাত্র ইতি। অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ ( অঙ্গুষ্ঠপরিমাণঃ; উপাধিভূতান্তঃকরণস্য অঙ্গুষ্ঠপরিমিতত্ত্বাৎ তৎপরিমাণ ইত্যর্থঃ।) পুরুষঃ(আত্মা) মধ্যে আত্মনি(শরীরমধ্যে) তিষ্ঠতি;[স এব চ] ভূত-ভব্যস্য
(অতীতস্য অনাগতস্য)[বর্তমানস্য চ] ঈশানঃ(প্রভুঃ শাসকঃ)। ততঃ (তৎস্বরূপবিজ্ঞানাৎ পরং) ন বিজুগুপ্সতে(সর্ব্বভয়-বিরহিতব্রহ্মস্বরূপলাভাৎ আত্মানং ন কুতশ্চিৎ গোপায়িতুমিচ্ছতীত্যর্থঃ)। অন্যৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ ॥
অঙ্গুষ্ঠপরিমিত অন্তঃকরণে অভিব্যক্ত হওয়ায় অঙ্গুষ্ঠমাত্র অর্থাৎ অঙ্গুষ্ঠপরিমিত পুরুষ(আত্মা) আত্ম-মধ্যে অর্থাৎ দেহাভ্যন্তরে অবস্থান করেন; অথচ সেই পুরুষই ভূত, ভবিষ্যৎ[ও বর্তমান, ‘এই কালত্রয়ের] ঈশ্বর(শাসক)। তাঁহাকে জানিলে[কেহই আর] আত্মাকে গোপন করিতে ইচ্ছা করে না। ইহাই সেই বস্তু ॥ ৮৩॥ ১২॥
পুনরপি তদেব প্রকৃতং ব্রহ্মাহ-অঙ্গুষ্ঠমাত্রোহঙ্গুষ্ঠপরিমাণঃ। অঙ্গুষ্ঠপরিমাণং হৃদয়পুণ্ডরীকং, তচ্ছিদ্রবর্ত্যন্তঃকরণোপাধিরঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ-অঙ্গুষ্ঠমাত্র-বংশপর্বমধ্যবর্ত্যম্ব- রবৎ। পুরুষঃ-পূর্ণমনেন সর্ব্বমিতি। মধ্যে আত্মনি শরীরে তিষ্ঠতি যঃ; তমাত্মান- মীশানং ভূত-ভব্যস্য বিদিত্বা ন তত ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥ ৮৩॥ ১২॥
পুনশ্চ সেই প্রস্তাবিত ব্রহ্মের বিষয়ই বলিতেছেন,-অঙ্গুষ্ঠমাত্র অর্থ-অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত; সাধারণতঃ হৃৎপদ্মের পরিমাণ এক অঙ্গুষ্ঠ; * সুতরাং সেই হৃৎপদ্মের ছিদ্রস্থিত অন্তঃকরণরূপ জীবোপাধিটিও অঙ্গুষ্ঠ- পরিমিত; অতএব অঙ্গুষ্ঠপরিমিত বংশ-পর্বের মধ্যবর্তী আকাশের যেরূপ অঙ্গুষ্ঠমাত্রত্ব ব্যবহার হয়, সেইরূপ অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত অন্তঃকরণে প্রতিফলিত আত্ম-চৈতন্যকেও ‘অঙ্গুষ্ঠমাত্র’ বা অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত বলা হইয়া থাকে। ইহাদ্বারা সমস্ত জগৎ পূর্ণতা লাভ করে, সেই ‘পুরুষ’ পদবাচ্য যে চৈতন্য আত্ম-মধ্যে-শরীরে অবস্থান করেন; ভূত (অতীত) ও ভব্য(যাহা হইবে), এতদুভয়ের ঈশানকে(শাসন- কর্তাকে) জানিয়া-“ন ততঃ” ইত্যাদি অংশের ব্যাখা পূর্ববৎ ॥৮৩৷১২৷৷
অস্থমাধঃ পুরুষো জ্যোতিরিবাধূমকঃ।
ঈশানো ভূতভব্যস্য স এবাদ্য স উ শ্বঃ।
এতদ্বৈ তং ॥ ৮৪ ॥ ১৩ ॥
[পুনরপি তদেবাহ]—অঙ্গুষ্ঠেতি। অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ(পূর্ব্ববৎ অঙ্গুষ্ঠপরিমিতঃ) পুরুষঃ(আত্মা) অধূমকঃ(অধূমকং ধূমরহিতং) জ্যোতিঃ(তেজঃ) ইব, ভূত- ভব্যস্য ঈশানঃ[চ]। স এব(পুরুষঃ) অদ্য[বর্ত্ততে]; শ্বঃ উ(শ্বোহপি ভবিষ্যৎ কালেহপি) সঃ[এব পুরুষঃ][বর্ত্তিষ্যতে]। অন্যৎ পূর্ব্ববৎ॥
অঙ্গুষ্ঠপরিমিত সেই পুরুষই নির্ধূম জ্যোতির ন্যায়(উজ্জ্বল) এবং ভূত ও ভব্যের ঈশান। সেই পুরুষই অদ্য[বর্তমান আছেন] এবং কল্যও সেই পুরুষই [বর্তমান থাকিবেন], অর্থাৎ ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকালে একই অবিকৃত আত্মা থাকে; পৃথক্ নহে ॥ ৮৪ ॥ ১৩
কিঞ্চ, অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো জ্যোতিরিবাধুমকঃ, অধূমকমিতি যুক্তং জ্যোতিঃ- পরত্বাৎ। যস্ত্বেবং লক্ষিতো যোগিভিহৃদয় ঈশানো ভূত-ভব্যস্য, স এব নিত্যঃ কূটস্থোহদ্যেদানীং প্রাণিষু বর্তমানঃ, স উ শ্বোহপি বর্ত্তিষ্যতে, নান্যস্তৎসমোহন্যশ্চ জনিষ্যত ইত্যর্থঃ। অনেন “নায়মস্তীতি চৈকে” ইত্যয়ং পক্ষো ন্যায়তো- ইপ্রাপ্তোহপি স্ববচনেন শ্রুত্যা প্রত্যুক্তঃ; তথা ক্ষণভঙ্গবাদশ্চ ॥ ৮৪ ॥ ১৩
অপি চ, সেই অঙ্গুষ্ঠ-পরিমিত পুরুষ অধুমক(ধূমহীন) জ্যোতির ন্যায়। শ্রুতিতে ‘অধুমকঃ’-শব্দটি পুংলিঙ্গ থাকিলেও ক্লীবলিঙ্গ জ্যোতির বিশেষণ হওয়ায় ‘অধুমকং’ বুঝিতে হইবে। যোগিগণ স্বহৃদয়ে অর্থাৎ সমাহিতচিত্তে যাঁহাকে এইরূপে ভূত-ভব্যের ঈশান বলিয়া নিরূপণ করিয়াছেন, সেই নিত্য কূটস্থ পুরুষই অদ্য অর্থাৎ এখনও সমস্ত প্রাণীতে বর্তমান আছেন, এবং কল্যও বর্তমান থাকিবেন। অভিপ্রায় এই যে, তাঁহার সমান বা তাঁহা হইতে পৃথক্ কেহ জন্মিবে না। কেহ কেহ বলেন, ‘পরলোকগামী আত্মা নাই’ পূর্ব্বোক্ত এই পক্ষটি যুক্তি- বিরুদ্ধ; সুতরাং অসম্ভব হইলেও শ্রুতি নিজবাক্যে তাহার প্রত্যাখ্যান করিলেন, ইহা দ্বারা ক্ষণভঙ্গবাদও(১) প্রত্যাখ্যাত হইল ॥ ৮৪ ॥ ১৩॥
যথোদকং দুর্গে বৃষ্টং পর্ব্বতেষু বিধাবতি। এবং ধর্ম্মান্ পৃথক্ পশ্যংস্তানেবানুবিধাবতি ॥ ৮৫ ॥ ১৪
[ভেদদর্শনফলম্ অনর্থ-লাভং স্পষ্টয়তি]—যথেতি। পর্ব্বতেষু দুর্গে(দুর্গমে ঊর্দ্ধভাগে) বৃষ্টম্ উদকং যথা(বিধাবতি বিবিধতয়া অধোভাগে ধাবতি গচ্ছতি); এবং[আত্মনঃ] ধর্ম্মান্ পৃথক্(আত্মনো ভিন্নান্) পশ্যন্(জানন্ জনঃ) তানেব (শরীরভেদান্) অনু(তদ্দর্শনানন্তরমেব) বিধাবতি(প্রাপ্নোতি),[ন মুচ্যতে ইত্যাশয়:] ॥
ভেদ দর্শনের অনর্থময় ফল প্রদর্শন করিতেছেন,—যেমন পর্ব্বতে দুর্গমপ্রদেশে পতিত মেঘোদক নিম্নপ্রদেশে নানাভাবে ধাবিত হয়, ঠিক তেমনি আত্মার বিবিধ ভেদদর্শনকারী ব্যক্তি সেই ভেদদর্শনের পরই নানাবিধ শরীর-প্রভেদ প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ৮৫ ॥ ১৪ ॥
পুনরপি ভেদদর্শনাপবাদং ব্রহ্মণ আহ,-যথা উদকং দুর্গে দুর্গমে দেশে উচ্ছিতে বৃষ্টিং সিক্তং পর্ব্বতেষু পৰ্ব্বতবৎসু নিম্নপ্রদেশেষু বিধাবতি বিকীর্ণং সদ্ বিনশ্যতি এবং ধৰ্ম্মান্ আত্মনো ভিন্নান্ পৃথক্ পশ্যন্ পৃথগেব প্রতিশরীরং পশ্যন্ তানেব শরীরভেদানুবর্তিনঃ অনুবিধাবতি-শরীরভেদমেব পৃথক্ পুনঃ পুনঃ প্রতিপদ্যত- ইত্যর্থঃ ॥ ৮৫ ॥ ১৪ ॥
পুনশ্চ ব্রহ্ম সম্বন্ধে ভেদদর্শনের নিন্দা করিতেছেন,-দুর্গ অর্থাৎ দুর্গম উন্নতপ্রদেশে বৃষ্ট অর্থাৎ মেঘনিৰ্ম্মুক্ত উদক যেমন পর্বতে অর্থাৎ পর্বতবিশিষ্ট নিম্নপ্রদেশসমূহে বিশেষরূপে ধাবমান হয়- ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইয়া বিনাশ প্রাপ্ত হয়। এইরূপ যে লোক আত্ম- ধৰ্ম্মসমূহ প্রত্যেক শরীরে পৃথক্ পৃথক্ দর্শন করে, সেই লোক বিভিন্ন
শরীরগত সেই সকল ভেদাভিমুখে ধাবিত হয়, অর্থাৎ পুনঃপুনঃ বিভিন্ন শরীর প্রাপ্ত হয়;[ কখনও আর মুক্ত হইতে পারে না] ॥ ৮৫ ॥ ১৪ ॥
যথোদকং শুদ্ধে শুদ্ধমাসিক্তং তাদৃগেব ভবতি। এবং মুনের্ব্বিজানত আত্মা ভবতি গৌতম ॥ ৮৬ ॥ ১৫
ইতি কঠোপনিষদি দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথমা বল্লী সমাপ্তা ॥ ২ ॥ ১
[ব্রহ্মৈকত্বদর্শিনস্তু নৈবমিত্যাহ]—যথেতি। হে গৌতম! যথা শুদ্ধম্ উদকং শুদ্ধে(উদকে) সিক্তং(নিক্ষিপ্তং সৎ) তাদৃগেব(শুদ্ধমেব) ভবতি,[নতু পৃথক্ তিষ্ঠতি] বিজানতঃ(একত্বং পশ্যতঃ) মুনেঃ(মননশীলস্য) আত্মা(অদ্বিতীয়- ব্রহ্মস্বরূপম্) এব ভবতি,[ব্রহ্মভাবপ্রাপ্ত্যা বিমুচ্যতে ইতি ভাবঃ। গৌত- মেতি নচিকেতসঃ সম্বোধনম্ ॥
হে গৌতম! নচিকেতঃ! শুদ্ধ বা নির্ম্মল জল নির্ম্মল জলে নিক্ষিপ্ত হইয়া যেমন তাদৃশই(নির্ম্মলই) হইয়া যায়, তেমনি বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ ব্রহ্মৈকত্বাভিজ্ঞ মুনির আত্মাও ব্রহ্মই হয় ॥ ৮৬॥ ১৫॥
অস্য পুনবিদ্যাবতো বিধ্যস্তোপাধিকৃতভেদদর্শনস্য বিশুদ্ধবিজ্ঞানঘনৈকরসম্ অদ্বয়ম্ আত্মানং পশ্যতো বিজানতো মুনের্মননশীলস্য আত্মস্বরূপং কথং সম্ভবতীতি উচ্যতে, যথা উদকং শুদ্ধে প্রসন্নে শুদ্ধং প্রসন্নম্ আসিক্তং প্রক্ষিপ্তম্ একরসমেব নান্যথা তাদৃগেব ভবতি আত্মাপ্যেবমেব ভবতি, একত্বং বিজানতো মুনেঃ মনন- শীলস্য, হে গৌতম! তস্মাৎ কুতাকিক-ভেদদৃষ্টিং নাস্তিককুদৃষ্টিঞ্চ উঙ্খিত্বা মাতৃ- পিতৃ-সহস্রেভ্যোহপি হিতৈষিণা বেদেনোপদিষ্টম্ আত্মৈকত্বদর্শনং শান্তদর্পৈরাদরণীয়- মিত্যর্থঃ ॥ ৮৬॥ ১৫
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য-গোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য- শ্রীমদাচার্য্য-শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ কঠকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথমবল্লীভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ ২॥ ১॥,
যে বিদ্বানের উপাধিকৃত ভেদদর্শন বা ভেদজ্ঞান বিদূরিত হইয়া গিয়াছে; বিশুদ্ধ অর্থাৎ উপাধিকৃত পরিচ্ছেদরহিত, বিজ্ঞানঘন,
একরস আত্মদর্শী মুনির আত্মা কি প্রকার হয়? এতদুত্তরে বলি- তেছেন যে, শুদ্ধ অর্থাৎ প্রসন্ন বা নিৰ্ম্মল জল অপর শুদ্ধ জলে নিক্ষিপ্ত হইলে, একাকার অর্থাৎ তদ্রূপই হইয়া যায়, ইহার অন্যথা হয় না, হে গৌতম!(নচিকেতঃ!) বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ আত্মৈকত্বদর্শী মুনির (মননশীলের) আত্মাও ঠিক সেইরূপই হইয়া যায়। অতএব, কুতার্কিক- গণের ভেদোপদেশ ও নাস্তিকগণের অসদ্বুদ্ধি পরিত্যাগপূর্ব্বক, সহস্র সহস্র মাতাপিতা অপেক্ষাও হিতৈষিণী শ্রুতির উপদেশে অভিমান ত্যাগ করিয়া আদর করা উচিত ॥ ৮৬ ॥ ১৫ ॥
ইতি কঠোপনিষদে দ্বিতীয়াধ্যায়ে প্রথমবল্লীর ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ২।১॥
পুরমেকাদশদ্বারমজস্যাবক্রচেতসঃ। অনুষ্ঠায় ন শোচতি বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে। এতদ্বৈ তৎ॥ ৮৭॥ ১
[ পুরমিতি। একাদশদ্বারং(শীর্ষণ্যানি সপ্ত, নাভিরেকা, পায়ুপস্থে দ্বে, শিরসি একম্, ইতি একাদশ দ্বারাণি যস্য, তৎ একাদশদ্বারম্) পুরং(দেহম্), অবক্রচেতসঃ (অবক্রম্ অকুটিলম্ আদিত্যপ্রকাশবৎ নিত্যমেবাবস্থিতমেকরূপং চেতো বিজ্ঞানমস্যেতি, নিত্যপ্রকাশরূপস্য) অজস্য(জন্মরহিতস্য) ব্রহ্মণঃ,[অধীনমিতি] অনুষ্ঠায়(তদধীনতয়া নিশ্চিত্য)[মমতাত্যাগাৎ বিবেকী জনঃ] ন শোচতি। [দেহত্যাগাৎ প্রাগেব অবিদ্যাক্ষয়াৎ] বিমুক্তঃ(অহঙ্কারাদিবন্ধরহিতঃ সন্) [দেহপাতাৎ পরং] বিমুচ্যতে(কৈবল্যং প্রাপ্তো ভবতি)। ন পুনর্জায়তে ইত্যভিপ্রায়ঃ]। এতৎ বৈ তৎ(ইতি প্রাগেব ব্যাখ্যাতম্) ॥
মস্তকে—চক্ষুদ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসিকাদ্বয়, মুখ, এই সপ্ত, ব্রহ্মরন্ধ্র এক, অধোদেশে নাভি এক, এবং মলমূত্র দ্বার দুই, এই একাদশ দ্বার-বিশিষ্ট পুর অর্থাৎ নগরস্বরূপ এই দেহটা অপরিবর্তনশীল চৈতন্যময় অজ—জন্মরহিত ব্রহ্মের অধীন; বিবেকী জন এইরূপ অবধারণ করিয়া[ আমি, আমার ইত্যাদি বুদ্ধি পরিত্যাগ করতঃ] শোক বা দুঃখ ভোগ করেন না; এবং[ অবিদ্যাক্ষয় হওয়ায়] এই দেহেই বিমুক্ত হইয়া পশ্চাৎ দেহপাতের পর বিশেষভাবে বিমুক্ত হয়, অর্থাৎ কৈবল্য প্রাপ্ত হয়;[ সে লোক আর জন্মধারণ করে না] ॥ ৮৭ ॥ ১ ॥
পুনরপি প্রকারান্তরেণ ব্রহ্মতত্ত্বনিদ্ধারণার্থোহয়মারম্ভঃ-দুর্বিজ্ঞেয়ত্বাদব্রহ্মণঃ। পুরং পুরমিব পুরম্, দ্বারপালাধিষ্ঠাত্রাদ্যনেকপুরোপকরণসম্পত্তিদর্শনাৎ শরীরং পুরম্। পুরঞ্চ সোপকরণং স্বাত্মনা অসংহতস্বতন্ত্রস্বাম্যর্থং দৃষ্টম্; তথেদং পুরসামান্যাৎ অনেকোপকরণসংহতং শরীরং স্বাত্মনা অসংহতরাজস্থানীয়স্বাম্যর্থং ভবিতুমর্হতি। তচ্ছেদং শরীরাখ্যং পুরম্ একাদশদ্বারং; একাদশ দ্বারাণ্যস্য-সপ্ত শীর্ষণ্যানি, নাভ্যা
১৯
সহার্ব্বাঞ্চি ত্রীণি, শিরস্যেকং, তৈরেকাদশদ্বারং পুরম্। কস্য?—অজস্য জন্মাদি- বিক্রিয়ারহিতস্য আত্মনো রাজস্থানীয়স্য পুরধৰ্ম্মবিলক্ষণস্য। অবক্রচেতসঃ, অবক্রম্ অকুটিলম্ আদিত্যপ্রকাশবৎ নিত্যমেবাবস্থিতম্ একরূপং চেতো বিজ্ঞানমস্যেতি অবক্রচেতাঃ, তস্য অবক্রচেতসো রাজস্থানীয়স্য ব্রহ্মণঃ। যস্যেদং পুরং, তং পরমেশ্বরং পুরস্বামিনম্ অনুষ্ঠানে ধ্যাত্বা; ধ্যানং হি তস্যানুষ্ঠানং সম্যবিজ্ঞানপূর্ব্বকম্। তং সর্ব্বৈষণাবিনিমুক্তঃ সন্ সমং সর্ব্বভূতস্থং ধ্যাত্বা ন শোচতি। তদ্বিজ্ঞানাদ- ভয়প্রাপ্তেঃ শোকাবসরাভাবাৎ কুতো ভয়েক্ষা। ইহৈবাবিদ্যাকৃতকামকৰ্ম্ম- বন্ধনৈর্বিমুক্তো ভবতি। বিমুক্তশ্চ সন্ বিমুচ্যতে—পুনঃ শরীরং ন গৃহ্লাতী- ত্যর্থঃ ॥ ৮৭ ॥ ১ ॥
ব্রহ্ম অত্যন্ত দুর্বিজ্ঞেয়; এই কারণে পুনঃ প্রকারান্তরে ব্রহ্মতত্ত্ব নিরূপণের উদ্দেশে এই বল্লী আরব্ধ হইতেছে,-‘পুর’ অর্থ-পুর- সদৃশ, প্রসিদ্ধ পুরে(নগরে) যেমন দ্বারপাল, পুরস্বামী ও পুরোপযোগী অন্যান্য বস্তু থাকে, এই শরীরেও সেই সমস্ত বিদ্যমান থাকায় এই শরীর ‘পুর’ বলিয়া কথিত হয়। দেখা যায়-পুর ও পুরোপকরণ বস্তুগুলি, পুরের সহিত যিনি সংহত নন, অর্থাৎ পুরের ক্ষয়-বৃদ্ধিতে যাঁহার স্বরূপতঃ ক্ষয় বা বৃদ্ধি হয় না, এমন একজন স্বাধীন স্বামীর (পুরাধিপতির) অধীন থাকে; পুরসাদৃশ্য থাকায় অনেকপ্রকার উপকরণ-(দ্বার-পালাদিস্থানীয় ইন্দ্রিয়াদি-) সমন্বিত এই শরীরও সেইরূপ শরীরের সহিত অসংহত(শরীরের হ্রাসবৃদ্ধিতে যাঁহার হ্রাস বৃদ্ধি নাই, এমন) একজন রাজস্থানীয় স্বামীর অধীন থাকা আবশ্যক। সেই এই শরীরসংজ্ঞক পুরটি একাদশ দ্বারযুক্ত; তন্মধ্যে মস্তকে সপ্ত(চক্ষুদ্বয়, শ্রোত্রদ্বয়, নাসাদ্বয় ও মুখ), নাভিসহ অধোবর্তী তিন (নাভি, পায়ু ও উপস্থ), ব্রহ্মরন্ধ্র এক; এই একাদশটি দ্বার থাকায় শরীররূপ পুরটিও একাদশ দ্বারযুক্ত *। এই পুরটি কাহার?
[উত্তর—] যিনি অজ অর্থাৎ জন্মাদিবিকার-রহিত, পুর হইতে বিভিন্নপ্রকার ও স্বাধীন রাজস্থানীয় আত্মা, এবং যিনি অবক্রচেতা অর্থাৎ যাঁহার চৈতন্য—বিজ্ঞান কখনও বক্র বা কুটিল নহে; পরন্তু সূর্য্যের ন্যায় নিত্যপ্রকাশমান ও কূটস্থ বা চিরস্থিত; সেই আত্ম- স্বরূপ ব্রহ্মের[পুর বা অভিব্যক্তি স্থান]। যাঁহার এই পুর, সেই পুরস্বামী পরমেশ্বরকে অনুষ্ঠান করিয়া অর্থাৎ ধ্যান করিয়া লোকে আর শোকপ্রাপ্ত হয় না। তাঁহার যথার্থস্বরূপ বিজ্ঞানপূর্ব্বক যে ধ্যান, তাহাই তাঁহার অনুষ্ঠান। অর্থাৎ ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ জ্ঞান- পূর্ব্বক যে ধ্যান, তাঁহার পক্ষে তদ্ভিন্ন আর কোনরূপ অনুষ্ঠান সম্ভব- পর হয় না।[বিবেকী পুরুষ] সর্ব্বপ্রকার কামনা-রহিত হইয়া সর্বভূতে সমভাবে অবস্থিত সেই পুরস্বামী আত্মাকে ধ্যান করিলে
আর কখনও শোক করেন না; কারণ, আত্মজ্ঞানে অভয়প্রাপ্তি হয়; তৎকালে শোকের অবসরই থাকে না; সুতরাং ভয়দর্শন হইবে কোথা হইতে?[অধিকন্তু] সেই ব্যক্তি এই দেহেই অবিদ্যা ও তৎকৃত কামকর্মাদি বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন, বিমুক্ত থাকিয়াও [দেহপাতের পর] আবার বিমুক্ত হন—পুনর্ব্বার আর শরীর গ্রহণ করেন না, অর্থাৎ তাঁহার আর জন্ম হয় না ॥ ৮৭ ॥ ১ ॥
হংসঃ শুচিষদ্বসুরন্তরিক্ষসদ্ হোতা বেদিষদতিথিদুর্দ্দোণসৎ।
নৃষদ্বরসসদ্ভূতসদ্যোম-
দব্জা গোজা ঋতজা অদ্রিজা ঋতং বৃহৎ ॥৮৮৷৷২৷৷ [ইদানীং তস্যৈবাত্মনঃ সর্ব্বপুরসম্বন্ধিত্বমাহ-হংস ইতি।] হংসঃ(হন্তি গচ্ছতি সর্ব্বং ব্যাপ্নোতীতি হংসঃ-পরমাত্মা সূর্য্যশ্চ)। শুচিষৎ(শুচৌ দিবি সীদতি বসতি ইতি শুচিষৎ)। বসুঃ-(বাসয়তি সর্ব্বমিতি বসুঃ-সর্ব্বলোকস্থিতিহেতুঃ)। অন্ত- রিক্ষসৎ-(বায়ুরূপেণ অন্তরিক্ষে সীদতীতি অন্তরীক্ষগ ইত্যর্থঃ।) হোতা(অগ্নিঃ), [যদ্বা জুহোতি শব্দাদিবিষয়ান্ অত্তি অনুভবতীতি --ইন্দ্রিয়াদিস্থঃ)। বেদিষৎ- (বেদ্যাং পূজ্যতয়াস্তীতি বেদিষৎ), অতিথিঃ(সোমঃ সন্) দুরোণসৎ(দুরোণে সোমরসপাত্রে-কলসে সীদতীতি দুরোণসৎ)। নৃষৎ-(নৃষু মনুষ্যেষু সীদতীতি নৃষৎ)। বরসৎ(বরেষু ব্রহ্মাদিদেবেষু সীদতি অস্তীতি বরসৎ)। ঋতসৎ--(ঋতে যজ্ঞে সত্যস্বরূপে বেদে বা সীদতীতি ঋতসৎ)। ব্যোমসৎ-(ব্যোম্নি আকাশে সীদতীতি ব্যোমসৎ)।[যদ্বা ব্যোতমস্যাং জগদিতি জগৎপ্রসূঃ প্রকৃতিঃ ব্যোমেত্যুচ্যতে; প্রকৃতিস্থ ইত্যর্থঃ] অব্জাঃ-(অপ্সু শঙ্খ-মৎস্যাদিরূপেণ জায়তে ইত্যজাঃ)। গোজাঃ-(গবি পৃথিব্যাং জায়ত ইতি গোজাঃ)। ঋতজাঃ-(সত্যফলক- যজ্ঞাদিরূপেণ জায়ত ইতি ঋতজাঃ)। অদ্রিজাঃ-(অদ্রিভ্যো জায়ত ইতি অদ্রিজাঃ)। ঋতং(সত্যম্),[যদ্বা ঋতং মুখ্যতো বেদপ্রতিপাদ্যম্]। বৃহৎ-(সর্ব্বকারণত্বাৎ মহৎ), এতদ্বৈ তদিতি।[অত্র-পরমাত্মপক্ষে সূর্য্যপক্ষে চ সর্ব্বাণি বিশেষণানি যথাসম্ভবং যোজ্যানি]॥
পূর্ব্বোক্ত আষাঢ় যে, সর্ব্বশরীরে তুল্যরূপ সম্বন্ধ আছে, এইখানে তাহাই
কথিত হইতেছে,-সমস্ত বস্তুর সহিত সম্বদ্ধ বলিয়া পরমাত্মা ও সূর্য্য, উভয়ই ‘হংস’ পদবাচ্য। সেই হংসই আবার স্বর্গরূপ শুচি প্রদেশে অবস্থিতি করেন বলিয়া ‘শুচিষৎ’; সর্ব্বলোকের স্থিতিসাধক বলিয়া ‘বসু’; বায়ুরূপে অন্তরিক্ষে বিচরণ করেন বলিয়া ‘অন্তরিক্ষসৎ’; স্বয়ংই অগ্নিস্বরূপ বলিয়া কিংবা শব্দাদি বিষয় সমূহ ভোগ করেন বলিয়া ‘হোতা’; পৃথিবীরূপ বেদিতে(পূর্ব্বোক্ত হোতার আশ্রয়ে) বাস করেন বলিয়া ‘বেদিষৎ’; অতিথিরূপে অর্থাৎ সোমরসরূপে দুরোণে (কলসে) বাস করেন বলিয়া ‘অতিথি’ ও ‘দুরোণসৎ’; নৃত্বে(মনুষ্যে) অবস্থান করায় ‘নৃষৎ’; সমস্ত শ্রেষ্ঠ পদার্থে অবস্থিতি করেন বলিয়া ‘বরসৎ’; শঙ্খ ও মৎস্যাদিরূপে জলে জন্ম ধারণ করেন বলিয়া ‘অবজা’, গোরূপা পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করেন বলিয়া গোজা, ঋত অর্থ-সত্য,-অবশ্যম্ভাবী কৰ্ম্মফল, তাহাতে প্রকটিত হন বলিয়া ‘ঋতজা’; এবং পর্ব্বতে প্রকাশ পান বলিয়া ‘অদ্রিজা’[শব্দে অভিহিত হন।] আর তিনি স্বয়ং সত্য স্বরূপ এবং মহৎ; ইহাই নচিকেতার জিজ্ঞাসিত সেই বস্তু ॥৮৮৷৷২৷৷]
স তু নৈকপুরবর্ত্যেবাত্মা, কিন্তুর্হি?—সর্ব্বপুরবর্তী। কথং? হংসঃ—হস্তি গচ্ছ- তীতি, শুচিষৎ শুচৌ দিবি আদিত্যাত্মনা সীদতীতি। বসুঃ বাসয়তি সর্ব্বানিতি। বায়াত্মনা অন্তরিক্ষে সীদতীত্যন্তরিক্ষযৎ। হোতা অগ্নিঃ, “অগ্নির্ব্বে হোতা” ইতি শ্রুতেঃ। বেদ্যাং পৃথিব্যাং সাউদতীতি বেদিষৎ। “ইয়ং বেদিঃ পরোহন্তঃ পৃথিব্যাঃ,” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ *। অতিথিঃ সোমঃ সন্ দুরোণে কলসে সীদতীতি দুরোণসৎ। ব্রাহ্মণোহতিথিরূপেণ বা দুরোণেষু গৃহেষু সীদতীতি দুরোণষৎ। নৃষৎ—নৃষু মনুষ্যেষু সীদতীতি নৃষৎ। বরসৎ বরেষু দেবেষু সীদতীতি বরসৎ। ঋতসৎ ঋতং সত্যং যজ্ঞো বা, তস্মিন্ সীদতীতি ঋতসৎ। ব্যোমসৎ—ব্যোম্নি আকাশে সীদতীতি ব্যোমসৎ। অজা অপসু শঙ্খ-শুক্তি-মকরাদিরূপেণ জায়ত ইতি অব্জাঃ। গোজাঃ—গবি পৃথিব্যাং ব্রীহিষবাদিরূপেণ জায়ত ইতি গোজাঃ। ঋতজাঃ—যজ্ঞাঙ্গরূপেণ জায়ত ইতি ঋতজাঃ। অদ্রিজাঃ—পর্ব্বতেভ্যো নদ্যাদিরূপেণ জায়ত ইতি অদ্রিজাঃ। সর্ব্বাত্মাপি সন্ ঋতম্ অবিতথস্বভাব এব। বৃহৎ—মহান্ সর্ব্বকারণত্বাৎ। যদাপ্যাদিত্য এব
মন্ত্রেণোচ্যতে; তদাপ্যস্যাত্ম-স্বরূপত্বমাদিত্যস্যাঙ্গীকৃতমিতি ব্রাহ্মণ-ব্যাখ্যানেহপ্য- বিরোধঃ। সর্ব্বথাপ্যেক এবাত্মা জগতো নাত্মভেদ ইতি মন্ত্রার্থঃ ॥৮৮৷২৷
কিন্তু সেই আত্মা যে, একটিমাত্র শরীররূপ পুরে বাস করেন, তাহা নহে; তবে কি? তিনি সমস্ত শরীরপুরে বাস করেন। কি প্রকারে?—তিনি হনন অর্থাৎ(সর্বত্র) গমন করেন বলিয়া ‘হংস’ পদ বাচ্য। এবং শুচি অর্থাৎ দ্যুলোকে সূর্য্যরূপে অবস্থান করেন বলিয়া শুচিষৎ; সমস্ত বস্তুতে অবস্থিতি করেন,” এই কারণে ‘বসু’, অন্তরিক্ষে(আকাশে) বায়ুরূপে অবস্থান করেন বলিয়া ‘অন্তরিক্ষসৎ’ শ্রুতিতে যে অগ্নিকে ‘হোতা’ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, তিনি সেই অগ্নিরূপ হোতা; এবং পৃথিবীরূপ বেদিতে অবস্থান করেন বলিয়া ‘বেদিষৎ’। শ্রুতি বলিয়াছেন—‘এই যে যজ্ঞ-প্রসিদ্ধ বেদী, ইহা পৃথিবীরই স্বরূপ, তদতিরিক্ত নহে।’ তিনিই আবার সোমরূপী অতিথি হইয়া দুরোণে(কলসে) অবস্থান করেন বলিয়া, অথবা ব্রাহ্মণ অতিথিরূপে গৃহে(দুরোণে) উপস্থিত হন বলিয়া ‘অতিথি ও দুরোণ- সৎ’; নৃ—মনুষ্য সমূহে অবস্থান করেন বলিয়া নৃষৎ, দেবাদি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিতে প্রকাশ পান বলিয়া ‘বরসৎ’; ‘ঋত’ অর্থ সত্য অথবা যজ্ঞ, তাহাতে থাকেন বলিয়া ‘ঋতসৎ’; আকাশে অবস্থিতি হেতু ‘ব্যোমসৎ’। শঙ্খ, শুক্তি(ঝিনুক) ও মকরাদিরূপে জলে জন্মধারণ করেন বলিয়া ‘অবজা’, পৃথিবীতে ধান্য যবাদিরূপে উৎপন্ন হন বলিয়া ‘গোজা’, যজ্ঞাঙ্গ দ্রব্যরূপে জন্ম লাভ করেন বলিয়া ‘ঋতজা’, পর্ব্বত হইতে নদী প্রভৃতি- রূপে জন্মলাভ হেতু ‘অদ্রিজা’ শব্দবাচ্য হন। কিন্তু, তিনি সর্বাত্মক বা সর্বময় হইয়াও স্বয়ং ঋতই অর্থাৎ সত্য স্বরূপই থাকেন,(বিকৃত হন না), এবং তিনি সর্ব্ব জগতের কারণ, এই জন্য বৃহৎ—মহৎ। কঠ ব্রাহ্মণোক্ত ব্যাখ্যানুসারে উল্লিখিত মন্ত্রে যদি সূর্য্যকেই অভিধেয়
বা বর্ণনীয় বলিয়া গ্রহণ করা যায়, * তাহা হইলেও সূর্য্যকেই আত্মস্বরূপ বলিয়া স্বীকার করায় ব্রহ্মপক্ষে ব্যাখ্যায়ও কোন বিরোধ হইতে পারে না। ফল কথা, যে কোন রকমেই হউক, সর্ব্বপ্রকারেই জগতে একই আত্মা, আত্মভেদ নাই;[ইহা প্রমাণিত হইল] ॥ ৮৮ ॥২॥
ঊর্দ্ধং প্রাণমুন্নয়ত্যপানং প্রত্যগস্যতি।
মধ্যে বামনমাসীনং বিশ্বে দেবা উপাসতে ॥৮৯॥৩॥
[ঊর্দ্ধমিতি।[যত্তচ্ছব্দাবত্র গ্রাহ্যৌ। অঙ্গুষ্ঠমাত্রত্বাদিনা প্রাগুক্তঃ যঃ] প্রাণং(প্রাণবায়ুম্) ঊর্দ্ধম্ উন্নয়তি(ঊর্দ্ধগতিমত্তয়া প্রেরয়তি), অপানঞ্চ(বায়ুং) প্রত্যক্(অধো)! বিন্মুত্রাদিনিষ্কাসনহেতুতয়া] অস্যতি(ক্ষিপতি প্রেরয়তি), মধ্যে(হৃদি) আসীনং(অবস্থিতং)[তং] বামনং(মুমুক্ষুভিঃ ভজনীয়ং) বিশ্বে (সর্ব্বে) দেবাঃ(চক্ষুরাদয়ঃ) উপাসত ইতি। বিশ্বদেবা ইতি’ পাঠান্তরম্। [এতেন প্রাণাপানপ্রেরকত্বলিঙ্গেন প্রাগুক্তেশানো মুখ্যঃ ‘প্রাণঃ’ ইত্যপি শঙ্কা নিরস্তা, নিরবকাশবামনশ্রুত্যাদেঃ ॥.]
যিনি প্রাণকে অর্থাৎ প্রাণবায়ুর ব্যাপারকে ঊর্দ্ধগামী করেন এবং অপান বায়ুর বৃত্তিকে অধোগামী করেন; হৃদয় মধ্যে অবস্থিত, মুমুক্ষুর উপাস্য সেই বামনকে (আত্মাকে) সমস্ত দেবগণ অর্থাৎ চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ উপাসনা করেন, অর্থাৎ তাঁহার উদ্দেশে, বা তাঁহারই প্রেরণায় নিজ নিজ কার্য্য করিয়া থাকে ॥৮৯৷৷৩৷]
আখ্যানঃ স্বকপাধিগমে নিষ্কমুচ্যতে,—উর্দ্ধং হৃদয়াৎ প্রাণং প্রাণবৃত্তিং বায়ু-
মুন্নয়তি ঊর্দ্ধং গময়তি। তথাপানং প্রত্যক্—অধোহস্যতি ক্ষিপতি। য ইতি বাক্যশেষঃ। তং মধ্যে হৃদয়পুগুরীকাকাশে আসীনং বুদ্ধাবভিব্যক্তং বিজ্ঞান- প্রকাশনং, বামনং বর্ণনীয়ং সম্ভজনীয়ং, বিশ্বে সর্ব্বে দেবাঃ চক্ষুরাদয়ঃ প্রাণা রূপাদি- বিজ্ঞানং বলিমুপাহরন্তো বিশ ইব রাজানমুপাসতে, তাদর্থ্যেনানুপরতব্যাপারা ভবন্তীত্যর্থঃ। যদর্থা যৎপ্রযুক্তাশ্চ সর্ব্বে বায়ুকরণব্যাপারা; সোহন্যঃ সিদ্ধ ইতি বাক্যার্থঃ ॥ ৮৯৷৷৩॥]
আত্মার স্বরূপ-পরিজ্ঞানের উপায় কথিত হইতেছে;—[ যিনি] প্রাণকে অর্থাৎ প্রাণ বায়ুর ব্যাপারকে হৃদয় প্রদেশ হইতে ঊর্দ্ধে লইয়া যান, এবং অপান বায়ুকেও অধোদিকে প্রেরণ করেন, শ্রুতিতে ‘যঃ’ এই কর্তৃপক্ষটি অনুক্ত রহিয়াছে;[ তাহা বুঝিয়া লইতে হইবে]। হৃৎপদ্ম-মধ্যবর্তী আকাশে(হৃদয়াকাশে) অবস্থিত,—অর্থাৎ বুদ্ধিতে যাহার জ্ঞান প্রকাশ অভিব্যক্ত বা প্রকটিত হয়; মুমুক্ষুগণের সম্যক্ ভজনীয়(উপাস্য) সেই বামনকে ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর—প্রেরক (আত্মাকে) চক্ষুঃ প্রভৃতি সমস্ত প্রাণ বা ইন্দ্রিয়বর্গ, প্রজাগণ যেরূপ রাজার উপহার প্রদান করতঃ উপাসনা করে, সেইরূপ রূপরসাদি বিষয়ে জ্ঞান(অনুভূতি) সমুৎপাদন করিয়া উপাসনা করিয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, হৃৎ-পদ্ম-মধ্যস্থ সেই আত্মার উদ্দেশ্যেই ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব ব্যাপার হইতে বিরত হয় না। প্রাণাদি করণবর্গের ব্যাপার- নিচয় যাহার উদ্দেশে এবং যাহার প্রেরণায় সম্পাদিত হয়, তিনি এই করণবর্গ হইতে পৃথক্—স্বতন্ত্র পদার্থ। ইহাই উক্ত বাক্যের তাৎপর্য্য লভ্য অর্থ ॥ ৮৯ ॥ ৩
অস্য বিস্রংসমানস্য শরীরস্থস্য দেহিনঃ। দেহাদ্বিমুচ্যমানস্য কিমত্র পরিশিষ্যতে। এতদ্বৈ তৎ ॥৯০॥৪॥
[ অস্যেতি। শরীরস্থস্য অস্য দেহিনঃ(দেহবতো জীবস্য) বিশ্বসমন্বয়(মূলং
দেহং ত্যজতঃ) দেহাৎ বিমুচ্যমানস্য[সতঃ] অত্র(প্রাণাদিসমন্বিতে দেহে) কিং পরিশিষ্যতে?[ন কিঞ্চিদপি ইত্যর্থঃ]। এতদ্বৈ তদিতি[যস্য অপগমে অত্র ন কিঞ্চিদপি তিষ্ঠতি], এতৎ বৈ(এব) তৎ,[যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্]॥
এই শরীরস্থ দেহী(দেহাভিমানী জীব) বিস্রংসমান হইলে—দেহ হইতে বহির্গত হইলে, এই দেহে কি অবশিষ্ট থাকে? অর্থাৎ প্রাণাদি করণনিচয় কিছুই থাকে না।[ যাহার অপগমে প্রাণাদি করণবর্গ পলায়ন করে], তাহাই তোমার জিজ্ঞাসিত সেই আত্মবস্তু ॥ ৯০॥৪॥
কিঞ্চ,—অস্য শরীরস্থস্য আত্মনো বিস্রংসমানস্য অবস্রংসমানস্য ভ্রংশমানস্য দেহিনো দেহবতঃ। বিস্রংসনশব্দার্থমাহ—দেহাদ বিমুচ্যমানস্যেতি। কিমত্র পরিশিষ্যতে প্রাণাদিকলাপে, ন কিঞ্চন পরিশিষ্যতে; অত্র দেহে, পুরস্বামি-বিদ্রবণ ইব পুর- বাসিনাম্। যস্য আত্মনঃ অপগমে ক্ষণমাত্রাৎ কার্য্যকারণকলাপরূপং সর্ব্বমিদং হতবলং বিধ্বস্তং ভবতি বিনষ্টং ভবতি; সোহন্যঃ সিদ্ধ আত্মা ॥৯০॥৪॥
আরও এক কথা, এই শরীরস্থ দেহী অর্থাৎ দেহাভিমানী আত্মা (জীব) বিস্রংসমান বা ভ্রংশমান হইলে—নিজেই বিস্রংসন শব্দের অর্থ বলিতেছেন—দেহ হইতে বিমুক্ত অর্থাৎ বহির্গত হইলে প্রাণাদি সমষ্টিময় এই দেহে কি অবশিষ্ট থাকে? অর্থাৎ কিছুই থাকে না। পুরাধিপতির অপগমে যেরূপ পুরবাসিগণ বিধ্বস্ত বা পলায়িত হয়, সেইরূপ যে আত্মার অপগমে কার্য্যকারণাত্মক এই প্রাণাদি সমষ্টি তৎক্ষণাৎ বলহীন—বিধ্বস্ত—বিনষ্ট হইয়া যায়; সেই আত্মা প্রাণাদি হইতে পৃথক্ ইহা সিদ্ধ বা প্রমাণিত হইল।(*) ॥ ৯০॥৪॥
২০
●
কশ্চন(কশ্চিদপি) মর্ত্যঃ(মরণধৰ্ম্মা মনুষ্যঃ) প্রাণেন ন জীবতি, অপানেন (বায়ুনা চ) ন[জীবতি]। তু(পুনঃ) ইতরেণ(তদ্বিলক্ষণেন) জীবন্তি (প্রাণান্ ধারয়ন্তি),[ইতরেণ কেন? ইত্যাহ]—যস্মিন্(পরাত্মনি) এতৌ (প্রাণাপানো) উপাশ্রিতৌ(অধীনতয়া বর্তেতে)॥
মরণশীল মনুষ্য প্রাণ বা অপানের দ্বারা জীবিত থাকে না; পরন্তু, এই উভয়ই(প্রাণ ও অপান) যাহাতে আশ্রিত আছে; প্রাণাপান-বিলক্ষণ সেই পরমাত্মার সাহায্যেই জীবিত থাকে ॥ ৯১৷৷৫৷৷
স্যান্মতং-প্রাণাপানাদ্যপগমাদেবেদং বিধ্বস্তং ভবতি, ন তু ব্যতিরিক্তাত্মাপগমাৎ, প্রাণাদিভিরেবেহ মর্ত্যো জীবতীতি। নৈতদস্তি,-ন প্রাণেন, ন অপানেন চক্ষুরা- দিনা বা মর্ত্যঃ মনুষ্যো দেহবান্ কশ্চন জীবতি। ন কোহপি জীবতি। ন হ্যেষাং পরার্থানাং সংহত্যকারিত্বাৎ জীবনহেতুত্বম্ উপপদ্যতে। স্বার্থেনাসংহতেন পরেণ কেনচিদপ্রযুক্তং সংহতানামবস্থানং ন দৃষ্টম্; যথা গৃহাদীনাং লোকে, তথা প্রাণা- দীনামপি সংহতত্বাভবিতুমর্হতি। অত ইতরেণতু ইতরেণৈব সংহতপ্রাণাদিবিলক্ষ- ণেন তু সর্ব্বে সংহতাঃ সন্তো জীবন্তি প্রাণান্ ধারয়ন্তি। যস্মিন্ সংহত-বিলক্ষণে আত্মনি সতি পরস্মিন্ এতৌ প্রাণাপানৌ চক্ষুরাদিভিঃ সংহতৌ উপাশ্রিতৌ; যস্যাসংহতস্যার্থে প্রাণাপানাদিঃ সর্ব্বং স্বব্যাপারং কুর্ব্বন্ বর্ত্ততে সংহতঃ সন্; স ততোহন্যঃ সিদ্ধ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৯১৷৫৷৷
শঙ্কা হইতে পারে যে, প্রাণাদি বায়ুর অপগমেই এই দেহ বিধ্বস্ত বা বিনষ্ট হইয়া থাকে; কিন্তু প্রাণাদির অতিরিক্ত আত্মার অপগমে বিধ্বস্ত হয় না; কারণ, এ জগতে মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল প্রাণিগণ প্রাণাদি দ্বারাই জীবন ধারণ করিয়া থাকে। না, এরূপ হইতে পারে না; কারণ, মর্ত্য—মনুষ্য অর্থাৎ দেহধারী কেহই প্রাণের দ্বারা কিংবা
অপানের দ্বারা অথবা চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়দ্বারা জীবন ধারণ করে না। কেন না, ইহারা সকলেই সংহত্যকারী অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে কার্য্য- সম্পাদক; সুতরাং পরার্থ(অপরের প্রয়োজন সাধনার্থ উৎপন্ন); পরার্থ বলিয়া ইহারা জীবনধারণের কারণ হইতে পারে না। জগতে স্বার্থ বা পরোদ্দেশ্যশূন্য—অসংহত অপর কাহারও দ্বারা পরিচালিত না হইয়া যেমন গৃহাদি কোন সংহত(সাবয়ব) বস্তুকেই অবস্থান করিতে দেখা যায় না; প্রাণাদি করণ নিচয়ও যখন সংহত, তখন তাহাদের সম্বন্ধেও তেমনি ব্যবস্থা হওয়া উচিত। অতএব নিশ্চয়ই প্রাণ প্রভৃতি সংহত পদার্থ হইতে’ বিভিন্নরূপ(অসংহত) অপরের দ্বারা সমস্ত* বস্তু সংহত(সম্মিলিত বা সাবয়ব) হইয়া জীবিত থাকে। সংহতবিলক্ষণ যে—পরমাত্মা বিদ্যমান থাকিলে এই প্রাণ ও অপান চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সহিত সংহতভাবে বর্তমান থাকে।[অভিপ্রায় এই যে,] প্রাণ ও অপানাদি করণনিচয় সংহত হইয়া যেই অসংহত আত্মার উদ্দেশ্যে নিজ নিজ কার্য্য করতঃ অবস্থান করে, সেই অসংহত পদার্থটি যে প্রাণাদি হইতে পৃথক্, ইহা দ্বারা তাহা প্রমাণিত হইল * ॥ ৯১ ॥ ৫ ॥
হন্ত ত ইদং প্রবক্ষ্যামি গুহ্যং ব্রহ্ম সনাতনম্। যথা চ মরণং প্রাপ্য আত্মা ভবতি গৌতম ॥৯২॥৬৷৷
। “যেমং প্রেতে” ইত্যাদি নাচিকেতসা যঃ পরলোকান্তিত্বে সন্দেহঃ কৃতঃ,
ইদানীং তন্নিবৃত্ত্যর্থং বিশিয্যাহ]—হন্ত ত ইতি। হে গৌতম, হস্ত ইদানীম্ তে (তুভ্যং) ইদং গুহ্যং সনাতনং ব্রহ্ম প্রবক্ষ্যামি।[ যদবিজ্ঞানাৎ] আত্মা মরণং প্রাপ্য চ যথা ভবতি;[ তচ্চ তুভ্যং প্রবক্ষ্যামি]॥
হে গৌতম![তোমার সংশয় নিবৃত্তির জন্য] এই গুহ্য(গোপনীয়) সনাতন (নিত্য) ব্রহ্মস্বরূপ তোমাকে বলিতেছি। এবং আত্মা(জীব)[ব্রহ্মকে না জানিয়া] মরণ প্রাপ্ত হইয়া(মৃত্যুর পর) যেরূপে সংসার লাভ করে, তাহাও তোমাকে বলিতেছি ॥ ৯২৷৷৬৷৷
হন্ত ইদানীং পুনরপি তে তুভ্যমিদং গুহ্যং গোপ্যং ব্রহ্ম সনাতনং চিরন্তনং প্রবক্ষ্যামি। যদ্বিজ্ঞানাৎ সর্ব্বসংসারোপরমো ভবতি, অবিজ্ঞানাচ্চ যস্য মরণং প্রাপ্য যথা চাত্মা ভবতি—যথা সংসরতি, তথা শৃণু, হে গৌতম ॥৯২৷৷৬৷৷
‘হন্ত’ কথাটি আহলাদসূচক; হে গৌতম!(নচিকেতঃ!) এখন পুনশ্চ তোমার উদ্দেশে এই গুহ্য অর্থাৎ গোপনীয়(যে-সে লোকের নিকট অপ্রকাশ্য), সনাতন অর্থাৎ চিরন্তন বা চিরস্থির ব্রহ্মতত্ত্ব বলিব; যাঁহার(ব্রহ্মের) জ্ঞানে সংসারের উপরম বা নিবৃত্তি(মুক্তি) হয়, আর যাঁহার অবিজ্ঞানে অর্থাৎ যে ব্রহ্মকে না জানার ফলে, আত্মা (দেহী) মরণ প্রাপ্ত হইয়া(মৃত্যুর পর) যে প্রকার হয়, অর্থাৎ যে প্রকারে সংসার লাভ করে; তাহা শ্রবণ কর ॥ ৯২ ॥ ৬ ॥
যোনিমধ্যে প্রপদ্যন্তে শরীরত্বায় দেহিনঃ।
শৃণুমন্যেহনুসংযন্তি যথাকর্ম্ম যথাশ্রুতম্ ॥ ৯৩ ॥ ৭ ॥
[পূর্ব্বোক্তং “যথা চ মরণং প্রাপ্য আত্মা ভবতি” ইতি বিবৃণন্ আহ]- যোনিমিতি। অন্যে(কেচন) দেহিনো(দেহধারণযোগ্যাঃ জীবাঃ) যথাকৰ্ম্ম যথাশ্রুতং(স্বস্বকৰ্ম্ম-বিদ্যানুসারেণ) শরীরত্বায় শরীরগ্রহণার্থং যোনিং প্রপদ্যন্তে জরায়ুজা ভবন্তি। অন্যে(দেহিনঃ)[যথাকৰ্ম্ম যথাশ্রুতং] স্থাণুং(স্থাবরদেহং) সংযন্তি(প্রাপ্নুবন্তি)॥
নিজ নিজ কৰ্ম্ম ও জ্ঞান অনুসারে কোন কোন দেহী শরীর গ্রহণার্থ যোনিদ্বার প্রাপ্ত হয়(শুক্র-শোণিত-সংযোগে উৎপন্ন হয়)। অপর কোন কোন দেহী স্থাণু অর্থাৎ বৃক্ষ-পাষাণাদি স্থাবর দেহ লাভ করে ॥৯৩৷৭৷৷
যোনিং যোনিদ্বারং শুক্র-বীজসমন্বিতাঃ সন্তোহন্যে কেচিদবিদ্যাবন্তো মূঢ়াঃ প্রপ- দ্যন্তে, শরীরত্বায় শরীরগ্রহণার্থং দেহিনো দেহবন্তঃ, যোনিং প্রবিশন্তীত্যর্থঃ। স্থাণুং বৃক্ষাদিস্থাবরভাবম্, অন্যে অত্যন্তাধমা মরণং প্রাপ্য অনুসংযন্তি অনুগচ্ছন্তি। যথাকৰ্ম্ম—যদ্ যস্য কৰ্ম্ম—তদ্ যথাকৰ্ম্ম, যৈর্যাদৃশং কৰ্ম্ম ইহ জন্মনি কৃতং, তদ্বশেন ইত্যেতৎ। তথা যথাশ্রুতং—যাদৃশঞ্চ বিজ্ঞানমুপাজিতং, তদনুরূপমেব শরীরং প্রতিপদ্যন্ত ইত্যর্থঃ; “যথা প্রজ্ঞং হি সম্ভবাঃ” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ ॥৯৩৷৭৷৷
কতকগুলি অবিদ্যাশালী, দেহী—দেহধারী মুঢ় ব্যক্তি শরীর গ্রহণের নিমিত্ত শুক্র-বীজ সমন্বিত হইয়া যোনি-দ্বার প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ জননেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করিয়া থাকে; অপর অতিশয় অধম ব্যক্তিরা মরণ প্রাপ্ত হইয়া অর্থাৎ মৃত্যুর পর স্থাণু অর্থাৎ বৃক্ষাদি স্থাবরভাব প্রাপ্ত হয়।[বুঝিতে হইবে] যাহার যেরূপ কৰ্ম্ম, অর্থাৎ ইহ জন্মে যাহারা যেরূপ কৰ্ম্ম করিয়াছে, তদনুসারে—এবং যাহারা যেরূপ জ্ঞান উপার্জন করিয়াছে, তদনুসারে শরীর প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কারণ, অপর শ্রুতিতে আছে,—[যাহার] যেরূপ প্রজ্ঞা বা জ্ঞান সঞ্চিত আছে;[তাহার] তদনুসারেই জন্ম হইয়া থাকে’ * ॥ ৯৩ ॥ ৭ ॥
য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষো নিৰ্ম্মিমাণঃ। তদেব শুক্রং তদ্ব্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে। তস্মিল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্ব্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন। এতদ্বৈ তৎ ॥ ৯৪ ॥ ৮ ॥
[পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাতং গুহ্যং ব্রহ্মস্বরূপমাহ]—য এষ ইতি। য এষ পুরুষঃ সুপ্তেষু(প্রাণাদিষু নির্ব্যাপারেষু সৎসু) কামং(কাম্যমানং ভোগ্যবিষয়ং) কামং (স্বেচ্ছানুসারেণ) নিৰ্ম্মিমাণঃ(সম্পাদয়ন্ সন্) জাগর্তি,(অনুপহতস্বভাব এব তিষ্ঠতীত্যর্থঃ)। তৎ(স পুরুষঃ)[তদেবেতি বিধেয়াপেক্ষয়া নপুংসকত্বম্], এব শুক্রং(শুদ্ধম্ উজ্জ্বলং), তৎ[এব] ব্রহ্ম, তৎ এব অমৃতম্(অনশ্বরম্) উচ্যতে। প্রাজ্ঞৈরিতি শেষঃ।।
[তস্যৈব মহিমান্তরমাহ]—সর্ব্বে লোকাঃ(পৃথিব্যাদয়ঃ) তস্মিন্(পরম কারণে ব্রহ্মণি) শ্রিতাঃ(আশ্রিতাঃ)। কশ্চন উ(কশ্চিদপি) তৎ(ব্রহ্ম) ন অত্যেতি(অতিক্রম্য ন বর্ত্ততে ইত্যর্থঃ)। এতৎ বৈ(এতদেব) তৎ, [যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্ আত্মতত্ত্বম্]॥
এখন পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞাত ব্রহ্মস্বরূপ অভিহিত হইতেছে—প্রাণাদি করণবর্গ সুপ্ত অর্থাৎ নির্ব্যাপার হইলে পর এই যে পুরুষ(আত্মা) ইচ্ছামত বা প্রচুরপরিমাণে কাম্য(অভীষ্ট ভোগ্য) বিষয়সমূহ নির্মাণ করতঃ জাগ্রৎ থাকেন, অর্থাৎ স্বীয় স্বপ্রকাশভাব পরিত্যাগ করেন না; তিনিই শুদ্ধ(প্রকাশময়), তিনিই ব্রহ্ম এবং তিনিই অমৃত অর্থাৎ অবিনাশী বলিয়া কথিত হন। পৃথিবী প্রভৃতি সমস্ত লোকই তাঁহাতে আশ্রিত; কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না ৷৷ ৯৪॥৮॥
যৎ প্রতিজ্ঞাতং গুহ্যং ব্রহ্ম প্রবক্ষ্যামীতি, তদাহ-য এষ সুপ্তেষু প্রাণাদিষু জাগর্তি-ন স্বপিতি। কথম্?-কামং কামং তং তমভিপ্রেতং শ্র্যাদ্যর্থম্ অবিদ্যয়া নিষ্মিমাণো নিষ্পাদয়ন্ জাগর্ত্তি পুরুষো যঃ, তদেব শুক্রং শুভ্রং শুদ্ধং, তদ্ ব্রহ্ম, নান্যগুহ্যং ব্রহ্মাস্তি। তদেব অমৃতম্ অবিনাশি উচ্যতে সর্ব্বশাস্ত্রেষু। কিং চ, পৃথিব্যাদয়ো লোকান্তস্মিন্নেব সর্ব্বে ব্রহ্মণি শ্রিতাঃ আশ্রিতাঃ সর্ব্বলোককারণত্বাৎ তস্য। তদু নাত্যেতি কশ্চনেত্যাদি পূর্ব্ববদেব ৷৷ ৯৪ ৷৷ ৮৷৷
ইতঃপূর্ব্বে ‘গুহ্য ব্রহ্মস্বরূপ বলিব’ বলিয়া যাহা প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে; তাহা বলিতেছেন,—
এই যে পুরুষ প্রাণ প্রভৃতি সুপ্ত হইলেও জাগ্রৎ থাকেন-সুপ্ত হন না। কি প্রকারে[জাগ্রৎ থাকেন]? কাম্যমান স্ত্রী প্রভৃতি তত্তৎ ভোগ্য পদার্থ অবিদ্যা-বলে নির্মাণ করতঃ-সম্পাদন করতঃ যে পুরুষ জাগ্রৎ থাকেন, * তিনিই শুক্র-শুভ্র বা নির্দোষ, তিনিই ব্রহ্ম; তদতিরিক্ত আর কোনও গুহ্য ব্রহ্ম নাই; এবং সমস্ত শাস্ত্রে তিনিই অমৃত অর্থাৎ বিনাশ রহিত বলিয়া কথিত হন। আরও এক কথা,-পৃথিবী প্রভৃতি সমস্ত লোকই সেই ব্রহ্মেই আশ্রিত আছে, কারণ তিনিই সমস্ত লোকের কারণ,[কার্য্য মাত্রই কারণে আশ্রিত থাকে]। কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না; ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্বেরই মত ॥ ৯৪ ॥ ৮॥
অগ্নির্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্টো রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব। একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপংরূপং প্রতিরূপো বহিশ্চ ॥ ৯৫ ॥ ৯ ॥
ইদানীং দেহভেদেহপি আখ্যান একত্বং প্রতিপাদয়িতুং, সদৃষ্টান্তমাহ—অগ্নি-
ত্যাদি মন্ত্রদ্বয়ম্]। যথা এক[এব] অগ্নিঃ ভুবনং(ইমং লোকং) প্রবিষ্টঃ (সন্) রূপং রূপং প্রতি(কাষ্ঠাদি-দাহভেদানুসারেণ) প্রতিরূপঃ(তত্তদুপাধি- সদৃশপ্রকাশঃ) বভূব। তথা সর্ব্বভূতান্তরাত্মা(সর্ব্বেষাং ভূতানাং অভ্যন্তরস্থ আত্মা) একঃ[এব সন্] রূপং রূপং(প্রতিদেহং) প্রতিরূপঃ(তত্তদ্-দেহো- পাধ্যনুরূপঃ)। ভবন্ অপি] বহিঃ চ(সর্ব্বভূতেভ্যঃ পৃথক্ এব, স্বয়মবিকৃত এব তিষ্ঠতীত্যাশয়ঃ)। যদ্বা, তথা এক[এব] আত্মা সর্ব্বভূতানাং অন্তঃ(অভ্যন্তরে) বহিশ্চ(বহিরপি) রূপং রূপং প্রতিরূপঃ ভবতীত্যর্থঃ ॥
দেহভেদেও যে, আত্মার ভেদ হয় না, পরবর্তী মন্ত্রদ্বয়ে তাহাই কথিত হইতেছে,—একই অগ্নি যেরূপ জগতে প্রবেশপূর্ব্বক বিভিন্ন দাহ্য পদার্থানুসারে তদনুরূপ প্রতীয়মান হইয়া থাকে; সেইরূপ সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরস্থ আত্মা এক হইয়াও ভিন্ন ভিন্ন দেহরূপ উপাধি অনুসারে সেই সকল উপাধির অনুরূপ হইয়াও বহিঃ অর্থাৎ সমস্ত উপাধি হইতে পৃথক্—অবিকৃতভাবেই থাকেন। অথবা একই আত্মা সর্ব্বভূতের অন্তরে ও বাহিরে ভিন্ন ভিন্ন উপাধির অনুরূপ বলিয়া প্রতীয়মান হন ॥ ৯৫ ॥ ৯॥
অনেক-কুতার্কিক-পাষণ্ড-কুবুদ্ধি-বিচালিতান্তঃকরণানাং প্রমাণোপপন্নমপি আত্মৈকত্ববিজ্ঞানম্ অসকৃৎ উচ্যমানমপি অনুজুবুদ্ধীনাং ব্রাহ্মণানাং চেতসি নাধীয়তে, ইতি তৎপ্রতিপাদনে আদরবতী পুনঃ পুনরাহ শ্রুতিঃ—অগ্নিরথা এক এব প্রকাশাত্মা সন্ ভুবনং—ভবন্ত্যস্মিন্ ভূতানীতি ভুবনম্—অয়ং লোকঃ, তমিমং ‘প্রবিষ্টোহনু- প্রবিষ্টঃ, রূপং রূপং প্রতি—দার্ব্বাদিদাহ্যভেদং প্রতীত্যর্থঃ, প্রতিরূপস্তত্র তত্র প্রতিরূপবান্—দাহ্যাভেদেন বহুবিধো বভূব। এক এব তথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং সর্বেষাং ভূতানামভ্যন্তর আত্মা অতিসূক্ষ্মত্বাৎ দার্ব্বাদিম্বিব সর্বদেহং প্রতি প্রবিষ্টত্বাৎ প্রতিরূপো বভূব, বহিশ্চ স্বেনাবিকৃতেন রূপেণ অকাশবৎ ॥ ৯৫ ॥ ৯ ॥ ভাষ্যানুবাদ।
বহুতর কুতার্কিক ও পাষণ্ডগণের অসদ্বুদ্ধি দ্বারা যাহাদের অন্তঃকরণ বিচালিত বা বিকৃত হইয়াছে; সেই সকল কুটিলমতি ব্রাহ্মণগণের হৃদয়ে এই আত্মৈকত্ব-বিজ্ঞান প্রমাণ সমর্থিত হইলেও এবং পুনঃ পুনঃ উপদিষ্ট
হইলেও স্থান পায় না; এই কারণে শ্রুতি সেই আত্মৈকত্ব প্রতি- পাদনে আগ্রহান্বিত হইয়া পুনঃ পুনঃ[তাহাই] প্রতিপাদন করিতে- ছেন *—একই অগ্নি যেরূপ প্রকাশস্বভাব হইলেও ভুবনে অর্থাৎ সমস্ত ভূত যেখানে উৎপন্ন হয়, সেই ‘ভুবন’ পদবাচ্য এই লোকে (জগতে) অনুপ্রবিষ্ট হইয়া প্রত্যেক রূপ অর্থাৎ কাষ্ঠ প্রভৃতি প্রত্যেক দাহ্য ভেদানুসারে প্রতিরূপ হয়; অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন দাহ্য পদার্থানুসারে বহুবিধ হইয়াছে(হইয়া থাকে)। সেইরূপ কাষ্ঠাদির মধ্যগত অগ্নির ন্যায় সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে স্থিত—অন্তরাত্মা এক হইয়াও অতি সূক্ষ্মতাহেতু সর্ব্ব দেহে প্রবেশ বশতঃ[সেই সকলের] প্রতিরূপ (সদৃশ) হইয়াছে; তথাপি[তিনি] বহিঃ অর্থাৎ আকাশের ন্যায় স্বরূপতঃ নির্ব্বিকার ॥ ৯৫ ॥ ৯ ॥
বায়ুর্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্টো রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব। একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং প্রতিরূপো বহিশ্চ ॥ ৯৬ ॥ ১০ ॥
[পুনরপ্যাহ]—এক[এব] বায়ুঃ যথা ভুবনং প্রবিষ্টঃ সন্ রূপং রূপং প্রতি- রূপঃ বভূব; তথা একএব সর্ব্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং(প্রতিদেহং) প্রতিরূপঃ [ভবন্ অপি] বহিঃ চ[স্বরূপেণ অবিকৃত এব তিষ্ঠতীত্যর্থঃ]॥
২১
একই বায়ু যেরূপ জগতে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া প্রত্যেক বস্তুর অনুরূপ ভাব প্রাপ্ত হইয়াছে। সেইরূপ সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা এক হইয়াও প্রত্যেক দেহানুসারে তদনুরূপ হইয়া প্রকাশ পাইয়াছেন; তথাপি তিনি স্বরূপতঃ অবিকৃতই আছেন৷ ৯৬॥ ১০॥
তথা অন্যো দৃষ্টান্তঃ—বায়ুর্যথৈক ইত্যাদি। প্রাণাত্মনা দেহেযু অনুপ্রবিষ্টঃ। রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূবেতি সমানম্ ॥ ৯৬ ॥ ১০ ॥
সেইরূপ অপর একটি দৃষ্টান্ত এই যে,—‘বায়ু যেমন এক হইয়াও’ ইত্যাদি।[ একই বায়ু] প্রাণরূপে দেহ মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া প্রত্যেক দেহানুসারে তদনুরূপ হইয়াছেন। অপর সমস্তই পূর্ব্বের ন্যায় ॥ ৯৬ ॥ ১০ ॥
সূর্য্যো যথা সর্বলোকস্য চক্ষু- নলিপ্যতে চাক্ষুষৈর্বাহ্যদোষৈঃ। একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন বাহ্যঃ ॥ ৯৭ ॥ ১১ ॥
[ক্লিশ্যমানজগদন্তঃপ্রবিষ্টস্য আত্মনোহপি তদ্বদেব ক্লেশঃ স্যাৎ, ইতি শঙ্কাং পরিহরন্ সদৃষ্টান্তমাহ] সূর্য্যো যথেতি। যথা সূর্য্যঃ সর্ব্বলোকস্য চক্ষুঃ (চক্ষুনিয়ন্তৃতয়া চক্ষুরন্তস্থঃ সন্নপি) চাক্ষুষৈঃ বাহ্যদোষৈঃ(চক্ষুঃসম্বন্ধিভিঃ বাহ্যৈঃ দোষৈঃ) ন লিপ্যতে। তথা সর্বভূতান্তরাত্মা একঃ[সন্ অপি] লোক-দুঃখেন ন লিপ্যতে(ন সংস্পৃশ্যতে)।[যতঃ] বাহ্যঃ(অসঙ্গ-স্বভাবঃ) ॥
যেমন একই সূর্য্য সর্ব্বলোকের চক্ষু অর্থাৎ নিয়ন্তরূপে চক্ষুর অভ্যন্তরস্থ হইয়াও চক্ষুঃসম্বন্ধী বাহ্যপদার্থগত দোষে লিপ্ত হন না; তেমনি সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা এক হইয়াও লোকদুঃখে লিপ্ত বা সম্বন্ধ হন না;[কারণ, তিনি চক্ষুর অধিষ্ঠাতা হইয়াও] বাহ্য অর্থাৎ সর্ব্বতোভাবে অসঙ্গ ॥ ৯৭ ॥ ১১ ॥
একস্য সর্ব্বাত্মত্বে সংসারদুঃখিং পরস্যৈব স্যাৎ, ইতি প্রাপ্তং; অত ইদমুচ্যতে,
-সূর্য্যো যথা চক্ষুষ আলোকেন উপকারং কুর্ব্বন্ মূত্রপুরীষাদ্যশুচিপ্রকাশনেন তদ্দশিনঃ সর্ব্বলোকস্য চক্ষুরপি সন্ ন লিপ্যতে চাক্ষুষৈঃ অশুচ্যাদিদর্শননিমিত্তৈঃ আধ্যাত্মিকৈঃ পাপ-দোষৈঃ, বাহ্যৈশ্চ অশুচ্যাদিসংসর্গদোষৈঃ। একঃ সন্ তথা সর্বভূতান্তরাত্মা ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন বাহ্যঃ। লোকো হবিদ্যয়া স্বাত্মনি অধ্যস্তয়া কামকর্ম্মোদ্ভবং দুঃখমনুভবতি, ন তু সা পরমার্থতঃ স্বাত্মনি। যথা রজ্জু- শুক্তিকোষরগগনেষু সর্প-রজতোদক-মলানি ন রজ্জাদীনাং স্বতো দোষরূপাণি সন্তি, সংসর্গিণি বিপরীতবুদ্ধ্যধ্যাসনিমিত্তাত্ত তদ্দোষব্দ বিভাব্যস্তে। ন তদ্দোষৈস্তেষাং লেপঃ. বিপরীতবুদ্ধ্যধ্যাসবাহ্যা হি তে। তথা আত্মনি সর্ব্বো লোকঃ ক্রিয়া-কারক- ফলাত্মকং বিজ্ঞানং সর্পাদিস্থানীয়ং বিপরীতমধ্যস্য তন্নিমিত্তং জন্ম-জরা-মরণাদি- দুঃখমনুভবতি, নত্বাত্মা সর্ব্বলোকাত্মাপি সন্ বিপরীতাধ্যারোপনিমিত্তেন লিপ্যতে লোকদুঃখেন। কুতঃ? -বাহ্যো রজ্জাদিবদেব বিপরীতবুদ্ধ্যধ্যাসবাহ্যো হিসঃ ॥৯৭৷১১৷
এক পরমাত্মাই সর্বাত্মক হইলে সংসার-দুঃখও তাঁহারই হইতে পারে? এই শঙ্কায় কথিত হইতেছে,-আলোক দ্বারা চক্ষুর উপকার- কারক সূর্য্য যেরূপ মল-মূত্রাদি অপবিত্র বস্তুর প্রকাশন দ্বারা সেই সকল অপবিত্রদর্শী লোকের চক্ষুঃস্বরূপ হইয়াও চাক্ষুষ পাপদোষে এবং বাহ্যদোষে লিপ্ত হন না। অপবিত্র বস্তু দর্শনে মনের মধ্যে যে পাপোদয় হয়, তাহাই এখানে আধ্যাত্মিক ‘চাক্ষুষ’ দোষ; আর অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শ জনিত যে দোষ হয়, তাহাই এখানে ‘বাহ্যদোষ’ নামে অভিহিত হইয়াছে। সেইরূপ সর্বভূতের অন্তরাত্মা এক হইয়াও লোক-দুঃখে লিপ্ত হন না; কারণ, তিনি বাহ্য(ভ্রমের অতীত)।[সাধারণতঃ] সমস্ত লোকই আপনাকে অধ্যস্ত বা আরোপিত অবিদ্যা বশতই কামনা ও তদনুযায়ী ক্রিয়া-সমুৎপন্ন দুঃখ অনুভব করিয়া থাকে; কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আত্মাতে সেই অবিদ্যা নাই; স্বভাবতঃই রজ্জু প্রভৃতির দোষরূপী অর্থাৎ রজ্জু প্রভৃতির ভ্রান্তি বা অজ্ঞান-কল্পিত সর্প, রজত, জল ও মালিন্য(নীল আভা) পথ যেরূপ[যথাক্রমে] রজ্জু, শুক্তিকা(ঝিনুক),
ঊষরভূমি ও আকাশে[দৃশ্যমান হইলেও বস্তুতঃ] থাকে না; কেবল বিপরীত বুদ্ধির অধ্যাস বা আরোপ বশতই সেগুলি ঐসকল বস্তুর ন্যায় প্রকাশ পায় মাত্র। কিন্তু সেই সমস্ত আরোপিত বস্তুর দোষে সেই রজ্জু প্রভৃতি পদার্থের কিছুমাত্র লেপ বা সংস্পর্শ হয় না; কারণ, সেই সকল পদার্থ বিপরীত বুদ্ধি বা ভ্রান্তি-অধ্যাসের অতীত। সেইরূপ সমস্ত লোকে আত্মাতেও সর্পাদির ন্যায় ক্রিয়া, কারক ও ক্রিয়াফলাত্মক বিপরীত বিজ্ঞানের অধ্যাস করিয়া সেই অধ্যাস-জনিত জন্ম-মরণাদি দুঃখ অনুভব করিয়া থাকে। কিন্তু আত্মা সর্ব্ব লোকের আত্মস্বরূপ হইয়াও বিপরীত বুদ্ধির(আমি, স্থূল, কৃশ, সুখী, দুঃখী ইত্যাদি জ্ঞানের) অধ্যাস বশতঃ লোক-দুঃখে অর্থাৎ সাধারণ লোকের অনুভূত দুঃখে লিপ্ত হয় না; কারণ, সেই আত্মা বাহ্য, অর্থাৎ রজ্জু প্রভৃতিরই ন্যায় বিপরীত বুদ্ধ্যাত্মক(ভ্রান্তিময়) অধ্যাসের অতীত ॥ ৯৭ ॥ ১১ ॥
একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা, একং রূপং বহুধা যঃ করোতি। তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা- স্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম্ ॥ ৯৮ ॥ ১২ ॥
[তস্যৈব মহিমান্তর-প্রদর্শন-পূর্ব্বকমুপাসনফলমাহ]-বশী এক ইতি। (সর্ব্বনিয়ন্তা) যঃ সর্ব্বভূতান্তরাত্মা একঃ(এক এব সন্) একং[এব] রূপং (অদ্বিতীয়মাত্মানমেব) বহুধা(দেব-তির্য্যঙমনুষ্যাদি-ভেদেন অনেক প্রকারং) করোতি। আত্মস্থং(স্বহৃদয়ে প্রকাশমানং) তম্(আত্মানং) যে ধীরাঃ(বিবেক- শালিনঃ) অনুপশ্যন্তি(সাক্ষাৎ অনুভবন্তি)। তেষাং[এব] শাশ্বতং(নিত্যং) সুখং[ভবতি], ইতরেষাং(অনাত্মদর্শিনাং) ন[অবিদ্যাবৃত-চিত্তত্বাদিতি ভাবঃ] ॥
তাঁহারই অপর মহিমা কথনপূর্ব্বক উপাসনাফল বলিতেছেন],—বশী(সর্ব্ব- নিয়ন্তা) ও সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মস্বরূপ যিনি এক হইয়াও স্বীয় একটি রূপকে (আপনাকে) দেব, তির্য্যক্ ও মনুষ্যাদিভেদে বহুপ্রকার করিয়া থাকেন। নিজ
নিজ বুদ্ধিতে প্রকাশমান সেই আত্মাকে যে সকল ধীরগণ(বিবেকিগণ) সাক্ষাৎ অনুভব করেন; তাঁহাদেরই নিত্য সুখ লাভ হয়, অপরের হয় না ॥ ৯৮॥ ১২॥
কিঞ্চ, স হি পরমেশ্বরঃ সর্ব্বগতঃ স্বতন্ত্রঃ একঃ, ন তৎসমোহভ্যধিকো বা অন্যোহস্তি। বশী সর্ব্বং হ্যস্য জগদ্ বশে বর্ততে। কুতঃ?—সর্বভূতান্তরাত্মা। যত একেব সদৈকরসমাত্মানং বিশুদ্ধবিজ্ঞানঘনরূপং নামরূপাদ্যশুদ্ধোপাধিভেদবশেন বহুধা অনেকপ্রকারেণ যঃ করোতি, স্বাত্মসত্তামাত্রেণ অচিন্ত্যশক্তিত্বাৎ। তম্ আত্মস্থং স্বশরীর-হৃদয়াকাশে বুদ্ধৌ চৈতন্যাকারেণ অভিব্যক্তমিত্যেতৎ। ন হি শরীরস্য আধারত্বমাত্মনঃ; আকাশবদমূর্ত্তত্বাৎ; আদর্শস্থং মুখমিতি যদ্বৎ। তমেতমীশ্বরম্ আত্মানং যে নিবৃত্তবাহ্যবৃত্তয়ঃ অনুপশ্যন্তি আচার্য্যাগমোপদেশম্ অনু সাক্ষাদনুভবন্তি ধীরাঃ বিবেকিনঃ। তেষাং পরমেশ্বরভূতানাং শাশ্বতং নিত্যং সুখম্ আত্মানন্দ- লক্ষণং ভবতি, নেতরেষাং বাহ্যাসক্তবুদ্ধীনাম্ অবিবেকিনাং স্বাত্মভূতমপি অবিদ্যা- ব্যবধানাৎ ॥ ৯৮ ॥ ১২ ॥
আরও এক কথা,—সেই পরমেশ্বরই সর্ব্বগত ও স্বতন্ত্র(স্বাধীন) এবং তাঁহার সমান বা অধিক আর কেহই নাই।[তিনি] বশী, অর্থাৎ সমস্ত জগৎ তাঁহার বশবর্তী হইয়া আছে; কারণ—তিনি সর্বভূতের অন্তরাত্মা; যে হেতু যিনি এক হইয়াও একরস(একই- প্রকার) বিশুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ আত্মাকে(আপনাকে) অশুদ্ধ(সদোষ) নাম-রূপাদি উপাধিভেদ অনুসারে বহুধা অর্থাৎ অনেক প্রকার করিয়া থাকেন; কারণ, তিনি স্বরূপতই অচিন্ত্যশক্তি-সম্পন্ন। আত্মস্থ অর্থাৎ স্বশরীরস্থিত হৃদয়াকাশে—বুদ্ধিতে চৈতন্যরূপে প্রকাশমান; আকাশের ন্যায় অমূর্ত্ত(পরিচ্ছেদশূন্য) আত্মার পক্ষে এই শরীর কখনই আধার বা আশ্রয় হইতে পারে না;[এই কারণেই ‘আত্মস্থ’ শব্দের ঐরূপ অর্থ করা হইল], আদর্শে প্রতিবিম্বিত মুখকে যেমন আদর্শস্থ বলা হয়, তদ্রূপ বুদ্ধিতে প্রতিবিম্বিত সেই ঈশ্বর- রূপী আত্মাকে যে সকল বাহ্যবিষয়াসক্তি-রহিত, ধীর অর্থাৎ বিবেক-
শালী লোক আচার্য্য ও আগমোপদেশানুসারে সাক্ষাৎ অনুভব করেন, তাঁহারা পরমেশ্বর ভাব-প্রাপ্ত হন। পরমেশ্বর-ভাবাপন্ন সেই সকল ধীর ব্যক্তিরই শাশ্বত নিত্য আত্মানন্দস্বরূপ সুখ লাভ হয়, কিন্তু তদ্ভিন্ন যাহারা বাহ্যবিষয়ে আসক্তচিত্ত—অবিবেকী, স্বস্বরূপ হইলেও অবিদ্যা দ্বারা আবৃত থাকায় তাহাদের পক্ষে উক্ত সুখ প্রকাশ’ পায় না ॥ ৯৮ ॥ ১২ ॥
নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানা- * মেকো বহুনাং যো বিদধাতি কামান্। তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা- স্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্ ॥৯৯ ॥১৩॥
[অপিচ],—অনিত্যানাং(বিনাশশীলানাং) নিত্যঃ(অবিনাশী কারণশক্তি- রূপঃ), চেতনানাং(বুদ্ধিমতাং—ব্রহ্মাদীনামপি) চেতনঃ(বোধসম্পাদকঃ), যঃ একঃ[সন্] বহুনাং(সংসারিণাং) কামান্(অভিলষিতার্থান্—কর্মফলানি) বিদধাতি(প্রদদাতি)। আত্মস্থং(বুদ্ধিস্থং) তং(আত্মানং) যে ধীরাঃ অনুপশ্যন্তি; তেষাং[এব] শাশ্বতী(নিত্যা) শান্তিঃ[ভবতি], ইতরেষাং ন॥
[আরও এক কথা],—সমস্ত অনিত্য পদার্থের নিত্য(অবিনাশী কারণস্বরূপ), এবং ব্রহ্মাদি সমস্ত চেতনের চৈতন্যপ্রদ যিনি এক হইয়াও বহুর—(সংসারীর) কাম অর্থাৎ কর্ম্মফল প্রদান করেন, আত্মস্থ সেই আত্মাকে যে সকল ধীর ব্যক্তি সাক্ষাৎ দর্শন করেন; তাঁহাদেরই নিত্য শান্তি লাভ হয়, অপর সকলের হয় না ॥ ৯৯ ॥ ১৩॥]
কিঞ্চ, নিত্যঃ অবিনাশী, অনিত্যানাং বিনাশিনাম্। চেতনঃ চেতনানাং চেতয়িতৃণাং ব্রহ্মাদীনাং প্রাণিনাম্। অগ্নিনিমিত্তমিব দাহকত্বম্ অনগ্নীনাম্ উদকাদীনাম্, আত্মচৈতন্যনিমিত্তমেব চেতয়িতৃত্বমন্যেষাম্।
কিঞ্চ, স সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্বেশ্বরঃ কামিনাং সংসারিণাং কর্ম্মানুরূপং কামান্ কর্ম্মফলানি।
স্বানুগ্রহনিমিত্তাংশ কামান্ য একো বহুনাম্ অনেকেষাম্ অনায়াসেন বিদধাতি প্রযচ্ছতীত্যেতৎ। তম্ আত্মস্থং যে অনুপশ্যন্তি ধীরাঃ, তেষাং শান্তিঃ উপরতিঃ শাশ্বতী নিত্যা স্বাত্মভূতৈব স্যাৎ, ন ইতরেষাম্ অনেকংবিধানাম্ ॥৯৯৷৷১৩৷৷
আরও এক কথা,—অনিত্য অর্থাৎ বিনাশশীল পদার্থ-নিচয়ের নিত্য—অবিনাশী শক্তি-স্বরূপ * এবং চেতন অর্থাৎ বুদ্ধিমান্ ব্রহ্মা প্রভৃতিরও চেতন অর্থাৎ বোধ-সম্পাদক,—অর্থাৎ অগ্নিসম্পর্ক বশতঃ জলাদি পদার্থের যেমন দাহকতা উৎপন্ন হয়, তেমনি অপর সমস্ত প্রাণীর চেতয়িতৃত্ব বা চৈতন্যও আত্মচৈতন্য-সম্পর্কাধীন।
আরও এক কথা, সকলের ঈশ্বর ও সর্বজ্ঞ যিনি এক হইয়াও কামনাশালী সংসারিগণের কর্ম্মানুরূপ কৰ্ম্মফল এবং স্বীয় অনুগ্রহ প্রদত্ত ও বহু কাম্য বিষয় অনায়াসে বিধান করেন—প্রদান করেন। আত্মস্থ(বুদ্ধিতে প্রকাশমান) সেই আত্মাকে যে সকল ধীর ব্যক্তি সাক্ষাৎ দর্শন করেন; তাঁহাদেরই নিত্য স্বাত্মস্বরূপ শান্তি অর্থাৎ উপশম হইয়া থাকে, কিন্তু অপর সকলের—যাহারা উক্তপ্রকার নহে, তাহাদিগের হয় না ॥ ৯৯ ॥ ১৩ ॥
তদেতদিতি মন্যন্তেই নির্দ্দেশ্যং পরমং সুখম্। কথং নু তদ্বিজানীয়াং কিমু ভাতি বিভাতি বা ॥১০০॥১৪॥
[যৎ পূর্ব্বোক্তং] অনির্দেশ্যং(ইয়ত্তয়া নির্দ্দিষ্টমশক্যং) পরমং সুখং (আত্মানন্দলক্ষণং) ‘তৎ এতৎ’(প্রত্যক্ষযোগ্যং) ইতি মন্যন্তে। নু(বিতর্কে)
কথং(কেন প্রকারেণ) তৎ(পরমং সুখং) বিজানীয়াং(আত্মবুদ্ধিগম্যং কুৰ্য্যাং?) [তৎ স্বপ্রকাশস্বভাবম্ আত্মসুখং] ভাতি কিমু?(প্রকাশতে কিং?)[যতঃ তৎ] বিভাতি বা? ‘অস্মৎ’-প্রতীতি বিষয়তয়া বিস্পষ্টং দৃশ্যতে বা নবা? ‘অহং’- প্রতীতি-বিষয়তয়া কথঞ্চিৎ প্রতীয়মানত্বেন তদ্বিজ্ঞানে সমাশ্বাসো জায়তে ইতি ভাবঃ ॥
পূর্ব্বোক্ত অনির্দেশ্য(বিশেষরূপে নির্দেশের অযোগ্য) যে পরম সুখকে (আত্মানন্দকে)[যতিগণ]: ‘তদেতৎ’ অর্থাৎ প্রত্যক্ষযোগ্য বলিয়া মনে করেন; তাহা কি প্রকারে অনুভব করিব? উহা প্রকাশ পায় কি? যে হেতু ‘আমি’ এই আত্মবুদ্ধির বিষয়রূপে উহা কথঞ্চিৎ প্রকাশ পায় কি না পায়? ॥ ১০০ ॥ ১৪ ॥
যত্তদাত্মবিজ্ঞানসুখম্ অনিৰ্দ্দেশ্যং নিৰ্দ্দিষ্টমশক্যং পরমং প্রকৃষ্টং প্রাকৃতপুরুষ-বাত্ম- নসয়োঃ অগোচরমপি সৎ নিবৃত্তৈষণা যে ব্রাহ্মণাঃ, তে তদেতৎ প্রত্যক্ষমেবেতি মন্যন্তে। কথং নু কেন প্রকারেণ তৎ সুখমহং বিজানীয়াম্—ইদমিত্যাত্মবুদ্ধিবিষয়ম্ আপাদয়েয়ম্, যথা নিবৃত্তবিষয়ৈষণা যতয়ঃ। কিমু তদ্ভাতি দীপ্যতে প্রকাশাত্মকং তৎ? যতোহস্মবুদ্ধিগোচরত্বেন বিভাতি বিস্পষ্টং দৃশ্যতে কিংবা নেতি ॥১০০৷১৪৷৷
সেই যে আত্মানুভূতিরূপ সুখ, উহা অনির্দেশ্য অর্থাৎ নির্দেশের (বিশেষরূপে জ্ঞাপনের) অযোগ্য, এবং পরম বা উৎকৃষ্ট অর্থাৎ অসংস্কৃত বুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষগণের বাক্য ও মনের অগোচর হইলেও যাঁহারা বীতস্পৃহ ব্রাহ্মণ(ব্রহ্মনিষ্ঠ), তাঁহারা উহাকে “তৎ এতৎ” ‘অর্থাৎ ‘ইহা সেই সুখ’ এইরূপে প্রত্যক্ষযোগ্য বলিয়াই মনে করেন। আমি কি প্রকারে সেই সুখ বিশেষরূপে অবগত হইতে পারি, অর্থাৎ সেই বীতস্পৃহ যতিগণের ন্যায় ‘ইহা’ এইরূপে স্ববুদ্ধির বিষয় করিতে পারি? সেই প্রকাশস্বভাব সুখ কি প্রকাশিত হয়? যে হেতু, ‘আমি’ এইরূপে ‘অস্মৎ’-বুদ্ধির বিষয় হইয়া উহা সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পায় অর্থাৎ অনুভূত হয় কি না হয়? ॥ ১০০ ॥ ১৪ ॥
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্ব্বং
তস্য ভাসা সর্ব্বমিদং বিভাতি ॥১০১॥১৫॥ ইতি কাঠকোপনিষদি দ্বিতীয়াধ্যায়ে দ্বিতীয়া বল্লী ॥২॥২॥
[প্রাগুক্তপ্রশ্নস্যোত্তরং বক্তুং তস্য অ-পর প্রকাশ্যত্বমাহ-ন তত্রেতি। তত্র (তস্মিন্ স্বপ্রকাশানন্দ-স্বরূপে আত্মনি) সূর্য্যঃ ন ভাতি(ন তং প্রকাশয়তীত্যর্থঃ)। চন্দ্রতারকং(চন্দ্রঃ তারকাসঙ্ঘশ) ন[ভাতি]। ইমাঃ(দৃশ্যমানাঃ) বিদ্যুতঃ ন ভান্তি; অয়ং অগ্নিঃ কুতঃ(কারণবিশেষাৎ)[ভায়াৎ?]।[কিং বহুনা-] ভ্রান্তং(প্রকাশমানং) তম্(আত্মানম্) এব অনু(অনুসৃত্য) সর্ব্বং(সূর্য্যাদিকং জ্যোতিঃ) ভাতি(প্রকাশং লভতে); ইদং সর্ব্বং(জগৎ) তস্য(আত্মজ্যোতিষঃ) ভাসা(দীপ্ত্যা) বিভাতি।(প্রকাশতে)। অতঃ তৎ ব্রহ্ম সূর্য্যাদিজ্যোতিঃ- স্বরূপেণ ভাতি চ বিভাতি চ, ইত্যাশয়ঃ] ॥
[পূর্ব্ব শ্লোকোক্ত ‘কিমুভাতি বিভাতি বা’ এই প্রশ্নের উত্তর প্রদানার্থ আত্মার স্বপ্রকাশত্ব বলিতেছেন-] সেই স্বপ্রকাশ আনন্দময় আত্মাকে সূর্য্য, চন্দ্র ও তারকাসমূহও প্রকাশ করিতে পারে না; বিদ্যুৎসমূহও প্রকাশ করিতে পারে না; এই লোক-লোচনগোচর অগ্নি আর প্রকাশ করিবে কি প্রকারে? অধিক কি? সূর্য্য চন্দ্র প্রভৃতি সমস্ত জ্যোতিঃপদার্থ প্রকাশমান সেই আত্মারই অনুগত ভাবে প্রকাশ পাইয়া থাকে; এই সমস্ত জগৎই তাঁহার দীপ্তিতে দীপ্তিমান্ হইয়া থাকে] ॥১০১৷৷১৫৷৷
তত্রোত্তরমিদং—ভাতি চ বিভাতি চেতি। কথং—ন তত্র তস্মিন্ স্বাত্মভূতে ব্রহ্মণি সর্ব্বাবভাসকোহপি সূর্য্যো ভাতি, তদ্ ব্রহ্ম ন প্রকাশয়তীত্যর্থঃ। তথা ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি, কুতোহয়ম্ অস্মদৃষ্টিগোচরোহগ্নিঃ। কিং বহুনা যদিদমাদিত্যাদিকং সর্ব্বং ভাতি, তত্তমেব পরমেশ্বরং ভান্তং দীপ্যমানম্ অনুভাতি অনুদীপ্যতে। যথা জলোলুমুকাদি অগ্নিসংযোগাদগ্নিং দহন্তমনুদহতি, ন স্বতঃ, তদ্বৎ।
२२
তস্যৈব ভাসা দীপ্ত্যা সর্ব্বমিদং সূর্য্যাদি বিভাতি। যত এবং তদেব ব্রহ্ম ভাতি চ বিভাতি চ। কার্য্যগতেন বিবিধেন ভাসা তস্য ব্রহ্মণো ভারূপত্বং স্বতোহবগম্যতে। ন হি স্বতো বিদ্যমানং ভাসনমন্যস্য কর্ত্তুং শক্যম্। ঘটাদীনাম্ অন্যাবভাসকত্বাদর্শ- নাৎ, ভাসনরূপাণাঞ্চ আদিত্যাদীনাং তদ্দর্শনাৎ ॥১০১৷১৫৷
ইতি শ্রীমৎপরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-গোবিন্দ-ভগবৎ-পূজ্যপাদ-শিষ্য- শ্রীমচ্ছঙ্কর-ভগবতঃ কৃতৌ কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়াধ্যায়ে
দ্বিতীয়-বল্লীভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥ বল্লী সমাপ্তা ॥
ভাষ্যানুবাদ।
পূর্ব্ব শ্লোকোক্ত প্রশ্নের উত্তর এই—তিনি সামান্য ও বিশেষা- কারে প্রকাশ পান; কিপ্রকার?—সূর্য্য সর্ববস্তু-প্রকাশক হইয়াও সর্বাত্মভূত সেই ব্রহ্মে প্রকাশ পান না; অর্থাৎ সেই ব্রহ্মকে প্রকাশিত করিতে পারেন না; চন্দ্র এবং তারকাও সেইরূপ; এই বিদ্যুৎসমূহও প্রকাশ পায় না। আমাদের প্রত্যক্ষগোচর এই অগ্নি আর পারিবে কোথা হইতে? অধিকের প্রয়োজন কি? এই যে সূর্য্য প্রভৃতি সমস্ত[জ্যোতিঃ] পদার্থ প্রকাশ পাইতেছে; তাহা সেই পরমেশ্বরে প্রকাশমান বলিয়াই তাঁহার অনুগত ভাবে প্রকাশ পাইতেছে। জল উল্মুক(জলৎকাষ্ঠ খণ্ড) প্রভৃতি পদার্থ যেমন অগ্নিসংযোগ বশতঃ দাহকারী অগ্নির অনুগত ভাবে দাহ করে, কিন্তু স্বভাবতঃ নহে, তেমনি এই সূর্যাদি পদার্থ সমূহও তাঁহার দীপ্তিতেই বিভাত হয়।
যে হেতু এই প্রকারে সেই ব্রহ্মই ভাত ও বিভাত হন। এবং কার্য্যগত বিবিধ দীপ্তিতে সেই ব্রহ্মের দীপ্তি-রূপতা স্বতই অবগত হয়। কেন না; যাহার স্বভাবসিদ্ধ দীপ্তি নাই; সে কখনই অন্যের দীপ্তি সম্পাদন করিতে পারে না। দেখিতে পাওয়া যায়,—দীপ্তিহীন ঘটাদি পদার্থসমূহ অন্যের অবভাসক হয় না, অথচ প্রকাশস্বরূপ আদিত্যাদির অন্য প্রকাশক হইয়া থাকে ॥ ১০১ ॥ ১৫
ইতি কঠোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদের দ্বিতীয়াধ্যায়ে
দ্বিতীয় বল্লী সমাপ্ত ॥ ২ ॥ ২ ॥
ঊর্দ্ধমূলোহবাক্শাখ এষোহশ্বত্থঃ সনাতনঃ। তদেব শুক্রং তদ্রব্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে। তস্মিল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্ব্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন।
এতদ্বৈ তং ॥ ১১০ ॥ ১ ॥
[ইদানীং সংসারমূলত্বেন ব্রহ্ম প্রস্তৌতি-“উর্দ্ধমূল’ ইত্যাদিনা। এষঃ(সংসার- রূপঃ) অশ্বত্থঃ(শ্বঃ-আগমিনি দিবসেহপি ন স্থাতা, ইতি অশ্বত্থঃ, তদাখ্যঃ বৃক্ষশ্চ), ঊর্দ্ধং(সর্ব্বোচ্চতমং ব্রহ্ম) মূলং(আদিকারণং যস্য, সঃ) উর্দ্ধমূলঃ, অবাচ্যঃ(অধোবর্তিন্যঃ) শাখাঃ(দেবাসুর-মনুষ্যাদিরূপঃ বিস্তারো যস্য, সঃ-) অবাক্শাখঃ, সনাতনঃ(অনাদিপ্রবাহরূপঃ)[চ প্রবৃত্তঃ]। “তদেব শুক্রং ইত্যাদ্যংশঃ পূর্ব্বমেব। ২।২।৮ শ্লোকে ব্যাখ্যাতঃ ॥
[এখন সংসার বৃক্ষের-মূলরূপে ব্রহ্মের স্বরূপ নিরূপণ করিতেছেন],—এই যে সংসাররূপ বৃক্ষ, ইহা অশ্বত্থ অর্থাৎ আগামী দিবসেও থাকিবে কি না, বলা যায় না; ঊর্দ্ধ অর্থাৎ সর্ব্বোচ্চতম ব্রহ্ম ইহার মূল বা আদিকারণ, ইহার শাখা অর্থাৎ দেবাসুরাদি বিস্তার অধঃ—নিম্নদেশে বিস্তৃত, এবং ইহা সনাতন বা অনাদিকাল হইতে প্রবৃত্ত ॥ ১১০৷৷১৷৷
তুলাবধারণেনৈব মূলাবধারণং বৃক্ষস্য ক্রিয়তে লোকে যথা, এবং সংসারকার্য্য- বৃক্ষাবধারণেন তন্মূলস্য ব্রহ্মণঃ স্বরূপাবদিধারয়িষয়া ইয়ং ষষ্ঠী বল্লী আরভ্যতে— উর্দ্ধমূলঃ—ঊর্দ্ধং মূলং যৎ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদমস্যেতি সোহয়ম্ অব্যক্তাদিস্থাবরান্তঃ সংসারবৃক্ষ উর্দ্ধমূলঃ। বৃক্ষশ্চ ব্রশ্চনাৎ, বিনশ্বরত্বাৎ। অবিছিন্ন-জন্ম-জরা-মরণ- শোকাদ্যনেকানর্থাত্মকঃ প্রতিক্ষণমন্যথাস্বভাবো মায়ামরীচ্যুদক-গন্ধর্ব্ব-নগরাদিবৎ দৃষ্টনষ্টস্বরূপত্বাদবসানে চ বৃক্ষবদভাবাত্মকঃ, কদলী-স্তম্ভবৎ নিঃসারঃ অনেকশত- পাষণ্ডবুদ্ধিবিকল্লাস্পদঃ, তত্ত্ববিজিজ্ঞাসুভিরনির্ধারিতদংতত্ত্বো বেদান্ত-নির্দ্ধারিত-
পরব্রহ্মমূলসারঃ, অবিদ্যা-কাম-কর্মাব্যক্তবীজ-প্রভবঃ অপরব্রহ্ম-বিজ্ঞান-ক্রিয়াশক্তি- দ্বয়াত্মক-হিরণ্যগর্ভাঙ্কুরঃ, সর্ব্বপ্রাণিলিঙ্গভেদস্কন্ধঃ, তত্ততৃষ্ণাজলাসেকোভূতদর্পঃ বুদ্ধীন্দ্রিয়বিষয়-প্রবালাঙ্কুরঃ, শ্রুতিস্মৃতিন্যায়বিদ্যোপদেশপলাশঃ, যজ্ঞ-দান-তপ- আদ্যনেকক্রিয়াসুপুষ্পঃ, সুখদুঃখ-বেদনানেকরসঃ, প্রাণ্যুপজীব্যানন্তফলঃ ততৃষ্ণা- সলিলাবসেকপ্ররূঢ়জটিলীকৃতদৃঢ়বদ্ধমূলঃ, সত্যনামাদিসপ্তলোক ব্রহ্মাদিভূতপক্ষি- কৃতনীড়ঃ, প্রাণিসুখদুঃখোদ্ভূত-হর্ষ-শৌক-জাত-নৃত্যগীতবাদিত্রক্ষে লিতা-স্ফোটিত- হসিতাকুষ্টরুদিত-হাহা-মুঞ্চমুঞ্চেত্যাদ্যনেক-শব্দকৃততুমুলীভূতমহারবঃ বেদান্তবিহিত- ব্রহ্মাত্ম-দর্শনাসঙ্গ শস্ত্র-কৃতোচ্ছেদ: এষ সংসারবৃক্ষঃ অশ্বত্থ:-অশ্বত্থবৎ কামকৰ্ম্ম- বাতেরিতনিত্যপ্রচলিতস্বভাবঃ, স্বর্গনর কতির্য্যপ্রেতাদিভিঃ শাখাভিরবাক্শাখঃ, (অবাঞ্চঃ শাখা যস্য সঃ)। সনাতনঃ অনাদিত্বাচ্চির প্রবৃত্তঃ। যদস্য সংসারবৃক্ষস্য মূলং, তদেব শুক্রং শুভ্রং শুদ্ধং জ্যোতিষ্মৎ চৈতন্যত্ম-জোতিঃস্বভাবং, তদেব ব্রহ্ম সর্ব্বমহত্ত্বাৎ, তদেবামৃতম্ অবিনাশস্বভাবম্ উচ্যতে কথ্যতে, সত্যত্বাৎ। ‘বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ম্,’ অনূতমন্যদতো মর্ত্যম্। তস্মিন্ পরমার্থসত্যে ব্রহ্মণি লোকা গন্ধর্ব্বনগরমরীচ্যুদক-মায়াসমাঃ পরমার্থদর্শনাভাবাবগম্যমানাঃ, শ্রিতা আশ্রিতাঃ, সর্ব্বে সমস্তা উৎপত্তিস্থিতিলয়েষু। তদু তদ্বহ্ম নাত্যেতি নাতিবর্ততে, মৃদাদিক- মিব ঘটাদিকাৰ্য্যং কশ্চন কশ্চিদপি বিকারঃ। এতদ্বৈ তদ্ ॥ ১১০ ॥ ১॥
জগতে[শিমুল প্রভৃতি] বৃক্ষের তুলা দর্শনেই যেমন তাহার মূলেরও অস্তিত্ব অবধারণ করা হইয়া থাকে; তেমনি কার্য্যভূত এই সংসাররূপ বৃক্ষের অবধারণে অর্থাৎ অস্তিত্ব দর্শনেই তম্মূলীভূত ব্রহ্মেরও অবধারণ হইতে পারে(১) এই কারণে ব্রহ্মস্বরূপাবধারণার্থ এই[তৃতীয়] বল্লী আরব্ধ হইতেছে,—
‘উর্দ্ধমূল’ অর্থ—উর্দ্ধ(উৎকৃষ্ট) যে বিষ্ণুর পরম পদ, তাহাই যাহার মূল,(আদি কারণ); অব্যক্ত(প্রকৃতি) হইতে আরম্ভ করিয়া স্থাবর(স্থিতিশীল বৃক্ষাদি) পর্য্যন্ত যে এই সেই সংসার বৃক্ষ, ইহাই ‘উর্দ্ধমূল’ এবং ব্রশ্চন বশতঃ(ছেদ্যত্ব নিবন্ধন) ‘বৃক্ষ’ পদবাচ্য। জন্ম, জরা, মরণ, শোক প্রভৃতি বহুবিধ অনর্থাত্মক(দুঃখ-ময়), প্রতিক্ষণে বিকারস্বভাব মায়া(ভেল্কী), মরীচিজল,(মরীচিকা) ও গন্ধর্ব্ব- নগর প্রভৃতির ন্যায় দৃষ্ট-নষ্টস্বভাব অর্থাৎ দেখিতে দেখিতে নষ্ট হওয়া যাহার স্বভাব, পরিণামেও বৃক্ষের ন্যায় অভাবাত্মক (অভাবে পর্য্যবসিত হয়), কদলীস্তম্ভের ন্যায় অসার, শত শত পাষণ্ড- গণের নানাবিধ কল্পনার বিষয়, অথচ তত্ত্বজিজ্ঞাসুগণ যাহার ‘ইদংতত্ত্ব’ অর্থাৎ প্রকৃত তত্ত্ব নির্দ্ধারণ করিতে অক্ষম, বেদান্তশাস্ত্রে নির্দ্ধারিত পরব্রহ্মই যাহার সারভূত মূল, অবিদ্যা(অজ্ঞান), কাম(বাসনা), কৰ্ম্ম ও অব্যক্তরূপ(প্রকৃতি—মায়ারূপ) বীজ হইতে সমুৎপন্ন, অপর- ব্রহ্মের(মায়োপহিত ঈশ্বরের) জ্ঞান শক্তি ও ক্রিয়া-শক্তিসমন্বিত হিরণ্যগর্ভ(সূক্ষ্ম শরীরসমষ্টিগত চৈতন্য) যাহার অঙ্কুর, সমস্ত প্রাণি- গণের সূক্ষমদেহের(২) বিভাগাবস্থা যাহার স্কন্ধ, ভোগতৃষ্ণারূপ জল- সেকে যাহার বৃদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয়ের(চক্ষুঃকর্ণাদির) বিষয়(রূপ-রস শব্দাদি) যাহার নবপল্লবের অঙ্কুর, শ্রুতি, স্মৃতি ও ন্যায়বিদ্যার উপদেশ যাহার পত্র; যজ্ঞ, দান, তপস্যা প্রভৃতি ক্রিয়ানিচয় যাহার উৎকৃষ্ট
পুষ্প, সুখ দুঃখানুভব যাহার বিবিধ রস, প্রাণিগণের উপভোগ্য স্বর্গাদি ফলই যাহার ফল, ফলতৃষ্ণারূপ সলিলসেকে সমুৎপন্ন ও যাহার দৃঢ়বন্ধন(অবান্তর মূল সমূহ),[ সাত্ত্বিক-রাজস ও তামসভাব] মিশ্রিত সত্যাদিনামক(ভূঃ, ভূবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ ও সত্য) এই সপ্তলোকস্থ ব্রহ্মাদি ভূতসমূহরূপ পক্ষিগণ যাহাতে নীড়(পক্ষীর বাসা) নিৰ্ম্মিত করিয়াছে; প্রাণিগণের সুখজাত হর্ষে ও দুঃখজাত শোকে সমুদ্ভূত নৃত্য, গীত, বাদ্য, ক্রীড়া, আস্ফোটন,(গর্বপ্রকাশ), হাস্য, রোদন, আকর্ষণ, ‘হায় হায়’! ছাড়-ছাড়! ইত্যাদি বহুবিধ শব্দই যাহাতে তুমুল মহাকোলাহল; বেদান্তশাস্ত্রোপদিষ্ট ব্রহ্মাত্মদর্শনরূপ অসঙ্গ (অনাসক্তিময়) শস্ত্র দ্বারা যাহার ছেদন হয়; এবস্তুত এই সংসারই অশ্বত্থ বৃক্ষ, অর্থাৎ অশ্বত্থবৃক্ষের ন্যায় কামনা ও তদনুগত কৰ্ম্মরূপ বায়ু দ্বারা সতত চঞ্চলস্বভাব; স্বর্গ, নরক, তির্য্যক্ ও প্রেতাদি দেহপ্রাপ্তিরূপ শাখা সমূহ দ্বারা অবাক্শাখ অর্থাৎ ইহার শাখা সমূহ অবাক্-অধোগামী, সনাতন অর্থাৎ অনাদি বলিয়াই চিরন্তন। এই সংসার-বৃক্ষের যিনি মূল, তিনিই শুক্র-শুভ্র বা শুদ্ধ-জ্যোতির্ময় অর্থাৎ চৈতন্যাত্মক আত্মজ্যোতিঃস্বভাবাত্মক; সর্বাপেক্ষা মহত্ত্বনিবন্ধন তিনিই ব্রহ্ম, সত্যস্বভাব বলিয়া তিনিই অমৃত-অবিনাশ বলিয়া কথিত হন।[কারণ, অন্যত্র শ্রুতি বলিয়াছেন যে,] ‘[ঘটপটাদি] বিকার আর কিছুই নহে কেবল বাক্যারব্ধ নাম মাত্র।’ ‘অন্য (ব্রহ্মভিন্ন) সমস্তই অনৃত(মিথ্যা) অতএব মর্ত্য(মরণশীল)।’ গন্ধর্বনগরী, মরীচিকা-জল ও মায়ার সদৃশ ও তত্ত্বদৃষ্টিতে মিথ্যা বলিয়া প্রতীয়মান সমস্ত লোক(জগৎ) সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশাবস্থায় পরমার্থ- সত্য সেই ব্রহ্মেই আশ্রিত থাকে। ঘটাদি কার্য্যসমূহ যেরূপ মৃত্তিকা অতিক্রম করিয়া থাকে না, সেইরূপ কেহই-কোন বিকারই সেই ব্রহ্মকে অতিক্রম করিয়া অবস্থান করে না বা করিতে পারে না। ইহাই সেইবস্তু[নচিকেতা যাহা জানিতে চাহিয়াছিলেন] ॥১১০॥১॥
[যদিদমিতি। যদিদং কিঞ্চ সর্ব্বং জগৎ(সর্বমেব জগদিত্যর্থঃ) প্রাণে (প্রাণাখ্যে ব্রহ্মণি)[স্থিতং, ততএব চ] নিঃসৃতং(উৎপন্নং সৎ) এজতি(যৎ- প্রেরণয়া চেষ্টতে)। এতৎ(প্রাণাখ্যং ব্রহ্ম) মহৎ ভয়ং(ভয়ানকং) উদ্যতম্ উদ্ধৃতং বজ্রং(বজ্রমিব) যে বিদুঃ, তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি ॥
এই যে কিছু জগৎ(জাগতিক পদার্থ) সমস্তই প্রাণ(ব্রহ্ম) হইতে নিঃসৃত (উৎপন্ন) এবং প্রাণসত্তায় স্পন্দমান হইয়া থাকে। যাঁহারা এই প্রাণ ব্রহ্মকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সমুদ্যত বজ্রের ন্যায় মনে করেন, অর্থাৎ তাঁহার সমস্ত শাসন মানিয়া চলেন, তাঁহারা অমৃত(মুক্ত) হন ॥ ১১১৷৷২৷৷
যদ্বিজ্ঞানাদমৃতা ভবন্তীত্যুচ্যতে, জগতো মূলং তদেব নাস্তি ব্রহ্ম, অসত- এবেদং নিঃসৃতমিতি।
তন্ন; যদিদং কিঞ্চ যৎ কিঞ্চ ইদং জগৎ সর্ব্বং প্রাণে পরস্মিন্ ব্রহ্মণি সতি এজতি কম্পতে। তত এব নিঃসৃতং নির্গতং সৎ প্রচলতি নিয়মেন চেষ্টতে। যদেবং জগদুৎপত্যাদিকারণং ব্রহ্ম, তৎ মহদ্ভয়ম্,মহচ্চ তৎ ভয়ঞ্চ-বিভেত্যম্মাদিতি মহদ্ভয়ম্। বজ্রমুদ্যতং উদ্যতমিব বজ্রম্, যথা বজ্রোদ্যতকরং স্বামিনম্ অভিমুখীভূতং দৃষ্ট্বা ভৃত্যা নিয়মেন তচ্ছাসনে প্রবর্ত্তন্তে, তথেদং চন্দ্রাদিত্যগ্রহনক্ষত্রতার কাদিলক্ষণং জগৎ সেশ্বরং নিয়মেন ক্ষণমপ্যবিশ্রান্তং বর্ত্তত ইত্যুক্তং ভবতি। যে এতৎ বিদুঃ স্বাত্মপ্রবৃত্তি-সাক্ষিভূতমেকং ব্রহ্ম, অমৃতা অমরণধৰ্ম্মাণস্তে ভবন্তি ॥ ১১১৷২ ॥
ভাল, যাঁহার বিজ্ঞানে লোকসমূহ অমৃত হয় বলা হইতেছে, জগ- তের মূল কারণ সেই ব্রহ্মেরই ত অস্তিত্ব নাই? কারণ এই জগৎ অসৎ হইতেই নিঃসৃত বা সমুৎপন্ন হইয়াছে;[সুতরাং ইহার মূলীভূত কোন সৎপদার্থই থাকিতে পারে না]। না—এ আপত্তি হইতে পারে না;
[কারণ,] যাহা এই কিছু অর্থাৎ এই যে কিছু জগৎ, বা জাগতিক পদার্থ, তৎ সমস্তই প্রাণের অর্থাৎ পরব্রহ্মের সত্তায়ই স্পন্দমান হই- তেছে,-সেই পরব্রহ্ম হইতেই নিঃসৃত হইয়া তাঁহার নিয়মানুসারে কার্য্য করিতেছে। যিনি এবস্তৃত-জগতের উৎপত্তি প্রভৃতির কারণস্বরূপ-ব্রহ্ম, তিনি মহৎভয়; তিনি মহৎও বটে এবং ভয়ও বটে,-অর্থাৎ সকলে তাঁহা হইতে ভয় পাইয়া থাকে। বজ্র উদ্যত অর্থ যেন উদ্যত(উত্থাপিত) বজ্রই। এই কথা উক্ত হইল যে, প্রভুকে উদ্যত বজ্রহস্তে সম্মুখাগত দর্শন করিয়া, ভৃত্যগণ যেরূপ নিয়মিতভাবে তাঁহার শাসনে থাকে; সেইরূপ, চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকাদি ঈশ্বর পর্য্যন্ত সমস্ত জগৎ ক্ষণকালও বিশ্রাম না করিয়া’ তাঁহার নিয়মাধীন হইয়া থাকে। আত্মকর্ম্মের সাক্ষিভূত এই এক ব্রহ্মকে যাঁহারা জানেন, তাঁহারা অমৃত অর্থাৎ মৃত্যুরহিত হন ॥১১১॥২॥
ভয়াদস্যাগ্নিস্তপতি ভয়াৎ তপতি সূর্য্যঃ।
ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুর্ধাবিতি পঞ্চমঃ ॥ ১১২ ॥ ৩ ॥
পূর্ব্বোক্তমেবার্থং প্রপঞ্চয়তি—ভয়াদিতি। অগ্নিঃ অস্য(জগৎকারণস্য ব্রহ্মণঃ) ভয়াৎ তপতি, সূর্য্যঃ[অস্য] ভয়াৎ তপতি।[অস্য] ভয়াৎ ইন্দ্রশ, বায়ুশ, পঞ্চমঃ মৃতুঃ(যমশ) ধাবতি(নিয়মেন স্বস্বব্যাপারান্ সম্পাদয়তি ইত্যর্থঃ)। [অন্যথা মহেশ্বরাণাং তেষাং স্বস্ব-কৰ্ম্মযু ঔদাসীন্যমপি সম্ভাব্যেত ইত্যাশয়ঃ]॥ পূর্ব্বোক্ত অর্থেরই প্রকাশার্থ বলিতেছেন,—অগ্নি ইঁহারই ভয়ে তাপ দিতেছেন, ইঁহারই ভয়ে সূর্য্য তাপ দিতেছেন, এবং ইঁহারই ভয়ে ইন্দ্র, বায়ু এবং[পূর্ব্বা- পেক্ষায়] পঞ্চম মৃত্যুও(যমও) ধাবিত হন, অর্থাৎ যথানিয়মে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদন করিতেছেন ॥ ১১২৷৷৩৷৷
কথং তদ্ভয়াৎ জগদ্বর্ততে?—ইত্যাহ, ভয়াৎ ভীত্যা অন্য পরমেশ্বরস্য’ অগ্নিস্তপতি, ভয়াৎ তপতি সূর্য্যঃ, ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ। ন হি ঈশ্বরাণাং
লোকপালানাং সমর্থানাং সতাং নিয়ন্তা চেৎ বজ্রোদ্যতকরবৎ ন স্যাৎ, স্বামিভয়- ভীতানামিব ভৃত্যানাং নিয়তা প্রবৃত্তিরুপপদ্যতে ॥১১২॥৩॥
তাঁহার ভয়ে জগৎ স্ব স্ব কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতেছে কি প্রকারে? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন, এই পরমেশ্বরের ভয়ে অগ্নি তাপ দিতেছেন, সূর্য্য ভয়ে তাপ দিতেছেন; ইন্দ্র, বায়ু, এবং পঞ্চম মৃত্যুও(যমও) [নিজ নিজ কার্য্যে] ধাবিত(সত্বর অগ্রসর) হইতেছেন। কারণ, যাঁহারা স্বয়ং ঈশ্বর অর্থাৎ শাসনক্ষমতাপ্রাপ্ত, লোকপাল(ভিন্ন ভিন্ন স্থানের অধিপতি) এবং সমর্থ বা শক্তিশালী, তাঁহাদের যদি বজ্রোদ্যত- করের ন্যায়[ভয়ানক একজন] নিয়ন্তা বা পরিচালক না থাকিত, তাহা হইলে কখনই প্রভুভয়ে ভীত ভৃত্যের ন্যায় তাহাদেরও সুনিয়মিত ভাবে কার্য্যসম্পাদন সম্ভবপর হইত না ॥১:২৷৩৷৷
ইহ চেদশকদ্বৌদ্ধং প্রাক্ শরীরস্য বিসর্গঃ।
ততঃ সর্গেষু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে ॥ ১১৩ ॥ ৪ ॥
- তৎস্বরূপাধিগমফলমাহ ইহেতি]।—ইহ(অস্মিন্ এব দেহে) চেৎ(যদি) বোদ্ধুং(ব্রহ্ম অবগন্তুং) অশকৎ(শক্তো ভবেৎ),[তদা] শরীরস্য বিস্রসঃ (বিস্রংসনাৎ—পতনাৎ) প্রাক্(পূর্ব্বমেব)[বন্ধনাৎ মুচ্যতে, জীবন্মুক্তো ভবতীত্যর্থঃ]।[বোদ্ধুং অশক্তঃ চেৎ, তদা] ততঃ(অনববোধাদেব) সর্গেযু (ভোগস্থানেষু স্বর্গাদিষু) শরীরত্বায়(দেহলাভায়) কল্পতে(সমর্থো ভবতি, ন মুচ্যতে ইত্যাশয়ঃ)। অথবা, ইহ(লোকে) শরীরস্য বিস্রসঃ(পতনাৎ) প্রাক্ চেৎ(যদি)[ব্রহ্ম] বোদ্ধুং অশকৎ(অশরুবন্—অসমর্থঃ ভবেৎ), ততঃ (অসামর্থ্যাৎ) সর্গেযু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে, লোকবিশেষে শরীরবিশেষং লভতে, ইত্যর্থঃ)॥
পূর্ব্বোক্ত ভয়ানক অবগতির ফল বলিতেছেন—এই দেহেই যদি কেহ সেই ব্রহ্মকে জানিতে সমর্থ হয় এবং জানে; শরীর-পাতের পূর্ব্বেই সেই লোক
২৩
সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হন। আর যে লোক বুঝিতে অশক্ত হয়, সে তাহার ফলেই স্বর্গাদি ভোগ স্থানে শরীর লাভের অধিকারী হয় ॥
অথবা—ইহলোকে শরীর পাতের পূর্ব্বে যদি ব্রহ্মকে বুঝিতে শক্ত না হয়, তাহা হইলে নানাবিধ লোকে শরীর লাভ করে;[ পক্ষান্তরে তাঁহাকে জানিতে পারিলে আর শরীর লাভ করিতে হয় না—মুক্তি হয়] ॥১১৩॥৪॥
তচ্চেহ জীবন্নেব চেৎ যদি অশকৎ-শক্তঃ সন্ জানাতি ইত্যেতৎ ভয়- কারণং ব্রহ্ম বোদ্ধ মবগন্তং-প্রাক্ পূর্ব্বং শরীরস্য বিস্রসোহবস্রংসনাৎ পতনাৎ সংসারবন্ধনাৎ বিমুচ্যতে। ন চেদশকদ্বোদ্ধুং ততোহনঘবোধাৎ সর্গেযু-সৃজ্যন্তে যেষু স্রষ্টব্যাঃ প্রাণিন ইতি সর্গাঃ-পৃথিব্যাদয়ো লোকাঃ, তেষু সর্গেযু লোকেষু শরীরত্বায় শরীরভাবায় কল্পতে সমর্থো ভবতি-শরীরং গৃহ্লাতীত্যর্থঃ। তস্মাচ্ছরীর- বিস্রংসনাৎ প্রাগাত্মাববোধায় যত্ন আস্থেয়ঃ ॥ ১১৩ ॥ ৪ ॥
এই দেহে অর্থাৎ জীবদবস্থায়ই যদি ভয়-কারণ সেই ব্রহ্মকে বুঝিতে —অবগত হইতে শক্ত হয় এবং শক্ত হইয়া জানিতে পারে; সেই লোক শরীর-বিস্রংসন অর্থাৎ দেহপাতের পূর্ব্বেই সংসার বন্ধন হইতে বিমুক্ত হয়। আর যদি অবগত হইতে শক্ত না হয়, তাহা হইলে সেই অব- গতির অভাবেই স্রষ্টব্য প্রাণিগণ যে সকল লোকে সৃষ্ট হয়, সেই সকল পৃথিবী প্রভৃতি লোকে শরীরত্ব(শরীরিত্ব) অর্থাৎ শরীর-লাভে সমর্থ হয়, উপযুক্ত শরীর গ্রহণ করে। অতএব শরীর পাতের পূর্ব্বেই আত্মজ্ঞানের জন্য যত্ন করা আবশ্যক ॥১১৩৷৪৷
যথাদর্শে তথাত্মনি, যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলোকে। যথাপ্সু পরীব দদৃশে, তথা গন্ধর্ব্বলোকে,
চ্ছায়াতপয়োরিব ব্রহ্মলোকে ॥ ১১৪ ॥ ৫ ॥ আত্মনো দর্শনপ্রকারমাহ—যথেতি। আদর্শে(দর্পণে)[মুখং] যথা
[ প্রতিবিম্বভূতঃ দৃশ্যতে]; আত্মনি(বুদ্ধৌ)[পরমাত্মা] তথা পরিদদৃশে (পরিদৃশ্যতে), জ্ঞানিভিরিতি শেষঃ]। স্বপ্নে যথা[অস্পষ্টরূপং] পিতৃলোকে তথা। অপ্সু(জলে) যথা, গন্ধর্ব্বলোকে তথা পরিদদৃশে ইব(পরিদৃশ্যতে ইব) [পরমাত্মা ইতি শেষঃ]।[কেবলং] ব্রহ্মলোকে ছায়াতপরোঃ(আলোকান্ধ- কারয়োঃ) ইব[অত্যন্তবৈলক্ষণ্যেন আত্মানাত্মনোঃ দর্শনং ভবতি, ইতি ভাবঃ]॥
এখন আত্মদর্শনের প্রকারভেদ বলা হইতেছে,—দর্পণে মুখের প্রতিবিম্ব যেরূপ, বুদ্ধিতে আত্মপ্রতিবিম্ব, সেইরূপ ও স্বপ্নে যেরূপ, পিতৃলোকেও সেইরূপ, এবং জলে যেরূপ, গন্ধর্ব্বলোকেও সেইরূপই জ্ঞানিগণ পরমাত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন। কেবল একমাত্র ব্রহ্মলোকেই আলোক ও অন্ধকারের ন্যায় অত্যন্ত বিলক্ষণভাবে আত্মা ও অনাত্ম-পদার্থ দর্শন করিয়া থাকেন ॥১১৪॥৫॥
যম্মাদিহৈবাত্মনো দর্শনম্ আদর্শস্থস্যেব মুখস্য স্পষ্টমুপপদ্যতে, ন লোকান্তরেষু ব্রহ্ম-লোকাদন্যত্র। স চ দুষ্প্রাপঃ। কথম্? ইত্যুচ্যতে—যথা আদর্শে প্রতিবিম্বভূতম্ আত্মানং পশ্যতি লোকঃ অত্যন্তবিবিক্তং; তথা ইহ আত্মনি স্ববুদ্ধাবাদর্শবন্নিৰ্ম্মলীভূতায়াং বিবিক্তমাত্মনো দর্শনং ভবতীত্যর্থঃ। যথা স্বপ্নে অবিবিক্তং জাগ্রদ্বাসনোদ্ভূতং, তথা পিতৃলোকে অবিবিক্তমেব দর্শনম্ আত্মনঃ কৰ্ম্মফলোপভোগাসক্তত্বাৎ। যথা চ অপ্সু অবিবিক্তাবয়বমাত্মস্বরূপং পরীব দদৃশে পরিদৃশ্যত ইব, তথা গন্ধর্ব্বলোকে- অবিবিক্তমেব দর্শনমাত্মনঃ। এবঞ্চ লোকান্তরেঘপি শাস্ত্রপ্রামাণ্যাদবগম্যতে। ছায়াতপয়োরিব অত্যন্তবিবিক্তং ব্রহ্মলোক এবৈকস্মিন্। স চ দুষ্প্রাপঃ অত্যন্ত- বিশিষ্টকর্মজ্ঞানসাধ্যত্বাৎ। তস্মাদাত্মদর্শনায় ইহৈব যত্নঃ কর্তব্য ইত্যভি- প্রায়ঃ ॥ ১১৪ ॥ ৫ ॥
যেহেতু এই দেহেই আদর্শস্থ মুখের ন্যায় আত্মার সুস্পষ্ট দর্শন সম্ভবপর হয়, পরন্তু ব্রহ্মলোক ভিন্ন অন্য কোন লোকেই সেরূপ দর্শন হইতে পারে না। অথচ সেই ব্রহ্মলোকও অতিদুর্লভ; কেন দুর্লভ, তাহাই বলা হইতেছে,—
মানুষ আদর্শে প্রতিবিম্বিত আত্মাকে যেরূপ অত্যন্ত পরিষ্কাররূপে দর্শন করে, আদর্শের ন্যায় অতি নিৰ্ম্মলীভূত আত্মাতে-স্বীয় বুদ্ধিতেও সেইরূপ অতি পরিষ্কারভাবে আত্মদর্শন হইয়া থাকে। স্বপ্নে যেরূপ অবিবিক্ত অর্থাৎ জাগ্রৎকালীন সংস্কারসহকৃত, পিতৃলোকেও সেইরূপ অবিবিক্তরূপে(সম্মিশ্রিতভাবে) আত্মার দর্শন হইয়া থাকে; কারণ,(আত্মা তৎকালেও) কৰ্ম্মফল-ভোগে আসক্ত থাকে। জলে যেরূপ অবয়ব বিভাগহীন অবস্থায়ই যেন আত্মা পরিদৃষ্ট হয়, গন্ধর্ব্ব- লোকেও সেইরূপ অবিবিক্তাবস্থায় আত্মার দর্শন হয়, অর্থাৎ সেই অবস্থায় আত্মার বিশেষভাব প্রতীত হয় না। শাস্ত্রের প্রামাণ্যানুসারে অন্যান্য লোকেও এইভাবে প্রতীতির তারতম্য জানা যায়। একমাত্র ব্রহ্মলোকেই ছায়া ও আতপের ন্যায় অর্থাৎ অন্ধকার ও আলোকের ন্যায় অত্যন্ত বিবিক্ত বা পরিস্ফুটরূপে[দর্শন হয়] সেই ব্রহ্ম- লোকও অতিশয় দুর্লভ; কারণ, ঐ লোকটি অতিশয় বিশিষ্ট কৰ্ম্ম (অশ্বমেধ প্রভৃতি) ও জ্ঞান বা উপসনাদ্বারা লভ্য। অভিপ্রায় এই যে, অতএব, আত্মদর্শনের জন্য ইহ জন্মেই যত্ন করা আবশ্যক ॥১১৪॥৫৷৷
ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগ্ভাবমুদয়াস্তময়ৌ চ যৎ।
পৃথগুৎপদ্যমানানাং মত্বা ধীরো ন শোচতি ॥ ১১৫ ॥ ৬॥ আত্মবোধে প্রকারান্তরমাহ—ইন্দ্রিয়াণামিতি। পৃথক্(আকাশা- দিভ্য একৈকশঃ) উৎপদ্যমানানাম্ ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগ্ভাবং(আত্মনো ভিন্নত্বং), উদয়াস্তময়ৌ(জাগ্রৎ-স্বপ্নাবস্থয়োঃ উৎপত্তি-প্রলয়ৌ চ যৎ; ধীরঃ(জনঃ) এতৎ মত্বা(বিবেকেন জ্ঞাত্বা) ন শোচতি(দুঃখভাক্ ন ভবতি, মুচ্যতে ইতি ভাবঃ) ॥
আত্মজ্ঞান সম্বন্ধে প্রকারান্তর কথিত হইতেছে, —আকাশাদি পঞ্চভূত হইতে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে উৎপন্ন ইন্দ্রিয় সমূহের যে, চেতন আত্মা হইতে পার্থক্য, এবং উদয় ও. অস্তময় অর্থাৎ জাগ্রৎ অবস্থায় বৃত্তিলাভ আর স্বপ্নাবস্থায় প্রলয় বা বৃত্তিহীনতা, ধীর ব্যক্তি ইহা জানিয়া আর দুঃখ ভোগ করেন না, অর্থাৎ মুক্তিলাভ করেন ॥: ১৫৷৬৷৷
কথমসৌ বোরব্যঃ? কিংবা তদববোধে প্রয়োজনম্? ইত্যুচ্যতে-ইন্দ্রিয়াণাং শ্রোত্রাদীনাং স্বস্ববিষয় গ্রহণ প্রয়োজনেন স্বকারণেভ্য আকাশাদিভ্যঃ পৃথগুৎপদ্য- মানানাম্ অত্যন্তবিশুদ্ধাৎ কেবলাচ্চিন্মাত্রাৎ আত্মস্বরূপাৎ পৃথগভাবং স্বভাববিলক্ষণা- ত্মকতাং, তথা তেষামেবেন্দ্রিয়াণাম্ উদয়াস্তময়ৌ চ যৎ পৃথগুৎপদ্যমানানাম্ উৎ- পত্তিপ্রলয়ৌ চ জাগ্রৎস্বাপাবস্থা প্রতিপত্যা নাত্মন ইতি মত্বা জ্ঞাত্বা বিবেকতঃ, ধীরো ধীমান্ ন শোচতি। আত্মনো নিত্যৈকস্বভাবত্বাব্যভিচারাচ্ছোকাদিকারণত্বানুপপত্তেঃ। তথা চ শ্রুত্যন্তরং-“তরতি শোকমাত্মবিৎ” ইতি ॥ ১১৫ ॥ ৬॥
কি প্রকারে ইহাকে(আত্মাকে) বুঝিতে হইবে? এবং তাহাকে জানিবার প্রয়োজনই বা কি? এই নিমিত্ত বলিতেছেন,-নিজ নিজ বিষয়(শব্দাদি) গ্রহণের উদ্দেশে স্বকারণ আকাশাদি পঞ্চভূত হইতে পৃথক্ পৃথক্ ভাবে উৎপন্ন * শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয় সমূহের যে অতিশয় বিশুদ্ধ কেবলই চিন্ময় আত্মা হইতে পৃথক্ভাব অর্থাৎ স্বভাব- বৈলক্ষণ্য, এবং পৃথকভাবে উৎপন্ন সেই ইন্দ্রিয়গণের যে, উদয় ও অস্তময় অর্থাৎ জাগ্রৎ অবস্থায় উৎপত্তি ও স্বপ্নাবস্থায় প্রলয়(বৃত্তির অভিব্যক্তি ও অনভিব্যক্তি), ইহাও সেই ইন্দ্রিয়গণেরই-আত্মার নহে; ধীর অর্থাৎ মোক্ষোপযোগী বুদ্ধিশালী ব্যক্তি বিবেকপূর্ব্বক ইহা অবগত হইয়া শোক করেন না; কারণ, আত্মা স্বভাবতই নিত্য
ও এক, কখনই তাঁহার সে স্বভাবের ব্যত্যয় হয় না; সুতরাং তন্নিমিত্ত শোক দুঃখাদির কিছুমাত্র কারণও থাকিতে পারে না। এতদনুরূপ শ্রুতিও আছে—‘আত্মবিৎ ব্যক্তি শোক অতীত হন’ ॥১১৫৷৬৷৷
ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনো মনসঃ সত্ত্বমুত্তমম্। সত্ত্বাদধি মহানাত্মা মহতোহব্যক্তমুত্তমম্ ॥ ১১৬ ॥ ৭ ॥
সর্ব্বাবশেষত্বেন আত্মা অধিগন্তব্যঃ, ইতি তৎক্রমমাহ—“ইন্দ্রিয়েভ্যঃ” ইত্যাদিনা শ্লোকদ্বয়েন। ইন্দ্রিয়েভ্যঃ মনঃ পরং, মনসঃ[অপি] সত্ত্বং(বুদ্ধিঃ) উত্তমম্। মহান্ আত্মা(হিরণ্যগর্ভোপাধিভূতা বুদ্ধিসমষ্টিঃ) সত্ত্বাৎ অধি(অধিকঃ), অব্যক্তং(প্রকৃতিঃমায়া) মহতঃ উত্তমম্ ॥
বাহ্য সর্ব্ব পদার্থের পরিশেষরূপে আত্মাকে জানিতে হইবে; এই নিমিত্ত তাহার ক্রম বলা হইতেছে,—ইন্দ্রিয়সমূহ অপেক্ষা মন শ্রেষ্ঠ, মন অপেক্ষা সত্ত্ব ( বুদ্ধি) শ্রেষ্ঠ, সত্ত্ব অপেক্ষা হিরণ্যগর্ভের উপাধি মহৎ-তত্ত্ব-সমষ্টি শ্রেষ্ঠ, মহৎ অপেক্ষাও অব্যক্ত( প্রকৃতি বা মায়া) শ্রেষ্ঠ ॥১১৬৷৭৷৷
যস্মাদাত্মন ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগভাব উক্তঃ, নাহসৌ বহিরধিগন্তব্যঃ। যস্মাৎ প্রত্যগাত্মা স সর্ব্বস্য; তৎকথমিত্যুচ্যতে,-ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মন ইত্যাদি। অর্থানামিহেন্দ্রিয়সমানজাতীয়ত্বাৎ ইন্দ্রিয়গ্রহণেনৈব গ্রহণম্। পূর্ব্ববদন্যৎ। সত্ত্বশব্দাদ- বুদ্ধিরিহোচ্যতে ॥ ১১৬॥ ৭ ॥
যে আত্মা হইতে ইন্দ্রিয় সমূহের পৃথক্ভাব বা পার্থক্যের উপদেশ উক্ত হইয়াছে, সেই আত্মা বাহিরে জ্ঞাতব্য নহে; যে হেতু সেই আত্মা সকলেরই প্রত্যক্-স্বরূপ। তবে তাঁহাকে কিরূপে[জানিতে হইবে;] তাহা কথিত হইতেছে—ইন্দ্রিয়সমূহ অপেক্ষাও মন শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি। ইন্দ্রিয়—অর্থ ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য শব্দাদি বিষয় সমূহ ও ইন্দ্রিয়ের সমান- জাতীয়(অচেতন জড় পদার্থ); এই কারণে ইন্দ্রিয়-গ্রহণেই সেই বিষয়
সমূহের গ্রহণ করা হইয়াছে। অপর সমস্তই প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীর দশম শ্লোকের ব্যাখ্যার অনুরূপ। এখানে ‘সত্ত্ব’ শব্দে ‘বুদ্ধিতত্ত্ব’ উক্ত হইয়াছে ॥ ১১৬॥ ৭॥
অব্যক্তাত্তু পরঃ পুরুষো ব্যাপকোহলিঙ্গ এব চ। তং জ্ঞাত্বা * মুচ্যতে জন্তুরমৃতত্বঞ্চ গচ্ছতি ॥ ১১৭ ॥ ৮ ॥
ব্যাপকঃ(সর্ব্বব্যাপী),[ন বিদ্যতে লিঙ্গং যস্য, সঃ] অলিঙ্গঃ(সর্ব্বধৰ্ম্ম- বিবর্জিতঃ) এব পুরুষঃ(পূর্ণঃ পরমাত্মা) তু(পুনঃ) অব্যক্তাৎ চ(অপি) পরঃ(নাতঃ পরমপি কিঞ্চিদস্তীতি ভাবঃ)। জন্তুঃ(প্রাণী) তং(পুরুষং) জ্ঞাত্বা(বিবেকতঃ অধিগম্য) মুচ্যতে[সংসার-বন্ধনৈরিতি শেষঃ।] অমৃতত্বং চ(অপি) গচ্ছতি ॥
সর্ব্বব্যাপী, অলিঙ্গ(সর্ব্বপ্রকার চিহ্নবর্জিত) পুরুষ(পরমাত্মা) অব্যক্ত অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ; তাঁহাকে জানিয়া লোকে সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হয় এবং অমৃতত্ব(মোক্ষ) লাভ করে ॥১১৭৷৷৮৷৷
অব্যক্তাত্তু পরঃ পুরুষো ব্যাপকঃ ব্যাপকস্যাপ্যাকাশাদেঃ সর্বস্য কারণত্বাৎ। অলিঙ্গঃ—লিঙ্গ্যতে গম্যতে যেন তল্লিঙ্গং—বুদ্ধ্যাদি, তদবিদ্যমান’ যস্যেতি সোহয়ম্ অলিঙ্গ এব চ। সর্ব্বসংসারধৰ্ম্মবর্জিত ইত্যেতৎ। তং জ্ঞাত্বা আচার্য্যতঃ শাস্ত্রতশ্চ মচ্যতে জন্তুঃ অবিদ্যাদিহৃদয়গ্রন্থিভির্জীবন্নেব; পতিতেহপি শরীরেহমৃতত্বঞ্চ গচ্ছতি। সোহলিঙ্গঃ পরোহব্যক্তাৎ পুরুষ ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ ॥ ১১৭ ॥৮॥
ব্যাপক আকাশাদি সর্ব্ব পদার্থেরও কারণ বলিয়া সর্ব্বব্যাপী এবং অলিঙ্গ—যদ্বারা লিঙ্গন অর্থাৎ অবগতি হয়, তাহার নাম লিঙ্গ—বুদ্ধি প্রভৃতি চিহ্ন; সেই:লিঙ্গ যাঁহার নাই, তিনিই অলিঙ্গ, অর্থাৎ নিশ্চয়ই তাঁহার কোনরূপ ‘লিঙ্গ’ নাই—তিনি সর্ব্ববিধ সংসার ধর্ম্মরহিত। জন্তু
(পুরুষ) আচার্য্য ও শাস্ত্র হইতে তাঁহাকে জানিয়া জীবদবস্থায়ই অবিদ্যাপ্রভৃতি হৃদয়-গ্রন্থি হইতে বিমুক্ত হয়। শরীরপাতের পরও অমৃতত্ব(মুক্তি) লাভ করে। সেই অলিঙ্গ পুরুষ অব্যক্ত অপেক্ষাও পর; এইরূপে পূর্ব্বোক্ত বাক্যের সহিত ইহার সম্বন্ধ করিতে হইবে ॥১১৭৷৮৷৷
ন সংদৃশে তিষ্ঠতি রূপমস্য, ন চক্ষুষা পশ্যতি কশ্চিদেনম্। * হৃদা মনীষা মনসাভিক্প্তে। য এনং বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥ ১১৮ ॥৯
তস্য অলিঙ্গস্য দর্শনং যথা ভবতি, তদাহ—নেতি। অন্য(পূর্ব্বোক্তস্য অলিঙ্গস্য) রূপং(স্বরূপং) সংদৃশে(প্রত্যক্ষবিষয়ে) ন তিষ্ঠতি;[অতঃ] কশ্চিৎ(কোহপি) এনং(পুরুষং) চক্ষুষা(কেনচিদপি ইন্দ্রিয়েণ) ন পশ্যতি (ন অবগচ্ছতি)।[পরন্তু] মনীষা(বিকল্পহীনয়া) হৃদা(হৃদয়স্থয়া বুদ্ধ্যা করণেন) মনসা(মননেন)[পুরুষঃ] অভিকুপ্তঃ(অভিব্যক্তঃ বিজ্ঞাতঃ ভবতীত্যর্থঃ)। যে(জনাঃ) এনং(পুরুষং) বিদুঃ(জানন্তি), তে অমৃতাঃ(মুক্তাঃ) ভবন্তি ॥
যে উপায়ে সেই অলিঙ্গ পুরুষের দর্শন হইতে পারে, তাহা বলা হইতেছে— ইহার প্রকৃত স্বরূপটি প্রত্যক্ষবিষয়ে থাকে না; সুতরাং কেহই চক্ষু দ্বারা অর্থাৎ কোন ইন্দ্রিয় দ্বারাই তাঁহাকে দর্শন করিতে পায় না।[ পরন্তু] বিকল্পহীন, হৃদয়স্থ বুদ্ধি দ্বারা মনের(মননের) সাহায্যে সেই পুরুষ অভিব্যক্ত হন; যাঁহারা তাঁহাকে জানেন, তাঁহারা অমৃত বা বিমুক্ত হন ॥১১৮৷৯৷৷
কথং তর্হি তস্য অলিঙ্গস্য দর্শনমুপপদ্যতে? ইত্যুচ্যতে,-ন সন্দৃশে দর্শনবিষয়ে ন তিষ্ঠতি প্রত্যাগাত্মনোঽস্য রূপম্। অতো ন চক্ষুষা সর্ব্বেন্দ্রিয়েন; চক্ষুগ্রহণস্যো- পলক্ষণার্থত্বাৎ। পশ্যতি নোপলভতে কশ্চন কশ্চিদপ্যেনং প্রকৃতমাত্মানম্।
কথং তর্হি তং পশ্যেৎ? ইত্যুচ্যতে—হৃদা হৃৎস্থয়া বুদ্ধ্যা। মনীষা—মনসঃ সঙ্কল্পাদিরূপস্যেষ্টে নিয়ন্ত ত্বেনেতি মনীট্, তয়া মনীষা বিকল্পবর্জিতয়া বুদ্ধ্যা। মনসা মননরূপেণ সম্যগ্দর্শনেন। অভিকুপ্তোহভিসমর্থিতোহভিপ্রকাশিত ইত্যেতৎ। আত্মা জ্ঞাতুং শক্য ইতি বাক্যশেষঃ। তমাত্মানং ব্রহ্মৈতদ্ যে বিদুর- মৃতাস্তে ভবন্তি ॥১১৮৷৷৯৷৷
তাহা হইলে কিরূপে সেই অলিঙ্গ পুরুষের দর্শন সম্পন্ন হইতে পারে? তাহা বলা হইতেছে-এই প্রত্যক্-আত্মার রূপ স্বরূপ) দর্শন বিষয়ে অবস্থান করে না, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-গ্রাহ্য হয় না। এখানে ‘চক্ষু’ শব্দটি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের উপলক্ষক(বোধক),[ ‘চক্ষু’ শব্দেই সমস্ত ইন্দ্রিয় বুঝিতে হইবে]। অতএব, কেহই চক্ষু দ্বারা অর্থাৎ কোন ইন্দ্রিয় দ্বারাই এই আত্মাকে দর্শন বা উপলব্ধি করিতে পারে না; তবে কি প্রকারে তাহাকে দর্শন করিবে? এইজন্য বলিতেছেন- ‘হৃৎ’ অর্থ-হৃদয়স্থ বুদ্ধি; মনীট্(মনীষা) অর্থ-সংকল্প- বিকল্পাত্মক মনের প্রভু বা পরিচালক(বিকল্পহীন)। ‘মনসা’ অর্থ-মনন-সম্যক্ দর্শন দ্বারা।[সম্মিলিত অর্থ এইরূপ--] বিকল্প- হীন(স্থির বা সংযত) বুদ্ধি দ্বারা মননের সাহায্যে(উক্ত পুরুষ) সম্যক্ বা যথাযথরূপে প্রকাশিত হন; অর্থাৎ ঐ উপায়ে আত্মাকে জানা যাইতে পারে। উক্ত বাক্যে এইটুকু শেষ বা অনুক্ত রহিয়াছে। সেই আত্মাকে ব্রহ্মভাবে যাঁহারা জানেন, তাঁহারা অমৃত হন ॥১১৮৷৯৷৷
যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ।
বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টতে * তামাহুঃ পরমাং গতিম্ ॥১১১॥১০॥
[ অথ বুদ্ধিস্থৈর্য্যোপায়ং যোগমাহ—যদেতি। জ্ঞানানি করণে ল্যুট্। যদা পঞ্চ জ্ঞানানি(জ্ঞানসাধনানি চক্ষুরাদীনি ইন্দ্রিয়াণি) মনসা সহ অবতিষ্ঠন্তে
(বিষয়েভ্যঃ ব্যাবৃত্ত্য অন্তর্মুখতয়া তিষ্ঠন্তি), বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টতে(বিষয়ান্ প্রতি ন ধাবতি)। তাং(বিষয়েভ্যঃ প্রত্যাহাররূপাং) পরমাং গতিং(পরমসাধনং জ্ঞানস্য) (আহুঃ বদন্তি)[যোগিন ইতি শেষঃ] ॥
এখন বুদ্ধির স্থিরতার উপায়ভূত যোগ বলিতেছেন,—যখন জ্ঞানসাধন [ শ্রোত্রাদি] পাঁচটি ইন্দ্রিয় মনের সহিত অবস্থান করে, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণ যখন বিষয় পরিত্যাগ পূর্ব্বক অন্তর্মুখ হইয়া থাকে, এবং বুদ্ধিও চেষ্টা না করে, অর্থাৎ স্বীয় ব্যাপারে প্রবৃত্ত না হয়, যোগিগণ সেই অবস্থাকেই পরমা গতি(জ্ঞানের পরম সাধন) বলিয়া থাকেন ॥ ১১৯ ॥ ১০ ॥
সা হৃদ-মনীট্ কথং প্রাপ্যতে? ইতি তদর্থো যোগ উচ্যতে,—যদা যস্মিন্ কালে স্ববিষয়েভ্যো নিবর্তিতানি আত্মন্যেব পঞ্চ জ্ঞানানি—জ্ঞানার্থত্বাৎ শ্রোত্রাদীনি ইন্দ্রিয়াণি জ্ঞানান্যুচ্যন্তে। অবতিষ্ঠন্তে সহ মনসা যদনুগতানি, তেন সঙ্কল্পাদিব্যাবৃত্তেনান্তঃকরণেন। বুদ্ধিশ্চ অধ্যবসায়লক্ষণা ন বিচেষ্টতে স্বব্যাপারেষু ন চেষ্টতে ন ব্যাপ্রিয়তে। তামাহুঃ পরমাং গতিম্ ॥ ১১৯ ॥ ১০ ॥
মনোবশীকরণের উপায় সেই বুদ্ধি কি উপায়ে প্রাপ্ত হওয়া যায়? তন্নিমিত্ত ‘যোগ’ কথিত হইতেছে-জ্ঞানোৎপত্তির সাধন বলিয়া শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ ‘জ্ঞান’ বলিয়া কথিত হয়। সেই পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় যে সময় স্বস্ব বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়া মনের সহিত আত্মাভিমুখে অবস্থান করে, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণ যাহার অনুগত হইয়া থাকে-সংকল্পাদি- রহিত সেই অন্তঃকরণের সহিত নিবৃত্ত হয় এবং নিশ্চয়াত্মক বুদ্ধিও চেষ্টা না করে-অর্থাৎ স্বীয় কর্তব্য বিষয়ে ব্যাপৃত না হয়; তাহাকে পরমা গতি, অর্থাৎ উৎকৃষ্ট সাধন বলা যায় ॥ ১১৯ ॥ ১০ ॥
তাং যোগমিতি মন্যন্তে স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্। অপ্রমত্তস্তদা ভবতি যোগো হি প্রভবাপ্যয়ৌ ॥১২০॥১১৷ উক্তায়া এব অবস্থায়া যোগসংজ্ঞামাহ-তামিতি। তাং(উক্তলক্ষণাং)
স্থিরাং(নিশ্চলাং ইন্দ্রিয়ধারণাং(ইন্দ্রিয়াণাং বিষয়েভ্যঃ প্রত্যাহৃত্য আত্মনি স্থাপনম্) ‘যোগম্’ ইতি মন্যন্তে[যোগিন ইতি শেষঃ]।[যদা খলু যোগসাধনে প্রবৃত্তো ভবতি], তদা[এব] অপ্রমত্তঃ(প্রমাদরহিতো) ভবতি,[যোগী ইতি শেষঃ]। হি(যস্মাৎ) যোগঃ প্রভবাপ্যয়ৌ(হিতসাধকঃ অহিতসাধকশ্চ ভবতি),[যোগারম্ভে প্রমাদাৎ অহিতম্, অপ্রমাদাচ্চ হিতং ভবতি; তস্মাৎ অহিত- পরিহারায় প্রমাদঃ পরিবর্জনীয় ইতি ভাবঃ]॥
পূর্ব্বোক্ত অবস্থাকেই যোগ বলিয়া নির্দেশ করিতেছেন,—সেই পূর্ব্বকথিত স্থিরতর ইন্দ্রিয়ধারণা অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহের স্থিরীকরণকেই(যোগিগণ) যোগ বলিয়া মনে করেন। সেই যোগারম্ভকালে সাধক প্রমাদ-(অনবধানতা) রহিত হইবে। কারণ, যোগই ‘প্রভব-(সিদ্ধি) ও অপ্যয়ের(বিনাশের) কারণ হইয়া থাকে। অর্থাৎ প্রমাদে অপায়, আর অপ্রমাদে সিদ্ধি হইয়া থাকে। অতএব, প্রমাদ-পরিত্যাগে যত্ন-পর হইবে ॥১২০৷৷১১৷৷
তামীদৃশীং তদবস্থাং যোগমিতি মন্যন্তে বিয়োগমেফ সন্তম্। সর্ব্বানর্থসংযোগ- বিয়োগলক্ষণা হি ইয়মবস্থা যোগিনঃ। এতস্যাং হ্যাবস্থায়াম্ অবিদ্যাধ্যারোপণবর্জিত- স্বরূপ-প্রতিষ্ঠ আত্মা। স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্-স্থিরামচলাম্ ইন্দ্রিয়ধারণাং বাহ্যান্ত:- করণানাং ধারণামিত্যর্থঃ। অপ্রমত্তঃ প্রমাদবর্জিতঃ সমাধানং প্রতি নিত্যং প্রযত্নবান্; তদা তস্মিন্ কালে, যদৈব প্রবৃত্তযোগো ভবতীতি সামর্থ্যাদবগম্যতে। ন হি বুদ্ধ্যাদি- চেষ্টাভাবে প্রমাদসম্ভবোহস্তি। তস্মাৎ প্রাগেব বুদ্ধ্যাদিচেষ্টোপরমাৎ অপ্রমাদো বিধীয়তে। অথবা, যদৈবেন্দ্রিয়াণাং স্থিরা ধারণা, তদানীমেব, নিরঙ্কুশমপ্রমত্তত্বম্, ইত্যতোহভিধীয়তে অপ্রমত্তস্তদা ভবতীতি। কুতঃ? যোগো হি যস্মাৎ প্রভ- বাপ্যয়ৌ উপজনাপায়ধৰ্ম্মক: ইত্যর্থঃ। অতঃ অপায়পরিহারায় অপ্রমাদঃ কর্তব্য- ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ১২০ ॥ ১১ ॥
প্রকৃত পক্ষে বিয়োগাত্মক(ভোগত্যাগ-স্বরূপ) হইলেও যোগিগণ ঈদৃশ সেই অবস্থাকে ‘যোগ’ বলিয়া মনে করেন। কারণ, এই
অবস্থাটি যোগীর সর্বপ্রকার অনর্থ সম্বন্ধের বিয়োগাত্মক। এই অব- স্থায়ই আত্মা অবিদ্যার আরোপ রহিত হইয়া স্বরূপে অবস্থিত হয়; স্থির অর্থ—চাঞ্চল্য-রহিত, ইন্দ্রিয়-ধারণা অর্থ—বাহ্য ও অন্তঃকরণ সমূহের ধারণা(আত্মাভিমুখীকরণ)।[সাধক ব্যক্তি] যখনই যোগে প্রবৃত্ত হইবে, তখনই সমাধির প্রতি অপ্রমত্ত অর্থাৎ প্রমাদ-বর্জ্জিত হইবে। মূলে ‘যখনই’ ইত্যাদি অংশ না থাকিলেও “তদা” শব্দ থাকার কল্পনা করিয়া লইতে হয়। কারণ, বুদ্ধি প্রভৃতি করণসমূহের চেষ্টার অভাব হইলে, কখনই প্রমাদের সম্ভাবনা হয় না। অতএব, বুদ্ধি প্রভৃতির ক্রিয়া-বিরামের পূর্ব্বেই প্রমাদত্যাগ বিহিত হইতেছে। অথবা, যখনই ইন্দ্রিয় সমূহের স্থিরতর ধারণা হয়, তখনই অব্যাহত ভাবে অপ্রমাদ সম্পন্ন হইয়া থাকে; এই কারণে তখন ‘অপ্রমত্ত হইবার’ বিধান করা হইতেছে। ইহার কারণ? যে হেতু যোগই প্রভব ও অপ্যয় স্বরূপ, অর্থাৎ হিত ও অপায়ের(অহিতের) কারণ হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, অতএব, অপায় বা অহিত পরিহারার্থ অপ্রমাদ বা অনবধানতা ত্যাগ করা আবশ্যক ॥ ১২০ ॥ ১১ ॥
নৈব বাচা ন মনসা প্রাপ্তুং শক্যো ন চক্ষুষা।
অস্তীতি কবতোহন্যত্র কথং তদুপলভ্যতে ॥ ১২১ ॥ ১২ ॥
আত্মনো দুর্বিজ্ঞেয়ত্বেন গুরূপদেশমাত্রগম্যত্বমাহ নৈবেতি। বাচা (বাক্যেন) ন এব, মনসা(অন্তঃকরণেন) ন এব, চক্ষুষা(চক্ষুরিত্যুপলক্ষণং সব্বেন্দ্রিয়াণাং, ততশ্চ কেনাপি ইন্দ্রিয়েণ) ন এব প্রাপ্তুং(জ্ঞাতুং) শক্যঃ (বিজ্ঞেয়ঃ)[ পরমাত্মা ইতি শেষঃ]।[তস্মাৎ][আত্মা]-অস্তি’ ইতি ব্রুবতঃ (আত্মাস্তিত্ববাদিনঃ আচার্য্যাৎ) অন্যত্র(নাস্তিকাদৌ) তৎ(আত্মস্বরূপং) কথম্ উপলভ্যতে?[ন কথমপি, ইতি ভাবঃ] ॥
দুর্বিজ্ঞেয় আত্মাকে কেবল গুরুর উপদেশ সাহায্যেই জানা যাইতে পারে, ইহা প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন যে,—আত্মা নিশ্চয়ই বাক্য দ্বারা নহে, মনের দ্বারা নহে,
এবং চক্ষু দ্বারাও(কোন ইন্দ্রিয় দ্বারাও) প্রাপ্তির যোগ্য নহে। অতএব আত্মার অস্তিত্ববাদী গুরু ভিন্ন অন্যত্র(নাস্তিকাদির নিকট) কিরূপে তাঁহাকে জানা যাইতে পারে? ॥১২১৷৷১২৷৷
বুদ্ধ্যাদিচেষ্টাবিষয়ং চেদ্ ব্রহ্ম, ‘ইদং তৎ’ ইতি বিশেষতো গৃহ্যেত, বুদ্ধ্যাদ্যপরমে চ গ্রহণকারণাভাবাদনুপলভ্যমানং নাস্ত্যের ব্রহ্ম। যদ্ধি করণগোচরং, তৎ ‘অস্তি’ইতি প্রসিদ্ধ: লোকে; বিপরীতঞ্চাসদিতি। অতশ্চানর্থকো যোগোহনুপলভ্যমানত্বাদ বা ‘নাস্তীতি’ উপলব্ধব্যং ব্রহ্ম, ইত্যেবং প্রাপ্তে ইদমুচ্যতে। সত্যম্—
নৈব বাচা, ন মনসা, ন চক্ষুষা-নান্যৈরপীন্দ্রিয়ৈঃ প্রাপ্তুং শক্যতে ইত্যর্থঃ। তথাপি সর্ব্ববিশেষরহিতোহপি জগতো মূলমিত্যবগতত্বাদস্ত্যেব; কার্য্যপ্রবিলাপ- নস্যাস্তিত্বনিষ্ঠত্বাৎ। তথা ইদং কাৰ্য্যং সৌক্ষ্ম্যতারতম্যপারম্পর্য্যেণ অনুগম্যমানং সদ্- বুদ্ধিনিষ্ঠামেবাবগময়তি। যদাপি বিষয়প্রবিলাপনেন প্রবিলাপ্যমানা বুদ্ধিঃ, তদাপি সা সৎপ্রত্যয়গর্ভৈব বিলীয়তে। বুদ্ধির্হি নঃ প্রমাণং সদসতোর্যাথাত্ম্যাবগমে। মূলং চেজ্জগতো ন স্যাৎ, অসদন্বিতমেবেদং কার্য্যমসদিত্যের গৃহ্যেত, ন ত্বেতদস্তি-সৎ- সদিত্যের তু গৃহ্যতে। যথা মৃদাদিকার্য্য ঘটাদি মৃদাদ্যন্বিতম্। তস্মাজ্জগতো মূলমাত্মা অস্তীত্যেবোপলব্ধব্যঃ।
তস্মাদস্তীতি ক্রবতোহস্তিত্ববাদিন আগমার্থানুসারিণঃ শ্রদ্দধানাদন্যত্র নাস্তিক- বাদিনি নাস্তি জগতো মূলমাত্মা, নিরন্বয়মেবেদং কার্য্যমভাবান্তং প্রবিলীয়ত- ইতি মন্যমানে বিপরীতদর্শিনি কথং তৎ ব্রহ্ম তত্ত্বত উপলভ্যতে, ন কথঞ্চনোপ- লভ্যত ইত্যর্থঃ ॥ ১২১ ॥ ১২॥
ব্রহ্ম যদি বুদ্ধি প্রভৃতি জ্ঞানসাধনের বিষয়ীভূত হইতেন, তাহা হইলে ‘ইহা সেই ব্রহ্ম’, ইত্যাকার বিশেষ ভাবে অবশ্যই তাঁহাকে গ্রহণ করা যাইতে পারিত; কিন্তু বুদ্ধি প্রভৃতির উপরম অর্থাৎ ব্যাপারের অবিষয়তা নিবন্ধন জানিবার উপায় না থাকায় উপলব্ধির বিষয় না হওয়ায় নিশ্চয়ই ব্রহ্ম নাই বা অসৎ। কারণ, জগতে যাহা করণ-
গোচর(জ্ঞানসাধনের বিষয়), তাহাই ‘সৎ’, আর তদ্বিপরীত মাত্রই ‘অসৎ’ বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই কারণে যোগ-সাধন অনর্থক(বিফল), অথবা, যখন উপলব্ধি হয় না, তখন নিশ্চয়ই ব্রহ্ম নাই; এইরূপ সম্ভা- বনায় এইকথা বলিতেছেন যে, সত্য বটে, বাক্য দ্বারা নহে, মনের দ্বারা নহে, চক্ষু দ্বারা নহে কিংবা অপরাপর ইন্দ্রিয় দ্বারাও পাইবার যোগ্য নহে; তথাপি কার্য্যের বিলয়ন বা বিনাশ যখন সৎ বস্তুকে (কারণকে) অবলম্বন না করিয়া হইতেই পারে না, তখন ব্রহ্ম সর্বপ্রকার বিশেষ গুণ-রহিত হইলেও জগতের মূল কারণ রূপে নিশ্চয়ই তাঁহার প্রতীতি আছে। সেইরূপ দেখাও যায়, [ধ্বংসোন্মুখ] কোন একটি কার্য্য বা জন্য বস্তু উত্তরোত্তর সূক্ষ্মতাপ্রাপ্ত হইতে হইতে পরিশেষে উহা যে সৎরূপেই অবস্থান করে, এইরূপই প্রতীতি(সবুদ্ধি) সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। * যখন বুদ্ধির বিষয়ের (সূক্ষ্মভাগের) বিলয়ন বা বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে তদ্বিষয়ক বুদ্ধিও বিলীন (বিনষ্ট) হইয়া যায়, তখনও সেই বুদ্ধি যেন ‘সৎ’ প্রতীতি সমুৎপাদন করিয়াই বিনষ্ট হইয়া যায়। কোন্টি যথার্থ সৎ, আর কোন্টি যথার্থ অসৎ, এই তত্ত্ব নির্ণয়ে বুদ্ধিই আমাদের একমাত্র প্রমাণ। জগতের মূল কারণ যদি অসৎই হইত, তাহা হইলে মৃত্তিকা প্রভৃতি কারণ সমুৎ- পাদিত ঘটাদি কার্য্য যেরূপ মৃত্তিকা সংবলিত রূপে গৃহীত(প্রতীত)
হয়, সেইরূপ অসৎকারণান্বিত কার্য্য—জগৎও ‘অসৎ’ বলিয়াই প্রতীত হইত; কিন্তু সেরূপ ত হয় না, বরং ‘সৎ’ বলিয়াই পরিগৃহীত হয়। অতএব, জগতের মূলকারণ আত্মা যে, আছেন, ইহা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিতে হইবে, অর্থাৎ বুঝিতে হইবে।
অতএব, ‘[আত্মা] আছে’ ইহা যিনি বলেন, সেই আত্মাস্তিত্ববাদী, শাস্ত্রার্থানুসারী শ্রদ্ধাবান্ ভিন্ন অন্যত্র নাস্তিকবাদী অর্থাৎ যিনি মনে করেন যে, জগতের মূল কারণ আত্মা বলিয়া কোন পদার্থ নাই, এই জগৎকার্য্যটি নিরন্বয় অর্থাৎ কারণের সহিত সম্বন্ধ-রহিতভাবেই অভাবে পর্যবসিত ‘হইবে’, এই প্রকার বিপরীতদর্শী নাস্তিকের নিকট সেই ব্রহ্ম কিরূপে যথাযথরূপে উপলব্ধি বা প্রতীতির বিষয় হইবেন? কোন প্রকারেই উপলব্ধ হইতে পারেন না ॥ ১২১ ॥ ১২॥
অস্তীত্যেবোপলব্ধব্যস্তত্বভাবেন চোভয়োঃ।
অস্তীত্যেবোপলব্ধস্য তত্ত্বভাবঃ প্রসীদতি ॥ ১২২ ॥ ১: ॥
আত্মোপলব্ধি প্রকারমাহ—অস্তীত্যাদি। উভয়োঃ(সোপাধিক-নিরুপাধি- কয়োমধ্যে)[নিরুপাধিক আত্মা] তত্ত্বভাবেন(অপরিণামি-সত্যরূপেণ) ‘অস্তি’ (সৎ) ইত্যেব উপলব্ধব্যঃ(বোদ্ধব্যঃ)। ‘অস্তি’ইতি(এবং) উপলব্ধস্য(উপলব্ধঃ —জ্ঞাতুঃ সকাশে) তত্ত্বভাবঃ(নিরুপাধিকস্বভাবঃ) প্রসীদতি(নিঃসংশয়ং প্রতীতিবিষয়ো ভবতি, ইত্যর্থঃ) ॥
পুনশ্চ আত্মোপলব্ধির প্রণালী বলিতেছেন,—উপাধিযুক্ত ও তদ্বিযুক্ত, এতদুভয় প্রকারের মধ্যে নিরুপাধিক আত্মাকেই তত্ত্বভাবে অর্থাৎ প্রকৃত সত্যরূপে ‘অস্তি’ অর্থাৎ ‘সৎ’ বলিয়া বুঝিতে হইবে। যে লোক ‘অস্তি’ বলিয়া উপলব্ধি করে, তাহার নিকট পূর্ব্বোক্ত তত্ত্বভাব আত্মার কূটস্থ সত্যরূপ প্রসন্ন হয়, অর্থাৎ নিঃসংশয়রূপে প্রকাশ পায় ॥ ১২২ ॥ ১৩ ॥
তস্মাদপোহাসদ্বাদিপক্ষমাসুরম্ অতীতোব আজ্ঞা। উপলব্ধব্যঃ সৎকার্য্যবুদ্ধ্যাদ্যপা-
ধিভিঃ। যদা তু তদ্রহিতোহবিক্রিয় আত্মা, কার্য্যঞ্চ কারণব্যতিরেকেণ নাস্তি, “বাচা- রম্ভণং বিকারো নামধেয়ং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্”ইতি শ্রুতেঃ। তদা তস্য নিরুপাধিকস্য অলিঙ্গস্থ্য সদসদাদিপ্রত্যয়বিষয়ত্ববর্জিতস্য আত্মনঃ তত্ত্বভাবো ভবতি। তেন চ রূপেণাত্মোপলব্ধব্য ইত্যনুবর্ততে। তত্রাপ্যুভয়োঃ সোপাধিক-নিরুপাধিকয়োরস্তিত্ব- তত্ত্বভাবয়োঃ নির্দ্ধারণার্থা ষষ্ঠী। পূর্ব্বম্ অস্তীত্যেবোপলব্ধস্য আত্মনঃ সৎকার্য্যোপাধি- কৃতাস্তিত্ব-প্রত্যয়েনোপলব্ধস্যেত্যর্থঃ। পশ্চাৎপ্রত্যস্তমিতসর্ব্বোপাধিরূপ আত্মনঃ তত্ত্বভাবঃ বিদিতাবিদিতাভ্যামন্যোহদ্বয়স্বভাবো “নেতি নেতি” “অস্কুলমনহহস্বম্” “অদৃশ্যেইনাত্ম্যে নিরুক্তেহনিলয়নে” ইত্যাদিশ্রুতিনিদ্দিষ্টঃ প্রসীদতি অভিমুখীভবতি, আত্মনঃ প্রকাশনায় পূর্বমন্তীত্যুপলব্ধবত ইত্যেতৎ ॥ ১২২॥ ১৩ ॥
অতএব, অসুরসম্মত অসদ্বাদিগের মত পরিত্যাগ পূর্বক সৎকার্য্য (সদ্রহ্মসম্ভূত) বুদ্ধ্যাদি উপাধি-সমন্বিত আত্মাকে ‘অস্তি’(সৎ) বলিয়াই বুঝিতে হইবে। যখন বিকারহীন আত্মা পূর্বোক্ত উপাধি- রহিত হয় এবং ‘বিকার(ঘটাদি কার্য্য) কেবল বাক্যারব্ধ নাম মাত্র, মৃত্তিকাই সত্য।’ এই শ্রুতি অনুসারে যখন জানা যায় যে, কারণের অতিরিক্তও কার্য্যের সত্তা নাই; তখন সেই উপাধিরহিত, অলিঙ্গ এবং সদসদাত্মক(কার্য্য-কারণভাবময়) বুদ্ধির অবিষয় আত্মার ‘তত্ত্বভাব’ প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায়; সেইরূপেই আত্মার উপলব্ধি করা উচিত। তন্মধ্যেও সোপাধিক ও নিরুপাধিক অর্থাৎ অস্তিত্ব ও তত্ত্বভাব, এতদুভয়ের মধ্যে প্রথমে ‘অস্তি’রূপেই উপলব্ধ হয়, অর্থাৎ প্রথমে বুদ্ধি প্রভৃতি কার্য্য সম্বন্ধ বশতঃ যে আত্মা ‘সৎ’প্রতীতির বিষয় হয়, পশ্চাৎ সেই আত্মারই সর্ব্বোপাধি-রহিত ‘তত্ত্বভাব’, যাহা বিদিত ও অবিদিত হইতে পৃথক্, স্বভাবত অদ্বিতীয় এবং যাহা ‘ইহা ব্রহ্ম নহে ইহা নহে’, ‘স্থূল, অণু ও হ্রস্ব নহে;’ এবং ‘অদৃশ্য, অনাত্ম্য(দেহাদি রহিত) ও বিলয়-রহিত’ ইত্যাদি শ্রুতিতে নির্দিষ্ট হইয়াছে; সেই তত্ত্বভাব প্রসন্ন হয় অর্থাৎ তাহার সম্মুখীন হয়।[কাহার? না-] আত্ম-প্রকাশের
উদ্দেশে যে লোক তৎপূর্ব্বে ‘অস্তি’ বলিয়া আত্মার উপলব্ধি করিয়াছে, তাহার—৷ ১২২ ॥ ১৩ ॥
যদা সর্ব্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ। অথ মর্ত্যোহমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে ॥ ১২৩৷১৪
মুমুক্ষোঃ তাদৃশপ্রসাদসাধ্যং ফলমাহ,—যদেতি। অন্য হৃদি শ্রিতাঃ(অন্তঃকরণ- গতাঃ) সর্ব্বে কামাঃ(বাসনাঃ) যদা প্রমুচ্যন্তে,[কর্মকর্তরি প্রয়োগঃ, মুক্তা ভবন্তি, অপগচ্ছন্তীতি যাবৎ]। অথ(অনন্তরং) মর্ত্যঃ(মরণশীলো মনুষ্যঃ) অমৃতঃ(মরণভয়রহিতঃ) ভবতি। অত্র(অস্মিন্ এব দেহে) ব্রহ্ম সমশ্নুতে (ব্রহ্মৈব ভবতীত্যর্থঃ)।
এই মুমুক্ষুর হৃদয়স্থিত সমস্ত কামনা যখন বিমুক্ত হইয়া যায়(আপনিই বিনষ্ট হইয়া যায়), তাহার পর সেই মর্ত্য(মরণশীল মনুষ্য) অমৃত হন; এবং এই দেহেই ব্রহ্মভাব উপলব্ধি করেন ॥ ১২৩৷৷১৪৷৷
এবং পরমার্থদর্শিনো যদা যস্মিন্ কালে সর্ব্বে কামাঃ কাময়িতব্যস্যান্যস্যাভাবাৎ, প্রমুচ্যন্তে বিশীর্য্যন্তে, যেহস্য প্রাক্ প্রতিবোধাদবিদুষো হৃদি বুদ্ধৌ শ্রিতাঃ আশ্রিতাঃ। বুদ্ধির্হি কামানামাশ্রয়ঃ নাত্মা “কামঃ সঙ্কল্পঃ” ইত্যাদিশ্রুত্যন্তরাচ্চ। অথ তদা মর্ত্যঃ প্রাক্ প্রবোধাদাসীৎ, স প্রবোধোত্তরকালমবিদ্যাকামকৰ্ম্মলক্ষণস্য মৃত্যোঃ বিনাশাৎ অমৃতো ভবতি গমনপ্রযোজকস্য বা মৃত্যোর্বিনাশাদগমনানুপপত্তেঃ। অত্র ইহৈব প্রদীপনির্ব্বাণবৎ সর্ব্ববন্ধনোপশমাদ ব্রহ্ম সমশতে ব্রহ্মৈব ভবর্তীত্যর্থঃ ॥ ১২৩৷১৪
এইপ্রকার পরমার্থতত্ত্বদর্শী পুরুষের প্রতিবোধ অর্থাৎ সর্বত্র ব্রহ্মদৃষ্টি সমুদিত হইবার পূর্ব্বে যে সমস্ত কামনা(বিষয়-তৃষ্ণা) হৃদয়কে আশ্রয় করিয়াছিল; আর কিছু কাময়িতব্য(প্রার্থনীয়) না থাকায় যখন সেই সকল কামনা প্রমুক্ত অর্থাৎ বিশীর্ণ(অসার) হইয়া যায়। বুদ্ধিই কামনার আশ্রয়, আত্মা নহে; ইহা যুক্তিতে এবং ‘কামনা-সংকল্প
২৫
[প্রভৃতি ধৰ্ম্ম সকল মনেরই]’ ইত্যাদি অপর শ্রুতি অনুসারেও[জানা যায়]। তখন, আত্মজ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বে যিনি মর্ত্য(মরণশীল) ছিলেন; জ্ঞানোদয়ের পর অবিদ্যা, কামনা ও তদনুরূপ চেষ্টাত্মক মৃত্যুর বিনাশ ‘হওয়ায় সেই মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল জীবই অমৃত হন। অথবা, জীবের লোকান্তরে গমনসাধক যে মৃত্যু, তাদৃশ মৃত্যুর অভাব বশতঃ অমৃত হন; কারণ, মৃত্যুর পর জ্ঞানীর আত্মার অন্যত্র গমন সম্ভবপর হয় না; পরন্তু, প্রদীপনির্ব্বাণের ন্যায় সমস্ত বন্ধনের একেবারে উপশম হওয়ায় এই দেহেই তিনি ব্রহ্ম ভোগ করেন, অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপই হইয়া যান ॥ ১২৩ ॥ ১৪ ॥
কদা পুনঃ সর্ব্বকামানাং সম্যক্ সমুচ্ছেদো ভবেৎ? ইত্যাহ—যদেতি। ইহ (মানুষদেহে) হৃদয়স্য সর্ব্বে গ্রন্থয়ঃ(গ্রন্থিবৎ অবিদ্যাবন্ধনানি) যদা প্রভিদ্যন্তে (অপযান্তি)। অথ(তদা) মর্ত্যঃ[সর্ব্বকাম-প্রহাণেন] অমৃতঃ(মুক্তঃ) ভবতি। এতাবৎ(এতাবদেব) অনুশাসনম্(নিষ্কামকর্ম্ম-শ্রবণ-মনন-ধ্যান-কর্তব্যোক্তিপরঃ বেদান্ত-শাস্ত্রস্যোপদেশ ইত্যর্থঃ) ॥
সমস্ত কামনার সমুচ্ছেদ হয় কখন? তাই বলিতেছেন যে,—এই মানুষ- দেহেই যে সময় হৃদয়গত সমস্ত অবিদ্যা-গ্রন্থি ভিন্ন বা বিনষ্ট হইয়া যায়; সেই সম- য়ই সমস্ত কামনার সমুচ্ছেদবশতঃ মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল মনুষ্য অমৃতত্ব লাভ করে। এই পর্য্যন্তই বেদান্তশাস্ত্রের উপদেশ[ ইহার অধিক আর উপদেশ নাই] ॥১২৪৷৷১৫৷৷
কদা পুনঃ কামানাং মূলতো বিনাশঃ? ইত্যুচ্যতে। যদা সর্ব্বে প্রভিদ্যন্তে ভেদমুপযান্তি বিনশ্যন্তি হৃদয়স্য বুদ্ধেরিহ জীবত এব গ্রন্থয়ো গ্রন্থিবদ্দঢ়বন্ধনরূপা অবিদ্যাপ্রত্যয়া ইত্যর্থঃ। ‘অহমিদং শরীরং, মমেদং ধনং, সুখী দুঃখী চাহম্’ইত্যেব- মাদিলক্ষণাঃ তদ্বিপরীতাৎ ব্রহ্মাত্মপ্রত্যয়োপজননাৎ ‘ব্রহ্মৈবাহমস্ম্যসংসারী’ ইতি।
বিনষ্টেষু অবিদ্যাগ্রন্থিষু তন্নিমিত্তাঃ কামা মূলতো বিনশ্যন্তি। অথ মর্ত্যোহমৃতো- ভবতি, এতাবদ্ধি —এতাবদেবৈতাবন্মাত্রং, নাধিকমস্তীত্যাশঙ্কা কর্ত্তব্যা। অনু- শাসনম্ অনুশিষ্টিঃ উপদেশঃ সর্ব্ববেদান্তানামিতি বাক্যশেষঃ ॥ ১২৪ ॥ ১৫ ॥
যখন এই জীবৎ-দেহেই হৃদয়গত গ্রন্থিসমূহ, অর্থাৎ দৃঢ়তর গ্রন্থিবন্ধনের ন্যায় সমস্ত অবিদ্যা-বুদ্ধি(ভ্রান্তি জ্ঞান সমুদয়) সর্বতো- ভাবে ভিন্ন অর্থাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়—অর্থাৎ ‘আমি এই শরীর(স্থূল, কৃশ ইত্যাদি), আমার এই ধন, আমি সুখী ও দুঃখী’, ইত্যাদি প্রকার অবিদ্যাত্মক প্রতীতি সমূহ যখন তদ্বিপরীত—‘আমি অসংসারী ব্রহ্ম- স্বরূপই’ এইরূপ ব্রহ্মাত্ম-জ্ঞানোদয়ে বিনষ্ট হইয়া যায়। অবিদ্যা- গ্রন্থিসমূহ বিনষ্ট হইলে, তদধীন বা তন্মূলক কামনাসমূহও বিনষ্ট হইয়া যায়। তখন, সেই মর্ত্য ব্যক্তি অমৃত হন। এই পর্য্যন্তই— ইহা অপেক্ষা অধিক আছে বলিয়া আশঙ্কা করা উচিত নহে, অনুশাসন অর্থাৎ সমস্ত বেদান্ত-শাস্ত্রের উপদেশ[এতদপেক্ষা আর অধিক তত্ত্বোপদেশ নাই]। ‘সর্ববেদান্তানাং’ পদটি শ্রুতিতে না থাকিলেও উহা ঐ বাক্যের শেষাংশ; এই কারণে ভাষ্যকার ঐটুকু ব্যাখ্যায় সংযোজিত করিয়া দিয়াছেন ॥ ১২৪ ॥ ১৫ ॥
শতঞ্চৈকা চ হৃদয়স্য নাড্য- স্তাসাং মূর্দ্ধানমভিনিঃসৃতৈকা। তয়োর্দ্ধমায়ন্নমৃতত্বমেতি, বিঘৃণ্যা উৎক্রমণে ভবন্তি ॥ ১২৫ ॥ ১৬ ॥
এবং মোক্ষহেতুব্রহ্মবিদ্যামুক্ত। জ্ঞানিনঃ চরমদেহাৎ নিষ্ক্রমণে মার্গবিশেষমাহ --শতমিত্যাদিনা। হৃদয়স্য(হৃদয়সম্বন্ধিন্যঃ) শতঞ্চ একা চ(একোত্তরশতং)
নাড্যঃ[সস্তি]; তাসাং[মধ্যে] একা(সুযুমাখ্যা নাড়ী) মূর্দ্ধানমভি(প্রতি) নিঃসৃতা(মূর্দ্ধপর্যন্তং গতা)। তয়া(সুযুমাখ্যয়া নাড্যা) উর্দ্ধম্ আয়ন্(গচ্ছন্) অমৃতত্বম্ এতি(অমৃতো ভবতীত্যর্থঃ)। অন্যাঃ(শতং নাড্যঃ) বিশ্বগুৎক্রমণে (লোকান্তরগমনার্থং) ভবন্তি ॥
হৃদয়স্থ একশত একটি নাড়ী আছে; তন্মধ্যে একটি নাড়ী(সুষুম্না নাড়ী) মূর্দ্ধ(ব্রহ্মরন্ধ্র,) অভিমুখে নির্গত হইয়াছে;[মানুষ মৃত্যুকালে] সেই নাড়ী দ্বারা উর্দ্ধে গমন করিয়া অমৃতত্ব লাভ করে, অপরাপর নাড়ীসমূহ অন্যান্য লোকে গমনের কারণ হয় ॥ ১২৫৷৷১৬৷৷
নিরস্তাশেষবিশেষ-ব্যাপিব্রহ্মাত্মপ্রতিপত্ত্যা প্রভিন্নসমস্তাবিদ্যাদিগ্রন্থেঃ জীবত এব ব্রহ্মভূতস্য বিদুষো ন গতিবিদ্যতে, ইত্যুক্তম্। “অত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে”, ইত্যুক্তত্বাৎ, “ন তস্য প্রাণা উৎক্রামন্তি।” “ব্রহ্মৈব সন্ ব্রহ্মাপ্যেতি” ইতি শ্রুত্যন্তরাচ্চ। যে পুনর্মন্দব্রহ্মবিদো বিদ্যান্তরশীলিনশ্চ ব্রহ্মলোকভাজঃ, যে চ তদ্বিপরীতাঃ সংসার- ভাজঃ, তেষামেষ গতিবিশেষ উচ্যতে!। প্রকৃতোৎকৃষ্টব্রহ্মবিদ্যাফলস্তুতয়ে। কিঞ্চান্যৎ, অগ্নিবিদ্যা পৃষ্টা, প্রত্যুক্তা চ। তস্যাশ্চ ফলপ্রাপ্তিপ্রকারো বক্তব্য ইতি মন্ত্রারম্ভঃ।
তত্র-শতঞ্চ শতসঙ্খ্যকা, একা চ-সুষুম্না নাম পুরুষস্য হৃদয়াদিনিঃসৃতা নাড্যঃ শিরাঃ। তাসাং মধ্যে মূর্দ্ধানং ভিত্ত্বাহভিনিঃসৃতা নির্গতা একা সুষুম্না নাম; তয়া অন্তকালে হৃদয়ে আত্মানং বশীকৃত্য যোজয়েৎ। তয়া নাড্যা উর্দ্ধম্ উপরি আয়ন্ গচ্ছন্ আদিত্যদ্বারেণ অমৃতত্বম্ অরণধৰ্ম্মত্বমাপেক্ষিকম্। “আভূতসংপ্লবং স্থানমমৃতত্বং হি ভাষ্যতে” ইতি স্মৃতেঃ। ব্রহ্মণা বা সহ কালান্তরেণ মুখ্যমমৃতত্বমেতি-ভুক্ত। ভোগাননুপমান্ ব্রহ্মলোকগতান্। বিষক্ নানাবিধগতয়ঃ অন্যা নাড্য উৎক্রমণে উৎক্রমণনিমিত্তং ভবন্তি; সংসারপ্রতিপত্যর্থা এব ভবন্তীত্যর্থঃ ॥ ১২৫ ॥ ১৬॥
সর্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্মরহিত, সর্বব্যাপী ব্রহ্মকে আত্মরূপে অবগত হওয়ায় যাহার সমস্ত অবিদ্যা-গ্রন্থি বিধ্বস্ত হইয়াছে; জীবদবস্থায়ই ব্রহ্ম-
ভাবাপন্ন সেই জ্ঞানীর আর লোকান্তরে গতি হয় না, ‘[ব্রহ্মবিৎ পুরুষ] এই দেহেই ব্রহ্ম ভোগ করেন; এই উদাহৃত শ্রুতি দ্বারা এ কথা পূর্ব্বেও উক্ত হইয়াছে এবং এতদনুকূলে ‘তাঁহার প্রাণ উৎক্রান্ত বা লোকান্তরগামী হয় না।’ ‘[ব্রহ্মবিৎ পুরুষ] ব্রহ্ম হইয়াই ব্রহ্ম প্রাপ্ত হন।’ ইত্যাদি আরও শ্রুতি উদাহৃত হইয়াছে। আর যাহারা অল্পপরিমাণে ব্রহ্মজ্ঞ, অথবা[পঞ্চাগ্নি-বিদ্যা প্রভৃতি] অপরাপর বিদ্যার অনুশীলন করিয়া ব্রহ্মলোকগামী হন; এবং যাহারা ঐ প্রকার নহে—সংসারগামী; এখন তাহাদের বিভিন্নপ্রকার গতির কথা অভিহিত হইতেছে, —প্রস্তাবিত ব্রহ্মবিদ্যাফলগত উৎকর্ষের প্রশংসা করাই ইহার উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন। আরও এক কথা,—অগ্নিবিদ্যা জিজ্ঞাসিত ও বর্ণিত হইয়াছে মাত্র; এখন তাহারও ফললাভের প্রকার বলা আবশ্যক। এই কারণে এই মন্ত্রের অবতারণা হইয়াছে।
পুরুষের হৃদয়-প্রদেশ হইতে শত অর্থাৎ শতসংখ্যক ও সুষুম্না নামক একটি—এই একশত একটি নাড়ী নির্গত হইয়াছে; তন্মধ্যে একটি সুষুম্নানামক নাড়ী মূর্দ্ধদেশ(ব্রহ্মরন্ধ্র) ভেদ করিয়া বহির্গত হইয়াছে। অন্তকালে আত্মাকে বশীভূত করিয়া স্বহৃদয়ে সেই নাড়ীর সহিত সংযোজিত করিবে। সেই নাড়ীর সাহায্যে উর্দ্ধে উৎক্রাস্ত হইয়া আদিত্য-মণ্ডলের দ্বারা অমৃতত্ব অর্থাৎ অমরত্ব লাভ করেন। ‘ভূতসংপ্লব’ অর্থ—প্রলয় কাল; তৎকালপর্যন্ত বর্তমান থাকাকে ‘অমৃতত্ব’ বলা হয়।’ এই স্মৃতিবাক্য অনুসারে জানা যায় যে, এই অমৃতত্ব ধর্মটি আপেক্ষিক অর্থাৎ অপরাপর অপেক্ষা দীর্ঘকালস্থায়িত্ব মাত্র। অথবা; তাঁহারা ব্রহ্মলোকে যাইয়া সেখানে অনুপম বিষয় সমূহ ভোগ করিয়া সেই ব্রহ্মার লয় কালে ব্রহ্মার সহিত যথার্থ অমৃতত্ব অর্থাৎ মুক্তি লাভ করেন। অপর নাড়ী সমূহ উৎক্রমণকালে নানাপ্রকার গতি লাভের কারণ হইয়া থাকে। অর্থাৎ অপরাপর
নাড়ী দ্বারা উৎক্রমণ হইলে জীবের বিভিন্ন লোকে গতি হইয়া থাকে। ফল কথা, সেই সকল নাড়ী কেবল সংসার প্রাপ্তিরই নিদান হইয়া থাকে মাত্র * ॥ ১২৫ ॥ ১৬ ॥
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষোহন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ। তং স্বাচ্ছরীরাৎ প্রবৃহেন্মুঞ্জাদিবেষীকাং ধৈর্য্যেণ। তং বিদ্যাচ্ছুক্রমমৃতং তং বিদ্যাচ্ছুক্রমমৃতমিতি ॥১২৬৷১৭৷৷
অথ সর্ব্ববল্যর্থমুপসংহরন্ আহ—অঙ্গুষ্ঠমাত্র ইত্যদি; অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ(অঙ্গুষ্ঠ- পরিমাণ-হৃদয়াভিব্যক্তত্বাৎ) পুরুষঃ(পুরি--হৃদয়ে শেতে, ইতি পুরুষঃ) অন্তরাত্মা (অন্তর্যামী) সদা(নিয়তং) জনানাং(প্রাণিনাং) হৃদয়ে(অন্তঃকরণে) সন্নিবিষ্টঃ (অবস্থিতঃ)[অস্তি]।[মুমুক্ষুঃ] মুঞ্জাৎ(তদাখ্যতৃণাৎ) ইষীকাং(গর্ভস্থদলং) ইব স্বাৎ(স্বকীয়াৎ) শরীরাৎ তং(অন্তর্য্যামিনং) ধৈর্য্যেণ(তিতিক্ষয়া) প্রবৃহেৎ (পৃথক্ কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ)। তং(দেহাৎ নিষ্কৃষ্টং) শুক্রং(শুদ্ধং) অমৃতং(ব্রহ্ম) বিদ্যাৎ(বিজানীয়াদিত্যর্থঃ)। উপনিষৎ-সমাপ্তৌ দ্বির্বচনম্ ॥
এখন সমস্ত বল্লীর অর্থ সংক্ষেপে উপসংহার করিতেছেন,—অঙ্গুষ্ঠ- পরিমিত অন্তর্যামী পুরুষ প্রাণিগণের হৃদয়ে সর্ব্বদা সন্নিবিষ্ট আছেন। মুমুক্ষু ব্যক্তি মুঞ্জাতৃণ হইতে যেরূপ ইষীকা(মধ্যের ডগটি) বাহির করেন, সেইরূপ ধৈর্য্য সহকারে সেই অন্তর্যামী পুরুষকে স্বীয় শরীর হইতে পৃথক্ করিবেন; এবং তাহাকেই শুদ্ধ অমৃতময় ব্রহ্ম বলিয়া জানিবেন। গ্রন্থসমাপ্তি জ্ঞাপনার্থ দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥ ১২৬৷৷১৭॥
ইদানীং সর্ব্ববল্যর্থোপসংহারার্থমাহ—অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষঃ অন্তরাত্মা সদা জনানাং সম্বন্ধিনি হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ যথা ব্যাখ্যাতঃ। তং স্বাৎ আত্মীয়াৎ শরীরাৎ প্রবৃহেৎ উদযচ্ছেৎ নিষ্কর্ষেৎ পৃথক্ কুৰ্য্যাদিত্যর্থঃ। কিমিব? ইত্যুচ্যতে—মুঞ্জাৎ ইব ইষীকাং অন্তঃস্থাং ধৈর্য্যেণ অপ্রমাদেন! তং শরীরান্নিষ্কৃষ্টং চিন্মাত্রং বিদ্যাৎ বিজানীয়াৎ— শুক্রং শুদ্ধম্ অমৃতং যথোক্তং ব্রহ্মেতি। তং বিদ্যাচ্ছক্রমমৃতমিতি দ্বির্বচন- মুপনিষৎসমাপ্ত্যর্থম্-ইতিশব্দশ্চ ॥ ১২৬ ॥ ১৭ ॥
এখন সমস্ত বল্লীর অর্থ উপসংহারার্থ বলিতেছেন,—অঙ্গুষ্ঠপরিমিত পুরুষ অন্তর্যামিরূপে সর্ব্বদা জনসম্বন্ধীয় হৃদয়ে সম্যরূপে নিবিষ্ট (বর্তমান) রহিয়াছেন। এই অংশের ব্যাখ্যা পূর্ব্বেও উক্ত হইয়াছে। তাহাকে স্বীয় শরীর হইতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক্ করিবে। কাহার ন্যায়? তাই বলা হইতেছে যে, মুঞ্জ হইতে তাহার অন্তঃস্থিত ইষীকাকে যেরূপ, সেইরূপ ধৈর্য্য সহকারে অর্থাৎ অপ্রমাদ সহকারে। শরীর- নিষ্কৃষ্ট(শরীর হইতে পৃথকৃত) সেই চিন্ময় আত্মাকে পূর্ব্বোক্ত- প্রকার শুক্র(শুদ্ধ) অমৃত ব্রহ্মস্বরূপ বলিয়া জানিবে। পুনর্ব্বার যে ‘তাহাকে শুক্র অমৃত বলিয়া জানিবে’ বলা হইয়াছে; ইহা উপনিষৎসমাপ্তির সূচকমাত্র ॥ ১২৬॥ ১৭॥
মৃত্যুপ্রোক্তাং নচিকেতোহথ লব্ধা বিদ্যামেতাং যোগবিধিঞ্চ কৃৎস্নম্। ব্রহ্ম প্রাপ্তো বিরজোহভূদ্বিমৃত্যু- রন্যোহপ্যেবং যো বিদধ্যাত্মমেব ॥ ১২৭৷১৮৷৷ ইতি কাঠকোপনিষদি দ্বিতীয়াধ্যায়ে তৃতীয়া বল্লী সমাপ্তা ॥ ২॥৩ ইতি কাঠকোপনিষৎ সমাপ্তা ॥
ইদানীমাখ্যায়িকার্থমুপসংহরন্তী শ্রুতিরাহ-মৃত্যুপ্রোক্তামিতি। অথ (অনন্তরং) নচিকেতঃ(নচিকেতাঃ) মৃত্যুপ্রোক্তাং(যমেন কথিতাং) এতাং (পূর্ব্বোক্তপ্রকারাং) বিদ্যাং(তত্ত্বজ্ঞানং) কৃৎস্নং(সসাধনং সফলং চ) যোগ- বিধিং(যোগানুষ্ঠানং) চ লব্ধা(অধিগম্য)[প্রথমং] বিরজঃ(নির্দোষঃ) বিমৃত্যুঃ(মৃত্যুকারণীভূতাবিদ্যারহিতশ্চ সন্) ব্রহ্মপ্রাপ্তঃ(ব্রহ্মস্বরূপ এব) অভূৎ। অন্যোহপি যঃ(কশ্চিৎ) এবং অধ্যাত্মং এবংবিৎ(প্রাগুক্তরূপমেব আত্মানং বেত্তি(জানাতি)[সোহপি নচিকেতোবদেব ব্রহ্মপ্রাপ্তো ভবতীতি ভাবঃ]। এখন আখ্যায়িকার বিষয় উপসংহার পূর্ব্বক শ্রুতি বলিতেছেন-অনন্তর নচিকেতা মৃত্যুকর্তৃক কথিত এই ব্রহ্মবিদ্যা ও সমস্ত(সাধন ও ফল সহকারে) যোগানুষ্ঠান পদ্ধতি অবগত হইয়া রজঃ(পাপাদি দোষ) রহিত ও বিমৃত্যু, অর্থাৎ মৃত্যুর কারণীভূত অবিদ্যাবিহীন হইয়া ব্রহ্মপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অপরও যে লোক এই প্রকারেই আত্মতত্ত্ব অবগত হয়,[সেও নচিকেতার ন্যায় বিরজঃ, বিমৃত্যু, হইয়া ব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়] ॥ ১২৭ ॥ ১৮ ॥
শ্রীদুর্গাচরণোৎপৃষ্ট। সরলা স্যাৎ সতাং মুদে ॥
ইতি দ্বিতীয়াধ্যায়ে কাঠকোপনিষদি তৃতীয়া বল্লী-ব্যাখ্যা সমাপ্তা।
শাঙ্কর-ভাষ্যম্।
বিদ্যান্তত্যর্থোহয়মাখ্যায়িকার্থোপসংহারঃ অধুনোচ্যতে,-মৃত্যুপ্রোক্তাং যমোক্তা- মেতাং বিদ্যাং ব্রহ্মবিদ্যাং যোগবিধিঞ্চ কৃৎস্নং সমস্তং সোপকরণং সফলমিত্যেতৎ। নচিকেতাঃ অথ বর প্রদানান্মৃত্যোঃ লব্ধা প্রাপ্যেত্যর্থঃ। কিং? ব্রহ্মপ্রাপ্তোহভূৎ মুক্তোহভবদিত্যর্থঃ। কথং? বিদ্যাপ্রাপ্ত্যা বিরজো বিগতরজাঃ বিগতধর্মাধর্মো বিমৃত্যুঃ বিগতকামাবিদ্যশ্চ সন্ পূর্ব্বমিত্যর্থঃ। ন কেবলং নচিকেতা এব* অন্যোহপি য এবং নচিকেতোবৎ আত্ম- বিৎ অধ্যাত্মমেবং নিরুপচরিতং প্রত্যস্বরূপং প্রাপ্যতত্ত্বমেবেত্যভিপ্রায়ঃ। নান্যদ্রূপপ্রত্যগ্রুপং তদেবমধ্যাত্মম্ এবম্ উক্তপ্রকারেণ যো বেদ
বিজানাতীতি এবংবিৎ, সোহপি বিরজাঃ সন্ ব্রহ্ম প্রাপ্য বিমৃত্যুর্ভবতীতি বাক্যশেষঃ ॥ ১২৭ ॥ ১৮ ॥
ইতি কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়াধ্যায়ে তৃতীয়া বল্লী সমাপ্তা ॥ ইতি পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শ্রীগোবিন্দভগবৎ-পূজ্যপাদ-শিষ্য-শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ কাঠকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়োহধ্যায়ঃ ॥ ২॥
সম্প্রতি এতদুপনিষদুক্ত বিদ্যার প্রশংসার্থ আখ্যায়িকায় বর্ণিত বিষয়ের উপসংহার করা হইতেছে,-নাচিকেতা মৃত্যুকর্তৃক বর প্রদানের পর যথোক্ত এই ব্রহ্মবিদ্যা এবং কৃৎস্ন(সাকল্যে) অর্থাৎ যোগোপায় ও যোগ-ফলের সহিত যোগবিধি(যোগানুষ্ঠান পদ্ধতি) অবগত হইয়া কি হইলেন? না—ব্রহ্মপ্রাপ্ত অর্থাৎ মুক্ত হইলেন। কি প্রকারে?— বিদ্যা-প্রাপ্তির ফলে প্রথমে বিরজ অর্থাৎ ধর্ম্মাধর্ম্ম রূপ রজোদোষ- রহিত এবং বিমৃত্যু অর্থাৎ বিষয়বাসনা ও অবিদ্যাশূন্য হইয়া। কেবল নচিকেতাই নহে, অপরও যে কোন লোক নচিকেতার ন্যায় অধ্যাত্ম অর্থাৎ প্রকৃত প্রত্যক্-আত্মা স্বরূপ ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হইয়া—যাহা প্রত্যক্ স্বরূপ নহে, এমন অর্চ্চিরাদি মার্গ প্রাপ্ত না হইয়া পূর্ব্বোক্ত প্রকারে আত্মতত্ত্ব পরিজ্ঞাত হয়, সেই অধ্যাত্ম-তত্ত্বজ্ঞ(এবংবিৎ) ব্যক্তিও বিরজ হইয়া ব্রহ্মলাভ করতঃ বিমৃত্যু(মৃত্যুরহিত অমৃত) হয় ॥ ১২৭ ॥ ১৮ ॥
ইতি কঠোপনিষদে দ্বিতীয়াধ্যায়ে তৃতীয়বল্লীর ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ কঠোপনিষৎ সমাপ্ত।
সহ নাববতু। সহ নৌ ভুনক্তু। সহ বীর্য্যং করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্ত মা বিদ্বিষাবহৈ ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥